আমরা যারা সুন্দর করে ওয়াজ করতে পারি, কিছুটা ভালো পড়াতে পারি, সামান্য লেখালেখি করতে পারি, দু/চারটি বই বা কিতাব লিখি, কিংবা নিয়মিত কিছু রিয়াজত-মুজাহাদা করি—
আমাদের ঘিরে সমাজে কিছু স্তাবক, ভক্ত ও ফ্যান-ফলোয়ার তৈরি হয়।
এতে আপাতত আপত্তির কিছু নেই। সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন তাঁরা আমাদের প্রকৃত যোগ্যতার চেয়ে অনেক বড় পরিচয়ে পরিচিত করতে শুরু করেন।
কাউকে বানিয়ে দেন ‘আল্লামা’, কাউকে ‘আন্তর্জাতিক লেখক, গবেষক ও চিন্তাবিদ’, কাউকে ‘শাইখুল হাদীস’ বা ‘শাইখুল ইসলাম’, অথবা 'যুগশ্রেষ্ঠ আলিম-মুহাদ্দিস-ফকীহ, কাউকে ‘মুজাদ্দিদে জমান’, কাউকে ‘মুফতিয়ে আজম’, 'ফকীহুল মিল্লাত', কাউকে ‘আরিফবিল্লাহ’, ‘কুতুবে জমান’ কিংবা ‘মুফাসসিরে কুরআন’; কেউ আবার হয়ে যান ‘আন্তর্জাতিক স্কলার’,...!
আরও বিপজ্জনক হলো—
এই বিশেষণগুলো যখন কেবল ফ্যান-ফলোয়ারদের মুখে উচ্চারিত থাকে না, ধীরে ধীরে আমাদের নিজেদের বিশ্বাসেরও অংশ হয়ে যায়।
গতকাল যে প্রশংসা শুনে আমরা সংকোচ বোধ করতাম, আজ সেটিকেই নিজের পরিচয় বলে ভাবতে শুরু করি।
এভাবে ক্রমে আত্মসমালোচনার জায়গা দখল করে নেয় আত্মতুষ্টি; বিনয়ের জায়গায় আসে আত্মম্ভরিতা; আর প্রকৃত যোগ্যতা যাচাইয়ের পরিবর্তে প্রশংসার প্রতিধ্বনিতেই আমরা নিজের মর্যাদা পরিমাপ করতে থাকি।
এরপর পরিবর্তন আসে আচরণেও—কথাবার্তায়, চলাফেরায়, পোশাকে, উপস্থিতির ধরনে, এমনকি মানুষের সঙ্গে দূরত্ব রাখার ভঙ্গিতেও।
মানুষটি হয়তো আগের মতোই আছেন; কিন্তু তাঁকে ঘিরে নির্মিত ‘মহত্ত্বের আবহ’ ধীরে ধীরে তাঁকেই বিশ্বাস করিয়ে দেয় যে, তিনি সত্যিই সেই মহান উচ্চতায় পৌঁছে গেছেন।
এখানেই স্তাবকের প্রশংসা অনেক সময় উপকারের পরিবর্তে ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়ায়।
শত্রুর সমালোচনা মানুষ সহজেই উপেক্ষা করতে পারে; কিন্তু আপনজনের অতিরঞ্জিত প্রশংসা অনেক সময় আত্মপ্রবঞ্চনাকে বৈধতা দেয়।
যে মানুষটি আমাদের ভুল ধরিয়ে দিতে পারত, তাকে আমরা ধীরে ধীরে দূরে সরিয়ে দিই; আর যারা প্রতিটি কথায় প্রশংসার মালা পরিয়ে দেয়, তাদের সান্নিধ্যেই স্বস্তি খুঁজি।
ফলে একসময় আশপাশের মানুষ আমাদের সম্পর্কে যে ‘বড় মানুষটির’ ধারণা তৈরি করেছে, আমরা নিজেরাই তার বন্দী হয়ে যাই।
তখন প্রশ্নটি আর থাকে না—‘আমি আসলে কতটুকু জানি, কতটুকু বুঝি এবং কতটুকু আমল করি?’ বরং প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ায়—‘মানুষ আমাকে কী নামে ডাকে?’ 'কী লকবে ভূষিত করে?'
সম্ভবত এ কারণেই অতিরিক্ত প্রশংসা কখনো কখনো অপমানের চেয়েও বিপজ্জনক।
অপমান মানুষকে আত্মসমীক্ষায় বাধ্য করতে পারে; কিন্তু অযাচিত প্রশংসা মানুষকে এমন এক আয়না দেখাতে পারে, যেখানে তার বাস্তব চেহারার চেয়ে অনেক বড় একটি প্রতিচ্ছবি দেখা যায়।
আর সবচেয়ে বড় বিপদ হলো—একসময় মানুষ সেই প্রতিচ্ছবিকেই নিজের প্রকৃত চেহারা মনে করতে শুরু করে।
তখন আর আয়নাটি তাকে তার চেহারা দেখায় না; বরং তাকে তার নিজের সম্পর্কে একটি বানানো গল্প দেখায়—আর সে গল্পের সবচেয়ে বড় বিশ্বাসী হয়ে ওঠে মানুষটি নিজেই।