উৎসব প্রাচীনকাল থেকেই সমাজে চলে এসেছে। উৎসব ব্যতীত কোনো জাতি নেই। প্রত্যেক জাতিরই কোনো না কোনো উৎসব রয়েছে।

জাতীয় উৎসবগুলোর মধ্যে কোনো কোনোটি ধর্মীয় উৎসব থেকে উৎসারিত হয়েছে।

কিছু কিছু উৎসব স্থানীয় কৃষি বা ফসল উৎপাদন ও ফসল কাটার সাথে সংশ্লিষ্ট। যেমন- নবান্ন উৎসব।

ঋতু পরিক্রমা বা বছর সমাপ্তির সাথেও কিছু কিছু উৎসব জড়িত। যেমন- চৈত্র সংক্রান্তি, বাংলা নববর্ষ উদযাপন, ইরানের নওরোয উৎসব, চীনের নববর্ষ বা শীতকালীন উৎসব ইত্যাদি।

আবার প্রত্যেক ধর্মেরও তার নিজস্ব উৎসব রয়েছে। ধর্মের মূল বিষয় আধ্যাত্মিক ও নৈতিক হলেও সেখানেও উৎসবের স্থান রয়েছে।

ধর্মীয় উৎসবগুলো তাদের আধ্যাত্মিক শিকড়ের সাথে সঙ্গতি রেখেই প্রচলিত হয়েছে। তবে কালপরিক্রমায় এ ধর্মীয় উৎসবগুলো অনেক স্থানীয় ও প্রচলিত বিষয়গুলোকে অঙ্গীভূত করে নিয়েছে।

কিছু উৎসব জাতির ঐতিহাসিক প্রধান প্রধান ঘটনাকে কেন্দ্র করেও প্রচলিত হয়ে থাকে। যেমন- আমাদের দেশে স্বাধীনতা দিবস ও বিজয় দিবসকে কেন্দ্র করে উৎসব পালন করা হয়।

এছাড়াও বর্তমান দুনিয়ায় পেশাগত বা ব্যবসায়িক কারণে নানা ধরনের উৎসবের আয়োজন হয়ে থাকে। যেমন- বিজ্ঞানমেলা, বইমেলা, সাহিত্য উৎসব, সঙ্গীত উৎসব ইত্যাদি।

সুতরাং বোঝা যায় যে,

উৎসব কয়েক ধরনের হতে পারে। যেমন- ধর্মীয়, রাষ্ট্রীয় অর্থনৈতিক, সাংস্কৃতিক ও বিশেষ জাতি-গোষ্ঠীর ঐতিহ্যগত উৎসব।

ধর্মীয় উৎসব শুধু ধর্মের লোকেরাই পালন করে। যেমন- মুসলমানদের জন্য দুই ঈদ, হিন্দুদের হোলি উৎসব-দুর্গাপূজা, খ্রিষ্টানদের খ্রিষ্টমাস-ইস্টার, ইহুদীদের পাসওভার-হানুক্কা, বৌদ্ধদের বৌদ্ধ পূর্ণিমা-চিবরদান, শিখদের বৈশাখী উৎসব ইত্যাদি। অন্য ধর্মের লোকদের সাথে এসব উৎসবের কোনো সম্পর্ক নেই।

একইভাবে ঐতিহ্যগত উৎসব সংশ্লিষ্ট জাতি-গোষ্ঠীর লোকেরা তা পালন করে থাকে। সেই জাতি-গোষ্ঠীর বিভিন্ন ধর্মের লোকেরাও তা একসাথে পালন করতে পারে। মুসলমানরাও তাতে শরীক হতে পারে, কোনো হারাম বা অবাঞ্ছিত কাজ না করার শর্তে।

রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় উৎসব জাতির সব লোকেরা ধর্ম নির্বিশেষে পালন করে থাকে। যেমন- বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় বা জাতীয় উৎসব- স্বাধীনতা দিবস, বিজয় দিবস ইত্যাদি।

কাজেই বোঝা যায় যে,

সব উৎসবই সবার নয়; তবে কিছু উৎসব সবার। অথচ আজ বাংলাদেশের একশ্রেণির লোকেরা বলতে শুরু করেছে যে, ‘ধর্ম যার যার, উৎসব সবার’।

এ কথাটি একদিকে চরম বিভ্রান্তিমূলক, অপরদিকে তা বাস্তবতার সাথে মোটেই সঙ্গতিপূর্ণ নয়। কোনো ধর্মাবলম্বীর ধর্মীয় উৎসব অন্য ধর্মাবলম্বীসহ সবাই এক সাথে পালন করতে পারে না। বিশেষত ইসলাম তা অনুমোদন করে না।

বস্তুতপক্ষে প্রকৃত সত্যটা হচ্ছে,

‘ধর্ম ও ধর্মীয় উৎসব যার যার, রাষ্ট্রীয় ও জাতীয় উৎসব সবার’।

বলাইবাহুল্য, প্রত্যেক ধর্মের নিজস্ব যে কোনো উৎসব, যেহেতু তা তার আধ্যাত্মিক শিকড় ও বিশ্বাসের সাথে সঙ্গতি রেখেই চালু হয়েছে, তাই তাতে তার অনুসারী লোকদের স্বাতন্ত্র্যবোধ থাকা প্রয়োজন।

এতে কারো দ্বিমত নেই যে, অমুসলিমদের প্রতি ইনসাফভিত্তিক নাগরিক ও মানবিক আচরণ করা ইসলামের শিক্ষা। অমুসলিমদেরকে সবধরনের সামাজিক ও মানবিক সহযোগিতা করা যাবে। এতে ইসলাম কোনোরূপ বাধা দেয় না।

কিন্তু তাদের ধর্মীয় উপাসনা, পূজা বা আরাধনায় যে কোনো ধরনের অংশ নেয়া মুসলিমদের জন্য অবশ্যই হারাম। নিজে পূজা করা যাবে না, প্রতিমা তৈরিতে ব্যক্তিগত অর্থ সাহায্য দেয়া যাবে না, উপাসনায় দৈহিক, মানসিক ও আর্থিক কোনো ধরনের সহায়তা দেয়া যাবে না।

যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তিগত পর্যায়ে অমুসলিমদের পূজা-অর্চনায় শরীক হয়, পূজা অনুষ্ঠান উপভোগ করে, দেবদেবীর কাছে সুখ-শান্তি ও সমৃদ্ধি কামনা করে, দেবদেবীর বিভিন্ন গুণকীর্তন করে, তাহলে সে কোনোভাবেই আর মুসলিম থাকবে না।

(বিদ‘আত ৫ম খণ্ড থেকে)