ইসলামী সাহিত্য: প্রকৃতি ও পরিধি

ভূমিকা

‘ইসলামী সাহিত্য’ বিশ্বপ্রেক্ষিতে একটি পরিচ্ছন্ন ও সৌন্দর্যম-িত সাহিত্য। ইসলামের আদর্শ, শিক্ষা-দীক্ষা, জীবনবোধ, নৈতিকতা ও ইতিহাস-ঐতিহ্য ইত্যাদি নানা মাত্রিক উপাদান নিয়ে এ সাহিত্য একটি শক্তিশালী ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী ভুবন নির্মাণ করে। সাহিত্য মানবতার জন্য, সাহিত্য কল্যাণের জন্য, সাহিত্য ন্যায়ের প্রতিষ্ঠা ও অন্যায়ের উৎখাতের জন্য। ইসলামী সাহিত্যের এটিই হচ্ছে মৌল পরিচয়। সাহিত্যে ইসলামী আদর্শের পূর্ণাঙ্গ বাস্তবায়ন ছাড়া পূর্ণাঙ্গ ইসলামী জীবন ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা সম্ভবপর নয়। তাই ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টি ইসলামী জীবন বিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেরই একটি অপরিহার্য অংশ। ইসলামী জীবন ব্যবস্থা যেমন সমগ্র মানবতার জন্য কল্যাণের বার্তাবহ, তেমনি ইসলামী সাহিত্যও মানবতার আশা-আকাক্সক্ষা পূরণের যথার্থ ধারক। ইসলামী সাহিত্য মানুষের সমাজকে কল্যাণ ও সফলতায় ভরে দেয়। নিম্নে ইসলামী সাহিত্যের পরিচয়, প্রকৃতি ও পরিধির ওপর বিশদভাবে আলোকপাত করা হলো।

সাহিত্য১ কি?

মানব মনের সূক্ষ্ম ভাব ও অনুভূতিকে ভাষার নিপুণতার সাথে প্রকাশ করাই হলো সাহিত্য। ব্যক্তি মাত্রই নিজেকে প্রকাশ করতে চায়। তদুপরি সে বাইরের জগতের রূপ-রস-গন্ধ-স্পর্শ-শব্দকে সূক্ষ্মভাবে অনূভব করার পর প্রকাশের আকাক্সক্ষা পোষণ করে। আবার কখনো তার ব্যক্তি-অনুভূতি নিরপেক্ষ বিশ্বজগতের বস্তু-সত্তাকে প্রকাশ করতে ইচ্ছে করে। সাহিত্যিক নিজের মনের কথা, বা পরের কথা কিংবা বাহ্যজগতের কথা তাঁর ব্যক্তিগত অনুভূতির রসে সিক্ত করে এবং তাঁর প্রজ্ঞার আলোকে নিষিক্ত করে শৈল্পিক ভঙ্গিমায় প্রকাশ করেন।২ অর্থাৎ সাহিত্যিক নিজের অভিজ্ঞতা সঞ্জাত বিদগ্ধ মনের রঙিন চশমায় যে সৌন্দর্য বা মহিমা দেখেন, উপভোগ করেন, আত্মস্থ করেন, তারই বহিঃপ্রকাশ যখন শিল্পম-িত হয়ে কাব্যরূপে বিধৃত হয়, তাকেই বলা হয় সাহিত্য।৩ আর সাহিত্যে প্রকাশভঙ্গি একটি গুরুত্বপর্ণ বিষয়। এতে কখনো ফুটে ওঠে সাহিত্যিকের বুদ্ধির দীপ্তি, কখনো বা মনের অনুভূতি, কখনো কল্পনা, আবার কখনো বা মুখ্য হয়ে ওঠে বাণী বিন্যাসের কলা-কৌশল। তবে যেভাবে হোক, তাতে জগত ও জীবন পদ্য ও গদ্য তথা সাহিত্যের বিভিন্ন ফর্মে সাহিত্যিকের জ্ঞান সিঞ্চিত মহৎ রসচেতনায় নিবেদিত হয়। রসবোদ্ধা তখন তাতে শিল্পীর সাক্ষাত পায়। আর তাঁর দর্পণে দেখে নিজেকেও। সাহিত্যে আবেগের সাযুজ্য থাকে এবং এ আবেগ-সাদৃশ্যের ভিত্তিতে সাহিত্যের মূল্য নির্ণীত হয়। টলস্টয় বলেন,

‘‘শিল্পের উদ্দেশ্যই হলো শিল্পীর ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা সঞ্জাত অনুভূতিকে রং, রেখা, শব্দ বা রূপকের সাহায্যে অন্যের মনে সঞ্চারিত করা। একটি শিল্পকর্ম তখনই সার্থক হবে, যখন পাঠকও শিল্পীর মতো একই আবেগে তরঙ্গায়িত হবে, একই আবেগে কম্পমান হবে।”৪

মানবসত্তা ও প্রকৃতির সাথে সাহিত্যের সুনিবিড় সম্পর্ক রয়েছে। মানুষ হলো বিবেকবান ও অনুভূতিসম্পন্ন প্রাণী। বস্তুত এ সুবাদেই মানুষ আশরাফুল মাখ্লুকাত বা সৃষ্টির শ্রেষ্ঠ পর্যায়ে উন্নীত হতে পেরেছে। তদুপরি মানুষ হলো সমাজবদ্ধ জীব। আমরা সকলেই একে অপরের ওপর নির্ভরশীল। ব্যক্তিবিশেষ বলে যতোই নিজের অস্তিত্ব প্রমাণ করতে চাই না কেন, আমাদের সামগ্রিক সত্তায় সমাজ ও জাতির প্রতিনিধিত্ব বিদ্যমান। তাছাড়া মানুষের মধ্যে আরো একটি সত্তা নিয়ত ক্রিয়াশীল। আর তা হলো সকল ক্ষমতার অধিকারী আল্লাহ তা‘আলার অদৃশ্য চিরন্তন সত্তা। প্রকৃত সাহিত্যিকের সার্থক শিল্পকর্মে মানব জীবনের এ মূল্যবোধগুলো সমহিমায় ভাস্বর হয়ে ওঠে।৫ যথার্থ অর্থে সাহিত্যিক কখনোই স্বেচ্ছাচারী নন। কারণ, সাময়িকতাকে অতিক্রম করে চিরকালীনতাকে আবাহন করা এবং তাৎক্ষণিক সত্যকে অবলম্বন করে চিরকালিক আনন্দ রচনা করাই তাঁর অন্বিষ্ট। এ কারণেই সাহিত্য বলতেই সাহিত্যিকের মনন, সমাজ-পরিবেশ ও বর্ণনাভঙ্গি-এ তিনটি বিষয়ই লক্ষ্য করার যোগ্য। সাহিত্যিক নিজের অনুভূতিকে প্রকাশ করেন, সত্যি; কিন্তু সর্বদা তাঁর আত্মগত ভাবোচ্ছ্বসই সাহিত্য নয়। বাইরের জিনিসকে তিনি ‘আপন মনের মাধুরী’ মিশিয়ে নিজের দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে বি করে হৃদয়গ্রাহী করে প্রকাশ করেন। সাহিত্যিক শুধু নিজেকে প্রকাশ করেন, তা নয়; বরং তাকে পাঠক সম্প্রদায়ের সাথেও সর্ম্পক রক্ষা করতে হয়। ফলে সাহিত্যিক যেমন একদিকে নিজের মনের অনুভূতি প্রকাশ করেন, তেমনি অন্যদিকে পাঠকের চাহিদাও পূরণ করেন। এ কারণে বলা হয়, সর্বকালের সহৃদয় জনের হৃদয়-বেদ্য ভাবকে আত্মগত করে আবার তাকে পরের করে প্রকাশই হলো সাহিত্য।৬

সাহিত্য হলো সমাজের দর্পণ। এতে জনগণের আশা-আকাঙ্ক্ষা, ভাব-অনুভূতি, সুখ-দুঃখ ও হাসি-কান্নার চিত্র ফুটে ওঠে। তবে তা সাহিত্যিকের দৃষ্টিভঙ্গি ও আবেগ-অনুভূতির জারক রসে সিঞ্চিত হয়ে সম্পূর্ণ ভিন্ন রূপে আত্মপ্রকাশ করে। সাহিত্যকে এ অর্থে জীবন সমালোচনা (Criticism of life) বলা হয়।৭ জাতিকে সঠিক পথ নির্দেশ দানের ক্ষেত্রেও এর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। সাহিত্য উন্নত-অনুন্নত বিশ্বের সর্বত্র অবাধে বিচরণ করে জাতির ত্রুটি-বিচ্যুতি ও দোষ-গুণগুলো চিহ্নিত করে। সামগ্রিকভাবে বিচার করলে একথা অবশ্যই স্বীকার করতে হবে যে, সাহিত্য শুধু মনের কারিগরী নয়, আবার শুধু বস্তুজগতের অনুরণনও নয়; বরং মানব সভ্যতা বিনিমার্ণের একটি অপরিহার্য উপাদান।

সাহিত্য ও ইসলাম

ইসলাম আল¬াহর দেয়া একটি নিখুঁত, পূর্ণাঙ্গ জীবন-ব্যবস্থা। ইতঃপূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, সাহিত্য জীবন-বিকাশের একটি বিশিষ্ট দিক। তদুপরি সমাজকে সঠিক পথ-নিদের্শনা দানের ক্ষেত্রেও এর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। কারণ সাহিত্যের আবেদন হলো মানুষের মন বা অনুভূতির কাছে। মন বা অনুভূতি মানুষকে যে পথে তাড়িত করে, সেটাই হয় সেই নির্দিষ্ট মানব-সমাজের লক্ষ্য বা আদর্শ। সুষ্ঠু, সুন্দর ও কল্যাণময় সমাজ গঠনে যেমন মানবতাবাদী পরিচ্ছন্ন সাহিত্য-সংস্কৃতি অপরিহার্য, তেমনি মানবতাবিরোধী ও অশ্লীল সাহিত্য-সংস্কৃতি যে কোনো সমাজকে ধ্বংস ও বিপর্যয়ের দ্বার প্রান্তে ঠেলে দেয়। এ কারণেই ইসলাম এসেই সাহিত্যের যে ধারা জাহিলী যুগ থেকে চলে আসছিল, তার খোল নল্চে পাল্টে দেয়। জাহিলী যুগের সাহিত্য চিন্তা কোন নির্দিষ্ট লক্ষ্যাভিসারী ছিল না। বিভ্রান্ত চিন্তার বিভিন্ন অলিগলিতে সে চিন্তা ছুটে বেড়াতো। অন্যদিকে আল-কুর’আন যে সাহিত্য ভা-ার মানুষের সামনে তুলে ধরেছে, তা একটি নির্দিষ্ট লক্ষ্যের দিকে তার অনুসারীদের এগিয়ে নিয়ে গেছে। আর আল-কুর’আনের অনুসারীরা সে অনুযায়ী নিজেদের জীবন ও সমাজ গড়ে তুলে তার বাস্তবতা প্রমাণ করেছেন। এক কথায়, ইসলাম এমন সাহিত্যের পক্ষপাতী, যা ঈমানী শক্তি ও সৎ কর্মের প্রেরণায় পরিপূর্ণ এবং এই সাথে মানবতাকে যুলম, অত্যাচার, অন্যায়, অবিচার থেকে মুক্তি দেবার জন্য লড়ে যাচ্ছে। এ ধরনের সাহিত্য সৃষ্টির জন্য ইসলাম নির্দেশ দান করেছে, অনুপ্রেরণা যোগিয়েছে। বিশ্ব ইতিহাসে এমন নজীর তো আর দ্বিতীয়টি নেই যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর মতো এতো উদারভাবে আর কোনো অবিসংবাদিত নেতা সাহিত্য-সংস্কৃতির ক্ষেত্রে সবিশেষ ভূমিকা রেখেছেন। তাঁর অনুপ্রেরণা, পৃষ্ঠপোষকতা আর অকুণ্ঠ সমর্থনেই সে সময়ে কবিতার জোয়ার বয়ে গিয়েছিল। উম্মুল মু’মিনীন সাইয়িদা ‘আয়িশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেই মসজিদে নববীতে কবি হাস্সান ইবন সাবিত (রা.)-এর জন্য একটি উচুঁ মিম্বর তৈরি করে দিয়েছিলেন। তার ওপর আরোহন করে হাস্সান রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশংসা গীতি ও মুশরিক কবিদের নিন্দা ও কুৎসার জবাবে রচিত নিন্দা কবিতা ও ইসলামের গৌরব গাথা আবৃত্তি করতেন। এগুলো শোনে মহানবী (সা.) কখনো বলতেন, إن الله يؤيد حسان بروح القدس ما يفاخر أو ينافخ عن رسول الله . -“হাস্সানের কন্ঠ যতোদিন পর্যন্ত রাসূলের পক্ষ হয়ে কবিতার বাণী শুনিয়ে যাবে, ততোদিন তাঁর সাথে জিব্রীল (আ.) থাকবেন।”৮ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রশস্তিসূচক কবিতা লেখার কারণে তিনি شاعر الرسول ‘রাসূলের কবি’ নামে খ্যাতি অর্জন করেন।৯ অন্য একটি হাদীসে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন,

“আমি ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা.) কে নির্দেশ দিলাম কবিতা রচনার, ভালোই করেছে সে। কা‘ব ইবন মালিক (রা.) সেও সুন্দর কবিতা উপহার দিয়েছে । নির্দেশ দিলাম হাস্সান ইবন সাবিত (রা.) কে, সে আমাদের তৃপ্তি দান করেছে এবং নিজেও পরিতৃপ্ত হয়েছে।”১০

কবি ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা.)-এর কবিতা শোনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলতেন, “দেখো, তোমাদের ভাইয়ের কবিতা কতো অনাবিল ও পরিচ্ছন্ন!”১১

অপর দিকে ইসলামে অশ্লীল, অরুচিকর মানবতা-বিধ্বংসী ও চরিত্র হননকারী সাহিত্যচর্চাকে নিষিদ্ধ ঘোষণা করা হয়েছে এবং এর রচয়িতাদের নিন্দা করা হয়েছে। হযরত আবূ সা‘ঈদ আল-খুদরী (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন: “একবার জনৈক কবি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে অশ্ল¬¬ীল কবিতা পাঠ করলো। তখন তিনি বলেছিলেন, ধরো, শয়তানকে বন্দী করো। এরকম লোকের পেট কবিতা দ্বারা ভর্তি হওয়ার চাইতে পুঁজে ভর্তি হওয়া অনেক ভালো।”১২ কবি হাস্সান (রা.) কে একবার প্রশ্ন করা হলো, শ্রেষ্ঠ কবি কে? তিনি বললেন, ইমরাউল কায়স। রাসূলুল্লাহ (সা.) এ খবর শোনে বললেন,

“হাস্সান ঠিকই বলেছেন। নিশ্চয় তার ভাষায় সম্মোহনী শক্তি রয়েছে এবং কাব্যকর্মে রয়েছে বর্ণনার পরিপাট্য। কিন্তু দুনিয়ায় সে শ্রেষ্ঠ কবির মর্যাদার পেলেও পরকালে তার কোন মর্যাদা নেই। পরকালে সে অতি হীন-তুচ্ছ। নরকের অগ্নিদ্বারে সে তার সমগোত্রীয় কবিদের নেতৃত্ব দেবে।”১৩

এর কারণ হচ্ছে, তার কবিতায় গভীর জীবনবোধের চিহ্ন ছিল না। তার কবিতা ছিল উদ্দেশ্যহীন ও লাগামহীন। সমাজদেহে দুর্গন্ধ ছড়ানো ও পচন ধরানোই ছিল তার কাজ। শিরক ও আল্লাহর সার্বভৌম সত্তার প্রতি আনুগত্যহীনতাই ছিল তার মূল সুর। তার কবিতার শিরা-উপশিরায় ব্যক্তিগত বাহাদুরি, অবৈধ প্রেমের অশ্লীল বর্ণনা, স্বগোত্রের গরিমা, অন্য গোত্রের নিন্দা, অহংকার, বিদ্রূপ, মদ ও নারী সম্ভোগসহ নানা প্রকার অসামাজিক ও অনৈতিক কথাবার্তাই প্রবাহিত ছিল। উপর্যুক্ত হাদীস থেকে বোঝা যায়, কোন্ ধরনের সাহিত্য চর্চা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অভিপ্রেত ছিল। একমাত্র ইসলামী ভাবধারার সাথে সামঞ্জস্যশীল সাহিত্য চর্চার তিনি অনুমতি দিয়েছেন।

ইসলামী সাহিত্যের সংজ্ঞা ও প্রকৃতি

‘ইসলামী সাহিত্য’ ইসলাম ও সাহিত্য- এ দুটি শব্দের সমন্বয়ে গঠিত। তাই ইসলাম যে আদর্শ ও নৈতিক মূল্যবোধগুলো সমাজে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়, যে সাহিত্য সেগুলোকে যথাযোগ্য মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করে, যে সাহিত্যে এ মূল্যবোধগুলো পত্র-পল্লবে শাখা-প্রশাখায় ছড়িয়ে পড়ে, তাকে ‘ইসলামী সাহিত্য’ বলা হয়। জগত ও জীবনের অসংখ্য দিক রয়েছে। ইসলামী সাহিত্য এসব দিকের ওপর ইসলামের নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত করে। জগত ও জীবন সম্পর্কে একজন খাঁটি মুসলমানের দৃষ্টি এবং একজন কাফির বা ধর্মহীন বস্তুবাদী লোকের দৃষ্টির মধ্যে যথেষ্ট পার্থক্য রয়েছে। একজন মুসলমান বিশ্বাস করে, এ জগত ও জীবনের স্রষ্টা হলেন আল্লাহ তা‘আলা। এ সৃষ্টির পেছনে তাঁর রয়েছে বিশেষ উদ্দেশ্য। আমাদের সৃষ্টির শুরুতে তিনি যে উদ্দেশ্য ব্যক্ত করেছেন, তা হলো, ﴿إني جاعل في الأرض خليفة﴾-“ আমি পৃথিবীতে আমার প্রতিনিধি পাঠাতে চাই।”১৪ অর্থাৎ তিনি মানুষকে দেখতে চান নিজের প্রতিনিধিরূপে। আর আল্লাহর প্রতিনিধি হতে হলে মানুষকে প্রথমত নিজের মধ্যে সৃষ্টি করতে হবে আল্লাহর গুণাবলি। আর দ্বিতীয়ত প্রতিনিধিত্বের দায়িত্বের অপরিহার্য অংশ হিসেবে সার্বভৌম কর্তৃত্বের মালিক যেসব নীতি-নিয়ম, আইন-কানুন তৈরি করেছেন, সেগুলো তাকে কার্যক্ষেত্রে প্রয়োগ ও কার্যকর করতে হবে। দুনিয়া থেকে ফিতনা-ফাসাদ দূর করে শান্তি-শৃঙ্খলা, ন্যায় ও কল্যাণ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। সর্বোপরি আল্লাহর হুকম পুরোপুরি মেনে চলে তাঁর সন্তুষ্টি অর্জন করতে হবে। আর আল্ল¬াহর সন্তুষ্টি অর্জনই হলো এ জীবনের মূল লক্ষ্য। জীবনের যাত্রা এ জগতে শেষ হয়ে যায় না; বরং এটা সাময়িক জীবন। আসল জীবন শুরু হবে এর পর থেকে। জীবনের এ পরীক্ষাগার থেকে বের হয়ে মানুষ তখন তার রাব্বের দরবারে হাযির হয়ে যাবে। তখন সে হবে দস্তুর মতো একজন আসামী। সেখানে তাকে তার দুনিয়ার সমস্ত কাজের হিসাব দিতে হবে।... একজন প্রকৃত মু’মিনের সাহিত্যকর্মে তাঁর এ বিশ্বাসগুলো সুন্দরভাবে প্রতিফলিত হয়ে থাকে। অতএব, জগত ও জীবন সম্পর্কে ইসলামের এ দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ যখন শিল্পম-িত হয়ে কাব্যরূপে বিধৃত হয়, তাকেই ইসলামী সাহিত্য বলা হয়।১৫ প্রখ্যাত ইসলামী সাহিত্যিক রা’ফাত পাশা বলেন,

هو التعبير الفني الهادف عن وقع الحياة و الكون و الإنسان على وجدان الأديب تعبيرا ينبع من التصور الإسلامي للخالق عز و جل و مخلوقاته ‘ ولا يجافي القيم الإسلامية.

“ইসলামী সাহিত্য হলো জীবন, জগত ও মানব সম্পর্কে সাহিত্যিকের আত্মগত অনুভূতিকে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে শৈল্পিক ভঙ্গিতে প্রকাশ করা, যা স্রষ্টা ও সৃষ্টি সম্পর্কে ইসলামের দৃষ্টিভঙ্গির সাথে সামঞ্জস্যশীল হবে এবং ইসলামী মূল্যবোধসমূহের পরিপন্থী হবে না।”১৬

অর্থাৎ ইসলামী সাহিত্য নতুন কোনো সাহিত্য ভুবন নয়; অন্যান্য সাহিত্যের মতো এতেও থাকবে জীবনের অভিব্যক্তি, ভাবের উচ্ছ্বাস, শিল্পসঙ্গত প্রকাশভঙ্গি, আঙ্গিক গঠন ও বৈচিত্রমণ্ডিত বিষয়বস্তু। কেবল তারতম্য বিষয়বস্তুকে ঘিরেই। ইসলামী সাহিত্য শুধুই ইসলামের জীবনাদর্র্শ ও মূল্যবোধকে উপজীব্য করে রচিত হয়।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে এ কথা প্রমাণিত হয় যে, ইসলামী সাহিত্য একটি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যাভিসারী। জীবনের যেমন একটি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য রয়েছে, ইসলামী সাহিত্যও তেমনি একটি উদ্দেশ্য ও লক্ষ্যকে কেন্দ্র করে এগিয়ে চলে। এ কারণে নিছক শিল্পকারিতা বা উদ্দেশ্যহীন সাহিত্যচর্চার কোনো স্থান ইসলামে নেই।১৭ কারণ, সত্যিকার আল্লাহর বান্দাহর কোন কাজ উদ্দেশ্যহীন হতে পারে না। ‘সাহিত্যের খাতিরে সাহিত্য করা’ বা Art for Art’s sake এই নিরর্থক কুটিল বাক্য একজন সত্যিকার আল্ল¬াহর বান্দাহর জন্যে ভারসাম্যহীন ও অশোভনীয়। কেননা, বান্দাহর প্রতিটি কাজ তার মা’বূদের সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য নিবেদিত হতে বাধ্য। আল¬াহর প্রতি ঈমান আনয়নের মাধ্যমে মু’মিন ঘোষণা দান করে যে, ﴿إن صلوتي و نسكي و محياي و مماتي لله رب العالمين ﴾‘‘ আমার সালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু কেবল বিশ্ব প্রতিপালক আল্লাহর জন্যেই উৎসর্গীকৃত।”১৮

বাস্তবনিষ্ঠতা (Realism) ইসলামী সাহিত্যের একটি অনন্য বৈশিষ্ট্য। এটি সাহিত্যের ভাবতন্ত্র ও কল্পনা-প্রবণতার বিপরীত। ইসলামী সাহিত্যিকগণ জগত, জীবন ও প্রকৃতিকে যথাযথ রূপ দিতে চেষ্টা করেন। তবে তাতে ভাব ও কল্পনার সুসমন্বয় যে একেবারে থাকে না, তা নয়। বরং অনেক ইসলামী সাহিত্যিককে দেখা যায়, জগত ও জীবনের তথ্য-সত্যকে তিনি উচ্চতর কল্পনার আলোকে উদ্ভাসিত করে দেখেন এবং এর অপার রহস্যের চিন্ময় মূর্তি পাঠকের গোচর করেন।১৯

ইসলামী সাহিত্যে ব্যাপকতা আছে, চিন্তা ও লেখার স্বাধীনতা আছে। তবে অন্য যে কোনো সাহিত্যে এগুলো যে চেহারায় আত্মপ্রকাশ করেছে ইসলামী সাহিত্যে তার অবকাশ নেই। অন্য সাহিত্যে নিজেকে নৈতিক মূল্যবোধ, বিধি-নিষেধ ও নিয়ম-শৃঙ্খলার উর্ধ্বে রাখতে চায়। কিন্তু ইসলামী সাহিত্যে তা সম্ভব নয়।

ইসলামী সাহিত্যে জীবনের এমন সব নীতি ও মূল্যবোধের প্রতিফলন ঘটবে, যেগুলোকে ইসলাম মানবতার জন্য কল্যাণপ্রদ হিসেবে গণ্য করেছে এবং যার মধ্যে এমন সব নীতি ও মতবাদের বিরোধিতা করা হবে, যেগুলোকে ইসলাম মানবতার জন্য ক্ষতিকর বলে চিহ্নিত করেছে।

ইসলামী সাহিত্য এমন এক পর্যায়ের সাহিত্য, যার পেছনে সক্রিয় চিন্তাধারা ও মন-মস্তিষ্ক ইসলামী চিন্তার সীমারেখাকে মেনে নিয়েছে এবং বিষয়বস্তু উপস্থাপনা, বর্ণনা ও প্রকাশের ক্ষেত্রে ইসলাম আরোপিত নৈতিক বিধি-নিষেধকে নিজের জন্য অবশ্য পালনীয় রূপে গ্রহণ করেছে। ইসলামী সাহিত্যে মানুষের সাধারণ আশা-আকাক্সক্ষা এমন স্বাভাবিক পদ্ধতিতে মূর্ত হয়ে ওঠে, যার ফলে তা একটি সৎ ও সুন্দর জীবনের গঠনের ক্ষেত্র তৈরি করে বা তাতে সহায়তা করে।

ইসলামী সাহিত্য সমগ্র মানব জাতির কল্যাণকামী। এ সাহিত্য প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সব ধরনের যুলুমের বিরুদ্ধে প্রতিবাদমুখর। ধনী দরিদ্রের ওপর, সবল দুর্বলের ওপর, মালিক শ্রমিকের ওপর এবং সাদা কালোর ওপর যে যুলম ও নির্যাতন চালায়- এ সাহিত্য তার বিরুদ্ধে জিহাদ ঘোষণা করে।

এক কথায় ইসলাম আমাদের যে নৈতিক মূল্যবোধগুলো দান করেছে সেগুলোই হবে আমাদের ইসলামী সাহিত্যের মূল ভিত্তি। আর এখান থেকে এ কথাও স্পষ্ট হয়ে যায় যে, ইসলামী সাহিত্য ও সাহিত্যিকের মূল পথপ্রদর্শক হলো আল-কুর’আন ও সুন্নাহ। ইসলামী সাহিত্যিক সমাজ থেকে বিচ্ছিন্ন কোনো ব্যক্তিসত্তা নয়। মুসলিম সমাজে যে অবস্থা ও পরিবেশ বিরাজ করে, একজন ইসলামী সাহিত্যিক সেই সমাজের চিত্রকে তাঁর সাহিত্যে রূপায়িত করে। কিন্তু মুসলিম সমাজ সব সময় আর্দশ হয় না। পূর্ণাঙ্গ ইসলামী সমাজই হলো মুসলিম সমাজের আদর্শ। এ আদর্শ অর্জন করার জন্য সে চেষ্টা করতে থাকে। ইসলামী সাহিত্যিক মুসলিম সমাজের এমন কোনো চিত্র রূপায়িত করতে পারে না, যা ইসলামী সমাজের মান আরো নামিয়ে দেয়। তবে সমাজ পরিবর্তন ও সংশোধনের উদ্দেশ্যে এমন কোনো চিত্র অবশ্যই সে অঙ্কন করতে পারে; কিন্তু সে ক্ষেত্রে ইসলামী সাহিত্যিক তার হৃদয়ের পূর্ণ দরদ ও আন্তরিকতা দিয়ে গলদগুলো অনুভব করে। গলদের চিত্র অংকন করার সময় তার মনে একটুও আনন্দের দোলা লাগে না। তার কণ্ঠ হতাশার সুর শ্রুত হয় না। আর বিদ্রূপ ও অবিশ্বাসের কণ্ঠস্বর থেকে তো সে অনেক অনেক দূরে অবস্থান করে।২০

ইসলামী সাহিত্য ও মননশীল সাহিত্য:

মুসলমানদের মতো অনেক অমুসলিমও ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে কিংবা তার সাথে মিল রেখে সাহিত্য রচনা করে থাকে। যেমন জাহিলী যুগের কবিতাগুলোতে আমরা এ ধরনের অনেক সুন্দর সুন্দর বক্তব্য দেখতে পাই, যা ইসলামের আদর্শ ও মূল্যবোধের সাথে সামঞ্জস্যশীল। এগুলো শোনে খোদ রাসূলুল্লাহ (সা.)ও বিমোহিত হন। সাহাবী কবি লাবীদ (রা.)-এর জাহিলী যুগের একটি কবিতা রাসূলুল্লাহ (সা.) খুব বেশি পছন্দ করতেন। এ কবিতার একটি চরণ ছিল :

ألا كل شيء ما خلا الله باطل وكل نعيم لا محالة زائل

“সাবধান! আল্লাহ ছাড়া সকল কিছুই অমূলক। এই পৃথিবীর সব নি‘আমত অবশ্যই লোপ পাবে।”

এটি শুনে রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছিলেন: “ লাবীদের এ কথাটি একেবারে যথার্থ।”২১

‘আন্তারা ইবন শাদ্দাদ জাহিলী যুগের একজন প্রখ্যাত কবি ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) নুবুওয়াত প্রাপ্তির বিশ বৎসর আগে তাঁর মৃত্যু হয়। তাঁর কবিতা আরববাসীর মুখে মুখে প্রচারিত ছিলো এবং রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজেও তার কবিতায় মুগ্ধ ছিলেন। তাঁর সর্ম্পকে তিনি বলেন : “আন্তারা ছাড়া অন্য কোনো আরববাসীর এতো প্রশংসা আমার কানে পৌঁছে নি। (জীবিত থাকলে) তাঁকে দেখার আমার বড় ইচ্ছে ছিল।”২২ তিনি এক কবিতায় বলেন,

و أغض طرفي حين تبدو جارتي حتى يواري جارتي مأواها

“আমার প্রতিবেশিনী মহিলা ঘর থেকে বের হয়ে ঘরে ফিরে যাওয়া পর্যন্ত আমি আমার দৃষ্টি অবনত রাখি।”

আল-কুর’আনের নির্দেশের সাথে তাঁর এ কবিতার যথেষ্ট সাযুজ্য রয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,﴿ قل للمؤمنين يغضوا من أبصارهم و يحفظوا فروجهم﴾-“হে নবী, আপনি মু’মিনদেরকে বলে দিন, তারা যেন অপর মহিলা থেকে তাদের দৃষ্টিকে অবনত রাখে এবং সংরক্ষণ করে তাদের লজ্জাস্থানকে।”২৩

এভাবে অমুসলিম কিংবা ধর্মহীন বস্তুবাদী সাহিত্যিকদের ইসলামী আদর্শ ও মূলবোধের সাথে মিলসম্পন্ন রচনাকে ‘ইসলামী সাহিত্য’ অভিধায় আখ্যা দেয়া যাবে কি-না, এ বিষয়ে বিভিন্ন মত পরিলক্ষিত হয়। অনেকের মতে, ইসলামী সাহিত্য যেহেতু একটি আদর্শ ও লক্ষ্যাভিসারী, তাই এ সাহিত্য কোনো নিছক ধর্মীয় সাহিত্য নয়। ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা জাতিবিশেষের ধর্মাচরণের মধ্যে এ সাহিত্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা হচ্ছে সার্বজনীন সাহিত্য। এ কারণে ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে বা তার সাথে মিল রেখে যে সাহিত্য রচিত হয়, কোনো অমুসলিম কিংবা ধর্মহীন বস্তুবাদী লোকের হাতে রচিত হলেও তাও ‘ইসলামী সাহিত্য’ রূপে পরিগণিত হবে।২৪

এ প্রসঙ্গে আবার কেউ কেউ দুটি পরিভাষার আশ্রয় গ্রহণ করেছেন। ক. দা‘ওয়াহ সাহিত্য (أدب الدعوة الإسلامية) ও খ. ইসলামী সাহিত্য। দা‘ওয়াহ সাহিত্যে ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের পক্ষে জোরালো মত প্রতিষ্ঠা করা হয় এবং দাওয়াতী মিশন নিয়ে লোকদের মাঝে তা প্রচার করা হয়। এ ধরনের সাহিত্যের রচয়িতাকে অবশ্যই খাঁটি মুসলিম হতে হবে। আর ইসলামী সাহিত্যে আরব-ইসলামী সভ্যতার সৌন্দর্য ও মহিমা প্রচার করা হয়। ইসলামী সাহিত্যের এ বি¯তৃত তামাদ্দুনিক অর্থের নিরিখে তা ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা জাতিবিশেষের জন্য সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার বিষয়বস্তুই হলো প্রধান বিবেচ্য। কে রচনা করলো, তা দেখার বিষয় নয়; বরং কী রচনা করেছে, তা-ই হলো দেখার বিষয়। এ ধরনের সাহিত্য মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যে কেউ রচনা করতে পারে। এ দৃষ্টিকোণ থেকে যেমন নোবেল বিজয়ী আরবী সাহিত্যিক নাজীব মাহফুয, প্রখ্যাত নাট্যকার তাওফীক আল-হাকীম ও ইয়াহয়া হাক্কীর অনেক সাহিত্যকর্মকে ইসলামী সাহিত্যের অন্তর্ভুক্ত করা যায়, তেমনি মহাকবি গ্যাটে ও দান্তে প্রমুখের অনেক সাহিত্যকর্মকেও এর আওতায় নিয়ে আসা যায়।২৫

কিন্তু বিশিষ্ট ইসলামী সাহিত্যিক নজীব কিলানী, ড. আবদুল বাসিত বাদ্র, প্রফেসর মুহাম্মদ কুতুব ও প্রফেসর মুহাম্মদ হাসান বরীগশ প্রমুখ এ মতকে সমর্থন করেন না।২৬ তাঁদের মতে, কারো সৎ আমলগুলো কবুল হওয়ার জন্য যেমন ঈমান ও ইসলামের শর্ত রয়েছে, তেমনি ইসলামী সাহিত্য হওয়ার জন্য লেখককে অবশ্যই মুসলমান হতে হবে। কোনো অমুসলিম থেকে ইসলামী সাহিত্য রচিত হতে পারে না। ড. নজীব কিলানী বলেন,

الأدب الإسلامي لا يمكن أن يصدر إلا عن ذات نعمت باليقين ‘ و سعدت بالاقتناع‘ و تشبعت بمنهج الله ‘ ...

“ইসলামী সাহিত্য দৃঢ় প্রত্যয়ী, আত্মতৃপ্ত ও আল্ল¬াহ প্রদত্ত ব্যবস্থার প্রতি পূর্ণবিশ্বাসী ব্যক্তি থেকেই কেবল প্রকাশ পেতে পারে।...”২৭

শেষোক্ত মতটিই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। কেননা, ইসলামের আদর্শ ও মূল্যবোধের সাথে মিলসম্পন্ন অমুসলিমদের সাহিত্যকর্মগুলো কখনো সাহিত্যিকের আত্মগত ভাবোচ্ছ্বাস থেকে, কখনো ক্ষণস্থায়ী অনুভূতি থেকে, আবার কখনো সুস্থ মানব মনন ও রুচি সঞ্জাত বিদগ্ধ মনের সুনির্দিষ্ট অভিজ্ঞতা থেকেও প্রকাশ পেতে পারে। ইসলামী মুল্যবোধ ও ভাবধারার ঐতিহ্যমণ্ডিত বর্ণনার অনুকরণ কোনোভাবেই তাদের উদ্দেশ্য নয়। অধিকন্তু, অমুসলিম তথা খ্রিষ্টান, ইয়াহুদী, অগ্নিউপাসক, প্রতিমাপূজারী ও ধর্মহীন লোকদের ইসলামী ভাবধারার সাথে মিলসম্পন্ন সাহিত্যকর্মকে ‘ইসলামী সাহিত্য’ অভিধায় অভিহিত করা এক ধরনের অযাচিত উদারতা, যাতে প্রকারান্তরে ইসলামের বিশিষ্ট মর্যাদা ও সৌন্দর্যাবলি ম্লান হয়ে পড়বে। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার নাম। এতে অংশবিশেষ মেনে চলার এবং অংশবিশেষ পরিত্যাগ করার কোনো অবকাশ নেই। তাই অমুসলিমদের কোনো কোনো চিন্তা ইসলামী চিন্তার সাথে যদি মিলেও যায়, তার সে চিন্তাবিশেষকে ইসলামী বলা যেতে পারে না। কারণ, এটি হচ্ছে অপ্রধান ক্ষেত্রবিশেষে অংশবিশেষের মিলন মাত্র। তাও আবার উদ্দেশ্য প্রণোদিতভাবে নয়। বর্ণিত রয়েছে, একবার হযরত শারীদ আস-সকফী (রা.) রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সামনে কবি উমাইয়্যা ইবন আবিস্ সালতের কবিতা পড়ে শোনাচ্ছিলেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) তা শোনে অত্যন্ত মুগ্ধ হন এবং বলেন, كاد يسلم-“সে তো প্রায় মুসলমান হয়ে গিয়েছিলো।”২৮ অর্থাৎ তাঁর কথায় ইসলামের সুর বেজে ওঠেছে। তবে তা পুরোপুরি ইসলামী নয়। কেননা, তার অন্তরে আজো কুফরী রয়ে গেছে। এ কথা অন্য বর্ণনায় এভাবে বলা হয়েছে, أمن شعره و كفر قلبه - “আরে তার কবিতা তো ঈমানদার হয়ে গেছে। অথচ তার অন্তর আজো কাফির রয়ে গেছে।”২৯

ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধের ভিত্তিতে অমুসলিমদের রচিত সাহিত্যকর্মকে ‘মননশীল সাহিত্য’ (أدب الحكمة) নামে আখ্যায়িত করা যায়।৩০ মননশীলতা অর্থাৎ বুদ্ধিদীপ্ত চিন্তাশক্তি বা বিচারশক্তিকে আরবীতে ‘হিকমত’ বলা হয়। আর ‘হিকমত’ শব্দটি বহুল প্রচলিত একটি ইসলামী পরিভাষা। রাসূলুল্ল¬াহ (সা.) যেসব কথায় মুগ্ধ হন, তার কোনো কোনোটিকে তিনি ‘হিকমত’ বলে উল্লে¬খ করেন। তিনি বলেন, إن من الشعر لحكمة-‘‘কবিতার মধ্যে অনেক বুদ্ধিদীপ্ত কথা রয়েছে।”৩১ তা ছাড়া সাহাবা কিরাম, আলিম ও ফকীহগণও শব্দটি বহুলভাবে ব্যবহার করেছেন। হযরত জাবির ইবনু মা‘দান থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন:

كل حكمة لم ينزل فيها كتاب ‘ و لم يبعث بها نبي ‘ ذخرها الله حتى تنطق بها ألسن الشعراء

“প্রতিটি বুদ্ধিদীপ্ত কথা, যা কিতাবে অবতীর্ণ করা হয়নি এবং কোনো নবীর কাছেও তা প্রেরণ করা হয়নি, আল্লাহ তা‘আলা তা সঞ্চিত করে রেখেছেন। এগুলো কবিরা তাদের ভাষায় প্রকাশ করবে।”৩২

ইসলামী সাহিত্য ও অনৈসলামী সাহিত্য

ইসলামী আদর্শ ও মূলবোধের পরিপন্থী মুসলিম-অমুসলিম নির্বিশেষে যে কারো সাহিত্যকর্মকে ‘অনৈসলামী সাহিত্য’ বলা হয়।৩৩ এ ধরনের সাহিত্যকে বিভিন্ন দর্শন, চিন্তাধারা ও ধর্মমতের দিকে সম্পৃক্ত করে বিভিন্ন নামে অভিহিত করা হয়ে থাকে। যেমন ‘অস্তিত্ববাদী সাহিত্য’, ‘বস্তুবাদী সাহিত্য’, ‘প্রকৃতিবাদী বা জড়বাদী সাহিত্য’, ‘সাম্যবাদী সাহিত্য’, ‘সমাজতান্ত্রিক সাহিত্য’, ‘ইয়াহুদী সাহিত্য’, খ্রিষ্টান সাহিত্য’, ‘বৌদ্ধ সাহিত্য’ ও ‘হিন্দু সাহিত্য’ প্রভৃতি।

ইসলামী সাহিত্য এবং অশ্লীলতা ও যৌনতা

রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন, -ليس المؤمن بالطعان ولا اللعان ولا الفاحش ولا البذى“মু’মিন কোনো দিন মিথ্যারোপ করতে পারে না, পারে না অভিশাপ দিতে। সে কখনো অশ্ল¬ীল হতে পারে না, পারে না নির্লজ্জ হতে।”৩৪ ইসলামী সাহিত্যের কোথাও কোনোভাবেই অশ্ল¬ীলতা ও যৌনতার প্রতি সমর্থন নেই। না বিষয়বস্তুতে, না প্রকাশভঙ্গিতে, না আকার-ইঙ্গিতে, না বিষয়বস্তুর প্রাথমিক স্তর বিন্যাসে। অশ্লীলতা হচ্ছে একটা বিকৃত রুচি। আর এ বিকৃত রুচির সাথে ইসলামী সাহিত্যিকের কোনো ধরনের সম্পর্ক থাকতে পারে না। স্বামী-স্ত্রীর গোপন বিষয় তৃতীয় ব্যক্তির সামনে বলা রাসূলুল্লাহ (সা.) নিষিদ্ধ করেছেন। আসলে এটা সাহিত্যের বিষয় নয়। সাহিত্যে ক্ষেত্রে একে টেনে এনে সাহিত্যের কোনো উন্নতি সাধন করা হয়নি এবং এ ধরনের কোনো সাহিত্যিকের কল্যাণকামী চরিত্র থাকতে পারে না। এ ধরনের সাহিত্য চরিত্রক্ষয়, চরিত্রনাশ ও চরিত্র ধ্বংসই করতে পারে শুধু। কাজেই ইসলামী সাহিত্যের সাথে এর দূরবর্তী কোনো সর্ম্পকও থাকতে পারে না।

অশ্লীলতা ও যৌনতা প্রসঙ্গকে যারা সাহিত্যের আওতাভুক্ত করেন, জীবন সম্পর্কে আসলে তাদের দৃষ্টিভঙ্গিও আলাদা। মানুষ ও মানুষের জীবনকে তারা যে দৃষ্টিতে বিচার করেন ইসলামের সাথে তার বিরোধ সুস্পষ্ট। ফ্রয়েডের দৃষ্টিতে মানুষকে তারা দেখেন একটি যৌন জীব হিসেবে। মানুষ ও পশুর মধ্যে এ ক্ষেত্রে তারা কোনো পার্থক্যই করে না। আর জীবনকে তারা শুধু উপভোগ করার কথাই চিন্তা করে। জীবন ও যৌবন তাদের কাছে একটি সম্পদ। এ জন্য দুনিয়ায় যতদিন থাকা যায়, ততদিন এ সম্পদ দুটি উপভোগ করার জন্য তারা হাজারো পন্থা উদ্ভাবন করে।

এ জীবন দর্শনের সাথে ইসলামের বিরোধ অত্যন্ত সুস্পষ্ট। ইসলামও জীবন ও যৌবনকে একটি মূল্যবান সম্পদ মনে করে। তবে তা এজন্য যে, এগুলো আল্লাহর আমানত। এর মধ্যে বেঁচে থাকার ও বংশ রক্ষার একটা তাগিদ রয়েছে। কিন্তু যে তাগিদটি এর সমগ্র সত্তাকে ঘিরে রেখেছে সেটি হল আল্লাহর আনুগত্যে একে পুরোপুরি সোপর্দ করা। কাজেই এখানে পাশবিক জীবন উপভোগের কোনো অবকাশ নেই। জীবন ও যৌবনের মানবিক ব্যবহারকেই এখানে প্রতিষ্ঠিত করা হয়েছে।

কাজেই ইসলামী সাহিত্যে অশ্ল¬ীলতা ও যৌনতার প্রসঙ্গটি কোথাও বিশিষ্ট ভূমিকা পালন করতে পারে না। এমনকি আকারে-ইঙ্গিতে অশ্ল¬ীলতা ও যৌনতার প্রকাশও শোভনীয় মনে করা হয়নি। আল¬াহ তা‘আলা বলেন: ﴿و لا تقربوا الزنى إنه كان فاحشة و ساء و سبيلا ﴾-‘‘আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিঃসন্দেহে তা নির্লজ্জতা ও খারাপ পথ।”৩৫ এখানে ব্যভিচারের ধারে কাছে যেতে নিষেধ করে এ কথাই প্রকাশ করা হয়েছে যে, ব্যভিচার করা তো দূরের কথা, ব্যভিচারের প্রতি উৎসাহী করে তোলে, ব্যভিচারের আকাক্সক্ষা সৃষ্টি করে, ব্যভিচারের ইচ্ছা মনের মধ্যে জাগ্রত করতে পারে- এ ধরনের যে কোনো পরিবেশ সৃষ্টি করা থেকে বিরত থাকতে হবে। এ থেকে ইসলামী সাহিত্যে অশ্লীলতার সামান্য আমেজ সৃষ্টিও যে বাঞ্ছনীয় নয়, তা সহজেই অনুমান করা যায়।৩৬

বিগত ঊনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে সাহিত্যের নামে নতুন একটি ধারা সৃষ্টি হয়েছে, যাকে আরবীতে ‘حداثة ’ বলা হয়। এর অর্থ আধুনিকতা বা মুক্ত সাহিত্য চর্চা। এটি মূলত একটি অশ্লীল সাহিত্য। একে আমাদের নব প্রজন্মের সামনে পশ্চিমারা আধুনিক সাহিত্য নামে চালিয়ে দেয়ার পায়ঁতারা চালাচ্ছে।৩৭ এ ষড়যন্ত্রকে রুখতে হলে ইসলামী সাহিত্যের ব্যাপক বিকাশ ঘটানো ছাড়া উপায়ান্তর নেই।

ইসলামী সাহিত্যের পরিধি

ইসলামী সাহিত্যের বিষয়বস্তু অত্যন্ত ব্যাপক। পূর্বে উল্লেখ করা হয়েছে, সাহিত্য হলো অনুভূতিসঞ্জাত অভিজ্ঞতারই অভিব্যক্তি। আর যেহেতু এ অভিজ্ঞতার কোনো নির্দিষ্ট সীমারেখা নেই, তাই ইসলামী সাহিত্যের বিষয়-পরিধিরও কোনো সীমারেখা নেই। ইসলামী জীবন দর্শনের মতো ইসলামী সাহিত্যও মানব জীবনের সকল দিক ও বিভাগকে শামিল করে। সমগ্র মানব জীবনের সাথে এর সমান সম্পর্ক। জীবনের সমস্ত দিক ও বিভাগের সাথে সামঞ্জস্য রেখে ভারসাম্যপূর্ণ সাহিত্য সৃষ্টিই এর কাজ।৩৮ এতে মানুষের চিন্তা-চেতনা, আশা-আকাঙ্ক্ষা, দুঃখ-বেদনা, ন্যায়-অন্যায় ও দুনিয়া-আখিরাতের চিত্র যেমন রূপায়িত হয়, তেমনি তার সকল মূল্যবোধ ও চিন্তাধারার চিত্রও ফুটিয়ে তোলা হয়। এক কথায়, ইসলামী সাহিত্য জীবনের প্রতিনিধিত্ব করে। আর জীবন বলতে যা ছিল, যা হচ্ছে বা হবে এবং যা হওয়া উচিত সবগুলোই বোঝায়। ইসলামী সাহিত্য এসব বিষয়ের ওপর নৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে আলোকপাত করে। একজন ইসলামী সাহিত্যিক একদিকে যেমন ইসলামের ওপর পূর্ণ বিশ্বাসী হবেন, তেমনি অন্যদিকে হবেন পুরোপুরি সমাজ ও পরিবেশ সচেতন। মানুষের এবং মানুষের সমাজের সমস্যাগুলো সে হৃদয় দিয়ে অনুভব করবেন। মানবতার কল্যাণাকাক্সক্ষা তার হৃদয়ের প্রতিটি তন্ত্রীতে অনুরণিত হবে। তিনি সাহিত্যে ইসলামের আকীদা-বিশ্বাস ও মূল্যবোধগুলো প্রতিষ্ঠা করবেন। পাশাপাশি বর্তমান নৈতিকতা-বিগর্হিত পরিবেশ ও অসুস্থ সমাজচরিত্রের মুখোশ উন্মোচন করবেন। এ সাথে ইসলামের নৈতিক চরিত্রের গুণাবলির আলো জ্বালিয়ে সমগ্র সমাজ অঙ্গনকে আলোকিত করবেন। তাছাড়া তিনি জগত ও প্রকৃতির মনোজ্ঞ চিত্র অঙ্কন করে আল্লাহর অপার কুদরত মানব সমক্ষে তুলে ধরতে পারেন।

ইসলামী সাহিত্য রচনার সুনির্দিষ্ট কোনো ফর্ম বা ধারা নেই; বরং ইসলামী আদর্শ ও মূল্যবোধকে ধারণ করে বর্তমানে সাহিত্যে প্রচলিত বিভিন্ন ফর্ম যেমন কবিতা, নাটক, উপন্যাস, ছোট গল্প, প্রবন্ধ, গদ্য-কবিতা, লিপি-সাহিত্য, ভ্রমণবৃত্তান্ত, জীবন চরিত ও আত্মচরিত প্রভৃতি এবং বিভিন্ন শৈল্পিক ধারা যেমন গীতিধারা (Lyrical trend), বাস্তবনিষ্ঠ ধারা (Realistic trend), ভাবতান্ত্রিক ধারা (Idealistic trend), রোমান্টিক ধারা (Romantic trend), ক্লাসিক ধারা (Classic trend), মিস্টিক ধারা (Mystic trend) ও প্রতীকী ধারা (Symbolic trend) প্রভৃতি অনুকরণ করে ইসলামী সাহিত্য রচনা করা যায়। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, আমাদের যুগের ইসলামী সাহিত্যিকগণ সাহিত্যের আধুনিক ফর্ম ও ধারা অবলম্বন করে সাহিত্য সৃষ্টির পথে এগিয়ে আসছেন না। তাঁরা কেবল ক্লাসিক্যাল রীতি ও ধারা অনুযায়ী কবিতা রচনা করতে এবং প্রবন্ধ ও সন্দর্ভ লেখালেখি করতেই স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আবার অনেকেই গল্প, নাটক ও উপন্যাসকে ভালো চোখে দেখেন না। তবে এর মধ্যেও নতুন ফর্ম ও ধারা অবলম্বন করে বর্তমানে কিছু কিছু কাজ হচ্ছে না, তা নয়; তবে প্রয়োজনের তুলনায় তা অত্যন্ত অপ্রতুল। এ প্রসঙ্গে প্রখ্যাত ইসলামী সাহিত্যিক ড. আবদুর রহমান রা’ফাত পাশার মন্তব্যটি প্রনিধানযোগ্য। তিনি বলেন,

“সাহিত্যের নতুন নতুন ফর্ম, বিশেষ করে গল্প, উপন্যাস ও নাটকের প্রতি সর্বসাধারণের আকর্ষণ দেখে আমাদের চোখ খোলে দেখা প্রয়োজন, এ সব বিপজ্জনক অস্ত্রে সুসজ্জিত হয়ে কীভাবে অন্যায় ও অশ্লীলতা আমাদের জাতীয় জীবনে মজবুত অবস্থান তৈরি করে নিচ্ছে। অধিকন্তু, এর ভয়াবহ পরিণাম থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে আমাদের প্রস্তুত হতে হবে সে অস্ত্র ছিনিয়ে নিয়ে সেই আল্লাহভীরু লোকদের হাতে তুলে দেওয়ার জন্য, যাঁরা এসব অস্ত্রকে কল্যাণ ও ন্যায়ের পথে ব্যবহার করতে সমর্থ হবেন। আমরা মিম্বরগুলোতে অশ্লীল বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা এবং মিডিয়ার সাথে সম্পর্কচ্ছেদের বক্তব্য শুনতে পাই। কিন্তু এসব লোক এটা বুঝতে পারছে না যে, সে বই-পুস্তক, পত্র-পত্রিকা ও মিডিয়ার মুকাবিলা মিম্বরের খুতবা কিংবা মাহফিলের জ্বালাময়ী বক্তব্য দ্বারা হবে না; বরং তার মুকাবিলা করতে হলে ইতিবাচক ও গঠনমূলক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে হবে। আঁধারকে হাজার বার গালি দেয়ার চাইতে একটি মোম বাতি জ্বালিয়ে দেয়াই শ্রেয়।”৩৯

ইসলামী সাহিত্য কোনো ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা জাতিবিশেষের জন্যও সীমাবদ্ধ নয়। কোনো স্থান ও সময়ের জন্যও নির্ধারিত নয়; বরং যেসব মূল্যবোধের ভিত্তিতে ইসলামী সাহিত্য গড়ে ওঠে, সেগুলো যেমন সর্বকালীন ও বিশ্বজনীন, তেমনি ইসলামী সাহিত্যের ব্যাপ্তিও সর্বকালীন ও বিশ্বজনীন। আরবদেশে আরবরা ইসলামী মূল্যবোধের ভিত্তিতে যে সাহিত্য গড়ে তোলে, বাংলাদেশের মুসলমানরা তাদের গড়া ইসলামী সাহিত্যের সাথে তার ব্যাপক সাযুজ্য অনুভব করে। ওয়াশিংটনে বা লন্ডনে যে সাহিত্য গড়ে ওঠে তার মানবিক মূল্যবোধটুকুই আমাদের হৃদয় স্পর্শ করে; কিন্তু আরবের ইসলামী সাহিত্যের সবটুকুই আমাদের আপন মনে হয়।

ইসলামী সাহিত্যের বিশ্বজনীনতার আর একটা দিক হচ্ছে, সমগ্র বিশ্ব মানবতার জন্য এর সুস্পষ্ট আবেদন রয়েছে। ইসলামী সাহিত্যের মূল্যবোধগুলো যে কোনো দেশের, যে কোনো সময়ের সাহিত্যের আদর্শ হতে পারে। মানবতার কল্যাণ, সামাজিক সাম্য ও সুবিচার ও সৌ-ভ্রাতৃত্ব ইত্যাদি বিষয়গুলো সকল দেশের সকল যুগের মানব সমাজের আপন সম্পদ। অতএব, এসব মূল্যবোধের ভিত্তিতে যে কোনো দেশে, যে কোনো সময়ে, যে কোনো ভাষায় মুসলমানদের রচিত সাহিত্যকর্মগুলো ‘ইসলামী সাহিত্য’ অভিধায় ভূষিত হবে। চাই তা আরবী ভাষায় হোক, কিংবা বাংলায় বা উর্দুতে বা ইংরেজিতে হোক বা অন্য যে কোন ভাষায়।

ইসলামী ভাবধারা যে উন্নতমানের বিশ্বজনীন সাহিত্যে সৃষ্টিতে সক্ষম, মহাকবি আল্লামা ইকবালের সাহিত্য তার প্রমাণ। তিনি উর্দু ভাষায় ইসলামী সাহিত্যের এমন নিদর্শন সৃষ্টি করেছেন, যা বিংশ শতাব্দীতে ইসলামী সাহিত্যের বিপ্লবী চেতনাকে পরিপূর্ণ রূপদানে সক্ষম হয়েছে। তিনি ইসলামের চিন্তাধারাকে কুর’আন ও হাদীস থেকে সরাসরি গ্রহণ করেছেন। প্রচলিত চিন্তা ও মতবাদের প্রতাপে তিনি কোথাও আড়ষ্ট হননি। এ ছাড়া পাশ্চাত্যের চিন্তার মধ্য দিয়ে অতিক্রম করার সময় তিনি কোথাও তার বিভ্রান্তি, ক্ষতি ও ধ্বংসকারিতা সম্পর্কে যুগমানসকে সতর্ক করতে ভুলেননি। বাংলায় ফররুখ আহমদ বিশেষ পদ্ধতিতে প্রায় তাঁরই অনুসরণ করেছেন। তাঁর সাহিত্যে আমরা এক দিকে দেখি জীবন সংগ্রাম। এ জীবন সংগ্রামে মর্দে মু’মিনের আত্মা ক্লান্ত পরিশ্রান্ত নয়। হতাশার বিরুদ্ধে তাঁর জিহাদ। হতাশার সাত সাগর পাড়ি দিয়ে সে হেরার রাজ তোরণে উপনীত হবেই। অন্যায়-শোষণ-যুলমের বিরুদ্ধে তার জিহাদ। এই অন্যায়-যুলমের টুটি চেপে ধরার জন্য সে ‘উমরের মতো সিপাহসিলারের অনুসন্ধান করে ফিরছে।৪০

উপসংহার

ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টি ইসলামী জীবন বিধান প্রতিষ্ঠার আন্দোলনেরই একটি অপরিহার্য অংশ। তাই ইসলামী সমাজ বিনির্মাণে যে সর্বাত্মক অবিরাম প্রচেষ্ঠা চালানোর কথা বলা হয়েছে, শিল্প-সাহিত্যের মাধ্যমেও সে প্রচেষ্ঠা অব্যাহত রাখা অপরিহার্য। ঈমানী তেজোদ্দীপ্ত সালিহ-মুত্তাকীদেরকে এর গুরুত্ব যথাযথভাবে উপলব্ধি করে স্বীয় দায়িত্ব পালনে যতœবান হতে হবে। এ দায়িত্ব পালন নিঃসন্দেহে জিহাদের সমতুল্য। কবি হাস্সান, কা‘ব ও ‘আবদুল্লাহ ইবন রাওয়াহা (রা.) প্রমুখ এ জিহাদী দায়িত্বই পালন করে গেছেন, আর এ ক্ষেত্রে রেখে গেছেন এক বর্ণাঢ্য, স্বর্ণোজ্জ্বল ঐতিহ্য। আধুনিক আরবী, উর্দু ও ফার্সী ভাষায় বেশ কিছু কাল থেকে ইসলামী সাহিত্য আন্দোলন চলছে। বাংলা ভাষায়ও আজ এর যথার্থ সময় উপস্থিত। এতে বর্তমানে বেশ জোরালেভাবে দুটি ধারা প্রচলিত রয়েছে। একটা ফ্রয়েডীয় এবং অন্যটা মার্কসীয়। অর্থাৎ একটা যৌনবৃত্তি এবং অন্যটা উদরবৃত্তি। ইসলামী যে ধারাটি চালু রয়েছে তা অনুজ্জ্বল বলা চলে। ফলে বাংলা সাহিত্য এখন অনেকটা অপাঠ্য পর্যায়ে পৌঁছে গেছে। অথচ বাংলায় মধ্যযুগ থেকে মুসলিম সাহিত্য সাধনার যে একটা স্বতন্ত্র ধারা চলে আসছে, তার মধ্যেই রয়েছে ইসলামী সাহিত্যের বীজ। তাই বাংলা ভাষায় আজ ইসলামী সাহিত্য সৃষ্টিকে একটি আন্দোলনে রূপ দিতে হবে।

টীকা ও তথ্যসূত্র

১. সাহিত্য শব্দটি বাংলা। আভিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে এটি ‘সহিত’ শব্দ থেকে এসেছে। এর অর্থ হল মিলন বা একাত্মতা। কেউ বলেছেন, এই মিলন হচ্ছে শব্দের সাথে শব্দের মিলন। কেউ বলেছেন, লেখকের সাথে পাঠকের মিলন। কেউ বলেছেন, শব্দার্থের পরস্পর সমতা তথা শব্দ ও অর্থের সুষম মিলন। সাহিত্যের আরবী প্রতিশব্দ ‘আদব’। এর আভিধানিক অর্থ হল শিষ্টাচার, সুন্দর আচরণ ইত্যাদি। বর্তমানে শব্দটি ‘সাহিত্য’ অর্থে ব্যবহৃত হয়। শব্দটি এ অর্থে ব্যবহারের মধ্যে এ দিকে সূক্ষ্ম ইঙ্গিত রয়েছে যে, সাহিত্য হলো, যা মানুষকে শ্ল¬ীলতা ও ন্যায়ের প্রতি উদ্বুদ্ধ করে এবং অশ্ল¬ীলতা ও অন্যায় থেকে বারণ করে। কুরুচিপূর্ণ রচনা ‘সাহিত্য’ নামে আখ্যা পাওয়ার উপযোগী নয়।

২. দাশ, শ্রীশ চন্দ্র, সাহিত্য-সন্দর্শন, ঢাকা: বর্ণবিচিত্রা, ১৯৯৪, পৃ.২১

৩. প্রখ্যাত ইসলামী সাহিত্যিক সাইয়িদ কুতুব সাহিত্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন,

هو التعبير عن تجربة شعورية في صورة موحية .-“ সাহিত্য হলো আত্মগত ভাবসঞ্জাত অভিজ্ঞতাকে এমন ভাবে প্রকাশ করা, যা পাঠকের অন্তরে দোলা দিতে সক্ষম হয়।” (সাইয়িদ কুতুব, আন-নাকদুল আদবী: উসূলূহু ওয়া মানাহিযুহু, বৈরূত: দারুশ শুরুক, ১৯৮৩, পৃ. ৯)

অন্যত্র তিনি বলেন,

هو تعبير عن قيم حية ينفعل بها ضمير الفنان ... و أن هذه القيم ... تنبثق عن تصور معين للحياة و الارتباط بين الإنسان و الكون و بين بعض الإنسان و بعض.

“শিল্পীর আত্মিক অনুভূতি সঞ্জাত উচ্ছ্বল মূল্যবোধকে অন্যের হৃদয়পটে প্রভাব বিস্তারকারী ভঙ্গিমায় প্রকাশ করাই হলো সাহিত্য। আর এ মূল্যবোধগুলো জীবন সম্পর্কে এবং জীবনে মানুষ ও জগতের সংযোগ এবং মানুষের পারষ্পরিক সম্বন্ধ সম্পর্কে সুনির্দিষ্ট চিন্তাধারা থেকে উদ্ভূত হয়।” (সাইয়িদ কুতুব, في التلريخ : فكرة و منهاج, বৈরূত: দারুশ শুরুক, ১৯৮৭, পৃ. ১১)

৪. ডি. এলিযাবেথ, ‘ الشعر: كيف نفهمه و نتذوقه (অনু: আশ-শূশ, মুহাম্মদ ইব্রাহীম, বৈরূত: মাকতাবাতু ফীমনাহ, ১৯৬১,) পৃ. ২৯

৫. কাস্সাব, ড. ওয়ালীদ, الأدب الإسلامي : مفهومه و أبعاده, ...পৃ.৯২

৬. দাশ, প্রাগুক্ত, পৃ.২২

৭. তালিব, আবদুল মান্নান, ইসলামী সাহিত্য: মূল্যবোধ ও উপাদান, (ঢাকা: বাংলা সাহিত্য পরিষদ, ১৯৮৪), পৃ. ৬

৮. তিরমিযী, আবূ ‘ঈসা মুহাম্মদ, আল-জামি‘, কিতাবুল আদাব, হাদীস নং: ২৭৭৩; আবূ দাউদ, সুলাইমান, আস-সুনান, কিতাবুল আদাব, হাদীস নং: ৪৩৬১

৯. ইস্পাহানী, আবুল ফরজ ‘আলী, কিতাবুল আগানী, (বৈরূত : দারুল ফিকর, ১৯৮৬), খ.৪, পৃ. ১৪৯

১০. ইস্পাহানী, প্রাগুক্ত, খ.৪, পৃ. ১৪৩

১১. ইবনু হাম্বল, আহমদ, আল-মুসনাদ, হাদীস নং: ২৩৯২০

১২. মুসলিম, আবুল হুসাইন, আস-সাহীহ, কিতাবুশ শি‘র, হাদীস নং ৪১৯৩

১৩. মোশাররফ হোসেন খান, সাহিত্য-সভ্যতা বিকাশে রাসুল (সা.), অগ্রপথিক, (ঢাকা: ইফাবা, জুলাই ২০০৩), পৃ. ৫৯ (শারহু শাওয়াহিদিল মুগনী, ১/২৩ সূত্রে বর্ণিত।)

১৪. আল-কুর’আন, ২:৩০

১৫. বরীগশ, মুহাম্মদ হাসান, الأدب الإسلامي : أصوله و سماته, ওমান: দারুল বশীর, ১৯৯২, পৃ. ১০৭; কিলানী, নজীব, مدخل إلى الأدب الإسلامي, কাতার: কুত্তাবুল উম্মাহ, ১৪০৭ি হ.,পৃ. ৩৬;

প্রখ্যাত ইসলামী সাহিত্যিক অধ্যাপক মুহাম্মদ কুতুব ইসলামী সাহিত্যের সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বলেন,

هو التعبير الجميل عن الكون و الحياة و الإنسان من خلال تصور الإسلام لهذا الوجود- “ইসলামের দৃষ্টিকোণ থেকে জগত, জীবন ও মানব সম্পর্কে সুন্দর বর্ণনাই হলো ইসলামী সাহিত্য।” (কুতুব, মুহাম্মদ, منهج الفن الإسلامي‘, বৈরূত: দারুশ শুরুক, ১৯৮৩, পৃ.৬ )

১৬. الأدب الإسلامي : فكرته و منهاجه, লখনৌ: নাদওয়াতুল আদাব আল-ইসলামী .., ১৯৮১, পৃ.৬৭ (রা’ফাত পাশা, ড. আবদুর রহমান, نحو مذهب إسلامي في النقد و الأدب শীর্ষক প্রবন্ধ)

১৭. প্রাগুক্ত, পৃ.৬৯

১৮. আল-কুর’আন,৬: ১৬২

১৯. সাহিত্যের পরিভাষায় একে ভাবতান্ত্রিক সাহিত্য (ওফবধষরংঃরপ খরঃবৎধঃঁৎব) বলা হয়। সাহিত্যের এ ধারা, যাতে বস্তু ও ভাবের পরম সমন্বিত রস সৃষ্টি হয়ে থাকে, তাকে শ্রেষ্ঠ সাহিত্য হিসেবে গণ্য করা হয়।

২০. তালিব. প্রাগুক্ত, পৃ.২০-২১

২১. বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল মানাকিব, হাদীস নং: ৩৫৫৩, কিতাবুল আদাব, হা.নং: ৫৬৮১; মুসলিম, আস-সাহীহ, কিতাবুশ শি‘র, হা.নং: ৪১৮৭; তিরমিযী, আল-জামি‘, কিতাবুল আদাব, হা.নং: ২২৭৬

২২. মোশাররফ হোসেন খান, প্রাগুক্ত, পৃ. ৫১

২৩. আল-কুর’আন,২৪:৩০

২৪. আবুর রিদা, সা‘দ, الأدب الإسلامي : قضية و بناء, জিদ্দা: আলমুল মা‘রিফাহ, ১৯৮৩, পৃ. ৯; ‘আব্বুদ, শলতাগ, الملامح العامة لنظرية الأدب الإسلاميদামিশক: দারুল মা‘আরিফা, ১৯৯২, পৃ.২৭; তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ. ৩০

২৫. মাজাল¬াতু রাবিতাতিল আদাবিল ইসলামী, ১৪১৫ হি. সংখ্যা-৮, পৃ.৫

২৬. কিলানী, প্রাগুক্ত, পৃ.৩৬; আবুর রিদা, প্রাগুক্ত, পৃ. ১০; বরীগশ, প্রাগুক্ত, পৃ. ১১১, ১১৩; আন-নাহভী, ‘আদনান, الأدب الإسلامي : إنسانيته و عالميته ‘(রিয়াদ: দারুন নাহভী) পৃ. ২৩

২৭. কিলানী, প্রাগুক্ত, পৃ.৩৬

২৮. বুখারী, আদাবুল মুফরাদ, পৃ. ৩৭৯

২৯. ইবনু ‘উমর আল-বাগদাদী, ‘আবদুল কাদির, خزانة الآداب و لب لباب لسان العرب, (মিসর: আল-হায়ইয়াতুল মিসরিয়্যা, ১৯৭৭), খ.১, পৃ.২৪৯

৩০. কাসসাব, প্রাগুক্ত, পৃ.৯৭।

তবে অনেকে একে অন্য নামেও ভূষিত করেছেন। যেমন- কেউ একে ‘সুস্থ রুচিশীল সাহিত্য’ (أدب الفطرة السوية) নামে, আবার কেউ একে ‘নিরপেক্ষ সাহিত্য’ (الأدب المحايد) নামে, আর কেউ একে ‘নৈতিক সাহিত্য’ (الأدب الخلقي) নামে আখ্যা দিয়েছেন। ড. আবদুল কুদ্দুস আবূ সালিহ একে ‘ইসলামী সাহিত্যের সাথে সামঞ্জস্যশীল সাহিত্য’ (الأدب الموافق للأدب الإسلامي) বলেছেন। ড. আহমদ বাসসাম ইসলামী ভাবধারার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ইউরোপীয় সাহিত্য কিংবা যে কোনো অমুসলিম সাহিত্যকে ‘মানবিক সাহিত্য’ (الأدب الإنساني) নামে আখ্যায়িত করেছেন।)

৩১. বুখারী, আস-সাহীহ, কিতাবুল আদাব, হাদীস নং: ৫৬৭৯, আবূ দাউদ, আস-সুনান, কিতাবুল আদাব, হা.নং: ৪৩৫৭; ইবনু মাজাহ, আবূ ‘আবদুল¬াহ, আস-সুনান, কিতাবুল আদাব, হা.নং: ৩৭৪৫

৩২. ইবনু ‘আবদুল র্বার, (তাহকীক: মুহাম্মদ মূসা আল-খাওলী, কায়রো: আদ-দারুল মিসরিয়্যা, ১৩৮২), খ. ১, পৃ. ৩৮

৩৩. অনেকে এ ধরনের সাহিত্যকে ‘জাহিলী সাহিত্য’ নামে, আবার অনেকে একে ‘পশ্চাদপদ সাহিত্য’ (Retreating Literature) নামেও আখ্যায়িত করেন।

৩৪. বুখারী, আল-আদাবুল মুফরাদ, পৃ.১৩৯

৩৫. আল-কুর’আন, ১৭:৩২

৩৬. তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ.২৭-২৮

৩৭. কাস্সাব, الحداثة في الشعر العربي المعاصر, দুবাই: দারুল কলম, ১৯৯৬, পৃ.১০০

৩৮. الأدب الإسلامي : فكرته و منهاجه, লখনৌ: নাদওয়াতুল আদাব আল-ইসলামী .., ১৯৮১, পৃ.৯০ (বদর, ড. আবদুল বাসিত, ملاحظات حول تعريف الأدب الإسلامي শীর্ষক প্রবন্ধ)

৩৯. الأدب الإسلامي : فكرته و منهاجه, লখনৌ: নাদওয়াতুল আদাব আল-ইসলামী .., ১৯৮১, পৃ.৬৪ (রা’ফত পাশা, ড. আবদুর রহমান, نحو مذهب إسلامي في النقد و الأدب শীর্ষক প্রবন্ধ)

৪০. তালিব, প্রাগুক্ত, পৃ.৩৮