ছাত্রাবস্থায় প্রায় প্রতি বছরই আমরা চুনতীর ঐতিহাসিক সীরাতুন্নবী (সা.) মাহফিলে অংশগ্রহণ করতাম এবং দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আগত বিভিন্ন ধারার প্রখ্যাত ওয়ায়িজদের বক্তব্য গভীর মনোযোগের সঙ্গে শুনতাম।

সে সময় একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ্য করতাম,

দেশের বহু খ্যাতিমান ওয়ায়িজ রাজনীতির ব্যাপারে অত্যন্ত কঠোর ও নেতিবাচক অবস্থান গ্রহণ করতেন। কেউ কেউ রাজনীতিকে হারাম বলেও মত প্রকাশ করতেন, ফাতওয়া দিতেন এবং সে দাবির পক্ষে বিভিন্ন দলিল-প্রমাণ উপস্থাপন করতেন।

একইভাবে,

সে সময় আলিমসমাজের একটি উল্লেখযোগ্য অংশও রাজনীতিকে স্বভাবতই সন্দেহের চোখে দেখতেন। তাঁরা রাজনীতি থেকে দূরে থাকার পরামর্শ দিতেন এবং অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রত্যক্ষ রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড থেকে নিজেদের স্বেচ্ছায় বিরত রাখতেন।

কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে দৃশ্যপটও বদলেছে।

মা শা'আল্লাহ,

আজ তাঁদের অনেকেই প্রত্যক্ষ রাজনীতিতে সক্রিয় হয়েছেন; আবার কেউ কেউ তুলনামূলকভাবে হঠাৎ করেই রাজনৈতিক অঙ্গনে উল্লেখযোগ্য উপস্থিতি ও ভূমিকা রাখতে শুরু করেছেন।

নীতিগতভাবে এতে আপত্তির কিছু নেই; বরং বিশেষ পরিস্থিতিতে এটি প্রয়োজনীয় ও ইতিবাচকও হতে পারে।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো,

রাজনৈতিক অভিজ্ঞতা ও দূরদর্শিতার ঘাটতি, পারস্পরিক অনৈক্য, সাংগঠনিক দুর্বলতা, ব্যক্তিকেন্দ্রিক প্রবণতা এবং অনেক ক্ষেত্রে সুবিধাবাদী আচরণ স্পষ্টভাবে দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে।

আরও দুঃখজনক হলো,

দীন ও মিল্লতের বৃহত্তর স্বার্থ সংরক্ষণের পরিবর্তে কখনো কখনো তাঁরা অন্যের রাজনৈতিক লক্ষ্য বাস্তবায়নের উপকরণে পরিণত হচ্ছেন—এমন ধারণাও জনমনে সৃষ্টি হচ্ছে।

এর পাশাপাশি আরেকটি বিষয়ও দৃষ্টিগোচর হয়।

তাঁদের রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অনেক সময় গঠনমূলক উদ্যোগের তুলনায় বিভাজন, মতবিরোধ ও ভাঙনের প্রবণতাই বেশি দৃশ্যমান বলে প্রতীয়মান হয়।

ঐক্য, সমন্বয় ও দীর্ঘমেয়াদি কৌশলগত চিন্তার পরিবর্তে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া ও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগ, ব্যক্তিগত ক্ষমতা ও নেতৃত্বের অভিলাষই যেন অধিক প্রাধান্য পাচ্ছে।

এসব বাস্তবতা বিবেচনায় কখনো কখনো মনে হয়,

অতীতে রাজনীতি থেকে তাঁদের দূরে থাকার যে প্রবণতা ছিল, তা হয়তো তাঁদের জন্য অধিক নিরাপদ ও কল্যাণকর ছিল।

আবার বর্তমান প্রেক্ষাপটেও মনে হয়,

প্রয়োজনীয় রাজনৈতিক প্রস্তুতি, সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি, সাংগঠনিক সক্ষমতা এবং পারস্পরিক ঐক্য প্রতিষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত রাজনীতির অস্থির অঙ্গনে অতিমাত্রায় সম্পৃক্ত হওয়ার পরিবর্তে দাওয়াহ, শিক্ষা, গবেষণা ও সমাজসংস্কারে অধিক মনোনিবেশ করা তাঁদের জন্য যেমন কল্যাণকর হতে পারে, তেমনি জাতি ও দীনি অঙ্গনের জন্যও অধিক ফলপ্রসূ হতে পারে।

একই সঙ্গে রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে আত্মপ্রকাশের চেয়ে একটি ঐক্যবদ্ধ, সুসংগঠিত ও কার্যকর সামাজিক-দ্বীনি প্রভাবক শক্তি ( প্রেসার গ্রুপ) হিসেবে নিজেদের গড়ে তোলার প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে দেশ, জাতি ও উম্মাহর জন্য আরও অধিক ইতিবাচক ও স্থায়ী অবদান রাখতে সক্ষম হতে পারে।

—ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণ ও অভিমত