সম্প্রতি জাতীয় সংসদে সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬ পাস হয়েছে। বিলটির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো—নির্দিষ্ট নিকটাত্মীয়ের মধ্যে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও দাতার জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার সংরক্ষণের সুযোগ তৈরি করা।
বিলটির উদ্দেশ্য হিসেবে পিতা-মাতা ও অন্যান্য দাতাকে সম্পত্তি হস্তান্তরের পরও জীবদ্দশায় সুরক্ষা দেওয়ার বিষয়টি গুরুত্বপূর্ণ।
তবে একজন মুসলিমের ক্ষেত্রে এ ধরনের আইনগত ব্যবস্থার শরিয়াহগত সম্ভাব্য প্রভাব ও অপব্যবহারের ঝুঁকিগুলোও গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
এখানে বিলটির ব্যাপারে সরাসরি কোনো ‘শরিয়াহগত অবস্থান’ নির্ধারণ করা উদ্দেশ্য নয়; বরং এর বিধানগুলো প্রয়োগের ফলে মুসলিম পরিবার ও সম্পত্তি-বণ্টনের ক্ষেত্রে কী ধরনের সম্ভাব্য শরিয়াহগত জটিলতা, বৈষম্য বা অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে, সেগুলো চিহ্নিত করাই মূল উদ্দেশ্য।
*ঝুঁকি-১, মিরাসের নির্ধারিত অংশ থেকে উত্তরাধিকারীদের বঞ্চিত হওয়ার আশঙ্কা:
এটি আমার দৃষ্টিতে বিলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহগত ঝুঁকিগুলোর একটি।কুরআন উত্তরাধিকারকে কোনো সাধারণ পারিবারিক বণ্টনব্যবস্থা হিসেবে ছেড়ে দেয়নি; বরং উত্তরাধিকারীদের অংশ সুনির্দিষ্ট করে দিয়েছে।
পবিত্র কুরআনে এ বণ্টনকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত বিধান বলা হয়েছে এবং পরবর্তী আয়াতে এগুলোকে ‘আল্লাহর সীমারেখা’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে (সূরা আন-নিসা, ৪:১১–১৪)।
ঝুঁকিটি একটি উদাহরণের মাধ্যমে বোঝা যায়।
ধরা যাক, একজন মুসলিম পিতার দুই ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রী রয়েছেন। তিনি জীবিত অবস্থায় তাঁর অধিকাংশ স্থাবর সম্পত্তি ১২২এ ধারার অধীনে একজন ছেলেকে হস্তান্তর করলেন এবং নিজের জন্য আজীবন ভোগাধিকার সংরক্ষণ করলেন।
যদি হস্তান্তরটি আইনগতভাবে সম্পূর্ণ হয়ে থাকে এবং মৃত্যুর সময় ওই সম্পত্তি আর তাঁর মালিকানায় না থাকে, তাহলে তা তাঁর রেখে যাওয়া সম্পদের (তরিকাহর) অংশরূপে গণ্য হবে না। ফলে তাঁর মৃত্যুর পর অন্য ছেলে, দুই মেয়ে ও স্ত্রী ওই সম্পত্তিতে মিরাসি অংশ পাবেন না।
এখানে আইনগত বৈধতা এবং শরিয়াহগত মূল্যায়ন—দুটি পৃথক প্রশ্ন। প্রশ্ন হলো, এই ব্যবস্থা কি স্বাভাবিক জীবদ্দশার সম্পত্তি হস্তান্তর হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে, নাকি আল্লাহ নির্ধারিত মিরাসের অধিকার থেকে কোনো উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করার উপায় হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে?!
_
*ঝুঁকি-২, হিবা ও মিরাসের পার্থক্যকে ভুলভাবে ব্যবহার করার আশঙ্কা:
ইসলামী আইনে হিবা ও মিরাস মৌলিকভাবে পৃথক।
হিবা হলো জীবদ্দশায় সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তর; আর মিরাস হলো মৃত্যুর পর মৃত ব্যক্তির রেখে যাওয়া সম্পত্তিতে শরিয়াহ নির্ধারিত উত্তরাধিকারীদের অধিকার।
সুতরাং একজন ব্যক্তি জীবিত অবস্থায় তাঁর সম্পত্তির মালিক এবং তা বৈধভাবে হিবা করার অধিকার রাখেন—এটি সত্য। কিন্তু এ অধিকার থেকে এমন সিদ্ধান্ত নেওয়া যায় না যে, মিরাসের বিধান এড়িয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে জীবদ্দশায় সম্পত্তি যেকোনোভাবে বণ্টন করাও শরিয়াহর দৃষ্টিতে সমানভাবে গ্রহণযোগ্য।
অতএব, হিবার বৈধতা এবং হিবার উদ্দেশ্য—দুটি পৃথক বিষয়। বিলটির শরিয়াহগত মূল্যায়নে এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
*ঝুঁকি-৩, সন্তানদের মধ্যে অন্যায় বৈষম্য:
সন্তানদের মধ্যে সম্পত্তি বণ্টনের ক্ষেত্রে ন্যায়বিচারের প্রশ্নটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
নু‘মান ইবন বশীর (রা.)-এর ঘটনায় তাঁর পিতা তাঁকে একটি বিশেষ উপহার দিলে রাসুলুল্লাহ ﷺ জানতে চাইলেন, তিনি কি অন্য সন্তানদেরও অনুরূপ দিয়েছেন। তিনি না বললে নবী ﷺ বলেন:
فَاتَّقُوا اللَّهَ وَاعْدِلُوا بَيْنَ أَوْلَادِكُمْ
“আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমাদের সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করো।” এরপর তাঁর পিতা সেই উপহার ফিরিয়ে নেন। (সহীহুল বুখারী)
সুতরাং জীবদ্দশায় সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়া বৈধ হতে পারে; কিন্তু এক সন্তানকে দেওয়া এবং অন্য সন্তানদের অযৌক্তিকভাবে বঞ্চিত করা শরিয়াহর ন্যায়নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এ প্রশ্ন এড়ানো যাবে না।
বিশেষত যদি কোনো গ্রহণযোগ্য প্রয়োজন বা কারণ ছাড়াই একজন সন্তানকে সম্পত্তি দেওয়ার উদ্দেশ্য হয় অন্য সন্তানদের ভবিষ্যৎ সম্পত্তি থেকে বঞ্চিত করা, তাহলে বিষয়টি আরও গুরুতর হয়ে ওঠে।
* ঝুঁকি-৪, হিবাকে মিরাস থেকে বঞ্চনার কৌশল হিসেবে ব্যবহারের আশঙ্কা:
এটি আগের ঝুঁকিগুলোরই আরও গুরুতর রূপ।
ধরা যাক, একজন ব্যক্তি মনে করলেন—
“আমার মৃত্যুর পর শরিয়াহ অনুযায়ী আমার মেয়েরাও সম্পত্তিতে অংশ পাবে। আমি তা চাই না। তাই জীবিত থাকতেই সব সম্পত্তি ছেলেকে দিয়ে দিই।”
এ ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে এটি জীবদ্দশার হিবা হলেও এর উদ্দেশ্য ও ফলাফল বিশেষভাবে বিবেচনার দাবি রাখে।
কুরআন উত্তরাধিকারীদের অংশ নির্ধারণ করার পর বলেছে: تِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ—“এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমারেখা।”(সূরা আন-নিসা, ৪:১৩)
অতএব,
একজন মুসলিমের জীবদ্দশায় সম্পত্তি ব্যবস্থাপনার স্বাধীনতা অবশ্যই রয়েছে; কিন্তু সেই স্বাধীনতাকে আল্লাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার-ব্যবস্থাকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পাশ কাটানোর উপায়ে পরিণত করা শরিয়াহর ন্যায়নীতি ও উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—তা গভীরভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
*ঝুঁকি-৫, হিবা ও ওসিয়তের সীমারেখা অস্পষ্ট হওয়ার আশঙ্কা:
শরিয়াহতে হিবা জীবদ্দশায় কার্যকর হয়, আর ওসিয়ত সাধারণত মৃত্যুর পর কার্যকর হয়। তাই কোনো সম্পত্তি মৃত্যুর পর কার্যকর হওয়ার উদ্দেশ্যে কাউকে দেওয়ার ব্যবস্থা হিবার নামে করলেই তা প্রকৃতিগতভাবে হিবা হয়ে যায় না।
এ প্রসঙ্গে প্রসিদ্ধ হাদিস: لا وصية لوارث –“কোনো ওয়ারিশের জন্য ওসিয়ত নেই।”
অন্য বর্ণনায় এসেছে:
إن الله قد أعطى كل ذي حق حقه
—“আল্লাহ প্রত্যেক হকদারকে তার হক দিয়ে দিয়েছেন।”
তাই ১২২এ-এর অধীনে কোনো দলিল করা হলে দেখতে হবে—বাস্তবে কি জীবদ্দশায় মালিকানা হস্তান্তর হয়েছে, নাকি মূল উদ্দেশ্য হলো মৃত্যুর পর নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে সম্পত্তি দেওয়ার ব্যবস্থা করা?
যদি দলিলের আড়ালে দ্বিতীয় উদ্দেশ্য কার্যকর থাকে, তাহলে এর প্রকৃতি নিয়ে গুরুতর ফিকহি প্রশ্ন তৈরি হতে পারে।
*ঝুঁকি-৬, মুসলিম আইনের হেবায় ‘কবজ’-এর প্রশ্ন:
মুসলিম আইনের হেবার ক্ষেত্রে কবজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ফিকহি বিষয়।
অন্যদিকে ১২২এ-এর ব্যবস্থা একটি পৃথক statutory mechanism, যেখানে সম্পত্তির মালিকানা হস্তান্তরের পাশাপাশি দাতার জীবদ্দশার ভোগাধিকার সংরক্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে।
এখানে তাই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো:
দাতা যখন সম্পত্তির বাস্তব ভোগ ও ব্যবহার নিজের কাছেই রাখছেন, তখন মুসলিম আইনের হেবার ক্ষেত্রে ‘কবজ’-সংক্রান্ত ফিকহি নীতির সঙ্গে এই ব্যবস্থার সম্পর্ক কী?
এ প্রশ্নের উত্তর সরাসরি “কবজ হয়নি” বলা যাবে না। কারণ, ১২২এ-এর অধীনে সম্পত্তি হস্তান্তর প্রচলিত হেবা নয়; এটি একটি পৃথক আইনগত ব্যবস্থা। তবে এখানেই একটি সম্ভাব্য শরিয়াহগত ঝুঁকি রয়েছে। কোনো মুসলিম যদি নতুন আইনের এই হস্তান্তর-পদ্ধতি ব্যবহার করে শরিয়াহর হেবা-সংক্রান্ত শর্তগুলো অনুসরণ না করেও প্রায় একই অর্থনৈতিক ফল অর্জন করতে পারেন, তাহলে এ পদ্ধতি হেবার একটি বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি হতে পারে। তাই নতুন আইনের হস্তান্তর-পদ্ধতি এবং শরিয়াহর হেবা—দুটিকে পৃথকভাবে মূল্যায়ন করা এবং এ ধরনের সম্ভাব্য অপব্যবহারের দিকটি বিবেচনায় রাখা জরুরি।
*ঝুঁকি-৭, গ্রহীতা দাতার আগে মারা গেলে নতুন উত্তরাধিকার-জটিলতা:
বিলটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো—গ্রহীতা দাতার জীবদ্দশায় মারা গেলেও নির্দিষ্ট পরিস্থিতিতে হস্তান্তর বাতিল না হয়ে সম্পত্তি গ্রহীতার আইনগত উত্তরাধিকারীদের কাছে যাওয়ার ব্যবস্থা থাকতে পারে।
ধরা যাক, বাবা ছেলেকে সম্পত্তি হস্তান্তর করলেন। ছেলে বাবার আগেই মারা গেল। তখন ছেলের উত্তরাধিকারীদের মধ্যে তার স্ত্রী ও সন্তান থাকতে পারেন।
ফলে বাবা জীবিত থাকা অবস্থাতেই সম্পত্তিটির ভবিষ্যৎ মালিকানা তাঁর সন্তানের উত্তরাধিকারীদের দিকে চলে যেতে পারে, যদিও বাবা নিজে তখনও সম্পত্তিটির ভোগাধিকার ধরে রেখেছেন।
এটি প্রচলিত মিরাসের সঙ্গে সরাসরি এক করে দেখা যাবে না; কারণ এখানে প্রথমে একটি জীবদ্দশার সম্পত্তি হস্তান্তর ঘটেছে। তবে এ ধরনের statutory succession-এর সঙ্গে মুসলিম উত্তরাধিকার আইনের সম্পর্ক এবং সম্ভাব্য প্রভাব ফিকহি দৃষ্টিতে আলাদাভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
*ঝুঁকি-৮, পিতা-মাতার সুরক্ষার পাশাপাশি অন্য উত্তরাধিকারীদের অধিকার ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা:
বিলটির একটি গুরুত্বপূর্ণ ও যৌক্তিক উদ্দেশ্য হলো—পিতা-মাতা সম্পত্তি সন্তানকে হস্তান্তর করার পরও যেন তাঁদের জীবদ্দশায় সেই সম্পত্তির ব্যবহার ও ভোগ থেকে বঞ্চিত না হন।
এই উদ্দেশ্যটি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ।
তবে প্রশ্ন হলো—
পিতা-মাতার জীবনকালীন সুরক্ষা নিশ্চিত করতে গিয়ে এমন কোনো কাঠামো তৈরি হচ্ছে কি না, যার মাধ্যমে তাঁদের মৃত্যুর পর অন্য শরিয়াহসম্মত উত্তরাধিকারীদের সম্ভাব্য অধিকার সম্পূর্ণভাবে বাদ দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
অর্থাৎ, একটি ন্যায়সংগত উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের পদ্ধতি যদি অন্য একটি শরিয়াহসম্মত অধিকারকে অকার্যকর করার সুযোগ তৈরি করে, তাহলে সেই ব্যবস্থার safeguards নিয়ে পুনর্বিবেচনা প্রয়োজন।
* ঝুঁকি-৯: “বাবা জীবিত থাকতেই দিয়ে দিয়েছেন”—এই ধারণার অপব্যবহার:
সামাজিকভাবে প্রায়ই বলা হয়—
“বাবা জীবিত থাকতেই সম্পত্তি দিয়ে দিয়েছেন; এটা তো তাঁর সম্পত্তি, তিনি যা ইচ্ছা করতে পারেন।”
এই বক্তব্যের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ সত্য আছে—জীবিত অবস্থায় সম্পত্তির মালিকানা তাঁরই।
কিন্তু এখান থেকে সীমাহীন স্বাধীনতার ধারণা গ্রহণ করা ঠিক নয়। একজন মুসলিম তাঁর সম্পত্তি জীবদ্দশায় হস্তান্তর করতে পারেন; একই সঙ্গে সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার করা এবং অন্যায়ভাবে কাউকে বঞ্চিত না করার শরিয়াহগত নীতিও তাঁকে বিবেচনায় রাখতে হবে।
সুতরাং—আইনগত ক্ষমতা ≠ সীমাহীন শরিয়াহগত নৈতিক অধিকার।
এই পার্থক্যটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
*ঝুঁকি-১০, শরিয়াহর বিধান এড়াতে আইনগত কৌশল ব্যবহারের আশঙ্কা:
এটি সবচেয়ে সূক্ষ্ম বিষয়গুলোর একটি।
কোনো ব্যক্তি বলতে পারেন—
“আমি কাউকে বঞ্চিত করছি না; আমি শুধু জীবিত অবস্থায় আমার সম্পত্তি হস্তান্তর করেছি।”
কিন্তু যদি বাস্তব উদ্দেশ্য হয়—
“আমার মৃত্যুর পর যেন অমুক উত্তরাধিকারী এই সম্পত্তিতে কোনো অংশ না পায়,”
তাহলে বিষয়টি শুধু দলিলের বাহ্যিক বৈধতার প্রশ্নে সীমাবদ্ধ থাকে না।
এখানে দেখতে হবে—
এটি কি প্রকৃত জীবদ্দশার সম্পত্তি হস্তান্তর, নাকি মিরাসের ফলাফল পরিবর্তনের জন্য একটি আইনগত কৌশল?
তাই এ ধরনের ক্ষেত্রে দলিলের ভাষা, হস্তান্তরের বাস্তবতা, উদ্দেশ্য, পরিস্থিতি এবং ফলাফল—সবগুলো বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
*ঝুঁকি-১১: দাতার নিজের ভবিষ্যৎ নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ার আশঙ্কা:
জীবনকালীন ভোগাধিকার দাতাকে একটি গুরুত্বপূর্ণ সুরক্ষা দিতে পারে। কিন্তু মালিকানা হস্তান্তরের পর দাতার ভবিষ্যৎ আর্থিক নিরাপত্তার ওপরও নতুন ধরনের নির্ভরশীলতা তৈরি হতে পারে।
ধরা যাক, একজন বৃদ্ধ পিতা তাঁর একমাত্র বাড়িটি সন্তানকে হস্তান্তর করলেন এবং নিজের আজীবন বসবাসের অধিকার রাখলেন। পরবর্তী সময়ে তাঁর চিকিৎসা বা অন্য কোনো জরুরি প্রয়োজনে বাড়িটি বিক্রি বা সম্পত্তির ওপর নতুন কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন হলো। তখন তিনি আর পূর্ণ মালিক নন।
ফলে মালিকানা ও ভোগাধিকারের পৃথকীকরণ একদিকে দাতাকে সুরক্ষা দিতে পারে, অন্যদিকে তাঁর ভবিষ্যৎ সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বাধীনতাও সীমিত করতে পারে।
* ঝুঁকি-১২, এক প্রজন্মের সম্পত্তি-বণ্টনের মাধ্যমে পরবর্তী প্রজন্মের উত্তরাধিকার-সম্পর্কেও প্রভাব পড়া:
ধরা যাক, দাদা তাঁর ছেলেকে সম্পত্তি হস্তান্তর করলেন। কিন্তু ছেলে দাদার আগেই মারা গেল।
তখন সংশ্লিষ্ট আইনি বিধানের কারণে সেই সম্পত্তির পরবর্তী মালিকানা ছেলের উত্তরাধিকারীদের দিকে যেতে পারে।
অর্থাৎ, দাদা হয়তো ভেবেছিলেন—
“আমি আমার ছেলেকে সম্পত্তি দিচ্ছি।”
কিন্তু বাস্তবে সেই সম্পত্তির ভবিষ্যৎ গন্তব্য হতে পারে ছেলের স্ত্রী, সন্তান বা অন্যান্য উত্তরাধিকারী।
এটি সরাসরি প্রচলিত মিরাসের বিধানের সঙ্গে এক করে দেখা যাবে না; কারণ এখানে প্রথমেই একটি জীবদ্দশার হস্তান্তর ঘটেছে। তবে এ ধরনের ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি পারিবারিক ও উত্তরাধিকারগত প্রভাব ফিকহি ও আইনগত—উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
*ঝুঁকি-১৩, সন্তানদের প্রতি ন্যায়বিচার এবং মিরাসের ২:১ অনুপাতকে এক করে ফেলার আশঙ্কা:
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
জীবদ্দশায় হিবা মিরাস নয়। তাই হিবার ক্ষেত্রে ছেলে-মেয়েকে অবশ্যই মিরাসের ২:১ অনুপাতে দিতে হবে—এটি সর্বসম্মত ফিকহি সিদ্ধান্ত নয়।
কিন্তু এর বিপরীত কথাটিও ঠিক নয় যে—
“যেহেতু হিবা মিরাস নয়, তাই সন্তানদের মধ্যে যেকোনো ধরনের বৈষম্য করা যাবে।”
নু‘মান ইবন বশীর (রা.)-এর হাদিস অন্তত সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচারের একটি সুস্পষ্ট নীতি প্রতিষ্ঠা করে।
তাই বিলটির ক্ষেত্রে শরিয়াহসম্মত ও নিরাপদ নীতি হতে পারে:
জীবদ্দশায় হিবা করা বৈধ; কিন্তু সেই হিবার সুযোগ নিয়ে সন্তানদের মধ্যে অন্যায় বৈষম্য করা বা কোনো উত্তরাধিকারীকে বঞ্চিত করার বৈধতা হিসেবে তা গ্রহণ করা যাবে না।
*ঝুঁকি-১৪, স্ত্রী বা অন্যান্য উত্তরাধিকারীকে পরোক্ষভাবে বঞ্চিত করার আশঙ্কা:
বিষয়টি শুধু সন্তানদের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
একজন ব্যক্তি জীবদ্দশায় তাঁর অধিকাংশ সম্পত্তি সন্তানদের হস্তান্তর করে দিলেন। তাঁর মৃত্যুর সময় স্ত্রী জীবিত থাকলেও ওই সম্পত্তি আর তাঁর মালিকানায় নেই। ফলে সেই সম্পত্তিতে স্ত্রীর মিরাসি অংশও সৃষ্টি হবে না।
আইনগতভাবে এটি সম্ভব হতে পারে।
কিন্তু শরিয়াহগতভাবে প্রশ্ন থাকবে:
এটি কি স্বাভাবিক জীবদ্দশার সম্পত্তি ব্যবস্থাপনা, নাকি স্ত্রীর ভবিষ্যৎ মিরাসি অধিকারকে উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে অকার্যকর করার ব্যবস্থা?
এখানেও কুরআনের “ফরীযাতান মিনাল্লাহ” এবং “তিলকা হুদূদুল্লাহ”—আল্লাহর নির্ধারিত বিধান ও সীমারেখার নীতি প্রাসঙ্গিক।
_
*ঝুঁকি-১৫, হেবার পাশাপাশি একটি বিকল্প আইনগত পথ তৈরি হওয়ার আশঙ্কা:
সরকারি ব্যাখ্যা অনুযায়ী, নতুন ১২২এ–১২২বি ব্যবস্থা প্রচলিত হেবা নয় এবং এটি হেবার বৈধতাকেও বাতিল করছে না।
কিন্তু বাস্তবে একজন মুসলিমের সামনে তখন দুটি পথ তৈরি হতে পারে—
পথ–১: মুসলিম আইনের হেবা
পথ–২: নতুন statutory পদ্ধতিতে সম্পত্তি হস্তান্তর
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন উঠতে পারে—
একজন মুসলিম কি শরিয়াহর হেবা-সংক্রান্ত শর্তগুলো অনুসরণ না করেও নতুন এই আইনি পদ্ধতি ব্যবহার করে প্রায় একই অর্থনৈতিক ফল লাভ করতে পারবেন?
যদি বাস্তবে তা সম্ভব হয়, তাহলে আইনটি সরাসরি হেবা-ব্যবস্থাকে বাতিল না করেও হেবার একটি বিকল্প পথ হিসেবে ব্যবহৃত হওয়ার সুযোগ তৈরি করতে পারে।
আর এখানেই বিলটির সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শরিয়াহগত ও আইনগত নীতিগত প্রশ্নগুলোর একটি সামনে আসে।
**
মোটকথা,
বিলটি সরাসরি শরিয়াহবিরোধী কি না—এ বিষয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত দেওয়ার আগে এর প্রতিটি বিধান শরিয়াহ ও মুসলিম ব্যক্তিগত আইনের আলোকে পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পরীক্ষা করা প্রয়োজন।
একদিকে, জীবিত ব্যক্তি তাঁর সম্পত্তির বৈধ মালিক এবং জীবদ্দশায় তা হিবা বা অন্য বৈধ উপায়ে হস্তান্তর করার অধিকার রাখেন।
অন্যদিকে, মিরাস আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত বিধান এবং সন্তানদের মধ্যে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠার নির্দেশও সুন্নাহতে সুস্পষ্ট।
তাই সমস্যাটি হিবা নামের কাজটিতে যতটা নয়, তার উদ্দেশ্য, কাঠামো, বাস্তব প্রয়োগ, সন্তানদের মধ্যে বৈষম্য এবং এর সম্ভাব্য ফলাফলেও ততটাই।
***
আমাদের বিবেচনায়
জীবদ্দশায় সম্পত্তি হস্তান্তর শরিয়াহসম্মত হতে পারে; কিন্তু এমন কোনো আইনগত ব্যবস্থা, যা একজন মুসলিমকে সম্পত্তি হস্তান্তরের মাধ্যমে আল্লাহ নির্ধারিত মিরাসের অধিকারীদের ইচ্ছাকৃতভাবে বঞ্চিত করার কার্যকর সুযোগ দেয়, তার শরিয়াহগত নিরাপত্তা, উদ্দেশ্য ও প্রয়োগ-পদ্ধতি গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।
মিরাসের অধিকার মৃত্যুর পর কার্যকর হয়—এ কারণে জীবিত ব্যক্তির সম্পত্তির ওপর তাঁর মালিকানা ও তা হস্তান্তরের অধিকার অস্বীকার করা যায় না। তবে সেই মালিকানার স্বাধীনতাকে এমন কৌশলে ব্যবহার করাও সমীচীন নয়, যার প্রধান উদ্দেশ্য আল্লাহ নির্ধারিত উত্তরাধিকার-ব্যবস্থাকে পাশ কাটানো।