মি‘আরে হক এটি একটি নতুন পরিভাষা। এ পরিভাষা সম্পর্কে দেওবন্দী এবং জামায়াত ঘরানার আলিমগণের প্রত্যেকের সমঝ আলাদা এবং এ পরিপ্রেক্ষিতে প্রত্যেক ঘরানার কাছে এর ব্যাখ্যাও ভিন্ন ভিন্ন।

আমার অধ্যয়ন মতে-

এ প্রসঙ্গে দেওবন্দী ঘরানার আলিমগণের সমঝ হলো, ‘জামা‘আতে সাহাবা রা. সত্যের মাপকাঠি’। তারা রাসূলুল্লাহ সা.-এর আদর্শের ছাঁচে নিজেদেরকে তৈরি করেছিলেন, আর উম্মতের পরবর্তী সদস্যগণ তাদের আদর্শের ছাঁচে নিজেদের তৈরি করবেন– এই হলো শরীয়তের একান্ত কাম্য।

পক্ষান্তর জামায়াত ঘরানার আলিমগণের সমঝ মতে-

‘মি‘আরে হক-এর অর্থ হলো_ সত্য-মিথ্যা, শুদ্ধ-অশুদ্ধ ও ন্যায়-অন্যায় নির্ণয়ের পরিপূর্ণ ত্রুটিমুক্ত মাপকাঠি। এ সমঝ অনুসারে তারা মনে করেন, কেবল আল্লাহ তা‘আলার কুরআন ও রাসূলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহই হলো সত্য-মিথ্যা, শুদ্ধ-অশুদ্ধ ও ন্যায়-অন্যায় নির্ণয়ের একমাত্র মাপকাঠি এবং সাহাবা কিরাম রা. হলেন এ মাপকাঠিতে সর্বাধিক উত্তীর্ণ আহলে হক।

উল্লেখ্য,

দু পক্ষই এ কথা বিশ্বাস করেন যে, সাহাবা কিরাম রা. মা‘সূম নন। কাজেই তাদের মধ্যে যার কোনো কথা বা কর্ম অথবা চিন্তা বা ইজতিহাদে ভুল বা পাপ সংগঠিত হয়েছে বলে কুরআন এবং হাদীসের বিশুদ্ধ বর্ণনা থেকে জানা যায়_সেই ভুল বা পাপ মেনে চলা উম্মতের কারো জন্য বৈধ নয়। আমার অধ্যয়ন মতে- এ ব্যাপারে দুপক্ষের কারো কোনো দ্বিমত নেই।

অধিকন্তু দুপক্ষের সকলেই এ কথাও মানে এবং বিশ্বাস করে যে, সাহাবীগণ সামগ্রিকভাবে আমাদের আদর্শ, তাদের সর্বসম্মত যে কোনো কর্ম বা মতামত উম্মতের জন্য হুজ্জত এবং তা মেনে চলা একান্ত কাম্য।

তবে যেসব বিষয়ে তাদের মধ্যে মতপার্থক্য রয়েছে, সেসব ক্ষেত্রে অনেক মুজতাহিদ সেই বিষয়গুলো কুরআন ও হাদীসের মি‘আরে যাচাই করতেন। তাদের মধ্যে যার মতটি কুরআন ও হাদীসের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ হতো সেটি গ্রহণ করতেন, অন্যান্য মত ত্যাগ করতেন। আবার অনেক মুজতাহিদ সেই বিষয়ে কারো মত সরাসরি গ্রহণ না করে নিজেই কুরআন ও হাদীসের আলোকে ইজতিহাদ করতেন।

কাজেই একটু গভীর গিয়ে চিন্তা করলে বোঝা যায়, দেওবন্দী ও জামায়াত ঘরানার আলিমগণের মধ্যে এ প্রসঙ্গে মৌলিক কোনো মতপার্থক্য নেই।

তবে মি‘আরে হক পরিভাষা প্রসঙ্গে তাদের দু দলের সমঝ যেহেতু ভিন্ন ভিন্ন, সংজ্ঞাও আলাদা আলাদা, তাই পরিভাষাটির প্রায়োগিক ক্ষেত্র নিয়ে বৈচিত্র্য লক্ষ্য করা যায়:

দেওবন্দী ঘরানার আলিমগণ তাদের সমঝ ও সংজ্ঞা অনুযায়ী ‘সাহাবীগণ মি‘আরে হক’,

পক্ষান্তরে জামায়াত ঘরানার আলিমগণের সমঝ ও সংজ্ঞা অনুযায়ী কেবল কুরআন ও রাসূলুল্লাহ সা.-এর সুন্নাহ-ই হলো মি‘আরে হক আর সাহাবা কিরাম রা. হলেন সেই মি‘আরে উত্তীর্ণ আহলুল হক।

আমার অধ্যয়ন মতে,

দেওবন্দীগণ মি‘আরে হককে যে অর্থে ব্যবহার করেন, সেই অর্থ উক্ত পরিভাষাটির মূল মর্ম বহন করে না; একটি আপেক্ষিক ও ব্যবহারিক মর্ম বহন করে।

এ আপেক্ষিক ও ব্যবহারিক অর্থে সাহাবীগণ যেমন আমাদের জন্য আদর্শ, মি‘আরে হক, তেমনি যুগে যুগে সত্যনিষ্ঠ ও ন্যায়পরায়ণ পূর্বসূরিগণ_যাদের আমল কুরআন ও হাদীসের মানদণ্ডে উত্তীর্ণ তারা_ আপেক্ষিকভাবে সামগ্রিক অর্থে তাদের উত্তরসূরিদের জন্য আদর্শ, মি‘আরে হক।

অনুরূপভাবে আপেক্ষিকতার বিচারে ন্যায়নিষ্ঠ ও পরহেযগার আলিমগণ সাধারণ লোকদের জন্য মি‘আরে হক, আদর্শ। সাধারণ লোকেরা তাদের ছাঁচে নিজেদের তৈরি করবেন, গড়ে তুলবেন- এটি হলো কাম্য।

এ অর্থে দেওবন্দীগণ যদি [তাদের ধারণামতে] বলেন যে, দেওবন্দ ও তাদের আকাবিরগণ এ যুগের মি‘আরে হক, আদর্শ, তবে তা অশুদ্ধ ও দূষণীয় হবে না।

অনুরূপভাবে জামায়াত ঘরানার আলিমগণও যদি ঐ অর্থে সাইয়েদ আবুল আ‘লা মওদূদী রাহ. বা বা অন্য কাউকে মি‘আরে হক বলেন, তবে তাও দোষের হবে না।

তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে পরিভাষাটির এরূপ সাধারণীকরণ বা ব্যাপকীকরণ সমর্থন করছি না।

বলার অপেক্ষা রাখে না,

এ বিষয়টি অত্যন্ত তাত্ত্বিক । নিগূঢ় তত্ত্বজ্ঞানী ব্যতীত সর্বসাধারণের পক্ষে এর গভীরে পৌঁছা, মূল রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব নয়। অধিকন্তু, এর সাথে যেহেতু সাহাবা কিরাম রা.-এর মর্যাদার বিষয়টি জড়িত, তাই এর আলোচনাও অধিকতর স্পর্শকাতর।

সুতরাং এ বিষয়টি সাধারণ্যের দোরগোড়ায় নিয়ে যাওয়া এবং তাদের আলোচনার বিষয়ে পরিণত করা কোনো দলের জন্যই সমীচীন নয়।

কারণ,

এ অবস্থায় খুবসম্ভব সর্বসাধারণ অজ্ঞতাবশত সাহাবা কিরাম রা. সম্পর্কে এমন অযাচিত অনেক মন্তব্যও করে ফেলতে পারে, যা তাদের দীন ও ঈমানের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর হবে। এ জন্য অবশ্যই দু পক্ষকেই আল্লাহ তা‘আলার কাছে জবাবদিহিতার সম্মুখীন হতে হবে।

প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, আদালতে সাহাবা ও মি‘আরে হক দুটি ভিন্ন বিষয়। অনুরূপভাবে মুশাজারাতে সাহাবা রা.-এর ক্ষেত্রে উম্মতের অবস্থান কী হবে তা আর একটি ভিন্ন বিষয়।

এ বিষয়গুলো সম্পর্কে আমার ‘উসূলুল ঈমান 3য় খণ্ডে বিস্তারিত আলোচনা রয়েছে। আশা করি, পাঠকগণ মূল্যবান পরামর্শ দান করবেন।

দু দলের প্রতিই আমার করজোড়ে অনুরোধ,

আপনারা সামাজিক গণমাধ্যমে এ ঝগড়া বন্ধ করুন এবং দীন ও মিল্লতের বৃহত্তর স্বার্থে সমসাময়িক ফিতনা ও চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে কথা বলুন এবং উম্মাহকে সজাগ করুন!!

আল্লাহ তা‘আলা আমাদের সকলকে সঠিক সমঝ দান করুন এবং সর্বপরিস্থিতিতে সত্য ও ন্যায়ের ওপর অটল-অবিচল থাকার তাওফীক দান করুন! আমীন!

هذا ما عندي فإن يك خطأ فمني ومن الشيطان وإن يك صوابا فمن الله.

أخواننا الكرام، فإن قبلتموه فبها ونعمت، وإن لم فلكلٍّ رأيٌ ، والاختلاف لا يفسد للودِّ قضيةً.