জামায়াত ও কাওমী ঘরানার আলিমদের মধ্যে মতপার্থক্য যেন পুরোনো ইতিহাস। কখনো এই বিতর্ক থাকে নীরব ও শীতল, আবার কখনো তা তীব্র হয়ে ওঠে প্রবল উত্তাপে।

একসময় মনে হয়—তারা পারস্পরিক বিরোধ ভুলে একসূত্রে গ্রথিত হচ্ছেন; কিন্তু পরক্ষণেই দেখা যায়, দূরত্বটা আবারও বেড়ে গেছে। সাম্প্রতিক সময়ে যেন কেউ ইচ্ছে করেই এই আগুনে ঘি ঢেলে দিচ্ছে।

তাদের মধ্যে যে বিষয়গুলো নিয়ে বিতর্ক হয়, তা কোনো নতুন ইস্যু নয়—বছরের পর বছর ধরে চলে আসা মতবিরোধই নতুন আঙ্গিকে সামনে আসে।

সম্ভবত, এসব প্রশ্নে উভয় পক্ষের মধ্যে কখনও পূর্ণ ঐকমত্য আসবে না। কারণ, তাদের চিন্তা, দৃষ্টিভঙ্গি ও উপস্থাপনার ধরণ সম্পূর্ণ ভিন্ন।

একপক্ষ প্রবলভাবে ঐতিহ্যনিষ্ঠ ও রক্ষণশীল মনোভাব ধারণ করেন,

অপরপক্ষ সময়ের চাহিদা, সামাজিক বাস্তবতা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জগুলো অনুধাবন করে সেগুলোর জবাব দিতে চান—

কখনো অভিযোজনের মাধ্যমে, কখনো ইসলামী দৃষ্টিকোণ থেকে নতুন বাস্তবতাকে বোঝার চেষ্টা করে।

অগ্রাধিকার নির্ধারণের ক্ষেত্রেও দুই পক্ষের চিন্তা ও দৃষ্টিভঙ্গিতে রয়েছে প্রকট পার্থক্য।

দুঃখজনক হলেও সত্য,

উভয় পক্ষের মধ্যে কমবেশি এক ধরনের শ্রেষ্ঠত্ববোধ ও আত্মগর্ব কাজ করে, ফলে তাদের অনেকেই একে অপরকে স্বীকৃতি দিতেও প্রায়ই অনীহা বোধ করেন—কখনো কখনো তা পরিণত হয় চরম সংকীর্ণতায়ও।

কে বেশি সঠিক বা বাস্তবসম্মত অবস্থানে আছেন, তা এক জটিল আলোচনার বিষয়—যা এই সংক্ষিপ্ত পরিসরে বলা সম্ভব নয়।

ইতিহাস বলছে, যুগে যুগে আলিমদের মধ্যে মতবিরোধ ছিল, আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। স্বার্থ ও দৃষ্টিভঙ্গির দ্বন্দ্বও মানবসমাজের চিরায়ত বাস্তবতা।

তাই মনে করা যে, এই বিরোধ একদিন পুরোপুরি মিটে যাবে—তা অবাস্তব এক কল্পনা। তবে এর মানে কখনও এ নয় যে, এ ধরনের বিরোধ নিয়ে নীরব থাকাই একান্ত সমাধান। বরং এগুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে, হওয়া উচিত—তবে সেটি হবে সীমিত পরিসরে, সংযত ভাষায়, গবেষণাধর্মী ও একাডেমিক কাঠামোর মধ্যে।

এ অবস্থায় আমাদের করণীয় হলো—

বিরোধকে সহনীয় পর্যায়ে রেখে, উম্মাহ ও জাতির বৃহত্তর কল্যাণে

‘আল-ইত্তিহাদ মা‘আল ইখতিলাফ’—অর্থাৎ মতবিরোধের মধ্যেও ঐক্যের সূত্র—আচরণে রূপ দেওয়া।

দুই পক্ষেরই সতর্ক থাকতে হবে, যেন এই মতভেদ কখনও বিভেদে পরিণত না হয়, যাতে পারস্পরিক সম্পর্ক, সৌহার্দ্য ও সম্মানবোধ ক্ষুণ্ন না হয়।

কারণ, ইসলামবিরোধী শক্তি, সেক্যুলারিস্ট ও লিবারেলিস্ট গোষ্ঠী চাইবে—এই অভ্যন্তরীণ বিরোধকে কাজে লাগিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক স্বার্থ হাসিল করতে এবং আমাদেরকে পরোক্ষভাবে তাদের কৌশলগত উদ্দেশ্যের হাতিয়ার বানাতে।

তাই উভয় পক্ষের দায়িত্বশীল আলিম, মুরব্বি ও চিন্তাশীলদের উচিত—

পরিস্থিতির গুরুত্ব অনুধাবন করা, অনুগামীদের নিয়ন্ত্রণে রাখা

এবং এই বিরোধ যেন আর না বাড়ে, সে ব্যাপারে দৃঢ় ভূমিকা নেওয়া।

অন্যথায়, কোনো পক্ষই লাভবান হবে না; বরং উভয়ের অবস্থান ক্রমেই দুর্বল হয়ে পড়বে—এটাই অনিবার্য পরিণতি।

আমাদের ভুলে গেলে চলবে না—

আজকের প্রজন্ম, বিশেষ করে জেন-জি, আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক বেশি সচেতন, যুক্তিনিষ্ঠ, অনুসন্ধিৎসু ও সমালোচনামুখী। তারা এখন আর কোনো আলিম, শাইখ বা পীরের বক্তব্য আগের মতো অন্ধভাবে মেনে নেয় না। তথ্যপ্রবাহের এই যুগে যুক্তিনিষ্ঠ অনুসন্ধান তাদের চিন্তার স্বাভাবিক অঙ্গ হয়ে ওঠেছে। তারা যুক্তি, দলীল-প্রমাণ ও বাস্তবতার আলোকে সবকিছু পর্যালোচনা করতে শিখেছে।

এমন প্রেক্ষাপটে আমাদের যেকোনো অসংযত আচরণ বা প্রান্তিক ও অপরিশীলিত বক্তব্য অনিবার্যভাবেই তাদের মধ্যে আমাদের প্রতি এক ধরনের উপেক্ষা ও অনাস্থা সৃষ্টি করবে—এ কথা বলার অপেক্ষা রাখে না।

তাই আমাদের কথা ও আচরণে আরও বেশি সতর্কতা, সংযম ও প্রজ্ঞা দরকার। আমাদের কোনো বক্তব্য বা কাজের মাধ্যমে ইসলামের মহত্তম আদর্শ সম্পর্কে তাদের মনে যেন কোনো বিভ্রান্তি না সৃষ্টি হয়—সে ব্যাপারে সজাগ থাকতে হবে।

নতুন প্রজন্ম যেন ইসলামের প্রতি বিরূপভাবাপন্ন না হয়ে ওঠে—

এই দায় আমাদের সবার।

আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সবাইকে সঠিক সমঝ ও প্রজ্ঞা দান করুন। আমীন।