জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমের সম্মানিত খতীব বাংলাদেশের বিজ্ঞ আলিমদের অন্যতম। যতটুকু জানি, হাদীস ও ফিকহে তাঁর যথেষ্ট ব্যুৎপত্তি রয়েছে। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে আমার পরিচয় বা সাক্ষাতের সুযোগ হয়নি; তবে তাঁর রচিত কয়েকটি বই পড়ার সুযোগ হয়েছে এবং সেগুলো থেকে উপকৃতও হয়েছি। তাঁর ইলম, সরলতা ও অনাড়ম্বর জীবনযাপনের কারণে তাঁর প্রতি আমার গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা রয়েছে।
সম্প্রতি তাঁর একটি বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পক্ষে-বিপক্ষে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা চলছে। তাঁর বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া বা না হওয়া—উভয়ই স্বাভাবিক।
প্রত্যেক মানুষেরই নিজস্ব জ্ঞান, চিন্তা, উপলব্ধি ও দৃষ্টিভঙ্গি থেকে মত প্রকাশের ও কথা বলার অধিকার রয়েছে। সেই অধিকার ও নিজস্ব দৃষ্টিভঙ্গির ভিত্তিতেই তিনি তাঁর কথাগুলো উপস্থাপন করেছেন।
একইভাবে, কোনো বক্তব্যের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করা এবং তার যুক্তি, তথ্য, পদ্ধতি কিংবা উপস্থাপনার সমালোচনা করাও অন্যদের স্বাভাবিক অধিকার। বরং কোনো ব্যক্তির বক্তব্যকে অন্ধভাবে ও চোখ বুজে গ্রহণ করা জ্ঞানচর্চার মৌলিক চেতনার সঙ্গেই অসঙ্গতিপূর্ণ।
অতএব,
খতীব সাহেবের বক্তব্যের কোনো অংশ কারও কাছে অযৌক্তিক, অসম্পূর্ণ বা অপ্রামাণ্য মনে হলে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা কিংবা তার যুক্তি ও উপস্থাপনার যৌক্তিক সমালোচনা করাকে আমরা অস্বাভাবিক মনে করি না; বরং দায়িত্বশীল ও গঠনমূলক জ্ঞানচর্চার স্বাভাবিক অংশ হিসেবেই দেখি।
তবে সমালোচনা ও অসম্মানকে এক করে দেখা উচিত নয়। কোনো বক্তব্যের যুক্তিগত দুর্বলতা, তথ্যগত অসংগতি কিংবা দৃষ্টিভঙ্গির সীমাবদ্ধতা চিহ্নিত করা বুদ্ধিবৃত্তিক সমালোচনা; কিন্তু বক্তার ইলম, ব্যক্তিত্ব, বয়স, আকৃতি-প্রকৃতি কিংবা মর্যাদাকে আক্রমণ করা সমালোচনার সীমা অতিক্রম করে।
সাম্প্রতিক প্রতিক্রিয়াগুলোর মধ্যে উভয় পক্ষেরই কিছু ভাষা ও আচরণ কমবেশি এ সীমারেখা অতিক্রম করেছে, যা কোনোভাবেই ভালো দেখাচ্ছে না। দুঃখজনক হলো, আলিমসমাজের পারস্পরিক মতপার্থক্য যখন খিস্তিখেউড় ও আক্রমণাত্মক বাক্যবিনিময়ে রূপ নেয়, তখন সাধারণ মানুষ সেটিকে গঠনমূলক বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক হিসেবে না দেখে অনেক সময় নিছক উপভোগের বিষয় হিসেবে গ্রহণ করে।
এতে শুধু সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মর্যাদাই ক্ষুণ্ন হয় না; সামগ্রিকভাবে আলিমসমাজের প্রতি সাধারণ মানুষের শ্রদ্ধাবোধেও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে। তাই মতপার্থক্য যত তীব্রই হোক, বিশেষত বয়োজ্যেষ্ঠ আলিমদের ক্ষেত্রে ভাষায় শালীনতা, আচরণে সৌজন্য এবং মূল্যায়নে ইনসাফ থাকা জরুরি।
বলার অপেক্ষা রাখে না,
কারও প্রতি শ্রদ্ধা থাকার অর্থ তাঁর সব বক্তব্যের সঙ্গে একমত হওয়া নয়। একজন ব্যক্তির ইলম ও অবদানের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা রেখেও তাঁর কোনো নির্দিষ্ট বক্তব্যের কঠোর সমালোচনা করা যায়। আবার কোনো বক্তব্যের সমালোচনা করলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির সামগ্রিক ইলম, ব্যক্তিত্ব ও অবদানকে অস্বীকার করা হয়—তাও নয়। ব্যক্তির মর্যাদা এবং বক্তব্যের মূল্যায়ন—এ দুটিকে পৃথক রাখাই ন্যায়সংগত ও বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে পরিণত আচরণ।
আমিও তাঁর বক্তব্য শুনে আমার একটি পোস্টে যথাযথ শ্রদ্ধা বজায় রেখে কিছু প্রশ্ন ও ব্যক্তিগত মূল্যায়ন তুলে ধরতে চেষ্টা করেছি। আমার আপত্তি মূলত তাঁর বক্তব্যের উপস্থাপনা ও পদ্ধতি নিয়ে; বক্তব্যের মূল বিষয়বস্তু বা আলোচনার অধিকার নিয়ে নয়।
আমার কাছে মনে হয়েছে, তাঁর সমালোচনায় সংশোধন ও কল্যাণকামিতার যে দরদ প্রত্যাশিত ছিল, তার পরিবর্তে কোথাও কোথাও ক্ষোভের আমেজ তুলনামূলকভাবে বেশি প্রকাশ পেয়েছে।
অবশ্য ব্যক্তিভেদে কথা বলার ধরন, ভাষারীতি ও প্রকাশভঙ্গিতে স্বাভাবিক পার্থক্য থাকে; তাই কেবল উপস্থাপনার ধরন দিয়ে কারও অভিপ্রায় সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সমীচীন নয়।
তবে কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের কোনো চিন্তা, বক্তব্য বা কর্মকাণ্ড আপত্তিকর মনে হলে তার সমালোচনা অবশ্যই করা যায়। আর সেই সমালোচনা যত বেশি যুক্তিনির্ভর, সংযত ও কল্যাণকামিতাপূর্ণ হয়, তা তত বেশি গ্রহণযোগ্য ও কার্যকর হওয়ার সম্ভাবনা রাখে।
বিশেষত তিনি যখন ‘ইকামতে দ্বীন’ প্রসঙ্গে কথা বলেছেন, তখন আলোচনাটি আরও গঠনমূলক হতে পারত, যদি জামায়াতে ইসলামীর ‘ইকামতে দ্বীন’ সম্পর্কিত ধারণা ও কর্মপদ্ধতিকে যথাযথভাবে উপস্থাপন করে তার দলীল-প্রমাণভিত্তিক সমালোচনা করা হতো এবং এর বিপরীতে তাঁর নিজের দৃষ্টিভঙ্গিও কুরআন-সুন্নাহ ও প্রাসঙ্গিক গবেষণার আলোকে সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হতো।
এতে আলোচনা ব্যক্তি বা দলকেন্দ্রিক প্রতিক্রিয়ার পরিবর্তে একটি প্রামাণ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক পর্যালোচনার রূপ পেত। আমার কাছে তাঁর সেদিনকার আলোচনায় তেমনটি যথেষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়নি।
এখানে আরেকটি বিষয়ও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন—
সমালোচনার বিষয়বস্তুর পাশাপাশি তার উপস্থাপনাও তার প্রভাব নির্ধারণ করে। একই বক্তব্য যুক্তি, সৌজন্য ও দরদের সঙ্গে উপস্থাপিত হলে মানুষের মধ্যে গ্রহণযোগ্যতা তৈরি করতে পারে; বিপরীতে কঠোর বা ক্ষুব্ধ ভঙ্গি কখনো যথার্থ বক্তব্যকেও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখে ফেলতে পারে।
আমার ধারণা, খতীব সাহেবের বক্তব্যকে কেন্দ্র করে সৃষ্ট বিরূপ প্রতিক্রিয়ার একটি কারণ তাঁর বক্তব্যের বিষয়বস্তুর পাশাপাশি এর উপস্থাপনাও।
তবে এ সীমাবদ্ধতা শুধু তাঁর একার নয়; আমরা যারা নিয়মিত জনসমক্ষে কথা বলি না, তাঁদের অনেকের মধ্যেই এ দুর্বলতা কমবেশি রয়েছে। অনেক সময় আমাদের মনে একটি বিষয় অত্যন্ত সুস্পষ্ট ও গোছানোভাবে থাকে, কিন্তু সেটিকে শ্রোতার কাছে একইভাবে সুবিন্যস্ত, সাবলীল ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় উপস্থাপন করা সম্ভব হয় না।
সুন্দর ও প্রভাবশালী বয়ানও আল্লাহপ্রদত্ত একটি বিশেষ নিয়ামত। কারও ইলম গভীর হতে পারে, গবেষণায় তিনি পারদর্শী হতে পারেন; কিন্তু জনসমক্ষে সেই ইলমকে সহজ, সাবলীল, সংযত ও হৃদয়গ্রাহী ভাষায় উপস্থাপনের সক্ষমতা তাঁর তুলনামূলকভাবে কম হতে পারে।
তাই ইলমের গভীরতা এবং বয়ানের দক্ষতা—দুটিকে একই বিষয় হিসেবে দেখা ঠিক নয়। বক্তব্যের উপস্থাপনায় দুর্বলতা থাকলে সেটিকে কোনো আলিমের ইলম বা সামগ্রিক যোগ্যতার মানদণ্ডে পরিণত করাও সমীচীন নয়।
তাঁর ব্যক্তিত্ব ও দায়িত্বের প্রেক্ষাপটও এখানে বিবেচনাযোগ্য। আমার পর্যবেক্ষণে তিনি মূলত একজন অধ্যবসায়ী, জ্ঞানসন্ধানী ও গবেষণামনস্ক আলিম। দারস-তাদরীস, তা‘লীম-তরবিয়াহ, অধ্যয়ন ও লেখালেখিই তাঁর স্বাভাবিক কর্মপরিসর। দীর্ঘদিন জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষাদানের পরিবেশে নিবিষ্ট একজন সাদাসিধে মানুষের কাছে রাজনীতির কূটকৌশল, প্রশাসনিক সমীকরণ কিংবা প্রাতিষ্ঠানিক জটিলতা মোকাবিলায় সমান দক্ষতা প্রত্যাশা করা সবসময় বাস্তবসম্মত নাও হতে পারে।
কারণ জ্ঞানচর্চা ও শিক্ষাদানের দক্ষতা এবং রাজনৈতিক-প্রশাসনিক বাস্তবতা মোকাবিলার কৌশলগত দক্ষতা—দুটি সম্পূর্ণ অভিন্ন বিষয় নয়। একজন ব্যক্তি উভয় ক্ষেত্রে সমান দক্ষ হবেন—এমন মানুষের সংখ্যাও সমাজে খুব বেশি নয়।
অন্যদিকে, জাতীয় মসজিদ বায়তুল মুকাররমের খতীবের দায়িত্বও অন্যান্য মসজিদের খতীবের দায়িত্বের সঙ্গে পুরোপুরি তুলনীয় নয়। এ দায়িত্ব স্বাভাবিকভাবেই বহুমাত্রিক। এটি কেবল ধর্মীয় নেতৃত্বের দায়িত্ব নয়; এর সঙ্গে সামাজিক, রাজনৈতিক, প্রাতিষ্ঠানিক এবং নানা সংবেদনশীল বাস্তবতাও জড়িয়ে থাকে। দেশের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষেরও তাঁর প্রতি নানা ধরনের প্রত্যাশা থাকে।
ফলে স্বভাবতই সরল, অধ্যয়নমুখী ও জ্ঞানচর্চায় নিবিষ্ট একজন আলিমের জন্য এমন একটি বহুমাত্রিক দায়িত্ব পালন সহজ নয়। এই বাস্তবতা তাঁর কোনো বক্তব্যের ন্যায্য সমালোচনা থেকে আমাদের বিরত রাখবে—এমন নয়; তবে তাঁর বক্তব্য ও ভূমিকা মূল্যায়নের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট দায়িত্বের বহুমাত্রিকতা এবং সামগ্রিক প্রেক্ষাপটটিও বিবেচনায় নেওয়া ন্যায়সংগত।
মোটকথা—খতীব সাহেবের বক্তব্যের যৌক্তিক সমালোচনা অবশ্যই হতে পারে—যদি কারো কাছে তা অযৌক্তিক মনে হয়; তাঁর বক্তব্যের দুর্বলতা, অসংগতি বা সীমাবদ্ধতাও চিহ্নিত করা যেতে পারে। কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে তথ্যনির্ভর, যুক্তিসংগত, গঠনমূলক ও শালীন। মতের অমিল থাকবে, সমালোচনাও থাকবে; কিন্তু মতের অমিল যেন ব্যক্তির প্রতি অসম্মান ও অশ্রদ্ধায় পরিণত না হয়।
বিশেষত আলিমসমাজের পারস্পরিক মতপার্থক্য যেন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের খিস্তিখেউড়ের উপকরণ কিংবা সাধারণ মানুষের বিনোদনের বিষয়ে পরিণত না হয়। আমরা যদি সত্যিই ইলম, হক ও কল্যাণের কথা বলতে চাই, তাহলে আমাদের মতপার্থক্যের মধ্যেও আদব, সৌজন্য ও ইনসাফের সংস্কৃতি ধরে রাখতে হবে।
মতকে কঠোরভাবে সমালোচনা করা যায়—ব্যক্তিকে অসম্মান না করেও। বরং শ্রদ্ধাশীল ভাষায় করা যুক্তিনির্ভর সমালোচনাই সবচেয়ে কার্যকর ও গঠনমূলক সমালোচনা।
৬ অক্টোবর ২০২৬