সাহিত্যের উন্নয়ন ও বিকাশে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অবদান

ভূমিকা :

হযরত রাসূলুল্লাহ (সা.) ছিলেন একজন ইনসানে কামিল- পূর্ণাঙ্গ মানুষ । মানুষ হিসেবে তিনি সকল মানবীয় গুণের অধিকারী ছিলেন । তাঁর সাহিত্য-চিন্তা ও অনুরাগের কথা আমরা অনেকেই জানি না । অথচ সাহিত্যের অঙ্গনেও তিনি ছিলেন একজন যর্থাথ প্রবাদ পুরুষ । আরবদের মধ্যে তিনি ছিলেন সবার চাইতে সেরা বিশুদ্ধভাষী- أفصح العرب । তিনি সাহিত্য-পরিবেশে জন্ম লাভ করেন এবং প্রতিপালিতও হন বনূ সা‘দ গোত্রে , যেখানে বিশুদ্ধ আরবী ভাষার প্রচলন ছিল । তাঁর মাতা আমিনা , পিতৃব্য আবূ তালিব ও ফুফীরা সকলেই যুগধর্মের দাবীতে স্বভাব কবি ছিলেন । রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে কবি না হয়েও কবি ও কবিতার একনিষ্ঠ পৃষ্ঠপোষক ও সমঝদার ছিলেন । সাহিত্যের এমন কোন এলাকা নেই , যেখানে তাঁর অবদানের প্রভাব পড়েনি । রাসূলুল্লাহ (সা.) আরবদেশে জন্ম গ্রহণ করেন । কিন্তু তাঁর অবদানের প্রভাবে কেবল আরবী সাহিত্যই সমৃদ্ধ হয়নি ; বরং তাঁর অবিস্মরণীয় অবদানের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রভাব তাঁর নিজের দেশের সাহিত্যের সীমা অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বের সকল দেশের সকল জাতির সাহিত্যে বিস্তার লাভ করেছে । আর তার ফল্গুধারা সকল কালের সকল মানুষকে সমৃদ্ধতর করে তুলতে অব্যাহত অবদান রাখছে ।

সাহিত্য কি ?

শিল্পী যখন তাঁর শিল্পকর্মের মাধ্যমে শিল্পকে প্রকাশ করেন , তখন তিনি বাইরের বিশ্বের রূপ-রস- গন্ধ-স্পর্শ-শব্দকে ব্যক্তিগত অনুভূতির রসে সিক্ত করে তাঁর অন্তর পুরুষকেই প্রকাশ করেন । পরিদৃশ্যমান জগতের ভাব যখন তাঁর নিজের ভাবনায় মিশে যায় , তখন বাহ্য জগতের কথাই তাঁর নিজের কথায় পরিণত হয় । আর সে কথাই যখন শিল্পীর মনের রসে জারিত হয়ে , তার প্রজ্ঞার আলোকে নিষিক্ত হয়ে বহির্বিশ্বের ভাষায় রূপ পায় , তারই শিল্পসঙ্গত সুষম প্রকাশ হল সাহিত্য ।

আর মানুষ যেহেতু বিবেকবান প্রাণী , তাই তার মধ্যে পশুবৃত্তির সাথে সাথে বিবেক-বুদ্ধি এবং অনুভূতিও রয়েছে । মূলত: বিবেক-বুদ্ধি ও অনুভূতির সুবাদেই মানুষ আশরাফূল মাখলুকাত- সৃষ্টির সেরা জীবের মর্যাদায় উন্নতি লাভ করতে পেরেছে । মানুষের বিবেক-বুদ্ধি ও অনুভূতি- এদুটি গুণ ছাড়াও তাদের আরেকটি গুণ রয়েছে । তা হল মানুষ সমাজবদ্ধ জীব । আমরা সকলেই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল । ব্যক্তিবিশেষ বলে যতই নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চাই না কেন , আমাদের সামগ্রিক সত্তায় সমাজ ও জাতির প্রতিনিধিত্ব বিদ্যমান । তাই আমাদের মধ্যে আমাদের অতীত , বর্তমান ও ভবিষ্যত একই সঙ্গে ক্রিয়াশীল । মানুষের মধ্যে আরো একটি সত্তা নিয়ত ক্রিয়াশীল । সেটি হল সকল ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ তা‘আলার অদৃশ্য চিরন্তন সত্তা । প্রকৃত সাহিত্যিকের শিল্পকর্মে তাঁর এসকল সত্তা একত্রে বিদ্যমান থাকে ।

মন্ময় (subjective) ও তন্ময় (objective) ধারায় প্রবাহিত সাহিত্যকর্মে কখনো ফুটে ওঠে বুদ্ধির দীপ্তি , কখনো বা মনের অনুভূতি , আবার কখনো বা প্রধান হয়ে ওঠে বাণী বিন্যাসের কলা-কৌশল । তবে যেভাবে হোক , তাতে জগত ও জীবন পদ্য ও গদ্য তথা সাহিত্যের বিভিন্ন ফর্মে সাহিত্যিকের জ্ঞান সিঞ্চিত মহৎ রসচেতনায় নিবেদিত হয় । রসবোদ্ধা তখন তাতে শিল্পীর সাক্ষাত পায় । আর তাঁর দর্পনে দেখে নিজেকেও । এভাবে সে আত্ম দর্শনের মাধ্যমে অতীতকে মন্থন করে বর্তমানকে উপলব্ধি করে নির্মাণ করে ভবিষ্যতকে । আর এ-ই হলো প্রকৃত সাহিত্যিক ও সাহিত্য বোদ্ধার আস্বাদন । এ ধরনের সার্থক ও যর্থাথ সাহিত্যের সুপথিকৃত ছিলেন আমাদের প্রিয় নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) , যা নিম্নের আলোচনা থেকে পরিস্ফুট হয়ে ওঠবে ।

জাহিলী যুগের সাহিত্যের স্বরূপ :

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আবির্ভাবের পূর্বে আরবী সাহিত্যের তখনকার সময়ের একমাত্র বাহন- কবিতার বিষয়বস্তু ছিল যুদ্ধের পায়ঁতারা , মদ্যপান , অশ্লীলতা , কাম-ক্রোধ , সম্পদ লুণ্ঠন , অন্যের বিরুদ্ধে উস্কানী , গোলযোগ সৃষ্টি ও নারী সম্ভোগ সহ সর্বপ্রকারের উচ্ছৃঙ্খল জীবন যাত্রার উজ্জ্বল বর্ণনা ; যার বর্ণনা কৌশল এতোই মারাত্মক ছিল যে , তার পাঠক তা পাঠ করে অন্যায় ও অসত্যের দিকে সহজেই ধাবিত হত । তদুপরি তখন উকাযের মেলাকে কেন্দ্র করে কবিদের মধ্যে চলতো সাহিত্য প্রতিযোগিতা । দ্বন্দ্ব , কোন্দল ও ব্যক্তির বড়াই নিয়ে কবিদের চলতো প্রতিভার পারঙ্গমতা । কবিরা নিজ নিজ গোত্রের শৌর্য-র্বীয ও রণ-চাতুর্যের কাহিনী আবৃত্তি করে উপস্থিত দর্শকদের মধ্যে উত্তেজনা সৃষ্টি করতো । ফলে বংশের কুৎসা ও কলংক রটনা নিয়ে কবিতার এমন লড়াই হতো যে , অধিকাংশ সময় তা সর্বনাশ বয়ে আনতো । এরূপ ঘটনা থেকেই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাল্যকালে ফিজারের যুদ্ধের সুচনা হয় । এযুদ্ধে হিজাযের সমস্ত গোত্র ও গোষ্ঠী জড়িত হয়ে সাহিত্য-সংস্কৃতির রূপায়নের নামে হত্যা , মিথ্যে অহংকার , মুর্খতা , ও দুর্বিনীতার পরিচয় দিয়ে মনুষ্যত্বকে লুটিয়ে দিয়েছিল । তদুপরি কবিরা এমন এক পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছিল যে , তখন কেউ কোন নতুন কথা বললেই তাকে কবির মনগড়া মিথ্যা আশ্রিত বক্তব্য বলে সাব্যস্ত করা হতো। এ ধরনের অবস্থায় রাসূলুল্লাহ (সা.) পবিত্র কুর’আনের বাণী প্রচার করলে তাঁকে কাফিররা কবি বলে অতি মাত্রায় অবজ্ঞা করতে থাকে । রাসূলুল্লাহ (সা.) বিভিন্ন যুক্তির মাধ্যমে তাদের এ অভিযোগের জবাব দেন ; কিন্তু তাতেও তারা অপপ্রচারে ক্ষান্ত হয়নি । ঠিক এমুহুর্তে আল্লাহ তা‘আলা এজাতীয় বিভ্রান্ত ও বিকৃত মস্তিষ্কের কবিদের সর্ম্পকে বলেছেন : و الشعراء يتبعهم الغاون ’ ألم تر أنهم في كل واد يهيمون ’ و أنهم يقولون ما لا يفعلون -“ আর বিভ্রান্ত লোকেরাই কবিদের অনুসরণ করে । তুমি কি দেখতে পাও না , তারা উপত্যকায় উপত্যকায় উ™£ান্তের মতো ঘুরে বেড়ায় । তদুপরি তারা মুখে যা বলে কাজে তা করে না ।” ( আল-কুর’আন , ২৬ : ২২৪-২২৬ )

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহিত্য চিন্তা :

রাসূলুল্লাহ (সা.) উপলব্ধি করেন যে , সমাজ বিনির্মাণ ও বিবর্তনের ক্ষেত্রে সাহিত্য-সংস্কৃতি গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখে । সুষ্ঠু , সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ গঠনে যেমন মানবতাবাদী পরিচ্ছন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতি অপরিহার্য , তেমনি মানবতাবিরোধী ও অশ্লীল সাহিত্য-সংস্কৃতি যে কোন সমাজকে ধ্বংস ও বিপর্যয়ের দ্বার প্রান্তে ঠেলে দেয় । তাই তিনি সুস্থ , রুচিকর , সৃজনশীল মানবতাবাদী সাহিত্য সৃষ্টির জন্য নির্দেশ দান করেছেন , অনুপ্রেরণা যোগিয়েছেন । অপর দিকে অশ্লীল , অরুচিকর মানবতা-বিধ্বংসী সাহিত্যকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছেন এবং এর রচয়িতাদের নিন্দা করেছেন । হযরত আবূ সা‘ঈদ খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন : “একবার জনৈক কবি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে অশ্লীল কবিতা পাঠ করল । তখন তিনি বলেছিলেন : ধরো , শয়তানকে বন্দী করো । এরকম লোকের পেট কবিতা দ্বারা ভর্তি হওয়ার চাইতে পুঁজে ভর্তি হওয়া অনেক ভালো ।” কবি হাস্সান (রা.) কে একবার প্রশ্ন করা হলো , শ্রেষ্ট কবি কে ? তিনি বললেন : ইমরাউল কায়স । রাসূলুল্লাহ (সা.) এখবর শুনে বললেন : “হাস্সান ঠিকই বলেছেন । নিশ্চয় তার ভাষায় সম্মোহনী শক্তি রয়েছে এবং কাব্যকর্মে রয়েছে বর্ণনার পরিপাট্য । কিন্তু দুনিয়ায় সে শ্রেষ্ট কবির মর্যাদার পেলেও পরকালে তার কোন মর্যাদা নেই । পরকালে সে অতি হীন-তুচ্ছ । নরকের অগ্নিদ্বারে সে তার সমগোত্রীয় কবিদের নেতৃত্ব দেবে । ” অন্য বর্ণনায় রয়েছে , একবার রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মজলিসে কবিদের নিয়ে আলোচনা হলো । ইমরাউল কায়সের প্রসঙ্গ এলে তিনি বললেন : “ দুনিয়ায় সে খ্যাতনামা কবি হলেও আখিরাতে তার নাম নেয়ার কেউ থাকবে না । যে সব কবি জাহান্নামে যাবে সে হবে তাদের অগ্রবর্তী পতাকাবাহী । ” এর কারণ হচ্ছে , তার কবিতায় গভীর জীবনবোধের চি‎‎হ্ণ ছিল না । তার কবিতা ছিল উদ্দেশ্যহীন ও লাগামহীন । এর শিরা-উপশিরায় ব্যক্তিগত বাহাদুরী , অবৈধ প্রেমের অশ্লীল বর্ণনা , স্বগোত্রের গরিমা , অন্য গোত্রের নিন্দা , অহংকার , বিদ্রƒপ , মদ ও নারী সম্ভোগ সহ নানা প্রকার অসামাজিক ও অনৈতিক কথাবার্তাই প্রবাহিত ছিল । অবশ্যই যে সব কবিতার বিষয়বস্তু ছিল সত্য ও সুন্দরের বর্ণনা , মানব কল্যাণ , নৈতিকতা ও মানবিকতা রাসূলুল্লাহ (সা.) সে সব কবিতার সৌন্দর্যকে স্বীকার করতেন । বর্ণিত রয়েছে , একবার হযরত শারীদ সকফী (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কবি উমাইয়্যা ইবন আবিচ্ছলতের কবিতা পড়ে শুনাচ্ছিলেন । কিছু কবিতা আবৃত্তি করার পর তিনি বললেন : “ আরো শুনাও । ” একশ’ টি পযর্ন্ত চরণ রাসূলুল্লাহ (সা.) শুনলেন , অতঃপর তিনি বললেন : أمن شعره و كفر قلبه - “ আরে তার কবিতা তো ঈমানদার হয়ে গেছে । অথচ তার অন্তর আজো কাফির রয়ে গেছে । ” অন্য বর্ণনায় রয়েছে , “ উমাইয়া তো প্রায় মুসলমান হয়ে গিয়েছিলো ।” অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন : “আমি ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা.) কে নির্দেশ দিলাম কবিতার রচনার , ভালই করেছে সে । কা‘ব ইবন মালিক (রা.) সেও সুন্দর কবিতা উপহার দিয়েছে । নির্দেশ দিলাম হাস্সান ইবন সাবিত (রা.) কে , সে আমাদের তৃপ্তি দান করেছে এবং নিজেও পরিতৃপ্ত হয়েছে । ” কবি ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা.)-এর কবিতা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলতেন : “দেখো , তোমাদের ভাইয়ের কবিতা কতো অনাবিল ও পরিচ্ছন্ন।” সাহাবী কবি লাবীদ (রা.)-এর একটি কবিতা রাসূলুল্লাহ (সা.) খুব বেশী পছন্দ করতেন । এ কবিতার একটি চরণ ছিল :

ألا كل شيء ما خلا الله باطل و كل نعيم لا محالة زائل

‘‘সাবধান হও ! আল্লাহ ছাড়া মিথ্যা সকলি আর

সব নি‘আমত এই পৃথিবীর

লোপ পাবে একদিন । ”

আন্তারা ইবন শাদ্দাদ জাহিলী যুগের একজন প্রখ্যাত কবি ছিলেন । রাসূলুল্লাহ (সা.) নবুওয়াত প্রাপ্তির বিশ বৎসর আগে তাঁর মৃত্যু হয় । তাঁর কবিতা আরববাসীর মুখে মুখে প্রচারিত ছিলো এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও তার কবিতায় মুগ্ধ ছিলেন । তাঁর সর্ম্পকে তিনি বলেন : “ আন্তারাহ ছাড়া অন্য কোন আরববাসীর এতো প্রশংসা আমার কানে পৌঁছে নি । ( জীবিত থাকলে ) তাঁকে দেখার আমার বড় ইচ্ছে ছিল । ”

বস্তুত তাঁর নিকট কবিতা হলো কথার মতোই । ভালো কথা যেমন সুন্দর , তেমনি ভালো কবিতাও সুন্দর । খারাপ কবিতা খারাপ কথার মতোই অপছন্দনীয় । তিনি বলেন : “ নিশ্চয়ই কবিতা হচ্ছে সুসংবদ্ধ কথামালা । কাজেই যে কবিতা সত্য আশ্রিত সে কবিতা সুন্দর , আর যে কবিতা সত্য বিবর্জিত সে কবিতার মধ্যে কোন কল্যাণ নিহিত নেই । ” অন্যত্র তিনি বলেছেন : “ ইসলাম গ্রহণের পরও যে অশ্লীল কবিতা ছাড়তে পারলো না , সে যেনো তার জিভটাই নষ্ট করে ফেললো । ”

সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষক হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা.) :

সাহিত্য সমাজের একটি দর্পন । সমাজকে সঠিক পথ নির্দেশ দানের ক্ষেত্রে এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ । কারণ , সাহিত্যের আবেদন হলো মানুষের মন বা অনুভূতির কাছে । মন বা অনুভূতি মানুষকে যে ভাবে , যে পথে তাড়িত করে , সেটাই হয় সেই নির্দিষ্ট মানব সমাজের লক্ষ্য বা আদর্শ । সে জন্য সাহিত্যের যারা চর্চা করেন , তাদের সৃষ্টিকর্মে উৎসাহ প্রদান যেমন প্রয়োজন , আবার তাদেরকে যথোপযুক্ত পথ নির্দেশনা প্রদান আরো বেশী গুরুত্বপূর্ণ । একারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) কবিদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দিতেন । বিভিন্ন এনাম-পুরস্কার দিয়ে তাঁদেরকে কাব্য চর্চায় উৎসাহ দান করতেন । সাহিত্যের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.) যে কতো উদার পৃষ্ঠপোষক ছিলেন নিম্নের কয়েকটি ঘটনা থেকে তার প্রকৃষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায় ।

ক. কবি কা‘ব ইবন যুহায়র ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ঘোর বিরোধী । তিনি ইসলাম সর্ম্পকে কুৎসাপূর্ণ কবিতাই শুধু রচনা করেননি ; তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন নাশেরও চেষ্টা করেছিলেন । কিন্তু পরবতীর্তে কবি নিজের ভুল বুঝতে পেরে ইসলাম গ্রহণ করেন । এসময় তিনি রচনা করেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শানে বিখ্যাত প্রশস্তি গাঁথা - বানাত সু‘আদ । রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর এ কবিতা শুনে এতোই অভিভূত হয়ে পড়েন যে , তিনি তার নিজ কাঁধ থেকে অতি মূল্যবান বুরদা-চাদরটি কবিকে উপঢৌকন হিসেবে দিয়ে তাঁকে বিরল সম্মানে ভূষিত করেন । রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এ উপহার কবি কা‘বকে এমনি ভাবে আলোড়িত করেছিল যে , তিনি মৃত্যুপূর্ব পর্যন্ত সম্মানের সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এ চাদর আকঁড়ে রেখেছিলেন । কবির মৃত্যুর পর তাঁর ছেলের নিকট থেকে মু‘আবিয়া (রা.) এ চাদরটি চল্লিশ হাজার দিরহামের বিনিময়ে ক্রয় করেন । বর্তমানে এটা তুরস্কের ইকব্যাপী প্যালেস মিউজিয়ামে ধর্মীয় স্মারক বিভাগে সংরক্ষিত রয়েছে ।

খ . রাসূলুল্লাহ (সা.) মসজিদে নববীতে কবি হাস্সান ইবন সাবিত (রা.)-এর জন্য একটি উচুঁ মিম্বর তৈরী করে দিয়েছিলেন । তার ওপর আরোহন করে হাস্সান রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশংসা গীতি ও মুশরিক কবিদের নিন্দা ও কুৎসার জবাবে রচিত নিন্দা কবিতা ও ইসলামের গৌরব গাঁথা আবৃত্তি করতেন । এগুলো শুনে মহানবী (সা.) কখনো বলতেন , “ হাস্সানের কন্ঠ যতোদিন পর্যন্ত রাসূলের পক্ষ হয়ে কবিতার বাণী শুনিযে যাবে , ততোদিন তাঁর সাথে জিব্রীল (আ.) থাকবেন । ” অন্য এক বর্ণনায় রয়েছে , হাস্সান (রা.) কবিতা আবৃত্তি শুরু করলে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁর জন্যে এ বলেও দু‘আ করতেন : “ হে আল্লাহ ! রুহুল কুদসকে দিয়ে তুমি তাঁকে সাহায্য করো । ” রাসূলুল্লাহ (সা.) কবি হাস্সান কে কতোটুকু ভালবাসতেন তা এঘটনা থেকে অনুমান করা যায় যে , যখন মিসরের শাসনকর্তা মুকাওকিস দুজন সুন্দরী মহিলা- মারিয়া কিবতীয়া ও তাঁর সহোদরা সিরীন কে উপঢৌকন হিসেবে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর খিদমতে পেশ করেন , তখন তিনি মারিয়াকে নিজের স্ত্রী হিসেবে গ্রহণ করেন এবং সিরীনকে কবি হাস্সানের স্ত্রী হিসেবে পেশ করেন ।

গ . কবি কুররা ইবন হুবায়রা ইসলাম গ্রহণ করার পর রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁকে দুটি চাদর উপহার দেন । উপরন্তু তাঁকে স্বীয় ঘোড়ার পিঠে আরোহন করান এবং তাঁকে তাঁর সম্প্রদায়ের নেতা মনোনিত করেন ।

ঘ . কবি নাবিঘা ইসলাম কবুলের পর রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে উপস্থিত হয়ে একটি কবিতা পাঠ করেন । কবিতাটি শুনে তিনি খুশী হয়ে তাঁর জন্যে এভাবে দু‘আ করেন , আল্লাহ তোমার মুখ অক্ষত রাখুক ! আল্লাহ তা‘আলা এ দু‘আ কবুল করেন এবং আমৃত্যু তাঁর চেহারা অক্ষত থাকে । এমনকি , তাঁর মুখের কোন দাঁত পড়ে গেলেও সেখানে নতুন দাঁত গজাত ।

ঙ . হুনায়ন যুদ্ধে প্রাপ্ত গনীমতের মাল থেকে রাসূলুল্লাহ (সা.) কবি ‘আব্বাস ইবন মিরদাস (রা.) কে দিলেন চারটি সবল উট । এতে তাঁর মন ভরলো না । ফলে অনুযোগের সুরে তিনি কবিতার ভাষায় আক্ষেপ প্রকাশ করলেন । এটা শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন , তোমাদের মধ্যে এমন কেউ কি আছে , যে কবিকে সন্তুষ্ট করতে পারে ? সঙ্গে সঙ্গে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চির অন্তরঙ্গ সঙ্গী হযরত আবূ বকর (রা.) এগিয়ে এলেন । কবিকে সাথে নিয়ে তাঁকে ইচ্ছেমতো একশোটি উট বেছে নিতে বললেন । কবি আনন্দে আত্মহারা হলেন ।

এভাবেই রাসূলুল্লাহ (সা.) কবিদেরকে সম্মান ও মর্যাদা দিতেন । বিভিন্ন হাদিয়া-পুরস্কার দিয়ে তাঁেদরকে কাব্য চর্চায় উদ্বুদ্ধ করতেন । এর দ্বারা বোঝা যায , রাষ্ট্রের বা সমাজের একটি দায়িত্ব হলো , কবি-সাহিত্যিকদের পৃষ্ঠপোষকতা প্রদান । রাসূলুল্লাহ (সা.)ও একটি হাদীসে বলেছেন : “ কবিদের আর্থিক সহযোগিতা করা পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার সমতুল্য ।” অন্য হাদীসে তিনি বলেছেন : “ তোমরা তোমাদের সন্তান-সন্ততিদের কবিতা শেখাও । এতে তাদের ভাষা মিষ্টি ও সুরেলা হবে । ”

রাসূলুল্লাহ (সা.) কবিদের উৎসাহিত করেই ক্ষান্ত হননি ; বরং তিনি একদল সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মী গড়ে তোলেন , যাঁরা ছিলেন ইসলামের চিরন্তন আদর্শে উদ্বুদ্ধ সত্যের পতাকাবাহী সাহসী সৈনিক । সাহিত্য-সংস্কৃতির ময়দানে ছিল তাঁদের আপোষহীন সংগ্রাম । জাহিলী চিন্তা-চেতনার অবসান ঘটিয়ে সত্য-সুন্দর কল্যাণের প্রত্যাশী ইসলামী চেতনাদীপ্ত এ সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মীগণ জগতকে উপহার দিলেন এক নতুন ধরনের সমৃদ্ধ সাহিত্য , যেটা শুধু মনের তৃপ্তি সাধনই নয় ; মানব মুক্তির দিশারী হিসেবে ইসলামকে এক বিজয়ী শক্তি রূপে প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রেও তার সাফল্য অনস্বীকার্য ।

মদীনার ইসলামী রাষ্ট্রে সাহিত্য-সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডে যাঁরা সর্বাধিক উল্লেখযোগ্য ভূমিকা পালন করেন তাঁেদর মধ্যে হযরত ‘আলী , হাস্সান ইবন সাবিত , কা‘ব ইবন মালিক , আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা , কা‘ব ইবন যুহায়র , লাবীদ ইবন রাবী‘আ , আল-আসওয়াদ ইবনুস সারী , আল-নাবিগাহ ইবনুল জা‘দাহ , সুহায়ম , যুহায়র ইবন জুনাব , কুররা ইবন হুবায়রা ও মহিলা কবি খানসা (রা.) প্রমুখ কবিদের নাম বিশেষ ভাবে উল্লেখযোগ্য । ইসলাম , রাসূলুল্লাহ (সা.) ও সাহাবীদের বিরুদ্ধে কাফির-মুশরিকগণ কবিতা ও নানা হাস্য-কৌতুকের মাধ্যমে যে সব কুৎসা ও নিন্দামূলক রচনা লিখতো তার দাঁত ভাঙ্গা জবাব দেয়ার সাথে সাথে ইসলাম , মহানবী (সা.) ও সাহাবা কিরামের মর্যাদা ও সুখ্যাতি প্রচারে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কবি সৈনিকগণ সর্বদা প্রস্তুত থাকতেন । কবিদের যোগ্যতা ও প্রতিভার বিচার করে রাসূলুল্লাহ (সা.) তাঁদের প্রত্যেককে এক একটি বিশেষ দায়িত্ব অর্পন করেছিলেন । যেমন কবি কা‘ব ইবন মালিকের দায়িত্ব ছিল কাফির-মুশরিকদের মনে আল্লাহর ভয় সৃষ্টি করা , কবি ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহার দায়িত্ব ছিল বিপক্ষীয়দের কুকর্ম-দু®কৃতির পরিচয় তোলে ধরা । আর কবি হাস্সানের দায়িত্ব ছিল শত্রুদের বংশের দোষ-ত্রুটি তোলে ধরা , তাদের ব্যঙ্গ-বিদ্রুপের সমুচিত জবাব দেয়া । তিনি ইসলাম বিরোধীদের মুকাবিলায় কাব্যযুদ্ধে সেনাপতির ভূমিকা পালন করতেন । এছাড়া তিনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশস্তিসূচক কবিতা লেখার কারণে তিনি شاعر الرسول - ‘ রাসূলের কবি ’ নামে খ্যাতি অর্জন করেন । এ সর্ম্পকে হযরত ‘আইশা (রা.) থেকে বর্ণিত , তিনি বলেন , রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন : “ যাও , তোমরা মুশরিকদের প্রতিপক্ষে কবিতার লড়াইয়ে লেগে যাও । কারণ মু’মিন জিহাদ করে জান দিয়ে , মাল দিয়ে , জবান দিয়ে । মুহাম্মদের আত্মা যার হাতের মুঠোয় , তাঁর শপথ ! তোমাদের কবিতা তীরের ফলা হয়ে তাদের কলজে ঝাঁঝরা করে দেবে ।” সর্বপ্রথম ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা এ উদ্দেশ্যে এগিয়ে এলেন । সম্পূর্ণ মুগ্ধ হতে পারলেন না রাসূলুল্লাহ (সা.) । কা‘ব ইবন মালিকও এগিয়ে এলেন । অবশেষে যখন হাস্সান এলেন , তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন :“ সবশেষে তোমরা ওকে পাঠালে ? ওতো লেজের আঘাতে সংহারকারী তেজোদৃপ্ত সিংহশাবক । একথা শুনে আনন্দে জিভ নাড়তে লাগলেন হাস্সান এবং বললেন , যিনি আপনাকে সত্য বাণী সহ পাঠিয়েছেন তাঁর শপথ , এজিভ দিয়ে ওদের চামড়া ছুলে ফেলার মতো গাত্রদাহ সৃষ্টি করে ছাড়বো । ....”

আরবের বিভিন্ন গোত্রের নামকরা কবিগণ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দরবারে এসেছেন কবিতা ও বাগ্মিতার লড়াই করার জন্য। রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের সামনে তাঁর কবি-যোদ্ধাদের এগিয়ে দিয়েছেন। আরবের খ্যাতনামা যে সব কবি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কবি-যোদ্ধাদের সাথে কবিতা ও বাক-যুদ্ধে ধরাশায়ী হয়ে ফিরে গেছেন তাদের অনেকেই মুসলমান হয়ে ইসলামের কবি সৈনিকে পরিণত হয়েছেন । কবি কা‘ব ইবন যুহায়র ও কবি কুররা ইবন হুবায়রা (রা.) প্রমুখ ছিলেন এমনি ধরনের কবি ।

রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে কবি না হয়েও কবিতার প্রতি ভীষণ অনুরক্ত ও তার প্রভুত সমঝদার ছিলেন । তিনি অন্যের মুখে কবিতা আবৃত্তি শুনতে পছন্দ করতেন । হযরত ‘আলী (রা.) ও ‘উমর (রা.) তাঁকেই প্রায়ই কবিতা আবৃত্তি করে শুনাতেন । কোন ব্যক্তি কী ধরনের প্রতিভার অধিকারী এবং কে কোন ধরনের কবিতা রচনায় পারঙ্গমতা ও কৃতিত্ব প্রদর্শন করতে পারতেন রাসূলুল্লাহ (সা.) তা সহজেই বুঝতে পারতেন । হযরত ‘আলী (রা.) অতিশয় বিজ্ঞ ও একজন খ্যাতনামা কবি ছিলেন । কিন্তু কাফিরদের নিন্দা কাব্যের জবাবে যখন তাঁকে কবিতা লেখার নির্দেশ দেবার জন্য জনৈক সাহাবী রাসূলুল্লাহ (সা.) কে অনুরোধ জানালেন , তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) তাকে বুঝালেন যে , হযরত ‘আলী এজন্য উপযুক্ত নন । পরে এরূপ কবিতা লেখার জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.) কবি হাস্সান , কা‘ব ইবন মালিক ও ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহাকে নির্দেশ দিলেন । হাস্সান (রা.) এক্ষেত্রে পূর্ণ যোগ্যতার পরিচয় দেন । একবার হাস্সান (রা.)কে লক্ষ্য করে রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন : “ তুমি আবূ বকরের কাছে যাও । মুশরিকদের ইতিহাস-ঐতিহ্য , তাদের বিবাদ-বিসম্বাদের কালো অধ্যায় তিনি তোমাকে আনুপূর্বিক বলতে পারবেন । গুনে গুনে বংশের নানা দিক তোমাকে দেখাতে পারবেন । আর তুমিও সে আলোকে নিন্দা কাব্যরচনা করতে সক্ষম হবে । যাও , তোমার সাথে জিব্রীল আছেন । ” হাস্সান (রা.) খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে সব জেনে এলেন তাঁর কাছ থেকে । এবার রাসূলুল্লাহ (সা.) পথ নির্দেশনা দিলেন , অমুক নারী সর্ম্পকে কিছু বলো না । অমুক সর্ম্পকে বলতে পারো ......। যখন হাস্সানের কবিতা কুরায়শদের দুকান ছিদ্র করে দিতে চাইলো , তখন তারা প্রত্যেকে তাঁর স্বরে চিৎকার শুরু করলো এবং বলতে থাকলো , একি ! এসব আবূ বকর ছাড়া আর তো কেউ জানতো না ।

কুর’আন অবতীর্ণ হওয়ার পর কিছুদিনের জন্য কাব্যচর্চা থমকে দাঁিড়য়েছিল । এপ্রসঙ্গে কবি লাবীদের ঘটনা স্মরণীয় । তিনি ইসলাম গ্রহণের পর কবিতা চর্চা প্রায় ছেড়েই দেন । এসর্ম্পকে তিনি বলতেন : কবিতার পরিবর্তে আমি কুর‘আনের নি‘মত পেয়েছি । কিন্তু কিছুদিন যেতে না যেতেই কাব্যের প্রতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগ্রহের কারণে কাব্যচর্চায় আবার প্রাণ-প্রবাহ সৃষ্টি হলো এবং সনাতন আরবী কবিতার ঢং-রূপ-রস সবই পরিবর্তিত হয়ে গেলো । সাহাবী কবিদের কবিতা কাফির কবিদের চাইতে ওজস্বিতা ও সাহিত্যিক রুচিতে শ্রেষ্ঠতর হতে লাগলো । অতঃপর যে কবি-সাহিত্যিকগণ এগিয়ে আসলেন তাঁরা কুর’আন ও হাদীসের বাকভঙ্গি ও শৈলীর অতুলনীয় অভিব্যক্তির সঙ্গে সুসম্পর্কিত হওয়ায় এবং এক মহান শিল্পরীতি দ্বারা প্রভাবিত হওয়ায় সাহিত্য বিকাশের ক্ষেত্রে উচুঁ পর্যায়ের সিদ্ধি লাভ করেন । সংক্ষিপ্ত শব্দ চয়নে প্রভূত ওজস্বিতা সঞ্চারের এক অসামান্য কৌশল আবিষ্কারের ফলে মুসলিম কবিদের সাথে অমুসলিম আরব লেখকদের গুণগত তারতম্য বেশ প্রকট হয়ে ওঠল ।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহিত্য চিন্তার প্রভাব:

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ইন্তিকালের পর তাঁর সুযোগ্য উত্তরসূরী খুলাফা রাশিদুনও সুস্থ ও মানবিক শিল্প-সাহিত্য বিকাশে পৃষ্ঠপোষকতা অব্যাহত রাখেন । এসময়ও মসজিদে নববীতে কবিতার আসর জমানো হতো । চার খলীফার প্রত্যেকেই কবিতা আবৃত্তি করতেন ও লিখতেন । দ্বিতীয় খলীফা হযরত ‘উমর (রা.) সাহিত্যের বিশেষ অনুরাগী ছিলেন । তিনি কবিতা শিক্ষা ও রচনাকে বিশেষভাবে উৎসাহিত করতেন । তিনি কোন ভিন্ দেশী প্রতিনিধি এলে তার সাথে শিল্প-সাহিত্য নিয়েও আলোচনা-পর্যালোচনা করতেন । এসময় অশ্লীল ও অমানবিক সাহিত্য চর্চা নিষিদ্ধ ছিল । হযরত ‘উমর (রা.) অশ্লীল কবিতা আবৃত্তি করার অপরাধে গভর্ণর ‘আদী ইবন নযলাকে পদচ্যুত করেন । খলীফা হযরত ‘উমর ইবন ‘আবদুল ‘আজীজ (রা.) কবি ‘উমর ইবন আবী রাবী‘আ ও আবুল আহওয়াসকে এ একই অপরাধের কারণে দেশান্তরিত করার আদেশ দেন । পরে ‘উমর ইবন আবী রাবী‘আ তাওবা করলে তাকে ক্ষমা হয় ।

পরবর্তীকালে মুসলিম শাসকদের অনেকেই বিভিন্ন যুগে বিভিন্ন দেশে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর এ সাহিত্য-চিন্তা লালন করেন এবং তাঁর এ মহান আদর্শ অনুসরণ করেন । ফলে শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতি সহ সকল কিছুতে মুসলমানগণ এক সময় জগতগুরুর মহিমান্বিত আসনে অধিষ্ঠিত হন । তাঁরা সারা বিশ্বকে জ্ঞানের আলো বিতরণ করেন , সুস্থ ও মানবিক সাহিত্য চর্চার দীক্ষা দান করেন । আজকের ইউরোপ-আমেরিকা তথা আধুনিক সভ্যতার গোড়াপত্তনের সময় ইসলাম ও মুসলমানদের অবদান চির স্মরণীয় । সমগ্র উপমহাদেশের শিল্প-সাহিত্য-সংস্কৃতিতে ইসলাম ও মুসলমানদের প্রভাব ও অবদান এক ঐতিহাসিক সত্য । বিশেষতঃ বাংলা ভাষা ও সাহিত্য বলতে গেলে মুসলমান শাসকদের প্রত্যক্ষ পৃষ্ঠপোষকতার ফসল । সেন আমলে দাক্ষিণাত্য থেকে ব্রা‏‏হ্মান্য আধিপত্যবাদের যুপকাষ্ঠে বাংলা ভাষা , সাহিত্য-সংস্কৃতি , এমন কি , সাধারণ বাঙালীর যখন চরম দৈন্যদশা , ইতিহাসের সে ক্রান্তি লগ্নে ১২০৩ খ্রিষ্টাব্দে মুসলমানগণ তখন বাংলার রাজধানী গৌড় অধিকার করে বাংলা ভাষা , সাহিত্য তথা জাতি-ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে আপামর বাঙালীকে মুক্তির পথ দেখালেন । রাজ-পৃষ্ঠপোষকতায় বাংলা ভাষা , সাহিত্য ও সংস্কৃতির ব্যাপক চর্চা শুরু হলো । ইংরেজ আধিপত্য বি¯তারের পূর্ব পর্যন্ত সুদীর্ঘ সাড়ে পাঁচ শো বছর পর্যন্ত এ ধারা অব্যাহত ছিল ।

এহলো সাহিত্যে ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর চিন্তার প্রত্যক্ষ প্রভাব । পরোক্ষ ভাবেও বিশ্বের সকল সাহিত্যে তার অবদানের প্রভাব পড়েছে । আর এ পরোক্ষ প্রভাবের স্বরূপ উপলব্ধি করতে বেশিদুর যেতে হবে না। বিশ্বের অনেক মনীষী আছেন , যাঁরা নিজেরা সাহিত্য প্রণয়ন করেননি বা কোন কিছু লিখে যাননি ; কিন্তু তাদেঁর প্রত্যক্ষ পরামর্শে , আদেশে বা নিদের্শে তাঁদের সামনেই তাঁদের সম্বন্ধে , অথবা তাঁরা যা শিক্ষা দিয়েছেন , সে সর্ম্পকে গ্রন্থাদি লিখিত হয়েছে ।

রাসূলুল্লাহ (সা.)কে কেন্দ্র করে ইংরেজি , ফরাসী , জার্মানী , আরবী , উর্দু , ফারসী ও বাংলা সহ পৃথিবীর প্রায় সোয়াশ ভাষায় তাঁর জীবন বৃত্তান্ত সমৃদ্ধ ও তাঁর ধর্ম ব্যাখ্যামূলক অসংখ্য গ্রন্থ লিখিত হয়েছে । আরবীতে তো অগণিত আছেই , জার্মান ভাষায়ও লিখিত হয়েছে শতাধিক সীরাত ও প্রায় অর্ধ শতাধিক তাফসীর । ইংরেজি ও ফরাসী ভাষায় আরো বেশি গ্রন্থ লেখা হয়েছে রাসূলুল্লাহ (সা.) কে কেন্দ্র করে । রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর রিসালাত , দা‘ওয়াত , যুদ্ধ , আধ্যাত্মবাদ , আচার-ব্যবহার প্রভৃতি বিভিন্ন দিক নিয়ে বহু গ্রন্থ প্রণীত হয়েছে । কবিতা , নাটক ও উপন্যাসাদিতে ইসলামের বিভিন্ন দিকে আলোকপাত করে বিবৃত হয়েছে নানা ঘটনা ও কাহিনী ।

এ ছাড়া ইতিহাস , আইন, সমাজ , রাজনীতি , অর্থনীতি , দর্শন তথা জ্ঞান-বিজ্ঞানের সকল শাখায় বিভিন্ন ভাষায় বহু গ্রন্থ রচিত হয়েছে ইসলাম ও রাসূলুল্লাহ (সা.)কে কেন্দ্র করে । সুতরাং নিঃসন্দেহে বলা যায় , আজকের বিশ্ব পল্লী (Global village) ধারণায় বিজ্ঞান ও সাহিত্যের সকল শাখায় ইসলাম ,আল্লাহ , রাসূলুল্লাহ (সা.) , কুর’আন ও হাদীস নিয়ে এতো বেশি আলোচনা ও লেখালেখি হচ্ছে যে , সাধারণ মানুষ কল্পনাই করতে পারে না যে, সাহিত্য বিকাশে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অবদান কী ! শুনলে অবাক হতে হয় যে , শুধু বাংলা ভাষাতেই মহানবী (সা.) , ইসলাম , মুসলিম ও তাঁদের শিক্ষা ইত্যাদি সম্বন্ধে লিখিত হয়েছে সহস্রাধিক গ্রন্থ । সাধারণ নিরক্ষর লোকও গেয়ে বেড়ায়-

ও দরিয়ার মাঝি , মোরে নিয়ে যাও রে মদীনায়

মুরশিদ হয়ে পথ দেখাও ভাই আমি যে পথ চিনি না ।

সাহিত্যের বিকাশে কুর’আন ও হাদীসের প্রভাব :

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনের প্রধান উৎস দুটি । একটি হলো : আল-কুর’আন , আর অপরটি হলো আল-হাদীস । কুর’আন হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবন-আদর্শ । আর হাদীস রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর বাণী , কর্ম ও মৌন সমর্থন সম্বলিত গ্রন্থ । এদুটোই বর্তমান বিশ্বের সর্বশ্রেষ্ট সাহিত্যিক উপাদান সম্বলিত গ্রন্থ । আল-কুর’আন শুধু ধর্মীয় গ্রন্থ হিসেবে নয় , বরং উৎকৃষ্ট সাহিত্য হিসেবেও মুসলিম ও অমুসলিম নির্বিশেষে বিশ্বের সকলের নিকট সমাদৃত ও স্বীকৃত । এর বর্ণনাভঙ্গি , বিষয়বস্তু , ভাষাশৈলী অবিসংবাদিত উৎকর্ষের চরম পর্যায়ের । এর অনুবাদ ও ব্যাখ্যা পৃথিবীর সকল এলাকার উন্নত ভাষায়ই সুসম্পন্ন হয়েছে , এখনো হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে । আল-কুর’আনের বর্ণিত জীবন ধারার বহু ব্যাপক সাহিত্য-ব্যাখ্যা অহরহ হয়েই চলেছে । আল -কুর’আনের ঐতিহাসিক বিবরণ ও দার্শনিক তত্ত্বের ওপর লিখিত হয়েছে হাজারো পুস্তক-পুস্তিকা ।

আল-কুর’আনের পরেই সাহিত্য বিকাশে সহায়ক হয়েছে রাসূলুল্লাহ (সা.)-হাদীস । আল-কুর’আন যেমন সাহিত্যিক উৎকর্ষের শ্রেষ্ট নিদর্শন , তেমনি হাদীসও শ্রেষ্ট সাহিত্যের অন্যতম নিদর্শন রূপে জ্ঞানীদের চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে । ভাষার উৎকর্ষে , বর্ণনার সাবলীলতায় হাদীসের ভাষার শ্রেষ্টত্ব সর্বজন স্বীকৃত । বিদগ্ধ চেতনা সমৃদ্ধ জীবনবোধ ও বিধান এমন সহজ ও সরল ভাষায় বিবৃত হয়েছে যে , সাধারণ লোকও অনায়াসে বোঝতে পারে । কুর’আনের মতো হাদীসেরও অনুবাদ ও ব্যাখ্যা পৃথিবীর সকল এলাকার উন্নত ভাষায়ই সুসম্পন্ন হয়েছে , এখনো হচ্ছে এবং ভবিষ্যতেও হবে ।

যাঁরা কুর’আন ও হাদীস অধ্যয়ন করেন এবং মেনে চলেন , তাঁদের চিন্তা-কর্ম-আচরণ তথা জীবনের সকল কিছুতেই এদু’য়ের গভীর প্রভাব লক্ষ্য করা যায় । একজন কবি-সাহিত্যিকের কর্ম তৎপরতা যেহেতু তাঁর চিন্তা-মনন-অনুভূতিকে ঘিরে , সেহেতু এসব ক্ষেত্রে এদু’য়ের বিষয়বস্তু ও চিšতাধারা তাঁর শিল্প-কর্মে প্রভূত প্রভাব বিস্তার করে । একজন ঈমানদার সাহিত্যিক শিল্প-সাহিত্যের ক্ষেত্রে আল-কুর’আন যে নীতিমালা দিয়েছে এবং মহানবী (সা.) তার যে ব্যাখ্যা প্রদান করেেেছন সেটাই স্বাভাবিক ভাবে মেনে চলেন । তিনি আল-কুর’আন ও রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর শিক্ষার রৌশনীতে সত্য-সুন্দর-কল্যাণের চেতনাকে প্রমূর্ত করে তোলেন। অকল্যাণ-মিথ্যা-কদাকার-মানবতা হীন অন্ধকার পথ পরিত্যাগ করেন ।

উপসংহার :

পরিশেষে আমরা বলতে পারি যে , রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহিত্য-চেতনা ছিল অত্যন্ত উর্বর , সমৃদ্ধ ও বিজ্ঞানসম্মত , যা লালন করা সুস্থ , মানবতাবাদী ও কল্যাণকর সমাজ বিনির্মাণ ও বিবর্তনের খাতিরে প্রত্যেক যুগেই , প্রত্যেক দেশেই , প্রত্যেকের জন্য অতীব প্রয়োজন । ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে যে সর্বাত্মক অবিরাম প্রচেষ্ঠা চালানোর কথা বলা হয়েছে শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমেও সে প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রাখা অপরিহার্য । ঈমানী তেজোদ্দীপ্ত সালিহ-মুত্তাকীদেরকে এর গুরুত্ব যথাযথ ভাবে উপলব্ধি করে স্বীয় দায়িত্ব পালনে যতœবান হওয়া আবশ্যক । এদায়িত্ব পালন নিঃসন্দেহে জিহাদের সমতুল্য । কবি হাস্সান , কা‘ব ও ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা.) প্রমুখ এ জিহাদী দায়িত্বই পালন করে গেছেন , আর এ ক্ষেত্রে রেখে গেছেন এক বর্ণাঢ্য , স্বর্ণোজ্জ্বল ঐতিহ্য । এ ঐতিহ্যের আলোক পথে চলার জন্য ঈমানী তেজোদ্দীপ্ত কবি-সাহিত্যিকগণ কি দ্বিধামুক্ত চিত্তে এগিয়ে আসবেন না ?