পীর-মাশায়িখ ও আলিমদের ঐক্য: ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার বাস্তবতা ও চ্যালেঞ্জ!!

আমাদের কারও কারও ধারণা,

পীর-মাশায়িখ ও উলামায়ে কিরাম ঐক্যবদ্ধ হলেই হয়তো চব্বিশ ঘণ্টার মধ্যে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব!

এ ধারণার পেছনে আলিম সমাজের প্রতি শ্রদ্ধা, তাঁদের নেতৃত্বের ওপর আস্থা এবং ইসলামী আদর্শভিত্তিক রাষ্ট্রব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষা কাজ করতে পারে।

কিন্তু রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার মতো জটিল রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে কেবল ধর্মীয় নেতৃত্বের ঐক্যের ফল হিসেবে বিবেচনা করা বাস্তবতার সরলীকরণ মাত্র।

এ বিষয়ে কয়েকটি পর্যবেক্ষণ প্রাসঙ্গিক।

প্রথমত,

পীর-মাশায়িখ ও উলামায়ে কিরামের ঐক্য সাধারণ মানুষের একটি ব্যাপক প্রত্যাশা। ধর্মপ্রাণ মানুষের একটি বড় অংশ চান, আলিমগণ পারস্পরিক বিরোধ, দলীয় সংকীর্ণতা ও নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা অতিক্রম করে বৃহত্তর দ্বীনি স্বার্থে ঐক্যবদ্ধ হোন।

তাঁদের মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে, কিন্তু সেই মতপার্থক্য যেন পারস্পরিক শত্রুতা, বিদ্বেষ কিংবা স্থায়ী বিভাজনের কারণ না হয়। বরং অভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা এবং মতভিন্নতার ক্ষেত্রে পারস্পরিক শ্রদ্ধা ও সহনশীলতার সংস্কৃতি গড়ে উঠুক। এই প্রত্যাশা নিঃসন্দেহে যৌক্তিক ও ইতিবাচক।

দ্বিতীয়ত,

আলিমদের ঐক্য তাঁদের সামাজিক ও রাজনৈতিক প্রভাব বৃদ্ধিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তাঁরা সমন্বিতভাবে কাজ করতে পারলে ধর্মীয় শিক্ষা, নৈতিকতা, সামাজিক ন্যায়বিচার, জনকল্যাণ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধসংশ্লিষ্ট বিভিন্ন বিষয়ে তাঁদের বক্তব্য ও দাবি অধিক কার্যকরভাবে উপস্থাপন করতে পারবেন। রাজনৈতিক দল ও রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকদের ওপরও তাঁদের প্রভাব বাড়তে পারে। এমনকি অভিন্ন স্বার্থসংশ্লিষ্ট অনেক দাবি আদায় এবং জননীতি প্রণয়নে ভূমিকা রাখার সুযোগ সৃষ্টি হতে পারে।

তবে রাজনৈতিক প্রভাব বিস্তার, নির্বাচনে বিজয় অর্জন এবং রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা কার্যকরভাবে পরিচালনা—তিনটি পৃথক বিষয়।

প্রথমটির জন্য ঐক্য গুরুত্বপূর্ণ হলেও পরবর্তী দুটি অর্জনে আরও অনেক শর্ত পূরণ করতে হয়।

তৃতীয়ত,

বর্তমান পরিস্থিতিতে পীর-মাশায়িখ ও আলিম সমাজের সর্বাত্মক ঐক্যের সম্ভাবনা অত্যন্ত ক্ষীণ বলেই প্রতীয়মান হয়। আলিমে আলিমে, শাইখে শাইখে, পীরে পীরে এবং দল ও উপদলে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য, পারস্পরিক অবিশ্বাস, নেতৃত্বের প্রতিযোগিতা ও সাংগঠনিক বিরোধ বিদ্যমান। এসব বিরোধের সবই যে অমূলক, তা নয়; কিছু বিরোধের পেছনে প্রকৃত ইলমি, ফিকহি ও আদর্শিক প্রশ্নও রয়েছে।

কিন্তু মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও অভিন্ন স্বার্থে সহযোগিতা করার যে মানসিকতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কৃতি প্রয়োজন, তা যথেষ্ট বিকশিত হয়নি। এ অবস্থায় অদূর ভবিষ্যতে সকল পীর-মাশায়িখ ও আলিমের পূর্ণাঙ্গ ঐক্য প্রতিষ্ঠার আশা করা কঠিন।

এ কারণেই রঙ্গ-রস করে বলা হয়, আলিমগণ অন্তত এ বিষয়ে একমত যে, তাঁরা কখনো ঐক্যবদ্ধ হবেন না! কথাটি অতিরঞ্জিত হলেও এর মধ্যে বিদ্যমান বিভাজন নিয়ে জনমনে জমে থাকা হতাশার প্রতিফলন রয়েছে।

তবে এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করা প্রয়োজন: সর্বাত্মক ঐক্য সম্ভব না হলেও অভিন্ন স্বার্থে কার্যকর সহযোগিতা অসম্ভব নয়। সব মতপার্থক্য দূর হওয়ার অপেক্ষায় না থেকে যেসব বিষয়ে ঐকমত্য রয়েছে, সেগুলোকে কেন্দ্র করে যৌথ উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। ব্যক্তিগত বা দলীয় পরিচয় অক্ষুণ্ণ রেখেও পারস্পরিক সহযোগিতা সম্ভব। বাস্তবসম্মত ঐক্যের সূচনা হতে পারে এভাবেই।

চতুর্থত,

ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা আর নির্বাচনী আস্থা এক বিষয় নয়। বাংলাদেশের বিপুলসংখ্যক মানুষ আলিমদের শ্রদ্ধা করেন, তাঁদের ধর্মীয় বক্তব্য শোনেন এবং ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে তাঁদের পরামর্শ গ্রহণ করেন।

কিন্তু এই শ্রদ্ধা স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাঁদের রাজনৈতিক নেতৃত্বের প্রতি আস্থা কিংবা নির্বাচনে ভোট প্রদানে রূপান্তরিত হয় না। ধর্মীয় বিষয়ে কাউকে গ্রহণযোগ্য মনে করা এবং রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব তাঁর হাতে অর্পণ করতে প্রস্তুত হওয়া সম্পূর্ণ ভিন্ন ধরনের মূল্যায়ন। ভোটাররা আদর্শ ও ধর্মীয় পরিচয়ের পাশাপাশি নেতৃত্বের যোগ্যতা, সততা, প্রশাসনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক পরিকল্পনা, জননিরাপত্তা, কর্মসংস্থান এবং সামগ্রিক রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতাও বিবেচনা করেন।

অতএব,

আলিমদের প্রতি মানুষের শ্রদ্ধাকে সরাসরি তাঁদের রাজনৈতিক সমর্থন হিসেবে গণ্য করা ঠিক হবে না। বরং অনুসন্ধান করা প্রয়োজন, ধর্মীয় গ্রহণযোগ্যতা কেন সব ক্ষেত্রে নির্বাচনী আস্থায় রূপান্তরিত হচ্ছে না এবং এ ব্যবধান দূর করতে কী ধরনের রাজনৈতিক, সাংগঠনিক ও সামাজিক উদ্যোগ প্রয়োজন।

পঞ্চমত,

জনগণের সঙ্গে ধর্মীয় নেতৃত্বের কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্পৃক্ততা আরও বিস্তৃত করা প্রয়োজন। মসজিদ, মাদরাসা, ওয়াজ-মাহফিল ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে আলিমদের সঙ্গে সমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশের যোগাযোগ রয়েছে।

কিন্তু আধুনিক রাজনৈতিক বাস্তবতায় জনসম্পৃক্ততার অর্থ শুধু ধর্মীয় যোগাযোগ নয়। দরিদ্র জনগোষ্ঠীর সমস্যা সমাধান, শিক্ষা ও স্বাস্থ্যসেবায় অবদান, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, দুর্যোগ মোকাবিলা, স্থানীয় উন্নয়ন, নাগরিক অধিকার রক্ষা এবং নারী ও তরুণদের ভবিষ্যৎ নিয়ে বাস্তবসম্মত উদ্যোগও গুরুত্বপূর্ণ।

আলিম সমাজের বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান এসব ক্ষেত্রে অবদান রাখলেও সেই প্রচেষ্টাগুলোকে আরও সমন্বিত, বিস্তৃত, প্রাতিষ্ঠানিক ও দৃশ্যমান করা প্রয়োজন। জনজীবনের বাস্তব সমস্যা সমাধানে ধারাবাহিক ভূমিকা রাখতে পারলে ধর্মীয় নেতৃত্বের প্রতি মানুষের আস্থা আরও গভীর হতে পারে।

মানুষ শুধু আদর্শের ঘোষণা শুনতে চায় না; সেই আদর্শ তার জীবন, জীবিকা, অধিকার ও নিরাপত্তার ক্ষেত্রে কী ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে পারে, সেটিও দেখতে চায়।

ষষ্ঠত,

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার ধারণাকে সুনির্দিষ্ট রাজনৈতিক, সাংবিধানিক ও নীতিগত কাঠামোয় উপস্থাপন করা জরুরি। ‘ইসলামী রাষ্ট্র’ বলতে ঠিক কী বোঝানো হচ্ছে, আইন প্রণয়নের নীতি কী হবে, শূরা বা পরামর্শের ভূমিকা কী হবে, শাসকের জবাবদিহি কীভাবে নিশ্চিত করা হবে, বিচার বিভাগের স্বাধীনতা কীভাবে রক্ষা করা হবে এবং নাগরিকদের অধিকার ও ধর্মীয় স্বাধীনতা কীভাবে সুরক্ষিত থাকবে—এসব প্রশ্নের সুস্পষ্ট উত্তর প্রয়োজন। অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কর্মসংস্থান, দুর্নীতি নিয়ন্ত্রণ, প্রশাসনিক সংস্কার ও সামাজিক নিরাপত্তা নিয়েও বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা থাকা দরকার।

ইসলামী আদর্শের প্রতি সাধারণ অঙ্গীকার থাকলেও এসব বিষয়ে বিভিন্ন আলিম ও ইসলামপন্থী রাজনৈতিক গোষ্ঠীর মধ্যে মতপার্থক্য থাকতে পারে। তাই কেবল একটি অভিন্ন স্লোগানের ভিত্তিতে ঐক্যবদ্ধ হওয়া যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নীতিগত সমঝোতা, অগ্রাধিকারের নির্ধারণ এবং বাস্তবায়নযোগ্য কর্মসূচির ওপর ঐকমত্য। রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব গ্রহণের আগে এসব প্রশ্নের উত্তর প্রস্তুত করা রাজনৈতিক পরিপক্বতারই পরিচায়ক।

সপ্তমত,

রাষ্ট্রীয় ক্ষমতা অর্জন ও কার্যকর রাষ্ট্র পরিচালনার মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ পার্থক্য রয়েছে। নির্বাচনে জয়লাভ করলেই রাষ্ট্রের সব প্রতিষ্ঠান ও ক্ষমতাকাঠামোর ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠিত হয় না। প্রশাসন, আমলাতন্ত্র, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী প্রতিষ্ঠান, বিচারব্যবস্থা, নিরাপত্তা কাঠামো, অর্থনৈতিক স্বার্থগোষ্ঠী এবং নীতিনির্ধারণে প্রভাবশালী বিভিন্ন মহলের ভূমিকা রাষ্ট্র পরিচালনায় গুরুত্বপূর্ণ। রাজনৈতিক আলোচনায় এসব অনানুষ্ঠানিক ক্ষমতাকেন্দ্রকে কখনো কখনো ‘ডিপ স্টেট’ ধারণার মাধ্যমে ব্যাখ্যা করা হয়। তবে প্রতিটি রাজনৈতিক বাধা বা রাষ্ট্রীয় মতপার্থক্যকে ডিপ স্টেটের কার্যক্রম বলে ব্যাখ্যা করা যথার্থ নয়।

মূল বিষয় হলো,

রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যপ্রণালি, ক্ষমতার ভারসাম্য, সাংবিধানিক সীমাবদ্ধতা এবং প্রশাসনিক বাস্তবতা সম্পর্কে পর্যাপ্ত জ্ঞান ও প্রস্তুতি থাকা প্রয়োজন। রাষ্ট্র পরিচালনার জন্য দক্ষ জনবল, নীতিগত অভিজ্ঞতা, প্রশাসনিক পরিকল্পনা এবং বিদ্যমান প্রতিষ্ঠানগুলোকে আইনসম্মত ও কার্যকরভাবে পরিচালনার সক্ষমতা অপরিহার্য। ধর্মীয় নেতৃত্বের ঐক্য এসব প্রস্তুতির বিকল্প হতে পারে না।

অষ্টমত,

আন্তর্জাতিক রাজনীতি ও ভূরাজনৈতিক বাস্তবতাও উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। বর্তমান বিশ্বে কোনো রাষ্ট্রের রাজনৈতিক গতিপথ কেবল অভ্যন্তরীণ জনসমর্থনের দ্বারা নির্ধারিত হয় না। প্রতিবেশী রাষ্ট্রগুলোর স্বার্থ, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বৈদেশিক বিনিয়োগ, ঋণ, কূটনৈতিক সম্পর্ক এবং বৃহৎ শক্তিগুলোর নীতিও রাষ্ট্র পরিচালনার পরিবেশকে প্রভাবিত করে। ইসলামপন্থী রাজনৈতিক শক্তিগুলোর কোনো কোনো অবস্থান আন্তর্জাতিক মহলে সংশয় বা বিরোধিতার মুখোমুখি হতে পারে; আবার বিভিন্ন দেশের সঙ্গে পারস্পরিক স্বার্থের ভিত্তিতে সহযোগিতার সুযোগও তৈরি হতে পারে।

অতএব,

বৈদেশিক চাপ মোকাবিলা ও জাতীয় স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য প্রয়োজন বাস্তবসম্মত কূটনীতি, আন্তর্জাতিক পরিস্থিতি সম্পর্কে জ্ঞান, দক্ষ নেতৃত্ব এবং সুসংহত পররাষ্ট্রনীতি। আদর্শিক অবস্থান গুরুত্বপূর্ণ হলেও তার সঙ্গে আন্তর্জাতিক বাস্তবতার কার্যকর সমন্বয় ঘটাতে হয়। এ ক্ষেত্রেও কেবল আলিমদের ঐক্য যথেষ্ট নয়।

নবমত,

রাষ্ট্রক্ষমতায় যাওয়ার জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী অর্থনৈতিক, সাংগঠনিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি। একটি রাজনৈতিক শক্তিকে শুধু আদর্শ প্রচার, ধর্মীয় আবেগ কিংবা জনসমাবেশের ওপর নির্ভর করলে চলে না। প্রয়োজন দেশব্যাপী সংগঠন, প্রশিক্ষিত জনবল, নেতৃত্ব তৈরির কার্যকর ব্যবস্থা, গবেষণা ও নীতিনির্ধারণী প্রতিষ্ঠান, স্বচ্ছ অর্থায়ন, আধুনিক যোগাযোগব্যবস্থা এবং অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, কৃষি, শিল্প, প্রযুক্তি ও কর্মসংস্থান বিষয়ে বাস্তবসম্মত কর্মপরিকল্পনা।

বিশেষত রাষ্ট্রীয় বাজেট, রাজস্বব্যবস্থা, ব্যাংকিং, বৈদেশিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ, দারিদ্র্য বিমোচন ও সামাজিক নিরাপত্তার মতো জটিল বিষয়ে সুস্পষ্ট নীতিগত অবস্থান প্রয়োজন।

এসব ক্ষেত্রে পর্যাপ্ত প্রস্তুতি ছাড়া রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জিত হলেও কার্যকর, স্থিতিশীল ও জনকল্যাণমুখী শাসন প্রতিষ্ঠা কঠিন হতে পারে। তাই ক্ষমতায় যাওয়ার আকাঙ্ক্ষার পাশাপাশি ক্ষমতা পরিচালনার যোগ্যতা অর্জনেও সমান গুরুত্ব দেওয়া জরুরি।

দশমত,

বৃহত্তর রাজনৈতিক ও সামাজিক জোট গঠন ছাড়া জাতীয় পর্যায়ে ব্যাপক গ্রহণযোগ্যতা অর্জন কঠিন। আধুনিক রাষ্ট্রে কোনো রাজনৈতিক শক্তির পক্ষে কেবল একটি ধর্মীয় বা আদর্শিক গোষ্ঠীর সমর্থনের ওপর নির্ভর করে দীর্ঘমেয়াদি জাতীয় ঐকমত্য গড়ে তোলা সহজ নয়। শ্রমজীবী মানুষ, কৃষক, পেশাজীবী, ব্যবসায়ী, শিক্ষক, শিক্ষার্থী, নারী, তরুণ এবং বিভিন্ন জাতিগত ও ধর্মীয় সম্প্রদায়ের বৈধ অধিকার ও স্বার্থ বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন।

বাংলাদেশের মতো বহুমাত্রিক সমাজে একটি রাজনৈতিক কর্মসূচির গ্রহণযোগ্যতা নির্ভর করে তার ন্যায়বিচার, আইনের শাসন, নাগরিক অধিকার, নিরাপত্তা, অর্থনৈতিক সম্ভাবনা ও জনকল্যাণ নিশ্চিত করার সক্ষমতার ওপর। তাই ইসলামী রাষ্ট্রব্যবস্থার ধারণাকে বাস্তব রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দিতে হলে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর উদ্বেগ, প্রত্যাশা ও যুক্তিসংগত প্রশ্নগুলোর উত্তর দিতে হবে। শুধু নিজস্ব সমর্থকগোষ্ঠীর মধ্যে জনপ্রিয় হওয়া আর জাতীয় পর্যায়ে গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক বিকল্প হয়ে ওঠা এক বিষয় নয়।

একাদশত,

মতপার্থক্যপূর্ণ আলিম ও ইসলামপন্থী দলগুলোর মধ্যে সহযোগিতার বাস্তবসম্মত কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। সর্বাত্মক ঐক্যের শর্ত আরোপ করলে মতপার্থক্যের কারণে সহযোগিতার সম্ভাবনাও নষ্ট হতে পারে। বরং কোন কোন বিষয়ে ঐকমত্য সম্ভব, কোন বিষয়ে মতপার্থক্য বহাল থাকবে এবং কোন পদ্ধতিতে বিরোধ নিষ্পত্তি করা হবে—এসব নির্ধারণ করা যেতে পারে। একটি যৌথ পরামর্শ পরিষদ, নিয়মিত সংলাপ, পারস্পরিক বিরোধ এড়িয়ে চলার নীতিমালা এবং অভিন্ন জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট বিষয়ে সমন্বিত কর্মসূচি এ ক্ষেত্রে সহায়ক হতে পারে।

এমন সহযোগিতার লক্ষ্য হওয়া উচিত কাউকে অন্যের অধীনস্থ করা কিংবা সব মতপার্থক্য মুছে ফেলা নয়; বরং পারস্পরিক স্বাতন্ত্র্য বজায় রেখেই অভিন্ন লক্ষ্য অর্জনে একযোগে কাজ করা। এই প্রক্রিয়ায় ব্যক্তিকেন্দ্রিক নেতৃত্বের পরিবর্তে নীতিনির্ভর ও প্রাতিষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত গ্রহণের সংস্কৃতি গড়ে তোলাও গুরুত্বপূর্ণ।

দ্বাদশত,

রাজনৈতিক সাফল্যের পাশাপাশি নৈতিক নেতৃত্ব ও জবাবদিহির প্রশ্নটিও সমান গুরুত্বপূর্ণ। ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার দাবি উত্থাপনকারী নেতৃত্বের কাছ থেকে সাধারণ মানুষ সততা, আমানতদারি, ন্যায়বিচার, সহনশীলতা ও আত্মসমালোচনার প্রত্যাশা করেন।

নিজেদের অভ্যন্তরীণ বিরোধ নিষ্পত্তিতে ন্যায়সংগত পদ্ধতি অনুসরণ, আর্থিক স্বচ্ছতা বজায় রাখা, নেতৃত্বের জবাবদিহি নিশ্চিত করা এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের প্রতি দায়িত্বশীল আচরণ করা—এসব বিষয়ও রাজনৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতার অংশ। যে নৈতিক মূল্যবোধ রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে প্রতিষ্ঠার কথা বলা হয়, তার প্রতিফলন নেতৃত্বের নিজস্ব আচরণ ও সংগঠন পরিচালনার মধ্যেও থাকা প্রয়োজন।

সারকথা,

পীর-মাশায়িখ ও উলামায়ে কিরামের ঐক্য নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ এবং কাম্য। কিন্তু সেই ঐক্যকে ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার একমাত্র কিংবা স্বয়ংসম্পূর্ণ শর্ত মনে করা বাস্তবসম্মত নয়।

ঐক্য রাজনৈতিক শক্তি বৃদ্ধির একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান, রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার নিশ্চয়তা নয়। রাষ্ট্রক্ষমতা অর্জন এবং তা জনকল্যাণমুখীভাবে পরিচালনার জন্য প্রয়োজন ব্যাপক জনসমর্থন, নির্বাচনী আস্থা, কার্যকর জনসম্পৃক্ততা, গ্রহণযোগ্য রাজনৈতিক কর্মসূচি, সাংগঠনিক দক্ষতা, অর্থনৈতিক প্রস্তুতি, প্রশাসনিক সক্ষমতা, সাংবিধানিক চিন্তা এবং বাস্তবসম্মত দেশি-বিদেশি কৌশলের সমন্বয়।

অতএব,

প্রশ্নটি শুধু এই নয় যে, পীর-মাশায়িখ ও আলিমগণ কখন ঐক্যবদ্ধ হবেন; বরং আরও গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো—তাঁদের মধ্যে ঐক্য প্রতিষ্ঠিত হলে সেই ঐক্যকে কীভাবে জনকল্যাণ, রাজনৈতিক আস্থা, প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং বাস্তবসম্মত রাষ্ট্রীয় কর্মসূচিতে রূপান্তর করা হবে? আর সেই ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অভিন্ন বিষয়ে সহযোগিতা, জনসম্পৃক্ততা বৃদ্ধি ও রাজনৈতিক প্রস্তুতি এগিয়ে নেওয়ার বিকল্প পথ কী হতে পারে?

আলিমদের ঐক্য অবশ্যই প্রয়োজন; কিন্তু ঐক্যের চেয়েও বড় প্রশ্ন হলো, সেই ঐক্যকে কার্যকর রাজনৈতিক শক্তি ও জনকল্যাণমুখী রাষ্ট্র পরিচালনার সক্ষমতায় রূপান্তর করার প্রস্তুতি কতটুকু রয়েছে।

ইসলামী রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার আকাঙ্ক্ষাকে বাস্তবসম্মত রাজনৈতিক কর্মসূচিতে রূপ দিতে হলে এই প্রশ্নগুলোর মুখোমুখি হওয়া অপরিহার্য।