সাম্প্রতিক আরব বিশ্বের রাজনৈতিক বাস্তবতা গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করলে এক ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক পরনির্ভরতার চিত্র স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মনে হয়, তাদের রাষ্ট্রনীতি আর স্বনির্ভর ভিত্তির ওপর দাঁড়িয়ে নেই; বরং রাজনীতি, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা ও নিরাপত্তা—সবকিছুই যেন অদৃশ্য এক নিয়ন্ত্রণব্যবস্থার অধীন, যা বহির্বিশ্বের শক্তিধর রাষ্ট্রগুলোর হাতে পরিচালিত।
এই নির্ভরতার বিনিময়ে তারা যেন নিঃশব্দে নিজেদের স্বাধীন সত্তা ও নীতিনির্ধারণী ক্ষমতার একটি বড় অংশ বিসর্জন দিয়ে ক্ষমতার স্থায়িত্ব নিশ্চিত করতে চায়। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে বিলাস, ভোগ ও আত্মতুষ্টির এমন এক জীবনধারা, যা বাস্তবতার কঠোর প্রশ্নগুলোকে আড়াল করে রাখে।
এই প্রেক্ষাপটে বৃহৎ শক্তিগুলো আরব রাষ্ট্রগুলোকে কৌশলগত দাবার ঘুঁটির মতো ব্যবহার করছে—কখনো মিত্রের পরিচয়ে, কখনো স্বার্থসিদ্ধির টুল হিসেবে; কিন্তু খুব কম ক্ষেত্রেই সমমর্যাদার অংশীদার হিসেবে।
ফলে নীতি ও সিদ্ধান্তে স্বকীয়তার জায়গা ক্রমশ সংকুচিত হচ্ছে, আর তার স্থলে প্রতিষ্ঠা পাচ্ছে নির্ভরতা, দাসত্ব ও আনুগত্যের এক নীরব সংস্কৃতি।
একই সঙ্গে আঞ্চলিক শক্তিগুলোর উত্থান এই দুর্বলতাকে আরও প্রকট করে তুলছে। ইরানসহ অন্যান্য শক্তি এই সুযোগে নিজেদের প্রভাব বিস্তারে সচেষ্ট—যা আন্তর্জাতিক রাজনীতির স্বাভাবিক বাস্তবতা।
কারণ,
শক্তির ভারসাম্য যেখানে দুর্বল, সেখানে প্রভাব বিস্তার অনিবার্য হয়ে ওঠে। তবে এ সত্য কোনো একক মতাদর্শ বা সম্প্রদায়ের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, ক্ষমতা যখন এককভাবে কেন্দ্রীভূত হয়, তখন তা প্রায়ই অন্যদের ওপর আধিপত্য বিস্তারের প্রবণতায় রূপ নেয়—পরিচয় শীয়া হোক বা সুন্নী, কিংবা অন্য যে কোনো পরিচয়ই হোক না কেন। বিভিন্ন সময় ও অঞ্চলের সংঘাত-সংঘর্ষ এ বাস্তবতারই বহিঃপ্রকাশ।
উদাহরণস্বরূপ, ইরাকে কুর্দি জনগোষ্ঠীর ওপর সংঘটিত নির্মমতা কিংবা পাকিস্তান ও আফগানিস্তানের সাম্প্রতিক দ্বন্দ্ব—এসবই প্রমাণ করে যে, কেবল পরিচয়ের ঐক্য সংঘাত প্রতিরোধের নিশ্চয়তা দেয় না; বরং ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা ও রাজনৈতিক স্বার্থই অনেক সময় সংঘর্ষের মূল চালিকাশক্তি হয়ে ওঠে, যদিও সংশ্লিষ্ট পক্ষগুলোর ধর্মীয় বা গোষ্ঠীগত পরিচয় এক ও অভিন্ন।
অথচ সম্ভাবনার বিচারে আরব বিশ্ব মোটেই দুর্বল নয়। বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, শক্তিশালী অর্থনৈতিক ভিত্তি এবং কৌশলগত ভৌগোলিক অবস্থান—সব মিলিয়ে তারা চাইলে বিশ্ব রাজনীতিতে একটি স্বতন্ত্র ও প্রভাবশালী মেরু গড়ে তুলতে পারে।
সমন্বিত সামরিক ও কৌশলগত সহযোগিতা তাদের জন্য কোনো কল্পনাবিলাস নয়; বরং তা একেবারেই বাস্তবসম্মত ও অর্জনযোগ্য সম্ভাবনা।
কিন্তু বর্তমান বাস্তব অবস্থাদৃষ্টে মনে হয়,
তারা সে পথে হাঁটবে না। বরং সে পথে অগ্রসর হওয়ার বদলে অনেক ক্ষেত্রে ক্ষমতার নিরাপদ আশ্রয় ও ভোগবিলাসের আকর্ষণই তাদের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করছে। ফলে আত্মনির্ভরতা ও প্রকৃত স্বাধীনতার যে কঠিন, কিন্তু টেকসই পথ—তা ক্রমেই আড়াল হয়ে যাচ্ছে।
সবচেয়ে উদ্বেগজনক দিক হলো—
এই অবস্থার মুখে আত্মসমালোচনার বদলে দায় অন্যের ওপর চাপিয়ে দেওয়ার প্রবণতাই যেন বেশি প্রাধান্য পায়। কখনো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বী, কখনো বৈশ্বিক শক্তি—দোষারোপের এ সীমাহীন চক্রে ঘুরপাক খেয়ে সাময়িক মানসিক স্বস্তি মিললেও বাস্তব পরিবর্তনের কোনো কার্যকর পথ উন্মুক্ত হয় না। বরং বিভাজনমূলক বয়ান ও পারস্পরিক অবিশ্বাস পরিস্থিতিকে আরও জটিল ও অস্থিতিশীল করে তোলে।
দুর্ভাগ্যজনকভাবে,
এই মানসিকতার প্রতিফলন তাদের সমর্থকদের মধ্যেও স্পষ্ট। তারাও একই বৃত্তে আবর্তিত হয়ে কখনো শীয়া-সুন্নী বিভাজনের শ্লোগান তোলে, কখনো তা উসকে দিয়ে পরিস্থিতিকে আরও উত্তপ্ত করে তোলে। ফলে যে সমস্যাগুলোর সমাধান প্রয়োজন ছিল, সেগুলোই উল্টো আরও জটিল আকার ধারণ করে।
অথচ ইতিহাসের শিক্ষা অত্যন্ত সুস্পষ্ট—
যে সমাজ নিজের সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতাকে সঠিকভাবে স্বীকার করতে পারে না, সে সমাজ কখনোই তার ভবিষ্যৎকে সুদৃঢ় ভিত্তির ওপর নির্মাণ করতে সক্ষম হয় না।
অতএব, আরব বিশ্বের সামনে সবচেয়ে জরুরি কাজ হলো বাহ্যিক প্রতিপক্ষ চিহ্নিত করার আগে নিজেদের অন্তর্গত সীমাবদ্ধতা ও দুর্বলতাগুলোকে স্বীকার করা। পরনির্ভরতার শৃঙ্খল থেকে বেরিয়ে এসে আত্মনির্ভরতার ভিত্তি গড়ে তোলা, এবং একটি কার্যকর ও সমন্বিত নিরাপত্তা কাঠামো নির্মাণ করা—এগুলোই হতে পারে টেকসই অগ্রগতির পথ।
অন্যথায় বিলাসের আবরণে আচ্ছাদিত এই আপাত-নিরাপত্তা একসময় অনিবার্যভাবেই ভঙ্গুর হয়ে উঠবে; আর তখন আঞ্চলিক কিংবা বৈশ্বিক শক্তিগুলোর কাছে ক্রমবর্ধমান নির্ভরতা ধীরে ধীরে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণে রূপ নেবে। ফলস্বরূপ, স্বাধীনতার স্থলে দীর্ঘস্থায়ী পরাধীনতার কঠিন বাস্তবতাই তাদের নিয়তি হয়ে দাঁড়াবে।