আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা: সমস্যাবলি ও সম্ভাব্য উত্তরণ-প্রক্রিয়া

ভূমিকা

আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা। এর প্রধান পরিচয় হলো তার ‘বিশেষায়িত’ দিক। জাতির ধর্মীয় ও পার্থিবÑসামগ্রিক কল্যাণ নিশ্চিত করতে এই বিশেষায়িত শিক্ষাধারার স্বকীয়তা সংরক্ষণ, আধুনিক ও যুগোপযোগী কারিকুলাম ও সিলেবাস প্রণয়ন এবং বৈশি^ক প্রেক্ষাপটে এর প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখা অত্যন্ত প্রয়োজনীয়। তবে যে মৌলিক উদ্দেশ্যকে সামনে রেখে শিক্ষাব্যবস্থার এ ধারাটি গড়ে ওঠেছিল, সময়ের এই সন্ধিক্ষণে এসে তা কতটুকু বাস্তবায়িত হচ্ছেÑসে প্রশ্ন আজও প্রাসঙ্গিক রয়ে গেছে। বর্তমান এই শিক্ষাব্যবস্থায় নানা ধরনের কাঠামোগত ও নীতিগত সমস্যা বিদ্যমান, যা এর পূর্ণ বিকাশে এবং স্বাতন্ত্র্য অক্ষুণœ রাখতে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করছে। বক্ষ্যমাণ প্রবন্ধে আমরা আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থার ইতিহাস, কাঠামো, বর্তমান সমস্যা, কারণ এবং সম্ভাব্য উত্তরণের উপায় সংক্ষেপে তোলে ধরবো, ইন্শা’আল্লাহ।

আলিয়া শিক্ষাধারার উদ্ভব ও বিকাশ

১৭৫৭ খ্রিস্টাব্দে পলাশীর যুদ্ধের পর ব্রিটিশরা উপমহাদেশে উপনিবেশ স্থাপন করলে এখানকার ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা ক্রমে স্থবির হয়ে পড়ে। এ সময় মুসলিম সমাজের মধ্যে ইসলামী জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা রক্ষার জন্য এবং সঠিক দ্বীনী জ্ঞান বিতরণের উদ্দেশ্যে আলিমসমাজ সর্বোচ্চ প্রচেষ্টা চালাতে থাকেন। তবে এই প্রচেষ্টায় প্রশাসনিক বা সরকারি কোন পৃষ্ঠপোষকতা ছিল না।

সরকারি স্বীকৃতি ও সহায়তার অভাবে তখন ব্রিটিশ প্রশাসন দাপ্তরিক কার্যক্রম পরিচালনার জন্য দক্ষ কর্মী খুঁজে পেতে ব্যর্থ হচ্ছিল। কারণ, ব্রিটিশরা ইংরেজি ভাষাকে জোরপূর্বক চাপিয়ে দিয়েছিল, যা এ অঞ্চলের মানুষের ছিল সম্পূর্ণ অপরিচিত। এই সমস্যার সমাধানে ব্রিটিশ সরকার একদিকে বিকল্প শিক্ষাব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার চেষ্টা করে, অন্যদিকে মুসলিম নেতৃবৃন্দও মুসলিম সমাজের জন্য স্বতন্ত্র ইসলামী শিক্ষাকেন্দ্র প্রতিষ্ঠার দাবি জোরালো করতে থাকেন। অবশেষে ১৭৮০ খ্রিস্টাব্দে গভর্নর জেনারেল ওয়ারেন হেস্টিং কলকাতায় কলকাতা আলিয়া মাদরাসা প্রতিষ্ঠা করেন এবং এর যাবতীয় ব্যয়ভার তার নিজস্ব তহবিল থেকে বহন করার দায়িত্ব নেন। এর মূল উদ্দেশ্য ছিল মুসলিম আইন (শরীয়া), ফিকহ, ও আরবী ভাষায় দক্ষ কর্মচারী তৈরি করা, যারা ব্রিটিশ প্রশাসনে কাজ করতে পারে। এই মাদরাসার পাঠ্যক্রম প্রণয়ন করা হয় উপনিবেশ-পূর্বকাল থেকে প্রচলিত ‘দরসে নেজামী’-এর পদ্ধতির অনুসরণে। পরবর্তীতে এ ধারা পূর্ববঙ্গে ছড়িয়ে পড়ে এবং আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা বাংলাদেশের মুসলিম সমাজে একটি সুপ্রতিষ্ঠিত শিক্ষা ধারায় পরিণত হয়।

১৮২৩ খ্রিস্টাব্দে আলিয়া মাদরাসার সিলেবাস সংস্কারের উদ্যোগ শুরু হয়। সাধারণভাবে সিলেবাস সংস্কার একটি স্বাভাবিক ও প্রয়োজনীয় বিষয় হলেও এই সংস্কারের অন্তরালে ছিল ইসলামী শিক্ষাকে ধীরে ধীরে প্রাণহীন ও অকার্যকর করে তোলার পরিকল্পনা। সংস্কারের এই ধারাবাহিকতায় ১৯১০ খ্রিস্টাব্দে আলিয়া মাদরাসাকে দুভাগে ভাগ করা হয়Ñ

১. ওল্ড স্কীম মাদরাসা, যেখানে প্রাচীন সিলেবাস বহাল রাখা হয়;

২. নিউ স্কীম মাদরাসা, যেখানে সেক্যুলার ধাঁচে নতুন পাঠ্যক্রম প্রবর্তিত হয়।

নিউ স্কীম মাদরাসার শিক্ষার্থীদের জন্য বিশ^বিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগসহ বিভিন্ন সুবিধা দেওয়া হয়। কিন্তু ওল্ড স্কীম মাদরাসাগুলোকে পরিকল্পিতভাবে অস্তিত্ব সঙ্কটের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়।

পাকিস্তান আমলে নিউ স্কীম মাদরাসাগুলোকে সাধারণ শিক্ষার সাথে একীভূত করা হয়, আর ওল্ড স্কীম মাদরাসাগুলো দরসে নেজামী পদ্ধতির অনুসরণে স্বাধীনভাবে পরিচালিত হতে থাকে।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর মাদরাসা শিক্ষায় নতুন প্রাণ সঞ্চার হয়। এ সময় বিভিন্ন সরকার আলিয়া শিক্ষাকে যুগোপযোগী ও কর্মমুখী করার নানা উদ্যোগ নেয়। প্রেসিডেন্ট শহীদ জিয়াউর রহমান-এর সময় গধফৎধংযধ ঊফঁপধঃরড়হ ঙৎফরহধহপব, ১৯৭৮ জারি করা হয়। এই অধ্যাদেশের মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড’ প্রতিষ্ঠিত হয় এবং মাদরাসা শিক্ষা একটি স্বতন্ত্র ধারায় জাতীয় শিক্ষাব্যবস্থার অন্তর্ভুক্ত হয়। ২০০৩ সালে মাদরাসা শিক্ষার উচ্চতর ডিগ্রিÑফাজিল ও কামিল ইসলামী বিশ^বিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার অধীনে নিয়ে আসা হয়। ২০১৩ সালে প্রতিষ্ঠা করা হয় ইসলামি-আরবি বিশ^বিদ্যালয়। ২০১৫-২০১৬ শিক্ষাবর্ষ থেকৈ ফাজিল ও কামিল ডিগ্রিসমূহ এ বিশ^বিদ্যালয়ের অধীনে নিয়ে আসা হয়।

স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে একাধিক শিক্ষা কমিশন গঠিত হয়েছে। এসব কমিশনের প্রস্তাব ও শিক্ষানীতি অনুসারে আলিয়া মাদরাসার সিলেবাসেও সময়ের প্রয়োজনের বিভিন্ন সংস্কার আনা হয়েছে। এরই ধারাবাহিকতায় ২০০৯ সালে গঠিত হয় কবির চৌধুরি শিক্ষা কমিশন, যার প্রণীত শিক্ষানীতিই বর্তমানে জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০ নামে পরিচিত। বাংলাদশের বর্তমান সকল ধারার পাঠ্যক্রম ও পাঠ্যসূচি এই শিক্ষানীতির আলোকে প্রণীত হয়েছে।

‘জাতীয় শিক্ষানীতি ২০১০’ মূলত প্রণীত হয় শিক্ষাকে জীবনমুখী, দক্ষতাভিত্তিক ও কর্মসংস্থান উপযোগী করার লক্ষ্যে। পাশাপাশি এ নীতির উদ্দেশ্য ছিল জাতীয় ঐক্য সুদৃঢ় করা এবং মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় শিক্ষাব্যবস্থাকে সমুন্নত রাখা।

এই শিক্ষানীতির ৬ষ্ঠ অধ্যায়ে মাদরাসা শিক্ষার লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও বাস্তবায়ন কৌশল নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এর উল্লেখযোগ্য কয়েকটি দিক হলোÑ

ক. সাধারণ শিক্ষার সাথে মাদরাসা শিক্ষার বিষয়সমূহের সমন্বয় সাধন।

খ. বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞানসহ আধুনিক বিষয়ের অন্তর্ভুক্তি।

গ. কারিগরি ও জীবনমুখী শিক্ষার সংযোজন।

ঘ. তথ্যপ্রযুক্তি শিক্ষাকে বাধ্যতামূলক করা।

ঙ. ধর্মীয় শিক্ষা সংরক্ষণ ও ইসলামি মূল্যবোধ জোরদার করা।

চ. কওমি শিক্ষাকে জাতীয় শিক্ষার মূলধারায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ গ্রহণ।

এ শিক্ষানীতির আলোকে ২০১২ সালে জাতীয় শিক্ষাক্রম ২০১২ প্রণীত হয়। এটি ‘সৃজনশীল শিক্ষাক্রম’ নামেই অনেকের কাছে পরিচিত। এই শিক্ষাক্রমে মুখস্থ নির্ভরতার পরিবর্তে শিক্ষার্থীদের মেধা যাচাই ও দক্ষতা বিকাশে গুরুত্বারোপ করা হয়েছে। পরবর্তীতে এ শিক্ষাক্রমকে পরির্বতন করে জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১ প্রণীত হয়। ২০২২ সালে এর পাইলটিং কার্যক্রম পরিচালিত হয় এবং ২০২৩ সালে রূপরেখাটি আনুষ্ঠানিকভাবে বাস্তবায়ন করা হয়। তবে বাস্তবায়নের পর থেকেই এই শিক্ষাক্রম রূপরেখাটি জাতীয়ভাবে ব্যাপক সমালোচনার জন্ম দেয়। ২০২৪-এর জুলাই মাসে রাজনৈতিক পরিবর্তনের পর অন্তর্বর্তীকালীন সরকার জাতীয় শিক্ষাক্রম রূপরেখা ২০২১ স্থগিত করে পূর্বের জাতীয় শিক্ষাক্রম-২০১২তে ফিরে যাওয়ার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। সরকারের এই সিদ্ধান্তের পর সংশ্লিষ্ট দপ্তরসমূহ পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও পরিমার্জন, মূল্যায়ন পদ্ধতির আধুনিকায়নসহ বিভিন্ন উদ্যোগ গ্রহণ করে।

আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থার কাঠামো

আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থা মূলত দুটি পর্যায়ে বিভক্তÑ

ক. দ্বীনী শিক্ষা: কুরআন, হাদীস, আকাইদ, ফিকহ, আরবী ভাষা, ইসলামের ইতিহাস প্রভৃতি;

খ. সাধারণ শিক্ষা: বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি ইত্যাদি।

এভাবে এই ব্যবস্থা ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আধুনিক জ্ঞানের মধ্যে ভারসাম্য আনার চেষ্টা করে। তবে বাস্তব প্রয়োগে এই ভারসাম্য কতটা অর্জিত হচ্ছেÑসেই প্রশ্ন দিনেদিনে বেড়েই চলছে।

আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থা সময়ের সঙ্গে পরিবর্তিত হয়ে এখন প্রাথমিক থেকে উচ্চশিক্ষা পর্যন্ত বিস্তৃত। এ ধারায় পাঁচ ধরনের মাদরাসা রয়েছেÑ স্বতন্ত্র ইবতেদায়ী মাদরাসা, দাখিল (এস.এস.সি সমমান) মাদরাসা, আলিম (এইচ.এস.সি সমমান) মাদরাসা, ফাজিল (¯œাতকÑ ডিগ্রি ও অনার্স সমমান) মাদরাসা ও কামিল (মাস্টার্স সমমান) মাদরাসা। বর্তমানে বাংলাদেশ মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড এবং ইসলামি-আরবি বিশ^বিদ্যালয়-এর অধীনে এই ব্যবস্থা পরিচালিত হয়।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে, বাংলাদেশের স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে প্রবর্তিত প্রায় সব শিক্ষানীতিই মূলত ধর্মনিরপেক্ষ বা সেক্যুলার চিন্তাধারার ভিত্তিতে রচিত হয়েছে। এসব নীতিতে মাদরাসায় সাধারণ শিক্ষার বিকাশের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হলেও, দ্বীনী শিক্ষার উন্নয়ন ও বিকাশের জন্য কার্যকর কোনো দিকনির্দেশনা বা পরিকল্পনা রাখা হয়নি।

আলিয়া শিক্ষাধারার প্রধান প্রধান সমস্যা ও উত্তরণের উপায়

ক. সিলেবাস ও কারিকুলামগত সমস্যাবলি

১. দ্বীনী ও সাধারণ শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্যহীনতা

আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থার মূল বশিষ্ট্য হলোÑ এটি একইসঙ্গে দ্বীনী ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বিত রূপ। পাঠ্যক্রমে ইসলামী জ্ঞানচর্চা ও আধুনিক বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার লক্ষ্য স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকলেও বাস্তব ক্ষেত্রে সেই কাক্সিক্ষত ভারসাম্য অর্জিত হয়নি। পাঠ্যক্রমের কাঠামো ও সময়বণ্টনের দিকে তাকালে দেখা যায়, দ্বীনী ও সাধারণ শিক্ষার অনুপাত ধীরে ধীরে অসম হয়ে পড়ছে।

সাম্প্রতিক পাঠ্যক্রম সংস্কার, জাতীয় শিক্ষা কাঠামোর সঙ্গে সামঞ্জস্য আনতে গিয়ে, আলিয়া মাদরাসাগুলোর সাধারণ শিক্ষার অংশ দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে। এখন বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, তথ্যপ্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান, অর্থনীতি ইত্যাদি বিষয়ে পাঠঘণ্টা ও মূল্যায়নের গুরুত্ব বহুলাংশে বেড়ে গেছে। অন্যদিকে, ইসলামী শিক্ষার প্রধান বিষয়সমূহÑ যেমন কুরআন, হাদীস, তাফসীর, আকাইদ, ফিকহ, উসূলল ফিকহ, আরবী ভাষা ও সাহিত্য, ইসলামী ইতিহাসÑ এই বিষয়গুলোর জন্য নির্ধারিত সময় ও পাঠ্যবিষয়ের পরিসর ক্রমশ কমে আসছে। ফলস্বরূপ, আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থার স্বকীয় ধর্মীয় চরিত্র, নেতিক ভিত্তি ও আদর্শগত ঐতিহ্য ক্রমান্বয়ে ক্ষয়প্রাপ্ত হচ্ছে। অনেক মাদরাসায় দ্বীনী শিক্ষা এখন নামমাত্র আনুষ্ঠানিকতার পর্যায়ে নেমে এসেছে, যা শিক্ষার্থীদের ধর্মীয় জ্ঞানের গভীরতা ও চিন্তাশক্তিকে সীমাবদ্ধ করে ফেলছে। বিশেষজ্ঞমহল বারবার সতর্ক করে বলেছেন যে, এই প্রবণতা অব্যাহত থাকলে আলিয়া মাদরাসা তার ঐতিহ্যগত চরিত্র হারিয়ে সাধারণ স্কুল-কলেজ ব্যবস্থার একটি অনুলিপিতে পরিণত হবে।

এখানে লক্ষণীয় যে, আধুনিকায়ন ও ধর্মীয় স্বকীয়তাÑ উভয়ের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষা করা অত্যন্ত জরুরি। আধুনিক জ্ঞান ও বিজ্ঞানভিত্তিক শিক্ষার বিস্তার অবশ্যই প্রয়োজনীয়, তবে তা দ্বীনী শিক্ষার ভিত্তিকে দুর্বল করে নয়; বরং আধুনিক জ্ঞানবিজ্ঞানকে একান্ত পরিপূরক হিসেবেই অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। যদি এই ভারসাম্য যথাযথভাবে রক্ষা করা যায়, তবেই আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থা একদিকে যেমন যুগোপযোগী হবে, অন্যদিকে ইসলামী মূল্যবোধ ও নৈতিকতা রক্ষার মাধ্যমে সমাজে এক অনন্য শিক্ষার ধারা প্রতিষ্ঠা করতে পারবে। এ উদ্দেশ্যে মাদরাসা বিশেষায়িত বিষয়গুলো ও সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলো এমন একটি যৌক্তিক অনুপাতে নিয়ে আসতে হবে, যাতে মাদরাসা শিক্ষার স্বকীয়তাও অক্ষুণœ থাকে, এর পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার একান্ত প্রয়োজনীয় বিষয়গুলোও বাদ না পড়ে। উদাহরণস্বরূপÑ প্রাথমিক স্তর থেকে উচ্চ মাধ্যমিক স্তর পর্যন্ত উভয় ধারার বিষয়গুলোর সম্ভাব্য অনুপাত হতে পারেÑ

 প্রাথমিক স্তরে: মাদরাসা বিশেষায়িত বিষয় ও সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলোর অনুপাত হতে পারে ৫০ঃ৫০;

 মাধ্যমিক স্তরে: সাধারণ শিক্ষার বিষয় ৩৫-৪০ শতাংশ, আর মাদরাসা বিশেষায়িত বিষয় ৬০-৬৫ শতাংশ রাখা যেতে পারে;

 উচ্চ মাধ্যমিক স্তরে: সাধারণ শিক্ষার বিষয় সর্বোচ্চ ২৫-৩০ শতাংশ, আর মাদরাসা বিশেষায়িত বিষয় ৭০-৭৫ শতাংশ নির্ধারণ করা যেতে পারে।

২. সিলেবাসের অসম্পূর্ণতা

আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান দুর্বলতা হলোÑ এর সিলেবাস বা পাঠ্যক্রমের অসম্পূর্ণতা। এই ব্যবস্থায় দ্বীনী শিক্ষা ও সাধারণ শিক্ষাÑ উভয় ধারার বিষয় অন্তর্ভুক্ত থাকলেও কোনো ক্ষেত্রেই গভীরতা ও বিশেষায়িত জ্ঞান অর্জনের পর্যাপ্ত সুযোগ তৈরি হয় না।

ধর্মীয় শিক্ষার ক্ষেত্রে দেখা যায়, প্রাচীন ইসলামী শাস্ত্রসমূহÑ যেমন তাফসীর, হাদীস, আকাইদ, ফিকহ, আরবী ভাষা ও সাহিত্য ইত্যাদি বিষয়ে কেবল নির্বাচিত অংশ বা নির্দিষ্ট অধ্যায় পাঠ করা হয়। ফলে শিক্ষার্থীরা কোনো একটি বিষয়কে পূর্ণাঙ্গভাবে অনুধাবন বা বিশ্লেষণ করার সুযোগ পায় না। অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক গ্রন্থ বা কিতাব সম্পূর্ণভাবে পাঠ করা হয় না; বরং সংক্ষিপ্ত ও আংশিক পাঠক্রমের মাধ্যমে পরীক্ষাভিত্তিক জ্ঞানার্জনেই সীমাবদ্ধ থাকতে হয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ইসলামী জ্ঞানের প্রকৃত গভীরতা, দর্শন, ও বিশ্লেষণাত্মক দিক অনুধাবন করতে পারে না। অন্যদিকে সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রেও একই ধরনের সীমাবদ্ধতা লক্ষ্য করা যায়। আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, তথ্যপ্রযুক্তি, পরিবেশবিদ্যা, অর্থনীতি, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক এবং সমসাময়িক সমাজবিজ্ঞানের মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো পাঠ্যক্রমে পর্যাপ্তভাবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়নি। অনেক মাদরাসায় এগুলোর পাঠদান কেবল আনুষ্ঠানিকভাবে হয়, কিন্তু ব্যবহারিক বা গবেষণামূলক কোনো প্রয়োগ দেখা যায় না। ফলে আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীরা সাধারণ স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ে।

এ অবস্থায় শিক্ষার্থীরা দুই ধারার জ্ঞানের মাঝামাঝি এক সীমিত স্তরে অবস্থান করে, যেখানে না তারা ধর্মীয় জ্ঞানে বিশেষজ্ঞ হতে পারে, না সাধারণ জ্ঞানে দক্ষতা অর্জন করতে পারে। এই দ্বৈত ঘাটতি তাদের উচ্চশিক্ষা ও কর্মজীবনে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়।

তাই আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে কার্যকর ও যুগোপযোগী করতে হলে পাঠ্যক্রমকে পুনর্গঠন করতে হবে। ধর্মীয় শিক্ষায় মৌলিক ও পূর্ণাঙ্গ কিতাবপাঠের সুযোগ সৃষ্টি করতে হবে, পাশাপাশি সাধারণ শিক্ষার ক্ষেত্রে আধুনিক বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও সামাজিক জ্ঞানের বিষয়গুলোকে বাস্তবভিত্তিকভাবে অন্তর্ভুক্ত করতে হবে। তবেই এই ব্যবস্থা সত্যিকার অর্থে ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর হয়ে উঠবে। এ উদ্দেশ্যে জাতীয় শিক্ষাক্রমের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে একটি সমন্বিত কারিকুলাম প্রণয়ন করলে শিক্ষার্থীরা উভয় ধারায় দক্ষ হতে পারবে।

৩. সিলেবাসের সমন্বয়হীনতা

স্তরভেদে আলিয়া ধারার পাঠ্যসূচিতে, বিশেষত মাদরাসা-বিশেষায়িত পাঠ্যপুস্তকগুলোর বিষয়বিন্যাস ও ধারাবাহিকতায় স্পষ্ট অসামঞ্জস্য দেখা যায়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা প্রাথমিক ও মাধ্যমিক স্তর অতিক্রম করে উচ্চ মাধ্যমিকে কিংবা উচ্চ শিক্ষায় পৌঁছালে ইসলাম শিক্ষার বিষয়গুলোতে প্রায়ই অস্বস্তি ও জটিলতার মুখে পড়ে। মূলত প্রাথমিক স্তর ও মাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যক্রম তাদেরকে পরবর্তী স্তরের ইসলামী বিষয়গুলো অধ্যয়নের জন্য যথাযথভাবে প্রস্তুত করতে ব্যর্থ হয়। ফলে উচ্চ মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষার ইসলামী পাঠ্যবিষয়গুলো, বিশেষত আরবী ট্রেক্সটনির্ভর পাঠ্যগ্রন্থগুলো শিক্ষার্থীদের কাছে অতিমাত্রায় কঠিন ও দুর্বোধ্য মনে হয়। এ পরিস্থিতির পরিণতিতে বিপুলসংখ্যক শিক্ষার্থী মাধ্যমিক কিংবা উচ্চ মাধ্যমিকের পর আর মাদরাসায় উচ্চশিক্ষা গ্রহণ না করে সাধারণ শিক্ষাধারার দিকে ঝুঁকে পড়ছে। উল্লেখ্য, ২০২৫ সালে দাখিল পরীক্ষায় অংশ নিয়েছে প্রায় ২,৯৩,০০০ জন শিক্ষাথী; কিন্তু আলিম পরীক্ষার্থীর সংখ্যা মাত্র ৮৬,০০০ জন। অর্থাৎ বিশাল এক অংশ মাধ্যমিকের পরই মাদরাসা ত্যাগ করেছে। আরও উদ্বেগজনক ব্যাপার হলোÑ আলিম স্তরের পর আবার অনেক শিক্ষার্থী মাদরাসা ছেড়ে বিভিন্ন পাবলিক বিশ^বিদ্যালয়ে বা সাধারণ কলেজে ভর্তি হচ্ছে। তাদের মধ্যে অনেকেই আবার দ্বৈত ভর্তি রাখেÑএকদিকে মাদরাসায় নামমাত্র ভর্তি থেকে কেবল পরীক্ষায় অংশ নেয়, আর অন্যদিকে সক্রিয়ভাবে বিশ^বিদ্যালয় বা কলেজে অধ্যয়ন করে।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োগযোগ্য উপায় হলোÑ ইবতেদায়ী থেকে কামিল পর্যন্ত পাঠ্যক্রম একক পরিকল্পনায় পুনর্র্নিমাণ করা; প্রতিটি স্তরের পাঠ্যবিষয় এমনভাবে সাজানো, যাতে তা পরবর্তী স্তরের ভিত্তি হিসেবে ভূমিকা রাখা; সব স্তরের পাঠ্যবইয়ে যৌক্তিক ক্রম ও ধারণাগত সামঞ্জস্য রক্ষা করা; প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পর্যায় থেকেই আরবী ভাষা, ব্যাকরণ ও শব্দভা-ার চর্চায় জোর দেওয়া, যাতে শিক্ষার্থীরা উচ্চস্তরের আরবী গ্রন্থাবলি পড়তে ও বুঝতে সক্ষম হয়।

৪. সিলেবাসের ধারাবাহিকতায় বিচ্ছিন্নতা

আলিয়া মাদরাসার মাধ্যমিক ও উচ্চ মাধ্যমিক পর্যায়ে বিজ্ঞান বিভাগ থাকলেও স্নাতক স্তরে সেই ধারার কোন সম্প্রসারণ নেই। ফলে বিজ্ঞান বিভাগে অধ্যয়নরত মেধাবী শিক্ষার্থীরা স্নাতক স্তরে মাদরাসায় থাকার সুযোগ না পেয়ে সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থায় স্থানান্তরিত হতে বাধ্য হয়। এতে মেধার অপসরণ ঘটে এবং আলিয়া ধারার শিক্ষাগত ধারাবাহিকতা ব্যাহত হয়।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজনÑ স্নাতক (ফাজিল) স্তরে বিজ্ঞান বিভাগ চালু করা; বিজ্ঞান ল্যাব, গবেষণাগার ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামো গড়ে তোলা; দক্ষ বিজ্ঞান শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণ কর্মসূচি গ্রহণ; ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিজ্ঞান পাঠ্যক্রমের উন্নয়ন প্রভৃতি।

৫. কার্যকরী ভাষা শিক্ষার ঘাটতি

যদিও আলিয়া ধারায় আরবী ভাষা একটি বাধ্যতামূলক বিষয় হিসেবে অন্তর্ভুক্ত, তবুও এ ক্ষেত্রে কার্যকর ভাষাগত দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা উল্লেখযোগ্যভাবে পিছিয়ে থাকে। মানহীন পাঠ্যপুস্তক, অকার্যকর পাঠদান পদ্ধতি এবং শিক্ষার্থীদের অনাগ্রহÑ এ তিনটি কারণে অধিকাংশ শিক্ষার্থী আরবী ভাষাকে কেবল পরীক্ষার একটি বিষয় হিসেবেই দেখে; বাস্তব জীবনে যোগাযোগের মাধ্যম হিসেবে কিংবা ইসলামী জ্ঞানচর্চার জন্য অপরিহার্য মূল ভাষা হিসেবে তারা একে গুরুত্ব দেয় না। ফলস্বরূপ, এমন অনেক শিক্ষার্থী দেখা যায়, যারা মাদরাসা থেকে ভালো ফলাফলসহকারে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জন করেও এক লাইন আরবী শুদ্ধভাবে পড়তে, লিখতে বা অর্থ বুঝতে সক্ষম নয়। একইভাবে ইংরেজি ভাষা শিক্ষার মানও বহুলাংশে সন্তোষজনক নয়।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনÑ আরবী ও ইংরেজি ভাষা শিক্ষার জন্য বর্তমান পাঠ্যপুস্তকগুলোকে আধুনিক ভাষা শিক্ষার কৌশল অনুযায়ী পুনর্গঠন করা, বাস্তবমুখী যোগাযোগ (ঈড়সসঁহরপধঃরড়হ-নধংবফ ষবধৎহরহম) কেন্দ্রিক পাঠ্যবিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, দৈনন্দিন জীবনে ব্যবহৃত আরবী ভাষার সংলাপ ও প্রেক্ষাপটভিত্তিক অনুশীলন যুক্ত করা, আরবী ভাষা ক্লাব ও ইংরেজি স্পোকেন ক্লাব গঠন করা, দৈনন্দিন ক্লাসে শিক্ষার্থীদের দিয়ে সংলাপ, প্রবন্ধপাঠ, বক্তৃতা বা ছোট গল্প রচনা করানো। বলার অপেক্ষা রাখে না, অনেক সময় শিক্ষকদের নিজেদের ভাষাগত দক্ষতার ঘাটতিই শিক্ষার্থীদের অগ্রগতিকে বাধাগ্রস্ত করে। এজন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করে আধুনিক শিক্ষণপদ্ধতি ও ভাষা শিক্ষার কৌশল সম্পর্কে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। শিক্ষকদের জন্য আরবী ও ইংরেজি ভাষায় উচ্চতর প্রশিক্ষণ (উরঢ়ষড়সধ বা ঝযড়ৎঃ ঈড়ঁৎংব) চালু করা যেতে পারে। তাছাড়া শিক্ষার্থীদেরও এ কথা বোঝাতে হবে যে, ভাষা কেবল পরীক্ষার বিষয় নয়, বরং জ্ঞানচর্চা ও বৈশ্বিক যোগাযোগের অন্যতম হাতিয়ার। বাস্তব প্রয়োগ দেখানোর জন্য মাদরাসায় আরবী বিতর্ক প্রতিযোগিতা, ইংরেজি বক্তৃতা প্রতিযোগিতা ইত্যাদি আয়োজন করা যেতে পারে। ইসলামী গ্রন্থ অধ্যয়নে আরবী জ্ঞানের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে ধর্মীয়ভাবে তাদের অনুপ্রাণিত করতে হবে।

৬. মানহীন ও অনুবাদভিত্তিক পাঠ্যপুস্তক

আলিয়া ধারায় মাদরাসা-বিশেষায়িত ইসলামী বিষয়সমূহের জন্য প্রণীত পাঠ্যপুস্তকে বিষয়গত অসঙ্গতি, এমনকি আরবী ব্যাকরণের বইয়েও ব্যাকরণগত ভুলের পরিমাণ চোখে পড়ার মতো। বছরের পর বছর পার হলেও এসব অসঙ্গতি ও ভুল সংশোধনে কার্যত কোন পদক্ষেপ নিতে দেখা যায় না। সাধারণ শিক্ষার পাঠ্যপুস্তক নিয়মিত হালনাগাদ করা হলেও মাদরাসা-বিশেষায়িত বিষয়গুলোতে তেমন উদ্যোগ দেখা যায় না। অধিকন্তু, কুরআন, হাদীস, ফিকহ, উসূল প্রভৃতি বিষয়ভিত্তিক পাঠ্যবইয়ে মূল টেক্সটের পাশাপাশি অনুবাদ ও ব্যাখ্যাসহ উপস্থাপিত হওয়ায় তা পাঠ্যপুস্তকের চেয়ে নোট বইয়ের মতো মনে হয়, যা একাডেমিক মানকে ক্ষুণœ করে।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনÑ আলিয়া মাদরাসার পাঠ্যপুস্তক প্রণয়ন ও সংশোধনের জন্য বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করা, যেখানে ইসলামী শিক্ষাবিদ, ভাষাবিদ, আধুনিক শিক্ষাবিশেষজ্ঞ ও আরবী ভাষার দক্ষ গবেষক অন্তর্ভুক্ত থাকবেন; প্রতি তিন থেকে পাঁচ বছর অন্তর পাঠ্যপুস্তক পর্যালোচনা ও হালনাগাদের একটি নিয়ম প্রবর্তন করা; প্রতিটি বই প্রকাশের আগে একাধিক পর্যায়ে সম্পাদনা ও প্রুফরিডিং বাধ্যতামূলক করা, বিশেষত আরবী ব্যাকরণ ও অনুবাদের ক্ষেত্রে; অনুবাদের পরিবর্তে ব্যাখ্যামূলক ও বিশ্লেষণমূলক উপস্থাপন (রহঃবৎঢ়ৎবঃরাব ঢ়ৎবংবহঃধঃরড়হ) প্রাধান্য দেওয়া উচিত, যাতে পাঠ্যবই ‘নোট বই’ নয় বরং ‘একাডেমিক গ্রন্থ’ হিসেবে গড়ে ওঠে; প্রতিটি নতুন পাঠ্যবই প্রকাশের আগে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের পিয়ার রিভিউ (ঢ়ববৎ ৎবারব)ি প্রক্রিয়া অনুসরণ করা; পাঠ্যপুস্তক লেখক, অনুবাদক ও সম্পাদকদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ কর্মশালা আয়োজন করা, যেখানে একাডেমিক লেখনরীতি, আরবী ব্যাকরণ, ও অনুবাদ নীতিমালা শেখানো হবে; পাঠ্যপুস্তকগুলোকে ডিজিটাল সংস্করণে (ঊ-নড়ড়শ) রূপান্তর করে দ্রুত হালনাগাদ ও সংশোধনের সুযোগ রাখা; শিক্ষার্থীদের জন্য অনলাইন নোট, অডিও ব্যাখ্যা ও ইন্টার‌্যাকটিভ কনটেন্ট যুক্ত করা; ইসলামি-আরবি বিশ্ববিদ্যালয় বা মাদরাসা শিক্ষা অধিদপ্তরের অধীনে একটি ঞবীঃনড়ড়শ ছঁধষরঃু অংংবংংসবহঃ ঈবষষ গঠন করে নিয়মিত পর্যবেক্ষণ ও মূল্যায়ন চালু করা প্রভৃতি।

৭. পাঠ্যবিষয় ও পাঠ্যপুস্তক নির্ধারণে অসঙ্গতি

আলিয়া ধারার শিক্ষাক্রমে পাঠ্যবিষয় নির্ধারণ ও পাঠ্যপুস্তক নির্বাচনেও অসঙ্গতি রয়েছে। উদাহরণস্বরূপ, বালাগাতের মতো অত্যাবশ্যকীয় আরবী বিষয়টি আলিম স্তরে ১০০ নম্বরের একটা পত্রের আওতায় মানতিকের সাথে মিলিয়ে পড়ানো হয়। এখানে এর নির্ধারিত পাঠ্যবই ‘দুরুসূল বালাগত’ থেকে এ শাস্ত্রের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ থেকে মাত্র একটি অংশ ‘ইলমুল মাআনি’ সম্পর্কে ভাসাভাসা কিছু মৌলিক ধারণা দেওয়া হয়। আর কোন স্তরেই এর পূর্ণাঙ্গ অধ্যয়ন বা অনুশীলনের সুযোগ রাখা হয়নি। অনুরূপ, দাখিল স্তরে ১০০ নম্বরের একটি বিষয় ‘আকাইদ ও ফিকহ’-এর আওতায় আকাইদ, ফিকহ, উসূলুল ফিকহ, আখলাক, ইলমুল ফিকহের ইতিহাস ও উসূলুল ফিকহের ইতিহাসের মতো বহু শাখা একত্রে সংযোজন করা হয়েছেÑ যা শিক্ষার্থীদের গভীর বোঝাপড়ার পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনÑ প্রতিটি বিষয়ের জন্য পৃথক পত্র ও পাঠ্যবই নির্ধারণ; বিষয়গুলোর গভীরতা ও ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ধাপে ধাপে শেখার সুযোগ তৈরি; শিক্ষার্থীদের বোঝাপড়ার সক্ষমতার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে পাঠ্যবিষয় পুনর্গঠন প্রভৃতি।

৮. সাধারণ শিক্ষার পাঠ্যবইয়ের কন্টেন্ট ইসলামী ভাবধারার সাথে অসঙ্গতি

আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থায় সাধারণ শিক্ষার বিষয়সমূহÑযেমন বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞান ইত্যাদি ক্ষেত্রে জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যপুস্তক বোর্ড (এনসিটিবি) কর্তৃক প্রণীত পাঠ্যক্রম অনুসরণ করে থাকে। তবে এ পাঠ্যক্রমের কনটেন্ট ক্ষেত্রবিশেষে ইসলামী আদর্শ, নৈতিকতা ও ভাবধারার সঙ্গে সাংঘর্ষিক বা অসামঞ্জস্যপূর্ণ। যেমনÑ কিছু পাঠ্যবইয়ে এমন কিছু বিষয়বস্তু পাওয়া যায়, যা ইসলামী নীতি, মূল্যবোধ বা বিশ্বাসের পরিপন্থী। বিশেষতÑ জীবনদর্শন, সমাজব্যবস্থা বা ইতিহাসের উপস্থাপনায় এমন ব্যাখ্যা দেওয়া হয় যা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে বিতর্কিত হতে পারে। কিছু গল্প, কবিতা বা চিত্রণ এমন জীবনাচরণের প্রতিফলন ঘটায়, যা মাদরাসা শিক্ষার্থীদের নৈতিক ও ধর্মীয় মূল্যবোধের সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ। এই বৈপরীত্যপূর্ণ বিষয়বস্তু শিক্ষার্থীদের মধ্যে যেমন চিন্তাগত বিভ্রান্তি সৃষ্টি করতে পারে, তেমনি তাদের ইসলামী নৈতিক ভিত্তিকে দুর্বল করতে পারে।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনÑ সাধারণ শিক্ষার বিষয়গুলো ইসলামী আদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে নতুন করে সাজানো; পাঠ্যবই প্রণয়ন কমিটিতে ইসলামী ও আধুনিক শিক্ষায় সমান পারদর্শী সদস্য অন্তর্ভুক্ত করা; এনসিটিবির আদলে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠানÑ ‘ন্যাশনাল মাদরাসা কারিকুলাম অ্যান্ড টেক্সটবুক বোর্ড (এনএমসিটিবি)’ গঠন করা; সময় ও সমাজের পরিবর্তনের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে বিষয়বস্তু হালনাগাদ করা প্রভৃতি।

খ. মূল্যায়ন ও পরীক্ষাকেন্দ্রিক সমস্যাবলি

১. মুখস্থবিদ্যা ও গতানুগতিক মূল্যায়ন পদ্ধতি

পরীক্ষাকেন্দ্রিক শিক্ষা ও প্রচলিত মূল্যায়ন পদ্ধতির কারণে অনেক আলিয়া মাদরাসায় কেবল মুখস্থনির্ভর গতানুগতিক পদ্ধতিতে পাঠদান করা হয়। এতে সমালোচনামূলক চিন্তাশক্তি, সৃজনশীলতা, গবেষণামুখিতা এবং বিষয়ভিত্তিক বাস্তব দক্ষতা অর্জনের ক্ষেত্রটি অবহেলিত থেকে যাচ্ছে।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনÑ সৃজনশীল প্রশ্নপদ্ধতি চালু করা, যাতে বিশ্লেষণ ও যুক্তিভিত্তিক উত্তর দিতে হয়; ক্ষেত্রবিশেষে বিকল্প মূল্যায়ন ব্যবস্থা (যেমন: প্রকল্পভিত্তিক, মৌখিক উপস্থাপনা, গবেষণা প্রতিবেদন) প্রবর্তন করা; আধুনিক মূল্যায়নপদ্ধতি সম্পর্কে মাদরাসা শিক্ষকদের নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া; ক্লাসে আলোচনা, বিতর্ক ও সমস্যা সমাধানমূলক কার্যক্রম অন্তর্ভুক্ত করা প্রভৃতি।

২. নোট-গাইডনির্ভর পরীক্ষামুখী পড়াশোনা

বাস্তব অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, শিক্ষার্থীরা শিক্ষাবর্ষের শুরু থেকেই মূল টেক্সট বইগুলো বাদ দিয়ে নোট ও গাইড বইয়ের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। এতে পাঠ্যবইভিত্তিক জ্ঞানার্জন ও বিষয়ভিত্তিক গভীরতা অর্জনের প্রবণতা আশঙ্কাজনক হারে কমে যায়। ফলস্বরূপ, তাদের শিক্ষা হয়ে পড়ে একান্তই পরীক্ষাকেন্দ্রিক ও যান্ত্রিক। যদিও শিক্ষাকর্তৃপক্ষ ও বোদ্ধামহল এ বিষয়ে বারবার সতর্ক করছে, তবুও কার্যকর উদ্যোগের অভাবে অবস্থার কোনো উন্নতি পরিলক্ষিত হচ্ছে না।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনÑ মূল পাঠ্যবইভিত্তিক শিক্ষা নিশ্চিত করা; পরীক্ষায় এমন প্রশ্ন তৈরি করতে হবে, যা নোট বা গাইড থেকে মুখস্থ করে লেখা সম্ভব নয়; বাস্তব উদাহরণ, চিত্র ও কেস স্টাডি সংযোজন করে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ বাড়ানো; পাঠ্যবোধ, বিশ্লেষণ ও প্রয়োগভিত্তিক প্রশ্ন বাড়ানো; নোট ও গাইড বইয়ের বাণিজ্যিক ব্যবহার কমাতে কঠোর নীতি গ্রহণ প্রভৃতি।

৩. পরীক্ষায় নকলের প্রবণতা

মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার একটি দীর্ঘস্থায়ী ও জটিল সমস্যা হলোÑ পরীক্ষায় নকলের প্রবণতা। দুঃখজনক হলেও সত্য, অল্প কয়েকটি ব্যতিক্রম ছাড়া দেশের অধিকাংশ মাদরাসায় বহু বছর ধরে পরীক্ষায় নকল চলে আসছে। এক সময় এই প্রবণতা কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও, সাম্প্রতিক সময়ে অনেক মাদরাসায় আবারও সেই পুরোনো চিত্র ফিরে এসেছে, বরং আরও ভয়াবহরূপে।

বর্তমানে বাস্তব পরিস্থিতি বিচার করলে দেখা যায়, অনেক মাদরাসায় পরীক্ষায় নকল এখন যেন এক প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। শুধু শিক্ষার্থীরাই নয়; অনেক ক্ষেত্রে শিক্ষক ও কর্তৃপক্ষের কিছু সদস্যও সরাসরি বা পরোক্ষভাবে এ অনৈতিক কাজে জড়িত। নকলকে রোধ করার জন্য তদারকি ব্যবস্থা থাকলেও, তা অনেক সময় কেবল আনুষ্ঠানিকতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে।

অন্যদিকে সাধারণ স্কুল ও কলেজ পর্যায়েও যদিও নকলের প্রবণতা রয়েছে, তবে সাম্প্রতিক সময়গুলোতে তা উল্লেখযোগ্যভাবে কমে এসেছে, এমনকি অনেক জায়গায় তা প্রায় বন্ধও হয়েছে। তাহলে প্রশ্ন জাগে, যেখানে অন্যান্য শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলো ক্রমে নিজেদের মূল্যায়নব্যবস্থায় শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনতে পেরেছে, সেখানে মাদরাসাগুলো কেন এখনও নকলের সেই পুরোনো অভ্যাস থেকে মুক্ত হতে পারছে না? এর পেছনে কি শুধুমাত্র ব্যবস্থাগত দুর্বলতা দায়ী, নাকি মাদরাসা শিক্ষাকে উদ্দেশ্যমূলকভাবে দুর্বল করার কোনো গভীর ষড়যন্ত্র কাজ করছেÑসেটি ভেবে দেখা প্রয়োজন।

বাস্তবতা হলো, মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন বা সংস্কারের যে সকল পরিকল্পনা গ্রহণ করা হচ্ছে, তা তখনই সফল হবে যখন পরীক্ষায় নকল সম্পূর্ণরূপে বন্ধ করা সম্ভব হবে। কারণ, নকল চলমান থাকলে কোনো সংস্কার, গবেষণা বা উন্নয়নমূলক উদ্যোগই কাক্সিক্ষত ফল দেবে না। এই বিষয়ে সম্প্রতি এক সম্মানিত অধ্যক্ষ তাঁর এক প্রবন্ধে অত্যন্ত যথার্থভাবে মন্তব্য করেছেনÑ

নকল বন্ধ করা হোক। ফাযিল-কামিল শিক্ষার পতনের মূল কারণ হলো নকল। প্রায় শতভাগ নকল চলছে ফাজিল-কামিলের পরীক্ষার হলে। দুই-চারজন সচেতন ও পরিণাম-সন্ধানী শিক্ষার্থী ছাড়া বাকিরা নকলের সঙ্গে যুক্ত। কেন্দ্র কর্তৃপক্ষের ছত্রছায়ায় এই নকল চলছে সারাদেশে। নকল চালু রেখে কোনো উন্নয়ন সম্ভব নয়। এটি এমন যেন তলাহীন বালতিতে সারাদিন পানি ঢালা। যত প্রস্তাব, গবেষণা বা পরিকল্পনাই নেওয়া হোক না কেন, পরীক্ষার হলে যদি নকল অব্যাহত থাকে, তবে সব প্রচেষ্টাই ব্যর্থ হবে।

এই বক্তব্যের মর্মার্থ অত্যন্ত গভীর। নকল শুধু শিক্ষার সততা নষ্ট করে না; বরং পুরো মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা, মর্যাদা ও ভবিষ্যৎকেও প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। তাই সময় এসেছে, নকল প্রতিরোধকে মাদরাসা সংস্কারের অগ্রাধিকারের শীর্ষে স্থান দেওয়ার।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনÑ নকলের সঙ্গে জড়িত শিক্ষার্থী, শিক্ষক বা কর্তৃপক্ষের বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক ও কঠোর শাস্তি নিশ্চিত করা; সিসি ক্যামেরা, অঘোষিত তদারকি টিম ও ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা চালু করা; পরীক্ষাকেন্দ্র নির্বাচনে নিরপেক্ষতা ও নজরদারি নিশ্চিত করা; মেধাভিত্তিক প্রতিযোগিতাকে উৎসাহিত করে ‘নকলমুক্ত পরীক্ষা’ আন্দোলন গড়ে তোলা; শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের নিয়ে নৈতিক শিক্ষা ও সচেতনতা সেমিনার আয়োজন করা প্রভৃতি।

গ. শিক্ষককেন্দ্রিক সমস্যাবলি

১. মানসম্পন্ন শিক্ষকের অভাব

আলিয়া মাদরাসাগুলোতে যোগ্য ও দক্ষ শিক্ষকের সংকট বর্তমানে একটি গুরুতর সমস্যা হিসেবে দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে মাদরাসা-বিশেষায়িত বিষয়সমূহে নির্ধারিত শাস্ত্রীয় কিতাবসমূহ পাঠদানে পারদর্শী শিক্ষক ক্রমেই বিরল হয়ে পড়ছেন। এর পেছনে কয়েকটি কারণ উল্লেখযোগ্য। প্রথমত, মেধাবী ও প্রতিশ্রুতিশীল তরুণ আলিমদের মধ্যে শিক্ষকতা পেশার প্রতি আগ্রহ ক্রমশ হ্রাস পাচ্ছে; অনেকেই তুলনামূলকভাবে অধিক আর্থিক সাফল্য ও সামাজিক মর্যাদাসম্পন্ন পেশার দিকে ঝুঁকছেন। দ্বিতীয়ত, শিক্ষক নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা, বিষয় ও মাননির্ধারণের ঘাটতি থাকার কারণে প্রকৃত যোগ্য ব্যক্তিরা অনেক সময় নিয়োগের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ)-এর প্রাথমিক বাছাই পরীক্ষায় সাধারণত আরবী বিষয়ে কোনো প্রশ্ন থাকে না। অনেকেই মনে করেন, এ প্রক্রিয়ায় আরবী বিষয়সমূহের যোগ্য শিক্ষক বাছাই হয়ে আসে না।

এর ফলশ্রুতিতে মাদরাসাগুলোর পাঠদানের মানে এক ধরনের স্থবিরতা দেখা দিয়েছে। শিক্ষকরা অনেক সময় আধুনিক শিক্ষাপদ্ধতি ও শিক্ষার্থীর মনস্তত্ত্ব অনুযায়ী পাঠদান করতে ব্যর্থ হচ্ছেন, ফলে শিক্ষার্থীদের শেখার আগ্রহ, বিষয়বস্তুর গভীর অনুধাবন এবং সামগ্রিক পারফরম্যান্সÑ উল্লেখযোগ্যভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। দীর্ঘমেয়াদে এই অবস্থা মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়নে একটি বড় বাধা হিসেবে দেখা দিচ্ছে।

এ সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজনÑ এনটিআরসিএ বা সংশ্লিষ্ট নিয়োগ কর্তৃপক্ষের পরীক্ষায় আরবী ও মাদরাসা-সংক্রান্ত বিষয়গুলোর জন্য বিশেষ প্রশ্নপত্র বা পৃথক ধারা প্রবর্তন করা; শিক্ষক নিয়োগে আলিম, ফাজিল, কামিল ডিগ্রিধারীদের জন্য নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও প্রশিক্ষণ মানদ- নির্ধারণ করা; রাজনৈতিক বা প্রশাসনিক প্রভাব মুক্ত করে একটি স্বচ্ছ, মেধাভিত্তিক নিয়োগব্যবস্থা গড়ে তোলা; শিক্ষক পেশাকে সম্মানজনক ও আর্থিকভাবে টেকসই করতে উচ্চ বেতন, ইনক্রিমেন্ট, ও প্রশিক্ষণভাতা চালু করা; শিক্ষকতার গুরুত্ব তুলে ধরে সম্মাননা, পুরস্কার ও প্রশংসাপত্র প্রদান করা, যা শিক্ষকতায় আগ্রহ জাগাতে সাহায্য করে।

২. শিক্ষকদের প্রশিক্ষণের ঘাটতি

মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার অপর একটি উল্লেখযোগ্য দুর্বলতা হলোÑ শিক্ষকদের পর্যাপ্ত পেশাগত প্রশিক্ষণের অভাব। অনেক মাদরাসা শিক্ষকই তাদের কর্মজীবনের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কোনো প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ গ্রহণের সুযোগ পান না। ফলে তাঁরা পাঠদানের আধুনিক কৌশল, শিক্ষার্থীকেন্দ্রিক শেখার পদ্ধতি, মনস্তাত্ত্বিক দিকনির্দেশনা বা শ্রেণিকক্ষ ব্যবস্থাপনাÑএসব বিষয়ে পর্যাপ্ত দক্ষতা অর্জন করতে পারেন না। যদিও শিক্ষক প্রশিক্ষণের জন্য কিছু সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ রয়েছে, যেমন মাদরাসা শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট বা স্বল্পমেয়াদি কর্মশালা, তবুও এগুলোর সংখ্যা, পরিধি ও কার্যকারিতা প্রয়োজনের তুলনায় একেবারেই সীমিত। অনেক ক্ষেত্রে প্রশিক্ষণের বিষয়বস্তু সময়োপযোগী নয়, আবার কোথাও প্রশিক্ষক ও প্রশিক্ষণ-সুবিধার অভাবে কাক্সিক্ষত ফল পাওয়া যায় না।

এই প্রশিক্ষণ ঘাটতির সরাসরি প্রভাব পড়ছে পাঠদানের মানের ওপর। অপ্রশিক্ষিত শিক্ষকরা অনেক সময় পাঠ পরিকল্পনা তৈরি, শিক্ষার্থীর শেখার পার্থক্য নির্ণয় কিংবা প্রযুক্তি ব্যবহার করে পাঠদানÑএসব বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেন না। এর ফলে শ্রেণিকক্ষে শিক্ষার্থীদের আগ্রহ হ্রাস পায়, বিষয়বস্তুর গভীরতা অনুধাবনে ঘাটতি দেখা দেয় এবং সামগ্রিক শিক্ষার মান নিম্নগামী হয়।

দীর্ঘমেয়াদে এই সমস্যা সমাধানে একটি সুসংগঠিত ও সময়োপযোগী শিক্ষক প্রশিক্ষণ কাঠামো গড়ে তোলা জরুরি, যেখানে প্রশিক্ষণ হবে ধারাবাহিক, ব্যবহারিক ও ফলাফলনির্ভর। জাতীয় শিক্ষক প্রশিক্ষণ ইনস্টিটিউট (ঘঞজঈঅ)-এর মাধ্যমে মাদরাসা শিক্ষকদের পেশাগত প্রশিক্ষণ বাধ্যতামূলক করা যেতে পারে। এতে মাধ্যমে মাদরাসা শিক্ষকদের পেশাগত দক্ষতা বৃদ্ধি পাবে এবং শিক্ষার্থীরা আধুনিক পদ্ধতিতে শিক্ষা লাভ করবে। তাছাড়া ইসলামি-আরবি বিশ^বিদ্যালয়/মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও মাদরাসার উদ্যোগে যৌথ প্রশিক্ষণ কোর্স বা ডিপ্লোমা প্রোগ্রাম চালু করা করতে পারে। মাদরাসাগুলোও নিজস্ব উদ্যোগে বছরে অন্তত একবার বিষয়বস্তুভিত্তিক শিক্ষক প্রশিক্ষণ কোর্সের আয়োজন করতে পারে।

৩. শিক্ষক সংকট

মাদরাসা শিক্ষার বর্তমান কাঠামোয় শিক্ষক সংকট একটি গুরুতর ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যা হিসেবে বিদ্যমান। অধিকাংশ মাদরাসায় নির্ধারিত জনবল কাঠামো অনুসারে উল্লেখযোগ্য সংখ্যক শিক্ষকপদ শূন্য রয়েছে। এ সংকট বিশেষভাবে প্রকট হয়ে ওঠেছে অনার্স পর্যায়ের মাদরাসাগুলোতে। যদিও কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন মাদরাসাকে অনার্স কোর্স পরিচালনার স্বীকৃতি প্রদান করে, তবুও এ স্বীকৃতি প্রদানের সময় শিক্ষকসংখ্যা ও তাদের যোগ্যতার মানদ- যথাযথভাবে বিবেচনা করা হয় না। ফলে অনেক মাদরাসায় প্রয়োজনীয় সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ ছাড়াই অনার্স কোর্স পরিচালিত হচ্ছে। অন্যদিকে অনার্স পর্যায়ে পাঠদানের জন্য নির্ধারিত সংখ্যক শিক্ষক নিয়োগের কোনো কার্যকর সরকারি নিয়োগব্যবস্থা নেই। এই পরিস্থিতিতে অধিকাংশ মাদরাসা নিজেদের সীমিত অর্থায়নে অল্পসংখ্যক নিয়োগ দিয়ে কোর্স চালিয়ে যাচ্ছে। কিন্তু এ উদ্যোগ শিক্ষার গুণগত মান রক্ষা বা একাডেমিক কার্যক্রম নির্বিঘœভাবে পরিচালনার জন্য মোটেও যথেষ্ট নয়। ফলস্বরূপ, শিক্ষকসংকট মাদরাসা শিক্ষার মানোন্নয়ন ও প্রাতিষ্ঠানিক স্থিতিশীলতার পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ সমস্যা থেকে উত্তরণের জন্য প্রয়োজনÑ বিদ্যমান শিক্ষক শূন্যপদগুলো দ্রুত পূরণের জন্য কার্যকর নিয়োগ প্রক্রিয়া চালু করা; অনার্স পর্যায়ে পাঠদানের জন্য পৃথক সরকারি পদ সৃষ্টি করা, যাতে বিষয়ভিত্তিক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ সম্ভব হয়; অনার্স পর্যায়ের মাদরাসাগুলোর জন্য বিশেষ আর্থিক তহবিল বরাদ্দ দেওয়া, যাতে তারা দক্ষ ও যোগ্য শিক্ষক নিয়োগে সক্ষম হয়; নতুন অনার্স কোর্স চালুর পূর্বে নির্ধারিত সংখ্যক যোগ্য শিক্ষক নিয়োগ বাধ্যতামূলক করা, যাতে স্বীকৃতির মান ও শিক্ষার মান দুটোই বজায় থাকে।

ঘ. আত্মপরিচয় ও পরিবেশগত সঙ্কট

১. আত্মপরিচয় সঙ্কট

আলিয়া মাদরাসাগুলোর অন্যতম চ্যালেঞ্জ হলো শিক্ষার্থীদের আত্মপরিচয় সংকট। এই শিক্ষাব্যবস্থার একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলোÑ এখানে ধর্মীয় ও সাধারণ শিক্ষার সমন্বয় ঘটানো হয়। অর্থাৎ, মাদরাসাকে একদিকে ধর্মীয় জ্ঞান ও ইসলামিক নীতিমালাভিত্তিক শিক্ষা প্রদান করতে হয়, অন্যদিকে জাতীয় মূলধারার শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে সাধারণ বিষয়াবলিও অন্তর্ভুক্ত করতে হয়। এই দ্বৈত শিক্ষার কাঠামো অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মানসিক ও পেশাগত পরিচয়ে বিভ্রান্তি সৃষ্টি করে।

ফলে দেখা যায়, মাদরাসার শিক্ষার্থীরা একদিকে ধর্মীয় শিক্ষায় পারদর্শিতা অর্জন করলেও, সমাজে ‘আলিম’ হিসেবে পূর্ণ মর্যাদা বা গ্রহণযোগ্যতা পান না। অন্যদিকে, সাধারণ শিক্ষাব্যবস্থার শিক্ষার্থীদের সঙ্গে প্রতিযোগিতামূলক পেশাজীবনে অংশগ্রহণের সময় তারা আত্মবিশ্বাসের ঘাটতিতে ভোগেন। কারণ তাদের পাঠ্যবিষয়, দক্ষতা ও দৃষ্টিভঙ্গি অনেক সময় মূলধারার চাহিদার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না। এই অবস্থায় শিক্ষার্থীরা এক ধরনের মানসিক টানাপোড়েনে পড়েÑ তারা বুঝে উঠতে পারে না, তাদের আসল পরিচয় ধর্মীয় জ্ঞানচর্চাকারী আলিম হিসেবে, নাকি আধুনিক শিক্ষিত নাগরিক হিসেবে। ফলস্বরূপ, তাদের আত্ম-পরিচয়ের বোধ অস্পষ্ট থেকে যায়, যা ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা, পেশা নির্বাচন ও সামাজিক অবস্থান নির্ধারণে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে।

এই সংকট নিরসনে প্রয়োজনÑ একটি সুসংহত পাঠ্যক্রম, যেখানে ধর্মীয় ও আধুনিক শিক্ষা এমনভাবে সমন্বিত থাকবে, যাতে শিক্ষার্থীরা নিজেদের দ্বৈত পরিচয়ের মধ্যে ভারসাম্য খুঁজে পায় এবং আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে সমাজে ভূমিকা রাখতে সক্ষম হয়।

২. পরিবেশগত অবক্ষয়

আলিয়া মাদরাসাগুলোর একটি স্বকীয় বৈশিষ্ট্য হলোÑ এখানে একটি ধর্মীয় আবহ ও ইসলামী মূল্যবোধভিত্তিক পরিবেশ বিরাজ করে। ঐতিহ্যগতভাবে মাদরাসাগুলো ছিল এমন প্রতিষ্ঠান, যেখানে শিক্ষার্থীদের শিক্ষা গ্রহণের পাশাপাশি চরিত্র গঠন, নৈতিকতা, বিনয় ও ধর্মীয় চেতনা লালনের প্রতি বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হতো। ছাত্র-শিক্ষক উভয়ের জীবনযাপন, পোশাক-আশাক, চালচলন, এমনকি ভাষা ও পারস্পরিক আচরণেও ইসলামী আদর্শের প্রতিফলন ঘটতো। নিয়মিত জামায়াতে সালাত আদায়, পাঞ্জাবি ও টুপি পরিধান, দাড়ি রাখা এবং শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তি প্রদর্শনÑএসব ছিল মাদরাসার পরিচয়ের অবিচ্ছেদ্য অংশ।

কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে এই পরিবেশে এক ধরনের অবক্ষয় লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আধুনিকতার প্রভাব, সামাজিক পরিবর্তন এবং গণমাধ্যম ও প্রযুক্তির অনুপ্রবেশের ফলে অনেক মাদরাসায় ঐতিহ্যবাহী দ্বীনী আবহ আগের মতো আর অটুট নেই। এখন অনেক শিক্ষার্থী পোশাক-আশাকে ইসলামী নিয়ম অনুসরণ না করে সাধারণ আধুনিক রীতির দিকে ঝুঁকছে; কেউ কেউ টুপি বা পাঞ্জাবি পরিধান করে না, দাড়ি রাখাকেও ব্যক্তিগত পছন্দ হিসেবে দেখছে। তদুপরি শিক্ষকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও ভক্তির জায়গায় অনেকে আনুষ্ঠানিক সম্পর্ক বজায় রাখছে, যা পূর্বের সংস্কৃতির তুলনায় এক প্রকার মানসিক দূরত্ব তৈরি করছে।

এই পরিবর্তন শুধু বাহ্যিক আচরণেই সীমাবদ্ধ নয়; এটি মূলত ধর্মীয় মূল্যবোধ ও আত্মিক অনুশাসনের অবক্ষয়ের দিকেও ইঙ্গিত দেয়। ফলস্বরূপ, মাদরাসার যে স্বতন্ত্র ধর্মীয় পরিবেশ একসময় শিক্ষার্থীদের নৈতিক বিকাশে মুখ্য ভূমিকা রাখতো, তা আজ অনেক ক্ষেত্রে দুর্বল হয়ে পড়েছে। এই অবস্থা রোধে প্রয়োজনÑমাদরাসায় এমন একটি শিক্ষাবান্ধব ও ধর্মীয় চেতনা-নির্ভর পরিবেশ পুনর্গঠন, যেখানে আধুনিকতার ইতিবাচক দিকগুলো গ্রহণ করেও ইসলামী ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ অক্ষুণœ রাখা সম্ভব হবে।

৩. সহশিক্ষা

মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ সমস্যা হলো সহশিক্ষা বা একসাথে ছেলে-মেয়েদের পড়ানো। মাদরাসা মূলত একটি ধর্মীয় ও শালীন পরিবেশে পরিচালিত শিক্ষাব্যবস্থা, যেখানে ইসলামী আদর্শ, চরিত্রগঠন ও নৈতিকতার বিকাশই প্রধান লক্ষ্য। তাই এই ব্যবস্থায় সহশিক্ষা ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে প্রশ্নবিদ্ধ। স্বাভাবিকভাবে, নারীদের জন্য আলাদা মাদরাসা থাকা উচিত, যেখানে তারা নিরাপদ ও ধর্মীয় পরিবেশে শিক্ষা অর্জনের সুযোগ পাবে। কিন্তু সাম্প্রতিক সময়ে দেখা যাচ্ছে, বিশেষ করে মফস্বল এলাকার অনেক মাদরাসায় ছেলে ও মেয়ে শিক্ষার্থীদের একসাথে পড়ানো হচ্ছে। এর ফলে মাদরাসার ধর্মীয় পরিবেশ ও লক্ষ্যÑ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।

এছাড়া কিছু মাদরাসায় নারী শিক্ষকদের নিয়োগও লক্ষ্য করা যায়, যা অনেক সময় শিক্ষার্থীদের মাঝে অপ্রয়োজনীয় মেলামেশার সুযোগ সৃষ্টি করে এবং সামগ্রিকভাবে ধর্মীয় পরিবেশে নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

অতএব, মাদরাসার ইসলামী আদর্শ ও পবিত্র পরিবেশ বজায় রাখতে সহশিক্ষা পরিহার করে নারীদের জন্য আলাদা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলাই কাম্য। এসব প্রতিষ্ঠানে মেয়েদের অংশগ্রহণ বাড়ানো দরকার। এভাবে নারী শিক্ষাকে উৎসাহিত করলে সমাজে নৈতিক ও শিক্ষাগত উন্নয়ন আরও ত্বরান্বিত হবে।

ঙ. তদারকি ও মূল্যায়নের দুর্বলতা

১. নিয়মিত পর্যবেক্ষণের অভাব

মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার সুষ্ঠু পরিচালনা ও মানোন্নয়নের জন্য নিয়মিত পর্যবেক্ষণ একটি অপরিহার্য উপাদান। কিন্তু বাস্তবে দেখা যায়, মাদরাসা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে দেশের সব মাদরাসার কার্যক্রম নিয়মিতভাবে তদারকি করা সম্ভব হয় না। এর প্রধান কারণ হলোÑ পর্যাপ্ত জনবল, অবকাঠামো ও কার্যকর প্রশাসনিক কাঠামোর ঘাটতি। ফলে তদারকির কাজ অনেক ক্ষেত্রেই কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ থেকে যায়।

এই তদারকির অভাবের ফলে বহু মাদরাসা প্রায় স্বতন্ত্রভাবে বা নিজেদের নির্ধারিত নীতিমালা অনুযায়ী পরিচালিত হয়। কোথাও পাঠ্যসূচি সঠিকভাবে অনুসৃত হয় না, কোথাও শিক্ষক উপস্থিতি বা পাঠদানের মানে বৈষম্য দেখা যায়। এর ফলে সমগ্র মাদরাসা ব্যবস্থার মধ্যে একক মানদ- বা গুণগত সামঞ্জস্য বজায় রাখা কঠিন হয়ে পড়ে। অধিকন্তু, নিয়মিত পরিদর্শনের অভাবে প্রশাসনিক অনিয়ম, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি, পরীক্ষার স্বচ্ছতা বা আর্থিক জবাবদিহিতার বিষয়গুলোও যথাযথভাবে মূল্যায়িত হয় না। দীর্ঘমেয়াদে এ অবস্থা মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার সার্বিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও মানের ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে।

এই পরিস্থিতির উত্তরণে প্রয়োজনÑমাদরাসা শিক্ষা বোর্ড ও সংশ্লিষ্ট বিশ^বিদ্যালয় কর্তৃক শিক্ষক ও পাঠদানের গুণগত মান নিয়মিত মূল্যায়ন করা। এতদুদ্দেশ্যে একটি শক্তিশালী তদারকি কাঠামো গড়ে তোলা, যেখানে ডিজিটাল পর্যবেক্ষণ ব্যবস্থা, আঞ্চলিক পরিদর্শন দল এবং মাননিয়ন্ত্রণ সংস্থা একযোগে কাজ করবে। প্রতিটি মাদরাসার মাননিয়ন্ত্রণে স্বাধীন ‘মান মূল্যায়ন ইউনিট’ গঠন করা যেতে পারে। নিয়মিত ও কার্যকর পর্যবেক্ষণ নিশ্চিত করতে পারলে মাদরাসা শিক্ষার মান উন্নয়ন ও নীতিগত সামঞ্জস্য রক্ষাÑউভয়ই সম্ভব হবে। তাছাড়া ভালো পারফর্ম করা শিক্ষকদের অর্থনৈতিক ও পদোন্নতির সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে।

২. শিক্ষার্থীর সংখ্যার সঙ্গে প্রতিষ্ঠানের অসঙ্গতি

দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে মাদরাসার সংখ্যা ও শিক্ষার্থীর অনুপাতের মধ্যে একটি উল্লেখযোগ্য অসামঞ্জস্য লক্ষ্য করা যায়। কোথাও প্রয়োজনের তুলনায় মাদরাসার সংখ্যা অপ্রতুল। ফলে শিক্ষার্থীদের জন্য পর্যাপ্ত আসন বা শিক্ষার সুযোগ তৈরি হয় না। আবার কিছু এলাকায় প্রয়োজনের তুলনায় অতিরিক্ত সংখ্যক মাদরাসা প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, যা সামগ্রিক শিক্ষার মান ও প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণে ভারসাম্যহীনতা সৃষ্টি করছে। উদাহরণস্বরূপ, অনেক মফস্বল এলাকায় দেখা যায়Ñএকটি উপজেলায় ফাজিল ও কামিল স্তরে সর্বমোট শিক্ষার্থী সংখ্যা হয়তো সর্বোচ্চ দুই থেকে তিন শতাধিক, অথচ সেখানে দু-তিন মাইলের অন্তর অন্তর সাত-আটটি ফাজিল-কামিল মাদরাসা চালু রয়েছে, এমনকি এর মধ্যে দু-তিনটিতে অনার্স কোর্সও খোলা আছে। শিক্ষার্থী সংখ্যা সীমিত হওয়ায় এই মাদরাসাগুলোর শ্রেণিকক্ষে উপস্থিতি অত্যন্ত কম থাকে; কোথাও নিয়মিত পাঠদান হয় না, কোথাও শিক্ষকদের সময়মতো ক্লাস নেওয়ার তাগিদও দেখা যায় না।

ফলস্বরূপ, পাঠদানের ধারাবাহিকতা ও মানÑউভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। অনেক সময় মাসের পর মাস কোনো ক্লাস না হয়েও শিক্ষার্থীরা কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় অংশ নেয় এবং বিস্ময়করভাবে ভালো ফলাফলও অর্জন করে, যা শিক্ষাব্যবস্থার কার্যকারিতা ও স্বচ্ছতা নিয়ে প্রশ্ন তোলে। এই পরিস্থিতি মূলত পরিকল্পনাহীন প্রতিষ্ঠান অনুমোদন, তদারকির ঘাটতি এবং স্থানীয় শিক্ষাচাহিদা নিরূপণের অভাবের ফল। এর ফলে একদিকে কিছু অঞ্চলে শিক্ষাসুবিধা সংকুচিত হচ্ছে, অন্যদিকে প্রয়োজনাতিরিক্ত মাদরাসা গড়ে ওঠায় শিক্ষার গুণগত মান ও শৃঙ্খলা ক্ষুণœ হচ্ছে।

এই অসঙ্গতি দূর করতে প্রয়োজনÑ জনসংখ্যা ও শিক্ষার্থীর চাহিদা অনুযায়ী মাদরাসার সংখ্যা নির্ধারণ, নতুন প্রতিষ্ঠান অনুমোদনে নীতিনির্ধারিত মানদ- প্রণয়ন এবং নিয়মিত মূল্যায়নব্যবস্থা চালু করা। তবেই মাদরাসা শিক্ষায় ভারসাম্য ও মানÑউভয়ই নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।

চ. আর্থিক সংকট ও অবকাঠামোগত সমস্যা

১. আর্থিক সংকট

মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থার অন্যতম প্রধান অন্তরায় হলো আর্থিক সংকট। অধিকাংশ মাদরাসা তাদের পরিচালন ব্যয় মেটাতে সরকারি অনুদান ও স্থানীয় জনগণের অনুদান বা দানের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু অনেক সময় এই অনুদান যথাসময়ে বা পর্যাপ্ত পরিমাণে পাওয়া যায় না, যার ফলে প্রশাসনিক কার্যক্রম, শিক্ষক-কর্মচারীদের বেতন প্রদান, শিক্ষাসামগ্রী সংগ্রহ ও অবকাঠামো রক্ষণাবেক্ষণ ব্যাহত হয়। এই আর্থিক অনিশ্চয়তা পাঠক্রমের ধারাবাহিকতা নষ্ট করে এবং শিক্ষার গুণগত মান রক্ষায় গুরুতর প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। দীর্ঘমেয়াদে এই সংকট মাদরাসা শিক্ষাকে টেকসই উন্নয়ন প্রক্রিয়া থেকে বিচ্ছিন্ন করে ফেলার আশঙ্কা সৃষ্টি করে।

এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণে প্রয়োজনÑ সরকারি বাজেটে মাদরাসা শিক্ষার জন্য আলাদা তহবিল থাকা, বরাদ্দ বৃদ্ধি করা; বেসরকারি খাতকে অংশগ্রহণে উৎসাহিত করা। উল্লেখ্য, দেশের জাতীয় বাজেটের প্রায় ১০%-১২% পুরো শিক্ষা খাতের জন্য বরাদ্দ করা হয়; কিন্তু এর মাত্র ৭%-৮% বরাদ্দ দেওয়া হয় মাদরাসা শিক্ষার জন্য। এভাবে বাজেটে মাদরাসা শিক্ষাধারাকে একটা গুরুত্বহীন খাত হিসেবে বিবেচনা নেওয়া হয়।

২. অবকাঠামোগত সমস্যা

বাংলাদেশের বহু মাদরাসায় এখনো পর্যাপ্ত অবকাঠামোগত সুবিধার অভাব লক্ষ করা যায়। বিশেষত শ্রেণিকক্ষের সীমাবদ্ধতা, বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগারের অনুপস্থিতি শিক্ষার্থীদের শিক্ষাগ্রহণ প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। ফলে তারা মূলত তাত্ত্বিক জ্ঞানের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থেকে যায় এবং বাস্তব বা প্রয়োগমূলক জ্ঞান অর্জনের সুযোগ পায় না। বর্তমান তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর যুগে শিক্ষাব্যবস্থার সঙ্গে প্রযুক্তিগত দক্ষতার সমন্বয় অপরিহার্য হলেও অবকাঠামোগত ঘাটতির কারণে মাদরাসা শিক্ষার মান আন্তর্জাতিক মানদ-ে উন্নীত করা কঠিন হয়ে পড়ছে। তদুপরি পর্যাপ্ত আসনব্যবস্থা, স্যানিটেশন, বিশুদ্ধ পানীয় জল ও পর্যাপ্ত আলো-বাতাসের অভাব শিক্ষার্থীদের মানসিক ও শারীরিক স্বাচ্ছন্দ্যেও নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে, যা সামগ্রিক শিক্ষার পরিবেশকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

এ সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজনÑ প্রতিটি মাদরাসায় অবকাঠামোগত সুবিধা বাড়ানো; বিজ্ঞানাগার, কম্পিউটার ল্যাব, ইন্টারনেট সুবিধা, মাল্টিমিডিয়া ক্লাসরুম ও সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার স্থাপন করা।

ছ. সামাজিক ধারণাগত সমস্যা

১. সামাজিক ধারণাগত সংকীর্ণতা

মাদরাসা শিক্ষার অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলো সমাজের একটি অংশের মধ্যে বিদ্যমান ধারণাগত সংকীর্ণতা বা ভ্রান্ত দৃষ্টিভঙ্গি। অনেকেই এখনো মনে করেন, মাদ্রাসা শিক্ষা মানে কেবল ধর্মীয় নেতাÑ যেমন ইমাম, খতিব বা হাফেজ তৈরির শিক্ষা। এই ধারণাটি মাদরাসা শিক্ষার প্রকৃত উদ্দেশ্য ও বৈচিত্র্যকে ছোট করে দেয়।

আসলে আধুনিক মাদরাসাগুলোতে কেবল ধর্মীয় বিষয় নয়; সাধারণ শিক্ষা যেমন বাংলা, ইংরেজি, গণিত, বিজ্ঞান, সমাজবিজ্ঞানসহ নানা বিষয়েরও পাঠদান করা হয়। কিন্তু সমাজের এই ভুল ধারণা থাকায় মাদরাসার শিক্ষার্থীরা প্রায়ই মূলধারার শিক্ষার্থীদের সমান মর্যাদা পায় না। এই সামাজিক মানসিকতা থেকে কিছু নেতিবাচক প্রভাব দেখা যায়। যেমনÑ মাদরাসা শিক্ষার্থীরা চাকরি বা উচ্চশিক্ষার সুযোগে বৈষম্যের মুখোমুখি হয়; তারা নিজেদের যোগ্যতা ও সম্ভাবনা সম্পর্কে অনিশ্চয়তায় ভোগে; পরিবার বা সমাজের কিছু অংশ মাদরাসায় সন্তান পাঠাতে দ্বিধাগ্রস্ত হয়ে পড়ে।

এই সমস্যার সমাধানের জন্য প্রয়োজনÑ সমাজে মাদরাসা শিক্ষার প্রকৃত কাঠামো ও অর্জন সম্পর্কে সচেতনতা বৃদ্ধি; মাদরাসা শিক্ষার আধুনিকীকরণ ও কর্মমুখী বিষয় সংযোজন; সরকার ও গণমাধ্যমের মাধ্যমে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের ইতিবাচক উদাহরণ প্রচার করা। এভাবে মাদরাসা শিক্ষাকে শুধুমাত্র ধর্মীয় গ-িতে সীমাবদ্ধ না রেখে সমাজে একে সমান মর্যাদাপূর্ণ ও প্রাসঙ্গিক শিক্ষার একটি ধারা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব।

জ. চাকরির বাজারে সঙ্কট

১. চাকরির বাজারে সীমিত সুযোগ

আলিয়া মাদরাসার শিক্ষার্থীদের অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ হলোÑ চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতামূলক অবস্থান তৈরি করতে না পারা। মাদরাসা শিক্ষা পদ্ধতি ঐতিহ্যগতভাবে ধর্মীয় জ্ঞান ও ইসলামিক গবেষণার ওপর বেশি গুরুত্ব দেয়। এর ফলে শিক্ষার্থীরা ধর্মীয় বিষয়ে যেমনÑকুরআন, হাদীস, তাফসীর, আকাইদ, ফিকহ প্রভৃতিতে দক্ষতা অর্জন করে, কিন্তু আধুনিক পেশাভিত্তিক ক্ষেত্র যেমন প্রশাসন, প্রযুক্তি, ব্যবসা-বাণিজ্য, প্রকৌশল বা চিকিৎসাÑএসব বিষয়ে তুলনামূলকভাবে পিছিয়ে থাকে।

এই অবস্থার কারণে তারা বেসরকারি ও সরকারি চাকরির বাজারে প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে পারে না বা খুব সীমিতভাবে পারে। অনেক সময় মাদরাসা ডিগ্রিগুলো কার্যত মূলধারার বিশ্ববিদ্যালয় বা নিয়োগ বোর্ডে সমানভাবে স্বীকৃতি পায় না। ফলে তারা এমন সব চাকরির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়, যেখানে আধুনিক দক্ষতা যেমন কম্পিউটার জ্ঞান, ইংরেজি ভাষা দক্ষতা, যোগাযোগ ও ব্যবস্থাপনা সক্ষমতা প্রয়োজন। তাছাড়া, মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য নির্দিষ্ট কর্মসংস্থান ক্ষেত্র প্রায়শই সীমিত থাকে। যেমনÑইমাম, খতিব বা ধর্মীয় শিক্ষকের পদ; ইসলামিক প্রতিষ্ঠানে শিক্ষকতা বা গবেষণা; মাদরাসা পরিচালনা বা ধর্মীয় প্রশাসনিক কাজ প্রভৃতি। এই সীমিত পরিসরের কারণে অনেকে শিক্ষা সম্পন্ন করার পরও বেকার থেকে যায়, যা তাদের আর্থিক ও সামাজিক অবস্থানকে দুর্বল করে।

এর সম্ভাব্য সমাধান হতে পারেÑমাদরাসা শিক্ষায় প্রযুক্তি, বিজ্ঞান ও বৃত্তিমূলক বিষয় অন্তর্ভুক্ত করা, যাতে শিক্ষার্থীরা আধুনিক চাকরির চাহিদার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে পারে; সরকার ও বেসরকারি খাতে মাদরাসা শিক্ষার্থীদের জন্য বিশেষ প্রশিক্ষণ ও ইন্টার্নশিপ কর্মসূচি চালু করা; মাদরাসা ডিগ্রিকে মূলধারার শিক্ষার সমমানের মর্যাদা দেওয়া, যাতে তারা সরকারি-বেসরকারি চাকরিতে আবেদন করতে পারে; মাদরাসা শিক্ষার্থীদের মধ্যে উদ্যোক্তা মনোভাব ও স্বনিযুক্তির (ংবষভ-বসঢ়ষড়ুসবহঃ) সুযোগ বাড়ানো।

সমস্যাগুলোর কারণ বিশ্লেষণ

উপর্যুক্ত সব সমস্যার মূল কারণগুলো নিম্নরূপ:

ক. সরকারের বৈষম্যমূলক আচরণ

স্বাধীনতা-উত্তর প্রত্যেকটি সরকারের সময়েই মাদরাসা শিক্ষাকে অবহেলা করার প্রবণতা দেখা গেছে। যেমনÑ উন্নয়ন প্রকল্প ও অনুদানে মাদরাসা শিক্ষাকে প্রায়ই অগ্রাধিকার দেওয়া হয় না; অনেক মাদরাসা শিক্ষক বেতন-ভাতা ও সুযোগ-সুবিধায় সরকারি স্কুল শিক্ষকদের তুলনায় বঞ্চিত; পাঠ্যক্রম আধুনিকীকরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়া হলেও তা ধারাবাহিকভাবে বাস্তবায়িত হয় না; প্রত্যেক জেলা ও উপজেলা লেভেলে সরকারি স্কুল ও কলেজ থাকলেও মাদরাসা সরকারিকরণের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয় না; রেজিস্ট্রার্ড প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোকে সরকারি করা হলেও একটা ইবতেদায়ী মাদরাসাও সরকারি করা হয়নি। এর পেছনের মূল রহস্য হলোÑ যে সরকারই আসুক না কেনÑপ্রত্যেকেই মাদরাসা শিক্ষাকে রাজনৈতিক বা ধর্মীয় সংবেদনশীলতার মধ্যে সীমাবদ্ধ রেখে দেখে। একে জাতীয় মানবসম্পদ উন্নয়নের মূল ধারায় যুক্ত করার প্রচেষ্টা কম।

খ. নীতিগত অসামঞ্জস্য

সাধারণ শিক্ষা ও ধর্মীয় শিক্ষার মধ্যে নীতিগত সমন্বয় না থাকার ফেলে শিক্ষাব্যবস্থায় বৈষম্য তৈরি হয়েছে। সাধারণ শিক্ষার সঙ্গে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি এবং পেশাভিত্তিক বিষয়গুলো যেখানে নিয়মিত হালনাগাদ হয়, সেখানে মাদরাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রম অনেক ক্ষেত্রেই পুরনো কাঠামোতে আটকে আছে। এর পেছনে মূল রহস্য হলোÑ মাদরাসা শিক্ষাকে একটি নিম্নমানের ধারা হিসেবে দেখা হয়; সরকারের নীতি প্রণয়নে মাদরাসা শিক্ষার প্রতিনিধিদের পর্যাপ্ত অংশগ্রহণ থাকে না। এতে শিক্ষার্থীরা মূলধারার চাকরি বা উচ্চশিক্ষায় পিছিয়ে পড়ে, যা সামাজিক ও অর্থনৈতিক বৈষম্য তৈরি করে।

গ. অপর্যাপ্ত অর্থায়ন

সরকারি বাজেটে মাদরাসা শিক্ষার জন্য পর্যাপ্ত বরাদ্দ না থাকায় অবকাঠামোগত উন্নয়ন, শিক্ষক প্রশিক্ষণ ও পাঠ্যক্রম হালনাগাদে বাধা সৃষ্টি হয়। এর পেছনে মূল রহস্য হলোÑ সরকারের অগ্রাধিকার সাধারণ ও কারিগরি শিক্ষার দিকে বেশি। মাদরাসা শিক্ষা ‘ধর্মীয় শিক্ষা’ হিসেবে বিবেচিত হওয়ায় এর উন্নয়নকে জাতীয় উন্নয়ন পরিকল্পনায় গুরুত্বপূর্ণ ধরা হয় না।

ঘ. দুর্বল প্রশাসনিক কাঠামো

মাদরাসা বোর্ড, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয় ও দপ্তরগুলোতে দক্ষ জনবল ও আধুনিক প্রযুক্তির অভাব রয়েছে। এর ফলে ফলপ্রসূ সংস্কার, তথ্য ব্যবস্থাপনা ও শিক্ষাগত মূল্যায়ন প্রক্রিয়া কার্যকর হয় না।

ঙ. সমন্বয়হীনতা

শিক্ষা মন্ত্রণালয় ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের মধ্যে কার্যকর সমন্বয়ের অভাবে নীতিনির্ধারণ ও বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় দ্বন্দ্ব ও বিলম্ব দেখা দেয়। অনেক সময় দুই মন্ত্রণালয়ের দৃষ্টিভঙ্গি ও অগ্রাধিকার ভিন্ন ভিন্ন হয়ে থাকে। এর ফলে মাদরাসা শিক্ষার পাঠ্যক্রম, স্বীকৃতি ও চাকরির যোগ্যতা সংক্রান্ত নীতিমালা অনিশ্চিত থাকে।

উপসংহার

বাংলাদেশের আলিয়া মাদরাসা শিক্ষাব্যবস্থা একটি ঐতিহাসিক ও মূল্যবোধনির্ভর শিক্ষাপদ্ধতি, যা দীর্ঘদিন ধরে ধর্মীয় জ্ঞানচর্চা, নৈতিকতা ও সামাজিক উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে আসছে। তবে সমসাময়িক বৈশ্বিক পরিবর্তন ও প্রযুক্তিনির্ভর জ্ঞানসমাজে এর কাঠামোগত ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা এখন সুস্পষ্ট। শিক্ষক সংকট, পাঠ্যক্রমের আধুনিকায়নের ঘাটতি, গবেষণা ও দক্ষতা উন্নয়ন কার্যক্রমের সীমাবদ্ধতা এবং কর্মমুখী প্রশিক্ষণের অভাবÑসব মিলিয়ে মাদরাসা শিক্ষাকে প্রত্যাশিত মানে উন্নীত করতে বড় বাধা হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে।

এই প্রেক্ষাপটে আলিয়া শিক্ষার আধুনিকায়ন অপরিহার্য। ধর্মীয় ঐতিহ্য ও মূল্যবোধ অক্ষুণœ রেখে এই ব্যবস্থায় বিজ্ঞান, প্রযুক্তি ও কর্মমুখী শিক্ষার সমন্বয় ঘটাতে হবে। পাশাপাশি শিক্ষক নিয়োগ ও প্রশিক্ষণব্যবস্থা উন্নত করা, পাঠ্যক্রমকে যুগোপযোগী করা, গবেষণা ও প্রযুক্তি-ব্যবহার বৃদ্ধি করা এবং প্রশাসনিক জবাবদিহিতা শক্তিশালী করা প্রয়োজন।

সরকার, মাদরাসা শিক্ষা বোর্ড, সংশ্লিষ্ট বিশ্ববিদ্যালয়, শিক্ষকসমাজ ও নীতিনির্ধারকদের সমন্বিত ও দূরদর্শী উদ্যোগের মাধ্যমেই আলিয়া মাদরাসা শিক্ষা জাতীয় শিক্ষার মূলধারায় শক্ত অবস্থান নিতে পারবে। সেইসঙ্গে এটি ধর্মীয় জ্ঞানের চর্চা ও নৈতিকতা বিকাশের পরিসর অতিক্রম করে মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক ন্যায় ও টেকসই উন্নয়নের এক কার্যকর মডেল হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারেÑএমন সম্ভাবনাই প্রবল।