যে কোনো বিষয়ে আধুনিকীকরণ অবশ্যই সময়ের চাহিদা ও দাবি হয়ে থাকে। ক্ষেত্রবিশেষে এটা প্রয়োজনীয় ও উপকারীও বটে।

তবে এ আধুনিকীকরণের মাত্রা যখন যে কোনো বিষয়ের মৌলের ওপর ছাপিয়ে যায়, মূলের ওপর প্রাধান্য বিস্তার করে,

তখন তা সংশ্লিষ্ট বিষয়ের অস্তিত্ব, বিশেষত্ব ও স্বাতন্ত্র্য রক্ষার জন্য প্রবল হুমকি হয়ে দাঁড়ায়।

বলার অপেক্ষা রাখে না, মাদরাসা শিক্ষা মূলত একটি বিশেষায়িত শিক্ষাব্যবস্থা। এর সুনির্দিষ্ট ভিশন-মিশন রয়েছে।

কিন্তু আমরা যেভাবে এতে আধুনিকীকরণ ও সাধারণীকরণের নামে নানা পরিবর্তন এনেছি এবং বিভিন্ন প্রজেক্ট নিয়ে একের পর এক সামনে অগ্রসর হচ্ছি, তাতে তার বিশেষত্ব ও স্বাতন্ত্র্য হারিয়েছে অনেক আগেই।

এখান থেকে কুরআন-হাদীস-তাফসীর-ফিকহ-উসূল প্রভৃতি বিষয়ে বুৎপত্তিসম্পন্ন দক্ষ ও মুখলিস আলিম বের হবার পথ অনেক আগেই প্রায় রুদ্ধ হয়ে গেছে বলা চলে।

ছাত্ররাও (প্রায়ই) এখন আর ভালো আলিম হবার উদ্দেশ্যে মাদরাসায় ভর্তি হয় না। মেধাবী ছাত্ররা (প্রায়ই) ভালো একটি রেজাল্ট নিয়ে মাঝপথে অন্যত্র সহজেই পাড়ি জমায়; মাদরাসায় পড়ালেখা শেষ করে না।

বলার অপেক্ষা রাখে না, ইবতেদায়ী, দাখিল ও আলিম স্তরগুলো মূলত আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থার ফিডার ইনস্টিটিউশন; ফাজিল-কামিল হলো প্রাণভোমরা।

বর্তমানে মাদরাসাগুলোতে ফাজিল ও কামিল স্তর আছে বটে; তবে সেখানে প্রাণের কোনো চাঞ্চল্য নেই; প্রায়ই নির্জীব অবস্থায় বাইরের খোলস নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে মাত্র।

ভর্তি রেজিস্টারে অনেক ছাত্রের নাম থাকে, পরীক্ষায়ও অনেকেই অংশগ্রহণ করে; কিন্তু ক্লাসগুলোতে উপস্থিতির হার একান্তই হতাশাব্যঞ্জক।

এমন কিছু প্রসিদ্ধ মাদরাসা সম্পর্কেও আমি ব্যক্তিগতভাবে জানি,

যেগুলোতে মাসের পর মাস ফাজিল ও কামিল স্তরে উল্লেখযোগ্য কোনো ক্লাসই হয় না, ছাত্ররাও ক্লাসে আসে না।

এখন আমরা অনেকেই তৃপ্তিবোধ করি,

আমাদের মাদরাসাগুলো থেকে এখন বিজ্ঞানী তৈরি হচ্ছে, ডাক্তার তৈরি হচ্ছে, প্রকৌশলী তৈরি হচ্ছে, সামনে বাণিজ্যবিশারদ তৈরি হবে, .. ইন্ শা’আল্লাহ!

এ আধুনিকীকরণের ধারা যেভাবে চলছে তাতে হয়তো- আর বেশিদিন সময় লাগবে না_

এ বিশেষায়িত শিক্ষা ব্যবস্থার স্বাতন্ত্র্য পুরোটাই/প্রায়ই হারিয়ে যাবে; মাদরাসাগুলো পরিণত হবে এক একটা আধুনিক ইসলামিক স্কুলে।

বড়ো আফসোসের ব্যাপার হলো,

আমাদের মাদরাসাগুলোর অভিভাবক প্রতিষ্ঠানসমূহ এবং দায়িত্বশীল আলিমগণ শিক্ষার পরিবেশ উন্নয়ন, দীনী ঐতিহ্যের হিফাজত ও সময়ের চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় সক্ষম সত্যিকার বিজ্ঞ আলিম গড়ার উপযোগী কারিকুলাম-সিলেবাস প্রণয়ন এবং যোগ্য শিক্ষক নিয়োগের পরিবর্তে বরাবরই এমন সকল অবিবেচনাপ্রসূত কাজ করেছেন বা করছেন,

যা আলিয়ার সেই ঐতিহ্যবাহী শিক্ষাব্যবস্থাকে রীতিমত অস্তিত্বসংকটে ফেলে দিয়েছে।

এ অবস্থা চলতে থাকলে অচিরেই আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থার স্বাতন্ত্র্য ও মৌলিকত্ব_যা যৎসামান্য বাকি আছে তাও_ ধরে রাখা দূরূহ হবে।