সম্প্রতি দেশের বিভিন্ন স্থানে মজলিসুল মুফাসসিরীন-এর বেশ কিছু অনুষ্ঠান ফেসবুক সূত্রে অনুষ্ঠিত হতে দেখলাম। দেখে ভালোই লাগল—বিপুল জনসমাগম, ব্যাপক উৎসাহ, বিপুলসংখ্যক আলিমের উপস্থিতি; সব মিলিয়ে দৃশ্যটি বেশ আশাব্যঞ্জক।

মনে হলো, দেশে তাফসীরচর্চার এমন জোয়ার উঠেছে যে, কুরআনের ব্যাখ্যা নিয়ে আর আমাদের বিশেষ কোনো দুশ্চিন্তা থাকার কথা নয়।

বরং একটু হিসাব করলে হয়তো দেখা যাবে, মুফাসসিরের সংখ্যা এখন এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, ভবিষ্যতে ‘মুফাসসির’ শব্দটির আগে ‘প্রকৃত’ শব্দটি বসানোই একটি আলাদা একাডেমিক প্রয়োজন হয়ে দাঁড়াতে পারে!

অবশ্য মজলিস, সম্মেলন কিংবা বিপুলসংখ্যক মুফাসসিরের সমাবেশ নিজে কোনো সমস্যা নয়; বরং তাফসীরচর্চার প্রতি মানুষের আগ্রহ নিঃসন্দেহে আনন্দের বিষয়।

প্রশ্নটি অন্য জায়গায়—‘মুফাসসির’ পরিচয়টি আমরা কতটা সহজ করে ফেলেছি?

কুরআনের কয়েকটি আয়াতের অনুবাদ জানা, কোনো তাফসীরগ্রন্থ থেকে দু-চারটি বক্তব্য উদ্ধৃত করা কিংবা ওয়াজের মঞ্চে আয়াতের ব্যাখ্যা করা—এসব অবশ্যই উপকারী কাজ;

কিন্তু এগুলোর কোনোটিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে কাউকে ‘মুফাসসির’ বানিয়ে দেয় না। কুরআনের ব্যাখ্যা করা আর তাফসীরশাস্ত্র চর্চা করা—দুটিকে এক করে ফেললে ‘মুফাসসির’ হওয়ার যোগ্যতা অর্জন খুব সহজ; শুধু মাইক্রোফোনটাই যথেষ্ট!

অথচ তাফসীর একটি সুসংহত ও গভীর শাস্ত্র। আরবি ভাষা ও বালাগাত, নাহু-সরফ, আসবাবুন নুযূল, হাদীস, উসূলুত তাফসীর, নাসিখ-মানসুখ, উসূলুল ফিকহ, আকীদা, ফিকহ, কিরাআত এবং পূর্ববর্তী মুফাসসিরদের বিশাল ঐতিহ্যের সঙ্গে পরিচয়—এসবের সমন্বিত জ্ঞান ছাড়া তাফসীরের কাজ মূলত কতটা সম্ভব, সে প্রশ্নটি অন্তত নিজেদের কাছে করা দরকার।

একটি আয়াতের ‘অর্থ’ জানা এবং সেই আয়াতের ‘তাফসীর’ করার যোগ্যতা অর্জন—মাঝখানে যে বেশ খানিকটা ইলমী দূরত্ব আছে, সেটুকু আমাদের মাঝে মাঝে মনে রাখা দরকার।

মুফতীদের ক্ষেত্রেও প্রায় একই দৃশ্য।

মনে হয়, দেশে মুফতীর সংখ্যা বৃদ্ধির হার কোনো এক অদৃশ্য জনশুমারি দপ্তর নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করছে! যত আলিম, তত মুফতী—এমন কোনো গাণিতিক সূত্র ইতোমধ্যে আবিষ্কৃত হয়েছে কি না, জানা নেই।

কোনো প্রশ্ন করুন—উত্তর আছে। সহজ প্রশ্নে তো আছেই; জটিল প্রশ্নেও আছে। সমসাময়িক অর্থনীতি, আধুনিক চিকিৎসা, জটিল আর্থিক লেনদেন, রাষ্ট্রীয় আইন, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক—বিষয় যাই হোক, উত্তর প্রদানে আত্মবিশ্বাসে কোনো ঘাটতি নেই। কখনও কখনও মনে হয়, প্রশ্নটি উত্তরদাতার কাছে পৌঁছানোর আগেই উত্তরটি তার কাছে পৌঁছে গেছে!

অথচ ইফতা নিছক ‘দ্রুত উত্তর দেওয়ার শিল্প’ নয়। ফিকহ ও ফাতাওয়া দীর্ঘ অধ্যয়ন, উসূলের গভীর অনুশীলন, মাযহাবসমূহের মতামত সম্পর্কে ধারণা, দলীলের তারতম্য বোঝা, বাস্তবতার যথাযথ অনুধাবন এবং সর্বোপরি ইলমী সতর্কতার বিষয়। ইফতার সনদ নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; কিন্তু সনদ একটি দরজা খুলে দিতে পারে, ইলমী পরিপক্বতা কাউকে সেই ঘরের ভেতর হাঁটতে শেখায়।

দুঃখের বিষয়,

কখনও কখনও এমন ব্যক্তিকেও দেখা যায়, যাঁর ইফতার প্রাতিষ্ঠানিক যোগ্যতা হয়তো আছে, কিন্তু ফিকহ ও ফাতাওয়ার সঙ্গে দীর্ঘমেয়াদি গভীর চর্চার সম্পর্ক খুব সামান্য; অথচ কঠিন থেকে কঠিনতর বিষয়ে ফাতাওয়া প্রদানে তাঁর আত্মবিশ্বাস প্রায় সীমাহীন। এখানে সমস্যাটি শুধু ভুল উত্তরের নয়; নিজের অজ্ঞতার সীমা সম্পর্কে অজ্ঞ থাকাও একটি গুরুতর ইলমী সমস্যা।

প্রকৃত আলিমের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য সম্ভবত এটাই—তিনি সব প্রশ্নের উত্তর জানেন না। বরং কোন প্রশ্নের উত্তর তিনি জানেন না, কোন প্রশ্নে আরও গবেষণা প্রয়োজন এবং কোন প্রশ্নে ‘আল্লাহু আ‘লাম’ বলা অধিক নিরাপদ—এই পার্থক্যটি তিনি জানেন। ‘আমি জানি না’ বলতে পারার যোগ্যতাও ইলমেরই একটি লক্ষণ।

আর এখানেই আমাদের সামগ্রিক আলিম-সমাজের একটি গভীর সংকট চোখে পড়ে।

শারঈ কোনো জটিল বিষয়ে কথা বলার মতো এমন আলিম খুঁজে পাওয়া ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠছে, যাঁর মধ্যে একই সঙ্গে রয়েছে শাস্ত্রীয় গভীরতা, গবেষণামূলক মানসিকতা, বিশ্লেষণী ক্ষমতা এবং সমকালীন বাস্তবতা সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা।

আলিয়া ধারার দিকে তাকালে দেখা যায়, সেখানে দ্বীনি শিক্ষায় শিক্ষিত অনেকের জ্ঞানের পরিধি প্রয়োজনের তুলনায় বেশ সীমিত এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা গভীর ও বুৎপত্তিমূলক পর্যায়ে পৌঁছাতে পারেনি। অবশ্যই ব্যতিক্রম আছেন—এবং ব্যতিক্রমের প্রতি যথাযথ সম্মান রেখেই কথাটি বলা হচ্ছে। কিন্তু সামগ্রিকভাবে ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন শাখায় দীর্ঘকালীন অধ্যয়ন, গবেষণা ও বুৎপত্তি অর্জনকারী আলিমের সংখ্যা প্রত্যাশার তুলনায় খুবই কম।

অন্যদিকে কওমি অঙ্গনেও সংকটটি ভিন্ন চেহারায় উপস্থিত। সেখানে শরিয়াহ, ফিকহ, হাদীস ও আরবি ভাষায় গভীর জ্ঞানসম্পন্ন এবং অভিজ্ঞ আলিম নিঃসন্দেহে রয়েছেন। কিন্তু সমসাময়িক রাষ্ট্রব্যবস্থা, আইন, অর্থনীতি, বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, সমাজবিজ্ঞান, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক কিংবা আধুনিক জ্ঞানতত্ত্ব সম্পর্কে সমানভাবে অবহিত আলিমের সংখ্যা তুলনামূলকভাবে নগণ্য।

ফলে দুই ধারায় যেন দুই ধরনের অসম্পূর্ণতা তৈরি হয়েছে। একদিকে আধুনিক জ্ঞান আছে, কিন্তু শাস্ত্রীয় গভীরতা দুর্বল; অন্যদিকে শাস্ত্রীয় জ্ঞান আছে, কিন্তু আধুনিক জগতের ভাষা ও বাস্তবতার সঙ্গে পরিচয় সীমিত। আর আমাদের প্রয়োজন এমন আলিম, যিনি একই সঙ্গে কিতাবের পৃষ্ঠা এবং সময়ের পৃষ্ঠাটি পড়তে পারেন।

নইলে বিপদটা বেশ মজার—আধুনিক সমস্যার উত্তর দিতে গিয়ে কেউ শুধু পুরোনো কিতাবের উদ্ধৃতি দেবেন, আর কেউ পুরোনো সমস্যার সমাধান করতে গিয়ে আধুনিক তত্ত্বের উদ্ধৃতি দেবেন; কিন্তু দুজনের কেউই হয়তো বুঝবেন না, উদ্ধৃত জ্ঞানটি কোন প্রেক্ষাপটে কীভাবে প্রয়োগ করতে হয়!

তাই এখন বোধ হয় শুধু ‘মুফাসসির কতজন’, ‘মুফতী কতজন’, ‘আলিম কতজন’—এই পরিসংখ্যান দিয়ে আত্মতুষ্ট হওয়ার সময় নয়। বরং প্রশ্নটি হওয়া উচিত—

গভীরভাবে পড়েছেন কতজন?

গবেষণা করেছেন কতজন?

নিজের শাস্ত্রের সীমানা অতিক্রম করে অন্য জ্ঞানশাখার সঙ্গে সংলাপ করতে পারেন কতজন?

সমসাময়িক জটিলতার শরিয়াহসম্মত বিশ্লেষণ করতে পারেন কতজন?

আর সবচেয়ে বড় কথা—

নিজের না-জানাটুকু স্বীকার করার মতো ইলমী বিনয় আছে কতজনের?

কারণ পরিচয়ের বাজারে আমাদের কোনো সংকট নেই; সংকট সম্ভবত যোগ্যতার বাজারে।

মুফাসসির আছেন, মুফতী আছেন, বক্তা আছেন, গবেষক আছেন—আলহামদুলিল্লাহ।

শুধু মাঝেমধ্যে মনে হয়, এই সব পরিচয়ের ভেতরে যে গভীর, পরিণত ও বহুমাত্রিক ‘আলিম’ সত্তাটি থাকার কথা, তারই যেন একটু আকাল চলছে।

সংখ্যা অবশ্যই আনন্দের; কিন্তু ইলমের ক্ষেত্রে সংখ্যা কখনও মানের বিকল্প নয়।

শত মুফাসসিরের সমাবেশ দৃষ্টিনন্দন হতে পারে; কিন্তু একজন প্রকৃত মুফাসসিরের গভীর তাফসীরচর্চা কখনও কখনও সেই সমাবেশের চেয়েও অধিক মূল্যবান।

আর শত ফাতাওয়ার চেয়ে একটি পরিমিত, গবেষণানির্ভর এবং দায়িত্বশীল ‘আল্লাহু আ‘লাম’ অনেক বেশি ইলমী সৌন্দর্যের পরিচয় বহন করতে পারে।