সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আমীরে হেফাযত ও বাইতুল মুকাররমের খতীব সংক্রান্ত আলোচনা বারবার নজরে আসছে।

বিষয়গুলো এড়িয়ে চলার চেষ্টা সত্ত্বেও, নিজের দায়িত্ববোধ থেকেই সংক্ষেপে খতীব মহোদয় সম্পর্কে আমার ব্যক্তিগত কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরতে বাধ্য হচ্ছি।

আমীরে হেফাযত প্রসঙ্গে পূর্বে কিছু লিখেছিলাম। বর্তমানে সে বিষয়ে নতুন করে আর কিছু লেখার প্রয়োজন বা আগ্রহ অনুভব করছি না।

হেফাযতের সাবেক আমীর সিংহপুরুষ শাইখুল হাদীস জুনাইদ বাবুনগরী (রাহ.)-এর ইন্তিকালের পর বর্তমানে জীবিত কাওমী অঙ্গনের প্রসিদ্ধ আলিমদের মধ্যে বাইতুল মুকাররমের খতীব, মুহতারাম মুফতী আবদুল মালেক (হাফি.) আমার অত্যন্ত শ্রদ্ধেয় ব্যক্তিদের একজন।

তাঁর সঙ্গে আমার কোনো ব্যক্তিগত পরিচয় নেই; সম্ভবত তিনিও আমাকে চেনেন না। তবে তাঁর বিভিন্ন লেখা ও গ্রন্থ পাঠের মাধ্যমে আমার অন্তরে তাঁর প্রতি গভীর শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা জন্মেছে। আমি তাঁকে আল্লাহর জন্য ভালোবাসি।

খতীব সাহেবকে আমি সবসময় একজন বিজ্ঞ, নিষ্ঠাবান ও সরলচারী আলিম হিসেবে জেনে এসেছি। তাঁর কথাবার্তা ও আচরণে স্বাভাবিক এক সারল্য স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হয়।

তবে সম্প্রতি তাঁর কিছু বক্তব্য আমাকে কিছুটা ভাবিত ও আশাহত করেছে—এ কথা বিনয়ের সাথেই বলছি।

খতীব মহোদয় আদতে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব নন—এ বিষয়টি অনস্বীকার্য। রাজনীতি বিষয়ে গভীর অধ্যয়ন, বিশ্লেষণ বা বাস্তব অভিজ্ঞতা তাঁর থাকবে—এমন প্রত্যাশা করাও স্বাভাবিক নয়।

তিনি মূলত একজন গভীর ধর্মতাত্ত্বিক, ইলমী ও আত্মিক চর্চায় মনোনিবেশকারী মানুষ। রাজনীতির জটিল ও কূটনৈতিক পরিসরে প্রবেশ করার মতো প্রস্তুতি বা আগ্রহ তাঁর মধ্যে নেই বলেই আমার ধারণা। সে কারণে রাজনৈতিক বিষয়ে তাঁর কিছু বক্তব্য বাস্তবতার আলোকে কখনো কখনো অসম্পূর্ণ বা সরলীকৃত মনে হওয়াই স্বাভাবিক।

আমার ব্যক্তিগত উপলব্ধিতে, এই ক্ষেত্রটি তাঁর স্বাভাবিক কর্মক্ষেত্র নয়; তাঁর প্রকৃত ময়দান হলো দারস–তাদরীস, দ্বীনী গবেষণা ও আত্মশুদ্ধির কাজ।

সাম্প্রতিক সময়ে নির্বাচন ও গণভোট প্রসঙ্গে তাঁর কিছু বক্তব্য ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।

তিনি যে সম্মানজনক ও গুরুত্বপূর্ণ অবস্থানে অধিষ্ঠিত, সে অবস্থান থেকে সাধারণত উম্মাহর কল্যাণে সুস্পষ্ট, দায়িত্বশীল ও দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য প্রত্যাশিত হয়।

বাস্তবতা হলো—জাতি তাঁর কাছে কখনোই জটিল কৌশলগত বা টেকনিক্যাল রাজনৈতিক বিশ্লেষণ প্রত্যাশা করে না। বরং গণভোটের মতো বিষয়ে কোন অবস্থানটি জাতির জন্য অধিক কল্যাণকর—হ্যাঁ কিংবা না—সে বিষয়ে একটি পরিষ্কার ও সহজ দিকনির্দেশনাই মানুষ আশা করে।

কিন্তু এ ক্ষেত্রে তিনি স্পষ্ট অবস্থান গ্রহণের পরিবর্তে তুলনামূলকভাবে সংযত ও কৌশলনির্ভর বক্তব্য প্রদান করেছেন বলে আমার মনে হয়েছে।

তিনি ‘হ্যাঁ’-এর পক্ষে সমর্থনের ক্ষেত্রে কিছু সমস্যার কথা বলেছেন—কারণ সব প্রস্তাবনায় একমত নাও হওয়া যেতে পারে; আবার ‘না’-এর ক্ষেত্রেও পক্ষে-বিপক্ষে আলোচনা করেছেন। তবে তাঁর বক্তব্যে এই আয়োজনগুলোর জটিল বাস্তব প্রেক্ষাপট খুব একটা প্রতিফলিত হয়নি; বিষয়গুলো কিছুটা সরলীকৃতভাবে উপস্থাপিত হয়েছে, ফলে সাধারণ মুসল্লীরা কোনো সুস্পষ্ট সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারবেন কি না—সে বিষয়ে সংশয় থেকে যায়।

অবশ্যই কেবল ‘ইসলাম’ নাম থাকলেই ভোট দেওয়া উচিত নয়; যেমন শুধু মার্কা বা ব্যক্তির নাম দেখেও অন্ধভাবে ভোট দেওয়া সমীচীন নয়—এই বিষয়টির প্রতি তিনি যথার্থভাবেই দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন। এ ক্ষেত্রে তাঁর ইঙ্গিত নিঃসন্দেহে ইতিবাচক ও প্রশংসনীয়।

বাস্তবতা হলো, এগুলো কোনো অবস্থাতেই একমাত্র বিবেচ্য হতে পারে না। অনুরূপভাবে কেউ নিজেকে হক্কানী দাবি করলেই তাও যথেষ্ট নয়; বরং সততা, ন্যায়নিষ্ঠতা, জবাবদিহিতা, আস্থাভাজনতা, সক্ষমতা, দূরদৃষ্টি, সাংগঠনিক যোগ্যতা ও নৈতিক মানদণ্ডের মতো গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। এসব মানদণ্ডের আলোকে বিচার করেই ভোট বা সম্মতির মতো গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা উচিত।

বিনীতভাবে বলতে চাই,

বিষয়গুলো তাঁর বক্তব্যে এমনভাবে উপস্থাপিত হলে অধিক সমীচীন হতো, যাতে কোনো পক্ষই পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ তুলতে না পারে এবং একই সঙ্গে বিষয়গুলো শ্রোতাদের কাছে আরও স্পষ্ট, সুসংহত ও উপকারীভাবে প্রতিভাত হয়।

বিনয়ের সঙ্গে আরও একটি অনুরোধ জানাতে চাই—

আল্লাহ তা‘আলা তাঁকে যে সম্মানজনক অবস্থানে আসীন করেছেন, সে অবস্থান থেকে রাজনৈতিক বিষয়ে বক্তব্য দিতে হলে আরও অধিক সতর্কতা অবলম্বন প্রয়োজন।

এ ক্ষেত্রে কেবল কিতাবী ইলম বা নৈতিক উপলব্ধি যথেষ্ট নয়; বরং রাজনৈতিক প্রজ্ঞা, বাস্তবতাবোধ, দূরদর্শিতা এবং রাজনীতির কূটনৈতিক বাস্তবতা সম্পর্কে দীর্ঘ অধ্যয়ন ও অভিজ্ঞতার প্রয়োজন রয়েছে।

তবুও এসব পর্যবেক্ষণের পরও তাঁর প্রতি আমার আন্তরিক শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা অটুট রয়েছে। আগামীতেও সেই শ্রদ্ধা ও ভালোবাসা বজায় রাখার ইচ্ছাই আমার।

উপরের কথাগুলো একান্তই আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও উপলব্ধির আলোকে উপস্থাপিত। আমি সচেতন যে, এ কারণে তিনি কিংবা তাঁর অনুসারীদের কেউ কেউ আমার ওপর অসন্তুষ্টও হতে পারেন।

তবুও আমার অনুভূতিগুলো আমি কেবল তাঁর প্রতি আন্তরিক ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা থেকেই প্রকাশ করলাম।