আমরা কি সত্যিই সমালোচনা করতে শিখেছি—নাকি কেবল আঘাত করতে শিখেছি?
আজকের সময়ে মতভিন্নতা যেন আর চিন্তার বৈচিত্র্য নয়, বরং ব্যক্তিগত আক্রমণের একটি সহজ উপলক্ষ।
অথচ সমালোচনারও রয়েছে একটি সৌন্দর্য, একটি আদব—যা হারিয়ে গেলে জ্ঞানচর্চা রূপ নেয় বিদ্বেষের ময়দানে।
আমাদের সকলের মনে রাখা উচিত যে,
সমালোচনারও একটি শিল্প আছে, একটি মাধুর্য আছে; ভুল ধরারও রয়েছে নির্দিষ্ট নিয়ম। যারা কথা বলেন কিংবা লেখালেখি করেন—তাদের সবার মধ্যেই কমবেশি ভুলত্রুটি থাকাটা স্বাভাবিক।
তাই কারো বক্তব্য বা লেখাকে অযৌক্তিক মনে হলে তার গঠনমূলক ও যৌক্তিক পর্যালোচনা করা—এটি জ্ঞানচর্চার একটি স্বীকৃত ও প্রয়োজনীয় অংশ।
তবে আমাদের এটাও উপলব্ধি করতে হবে যে,
আমাদের কারো কথাই চূড়ান্ত নয়; তেমনি কারো সমালোচনাও চূড়ান্ত নয়। মানুষের দৃষ্টিভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে, উপলব্ধি আলাদা হতে পারে। চিন্তার জগতে থিসিস, অ্যান্টিথিসিস ও সিনথেসিস—এগুলো স্বাভাবিক ও অবশ্যম্ভাবী বাস্তবতা।
সুতরাং কারো কথা বা লেখা আপনার পছন্দ না হলে কিংবা তা ভুল মনে হলে আপনি অবশ্যই সমালোচনা করতে পারেন—যদি আপনি নিজেকে সে কাজের উপযুক্ত মনে করেন।
তবে সেই সমালোচনা হতে হবে চিন্তার; ব্যক্তির নয়। কারণ ব্যক্তিকে আক্রমণ করা কখনোই জ্ঞানচর্চার অংশ নয়; বরং তা নৈতিক অবক্ষয়ের পরিচায়ক।
সমালোচনার ভাষা এমন হওয়া উচিত,
যাতে কারো ইজ্জত-আব্রু ক্ষুণ্ন না হয়। সেখানে থাকতে হবে সম্মান, দরদ ও ভালোবাসা। শব্দচয়ন ও উপস্থাপনায় থাকতে হবে শীতলতা ও সৌজন্য। যেন পাঠক বা শ্রোতা অনুভব করতে পারে—এ সমালোচনার পেছনে রয়েছে একাডেমিক বোঝাপড়া এবং উম্মাহর কল্যাণচিন্তার আন্তরিক আকুতি।
যে সমালোচনায় দরদ নেই, ভালোবাসা নেই, সংশোধনের ব্যথা নেই—তা প্রকৃতপক্ষে সমালোচনা নয়; তা হয় বিদ্বেষ, নয়তো হিংসার বহিঃপ্রকাশ।
কিন্তু দুঃখজনকভাবে, বর্তমান সময়ে আমরা প্রায়ই এর বিপরীত চিত্র দেখি।
অনেকেই সমালোচনার নামে বিদ্বেষ ছড়ান, সুযোগ পেলেই নিজের ভেতরের রাগ-ক্ষোভ উগরে দেন। চিন্তার বিশ্লেষণের পরিবর্তে ব্যক্তিকে আক্রমণ করেন—যা কোনোভাবেই শালীনতা, নৈতিকতা কিংবা শরীয়তের মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয়; বরং এটি সালাফে সালিহীনের পথ থেকেও বিচ্যুতি।
একবার ভেবে দেখুন—যদি আমাদের ভাষা এমন লাগামহীন হয়, যদি সমালোচনা এমন বিদ্বেষপূর্ণ হয়, তবে আমরা কেমন একটি সমাজ ও প্রজন্ম গড়ে তুলছি?
যদি আমরা অন্যের চিন্তাকে নাড়িয়ে দিতে চাই, তার ভাবনার দ্বার খুলে দিতে চাই—তাহলে তা কখনোই বিদ্বেষ দিয়ে সম্ভব নয়। এর জন্য প্রয়োজন দরদ, ভালোবাসা এবং হৃদয়ের গভীর সংশোধন-চেতনা।
আজ আমরা যেভাবে অনলাইন একটিভিজম, বক্তৃতা ও জনসম্মুখের আলোচনায় বিদ্বেষকে স্বাভাবিক করে তুলছি—এভাবে চলতে থাকলে ইসলামের অগ্রযাত্রাকে ব্যাহত করতে বাহ্যিক শত্রুর প্রয়োজন খুব বেশি হবে না; আমরা নিজেরাই নিজেদের জন্য যথেষ্ট হয়ে উঠব।
মহান আল্লাহ আমাদের হৃদয়কে কোমল করুন, দৃষ্টিকে প্রশস্ত করুন এবং আমাদের কথা ও কলমকে হিকমাহ, আদব ও কল্যাণের মাধ্যম বানিয়ে দিন।