একসময় আলিমসমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ রাজনীতিকে সন্দেহের চোখে দেখতেন। কেউ একে নৈতিক অবক্ষয়ের ক্ষেত্র হিসেবে আখ্যায়িত করতেন, কেউবা সরাসরি নিরুৎসাহিত করতেন; এমনকি কেউ কেউ এর বিরুদ্ধে ফাতওয়াও প্রদান করতেন।
ফলে তারা সচেতনভাবেই দলীয় রাজনীতির অঙ্গন থেকে নিজেদের দূরে রাখতেন এবং এটিকে দ্বীনি সাধনা ও আত্মশুদ্ধির পরিপন্থী বলেও বিবেচনা করতেন।
কিন্তু সমসাময়িক প্রেক্ষাপটে একটি লক্ষণীয় পরিবর্তন ঘটেছে।
পূর্বে রাজনীতি থেকে দূরে থাকা এই লোকগুলোর একটি উল্লেখযোগ্য অংশ আজ সক্রিয়ভাবে রাজনৈতিক অঙ্গনে প্রবেশ করেছে; অনেক ক্ষেত্রে তাদের উপস্থিতি অস্বাভাবিকভাবে উচ্চকণ্ঠ ও দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।
নীতিগতভাবে রাজনীতিতে অংশগ্রহণকে অগ্রহণযোগ্য বলা যায় না; বরং সুশাসন, ন্যায়বিচার ও নৈতিক মূল্যবোধ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে এটি একটি অপরিহার্য মাধ্যম হিসেবে বিবেচিত হতে পারে। তদুপরি, সমাজজীবনের বিভিন্ন স্তরে ইসলামের বিধিবিধান কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের জন্য রাজনীতি একটি গুরুত্বপূর্ণ ও অপরিহার্য অনুষঙ্গ।
তবে বাস্তবতা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়,
এই অংশগ্রহণের একটি বড় অংশই প্রস্তুতিহীন, অপরিণত এবং কৌশলগতভাবে দুর্বল। রাজনৈতিক প্রজ্ঞার অভাব, দূরদর্শিতার ঘাটতি, অভ্যন্তরীণ অনৈক্য, নেতৃত্বসংকট এবং ব্যক্তিস্বার্থনির্ভর প্রবণতা—সব মিলিয়ে একটি বিশৃঙ্খল ও অনির্দেশ্য পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, যা তাদের প্রত্যাশিত ভূমিকা পালনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে।
ফলত,
দীন ও মিল্লতের সামষ্টিক স্বার্থ সংরক্ষণ ও প্রতিনিধিত্বের পরিবর্তে বহু ক্ষেত্রে তারা নিজেরাই অন্য শক্তিগুলোর রাজনৈতিক এজেন্ডা বাস্তবায়নের কার্যকর মাধ্যম হয়ে উঠছেন।
রাজনৈতিক শিষ্টাচার, কৌশলগত প্রজ্ঞা এবং প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতার ঘাটতি তাদেরকে এমন এক দুর্বল অবস্থানে ঠেলে দিচ্ছে,
যেখানে তারা কখনো অদক্ষ আচরণের মাধ্যমে পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছেন,
আবার কখনো অচেতনভাবেই ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা বৃহত্তর ক্ষমতাকাঠামোর স্বার্থসিদ্ধির টুলে পরিণত হচ্ছেন।
এই প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন উত্থাপিত হয়—
এ ধরনের অপরিপক্ব ও অদূরদর্শী রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কতটুকু কল্যাণকর?
বরং বর্তমান বাস্তবতা বিবেচনায় মনে হয়, অতীতে রাজনীতি থেকে তাদের যে দূরত্ব ছিল, তা অন্তত কিছু ক্ষেত্রে তাদের জন্য সুরক্ষামূলক ও মর্যাদাপূর্ণ অবস্থান নিশ্চিত করেছিল।
আরও স্পষ্টভাবে বললে,
বর্তমান প্রেক্ষাপটে প্রস্তুতিহীন ও বিচ্ছিন্নভাবে রাজনীতিতে সম্পৃক্ত থাকার পরিবর্তে সাময়িকভাবে রাজনৈতিক অঙ্গন থেকে সরে দাঁড়িয়ে আত্মসমালোচনা, জ্ঞানার্জন, কৌশলগত সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং প্রাতিষ্ঠানিক ঐক্য গড়ে তোলাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত ও ফলপ্রসূ হতে পারে।
অন্যথায়,
আবেগনির্ভর ও অগভীর রাজনৈতিক সম্পৃক্ততা কেবল ব্যক্তিগত ও গোষ্ঠীগত ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং তা দীর্ঘমেয়াদে বৃহত্তর সমাজ ও জাতির জন্যও নেতিবাচক ও বিপর্যয়কর পরিণতি ডেকে আনতে পারে।