রাজনীতির একটি স্বাভাবিক ও মৌলিক গতিপ্রকৃতি রয়েছে। রাজনীতির শক্তি কেবল বক্তৃতা, বিবৃতি, প্রতিশ্রুতি কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার মধ্যে নিহিত নয়; বরং জনগণের সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক গড়ে তোলা, তাদের বাস্তব সমস্যা উপলব্ধি করা এবং সেসব সমাধানে কার্যকর ভূমিকা রাখার মধ্যেই এর প্রকৃত ভিত্তি নিহিত।
যে রাজনৈতিক শক্তি জনসম্পৃক্ততা, জনকল্যাণ ও সুস্পষ্ট কর্মসূচির মাধ্যমে মানুষের আস্থা অর্জন করতে পারে, তার রাজনৈতিক ভিত্তিও ক্রমে সুদৃঢ় হওয়ার সুযোগ সৃষ্টি হয়।
রাজনীতি যখন জনকল্যাণমুখী কর্মসূচি ও গঠনমূলক উদ্যোগের পরিবর্তে প্রতিপক্ষের সমালোচনা, পারস্পরিক দোষারোপ এবং নিজেদের মধ্যকার বিরোধে অধিকাংশ সময় ব্যয় করতে শুরু করে, তখন তার রাজনৈতিক কার্যকারিতা প্রশ্নের মুখে পড়ে।
সমালোচনা রাজনীতির স্বাভাবিক অংশ; অনিয়মের প্রতিবাদ, নীতিগত মতপার্থক্যের প্রকাশ এবং প্রতিপক্ষের অবস্থানের পর্যালোচনাও গণতান্ত্রিক রাজনীতির অপরিহার্য উপাদান।
কিন্তু সমালোচনাই যখন রাজনীতির প্রধান ভাষা হয়ে ওঠে এবং তার বিপরীতে জনকল্যাণে দৃশ্যমান কর্মতৎপরতা দুর্বল থাকে, তখন সেই রাজনীতি জনমানুষের প্রত্যাশা পূরণে ব্যর্থ হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের ইসলামী দলগুলোর রাজনৈতিক তৎপরতা পর্যালোচনা করলে বিষয়টি বিশেষভাবে সামনে আসে।
অনেক ক্ষেত্রেই তাদের পারস্পরিক মতপার্থক্য, নেতৃত্বকেন্দ্রিক বিরোধ, সাংগঠনিক প্রতিযোগিতা এবং একে অপরের বিরুদ্ধে কঠোর সমালোচনা ও কাদা ছোড়াছুড়ি যতটা দৃশ্যমান, জনজীবনের সমস্যা সমাধানে সমন্বিত, কার্যকর ও ধারাবাহিক উদ্যোগ ততটা স্পষ্ট নয়; বরং অনেক ক্ষেত্রেই তা অত্যন্ত ক্ষীণ।
এমনকি, কোনো কোনো ক্ষেত্রে পারস্পরিক বিরোধ ও বাক্যবাণে আক্রমণাত্মক ভাষার ব্যবহার গঠনমূলক রাজনৈতিক সংলাপের পরিসরকেও সংকুচিত করে দিচ্ছে।
অবশ্য সব ইসলামী দল কিংবা তাদের সামগ্রিক কর্মকাণ্ড সম্পর্কে এককথায় এমন সিদ্ধান্ত দেওয়া সংগত হবে না। বিভিন্ন দল নিজ নিজ পরিসরে ও সীমিত সামর্থ্যের মধ্যে দাওয়াহ, শিক্ষা, সমাজসেবা এবং জনকল্যাণমূলক নানা কর্মকাণ্ড পরিচালনা করে থাকতে পারে, কিংবা বাস্তবেই করছে।
কিন্তু প্রশ্ন হলো,
এসব উদ্যোগ কতটা সুসংগঠিত, ধারাবাহিক, জনসম্পৃক্ত এবং বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর কাছে দৃশ্যমান? তাদের রাজনৈতিক বক্তব্য ও বাস্তব কর্মসূচির মধ্যে কতটা সামঞ্জস্য রয়েছে?
গতকাল সাবেক ধর্মউপদেষ্টা মুহতারাম প্রফেসর ড. আ ফ ম খালিদ হোসেনের বক্তব্য এ প্রশ্নগুলোকে নতুন করে সামনে এনেছে।
তাঁর বক্তব্যের তাৎপর্য কেবল ক্ষমতায় যাওয়ার সম্ভাবনা নিয়ে মন্তব্যের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইসলামী দলগুলোর রাজনৈতিক সক্ষমতা, পারস্পরিক সম্পর্ক, জনসম্পৃক্ততা এবং বাস্তব কর্মসূচি নিয়েও আত্মসমালোচনার অবকাশ তৈরি করে।
ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষা রাজনৈতিক দলের জন্য অস্বাভাবিক নয়। কিন্তু সেই আকাঙ্ক্ষার যথার্থতা ও বাস্তবতা যাচাই করতে হয় জনসমর্থন, সাংগঠনিক সক্ষমতা, গ্রহণযোগ্য নেতৃত্ব, সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান এবং জনগণের সমস্যা সমাধানে কার্যকর ভূমিকার ভিত্তিতে।
এখানেই একটি মৌলিক প্রশ্ন দেখা দেয়—
ইসলামী দলগুলো যদি বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক গড়ে তুলতে, মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা নিয়ে ধারাবাহিকভাবে কাজ করতে এবং নিজেদের মধ্যে ন্যূনতম সমন্বয় প্রতিষ্ঠা করতে যথেষ্ট অগ্রগতি অর্জন করতে না পারে, তাহলে কেবল রাজনৈতিক বক্তব্য, পারস্পরিক সমালোচনা কিংবা ক্ষমতায় যাওয়ার প্রত্যাশা দিয়ে সেই ঘাটতি পূরণ হবে কীভাবে? !!
জনগণের কাছে নিজেদের রাজনৈতিক ও নৈতিক গ্রহণযোগ্যতা প্রতিষ্ঠা না করে ক্ষমতার হিসাব-নিকাশে অতিরিক্ত মনোযোগী হওয়া বাস্তবতার সঙ্গে প্রত্যাশার ব্যবধানকে আরও স্পষ্ট করে তুলতে পারে।
এর আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে।
ইসলামী দলগুলোর পারস্পরিক বিরোধ ও সমালোচনা যখন তাদের রাজনৈতিক তৎপরতার বড় অংশজুড়ে অবস্থান করে, তখন জনকল্যাণে সম্মিলিত উদ্যোগের সুযোগ সংকুচিত হয়ে আসে; অনেক ক্ষেত্রে এমন উদ্যোগের কার্যকর উপস্থিতিই প্রায় অনুপস্থিত থাকে।
শিক্ষা, কর্মসংস্থান, দ্রব্যমূল্য, দুর্নীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার, সুশাসন, নাগরিক অধিকার ও জননিরাপত্তার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে তারা যদি নিজস্ব অবস্থান ও কার্যকর কর্মসূচি নিয়ে ধারাবাহিকভাবে জনগণের পাশে দাঁড়াতে পারে, তাহলে রাজনীতিতে তাদের ভূমিকা আরও অর্থবহ হয়ে উঠতে পারে।
অন্যদিকে,
পারস্পরিক অবিশ্বাস, বিভক্তি ও কাদা ছোড়াছুড়ি তাদের সম্মিলিত উদ্যোগকে দুর্বল করার পাশাপাশি বৃহত্তর রাজনৈতিক পরিসরে দর-কষাকষির সক্ষমতাও সীমিত করে দিতে পারে। এমনকি, এই বিভক্তির সুযোগে তারা নিজেরাই অন্য রাজনৈতিক শক্তির স্বার্থসিদ্ধির টুলে পরিণত হওয়ার ঝুঁকিতে পড়তে পারে।
তবে ইসলামী দলগুলোর ঐক্য বলতে সব বিষয়ে মতৈক্য প্রতিষ্ঠা কিংবা নিজস্ব আদর্শ ও নীতিগত অবস্থান বিসর্জন দেওয়াকে বোঝায় না। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা বজায় রাখা, অভিন্ন জনস্বার্থের বিষয়ে সহযোগিতা করা এবং বিভেদ নিরসনে দায়িত্বশীল আচরণ করাই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচায়ক।
একইভাবে,
প্রতিপক্ষের সমালোচনা পুরোপুরি পরিহার করাও কাম্য নয়; বরং সমালোচনাকে তথ্য, যুক্তি ও নীতিগত অবস্থানের ভিত্তিতে পরিচালিত করা এবং তার পাশাপাশি নিজেদের বিকল্প কর্মসূচি ও বাস্তব অবদান তুলে ধরাই অধিক কার্যকর পথ।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো,
রাজনৈতিক শক্তিগুলো যখন নিজেদের মধ্যকার প্রতিযোগিতাকেই প্রধান বিবেচ্য করে তোলে, তখন জনগণের প্রকৃত প্রয়োজন ও প্রত্যাশা আড়ালে পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এতে শুধু সংশ্লিষ্ট দলগুলোর জনভিত্তিই দুর্বল হয় না; বরং তাদের পারস্পরিক বিভাজন বৃহত্তর রাজনৈতিক স্বার্থসংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর প্রভাব বিস্তারের সুযোগও তৈরি করতে পারে।
ফলে জনসম্পৃক্ততা, পারস্পরিক সহযোগিতা ও গঠনমূলক রাজনৈতিক কর্মসূচিকে অগ্রাধিকার দেওয়া তাদের নিজেদের স্বার্থেই জরুরি।
সাবেক ধর্মউপদেষ্টার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে তাই ইসলামী দলগুলোর সামনে আত্মজিজ্ঞাসার কয়েকটি মৌলিক প্রশ্ন উত্থাপিত হওয়া প্রয়োজন—
তারা কি জনগণের বাস্তব সমস্যা সমাধানের জন্য পর্যাপ্ত ও কার্যকর কর্মসূচি গ্রহণ করছে?
তাদের রাজনৈতিক তৎপরতা কি মানুষের আস্থা অর্জনের দিকে এগোচ্ছে, নাকি পারস্পরিক সমালোচনার বৃত্তেই ঘুরপাক খাচ্ছে?
ক্ষমতায় যাওয়ার প্রত্যাশার পাশাপাশি সেই লক্ষ্যে প্রয়োজনীয় জনসম্পৃক্ততা, সাংগঠনিক সক্ষমতা ও নীতিগত প্রস্তুতি গড়ে তোলার ক্ষেত্রে তারা কতটা অগ্রসর?
ইসলামী রাজনীতির গ্রহণযোগ্যতা শুধু ইসলামের পক্ষে বক্তব্য দেওয়া, স্বপ্ন দেখানো, প্রতিশ্রুতি প্রদান কিংবা ইসলামী আদর্শের প্রতিনিধিত্ব করার দাবি জানানোর ওপর নির্ভর করে না; বরং ন্যায়বিচার, সততা, জনসেবা, দায়িত্বশীলতা এবং মানুষের বাস্তব কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা পালনের মাধ্যমেই সেই দাবির যথার্থতা প্রমাণিত হতে হয়।
অতএব,
পারস্পরিক সমালোচনার রাজনৈতিক বৃত্ত থেকে বেরিয়ে জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি, জনকল্যাণমূলক কর্মসূচির বাস্তবায়ন, নীতিগত বিতর্কের উন্নত চর্চা এবং অভিন্ন স্বার্থে সহযোগিতার দিকে অগ্রসর হওয়াই এখন অধিক গুরুত্বপূর্ণ।
প্রশ্নটি তাই শুধু কে ক্ষমতায় যাবে, তা নয়; বরং জনগণের আস্থা অর্জন এবং তাদের কল্যাণে কার্যকর ভূমিকা রাখার জন্য কে কতটা প্রস্তুত। জনসমর্থন ও বাস্তব কর্মতৎপরতার ভিত্তি সুদৃঢ় না করে ক্ষমতায় যাওয়ার প্রত্যাশা যতই উচ্চকণ্ঠ হোক, তার বাস্তব ভিত্তি নিয়ে প্রশ্ন থেকেই যায়।