সম্প্রতি লক্ষ্য করা যাচ্ছে,

সম্প্রতি কাওমী ও আলিয়া—উভয় ধারার কিছু আলিম ও শিক্ষিত মহলের মধ্যে পারস্পরিক অবমূল্যায়নমূলক ও আক্রমণাত্মক বক্তব্যের প্রবণতা ক্রমবর্ধমানভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে, যা ইসলামী শিক্ষা-অঙ্গনের সুস্থ বৌদ্ধিক পরিবেশ সম্পর্কে নতুন করে ভাবনার অবকাশ সৃষ্টি করেছে।

বিশেষত কাওমী অঙ্গনের কিছু ব্যক্তির বক্তব্যে এমন ধারণার প্রতিফলন দেখা যায় যে,

আলিয়া ধারায় প্রকৃত অর্থে কোনো যোগ্য আলিম গড়ে ওঠেন না; এমনকি কেউ কেউ এমন মন্তব্যও করেন যে, সেখানে শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে সক্ষম ব্যক্তিও নেই।

অন্যদিকে আলিয়া ধারার কিছু ব্যক্তিও কাওমী শিক্ষাব্যবস্থা ও এর অবদান সম্পর্কে নেতিবাচক মন্তব্য করেন এবং বিভিন্নভাবে এ ধারার আলিমদের খাটো করে দেখানোর প্রবণতা প্রকাশ করেন।

এ ধরনের পারস্পরিক অবমূল্যায়ন কোনো সুস্থ জ্ঞানচর্চা, ইসলামী ভ্রাতৃত্ববোধ কিংবা গঠনমূলক শিক্ষা-সংস্কৃতির জন্য সহায়ক নয়।

এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে,

বর্তমানে আলিয়া মাদরাসা শিক্ষার সামগ্রিক মান নানা কারণে প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই। বিশেষত ইসলামী ও আরবী শিক্ষার গুণগত মান নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই উদ্বেগ রয়েছে।

তবে এ-ও ঐতিহাসিক সত্য যে,

একসময় এ ধারার প্রতিষ্ঠানগুলো থেকে বহু খ্যাতিমান কারী, আলিম, ফকীহ, গবেষক ও শিক্ষাবিদ গড়ে উঠেছেন, যারা দেশের ধর্মীয়, শিক্ষাগত ও সামাজিক অঙ্গনে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছেন।

বর্তমানেও আলিয়া মাদরাসার বহু শিক্ষার্থী পরবর্তী সময়ে বিশ্ববিদ্যালয় ও অন্যান্য উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে অধ্যয়ন করে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে শিক্ষা, গবেষণা, প্রশাসন, বিচারব্যবস্থা এবং বিভিন্ন পেশাগত ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অবদান রাখছেন। ফলে আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে সামগ্রিকভাবে অস্বীকার করা বাস্তবতার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয়।

আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থার বর্তমান অবস্থার পেছনে একাধিক কারণ রয়েছে। এর কিছু অভ্যন্তরীণ—যেমন পাঠ্যক্রম, শিক্ষার মান, প্রশাসনিক দুর্বলতা ও প্রাতিষ্ঠানিক সীমাবদ্ধতা; আবার কিছু বহিরাগত—যেমন সামাজিক, রাজনৈতিক ও নীতিগত প্রেক্ষাপট।

এসব বিষয়ে আমি বিভিন্ন সময় প্রবন্ধ, গবেষণাধর্মী লেখা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ধারাবাহিক আলোচনার মাধ্যমে সমস্যাগুলো বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি সম্ভাব্য সংস্কার ও উন্নয়নের বিভিন্ন দিকও তুলে ধরার চেষ্টা করেছি।

তবে এ কথাও উল্লেখযোগ্য যে,

সব আলিয়া মাদরাসার চিত্র একরকম নয়। এখনও এমন কিছু প্রতিষ্ঠান রয়েছে, যেখানে প্রাতিষ্ঠানিক বা ব্যক্তিগত উদ্যোগে যথেষ্ট মানসম্মত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। সেখান থেকে দক্ষ কারী, যোগ্য আলিম ও মেধাবী শিক্ষার্থী তৈরি হচ্ছেন। যদিও সামগ্রিক প্রয়োজনের তুলনায় তাদের সংখ্যা এখনও সীমিত।

আরও একটি বাস্তবতা হলো,

বর্তমানে বিভিন্ন আলিয়া মাদরাসায় উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কাওমী পটভূমির শিক্ষার্থী আলিয়া ও বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের একাডেমিক সনদ অর্জন করে শিক্ষকতা, প্রশাসন ও অন্যান্য পেশায় নিয়োজিত রয়েছেন।

সাম্প্রতিক সময়ে কিছু ক্ষেত্রে কেবল কাওমী সনদের ভিত্তিতেও চাকরির সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এ প্রবণতা দুটি ধারার মধ্যে পারস্পরিক যোগাযোগ ও সহযোগিতার একটি ইতিবাচক দিক নির্দেশ করে।

অন্যদিকে এটিও নির্দ্বিধায় স্বীকার করা উচিত যে,

ইসলামী ও আরবী শিক্ষার মৌলিক ভিত্তি, কুরআন তিলাওয়াত, হিফয, আরবী ভাষা ও প্রথাগত দীনী শিক্ষার ক্ষেত্রে কাওমী মাদরাসাগুলোর অবদান অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এখান থেকে প্রতিবছর বহু দক্ষ কারী, হাফিজ ও আলিম তৈরি হচ্ছেন, যা নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবিদার।

আমার নিজের শিক্ষাদান ও গবেষণার অভিজ্ঞতায় কাওমী ধারার বহু শিক্ষার্থীর সঙ্গে দীর্ঘদিন কাজ করার সুযোগ হয়েছে। সেই অভিজ্ঞতার আলোকে আমার পর্যবেক্ষণ হলো,

কাওমী মাদরাসাগুলোরও সামগ্রিক শিক্ষার মান ও একাডেমিক পরিবেশ সর্বত্র সমানভাবে সন্তোষজনক নয়।

একটি পূর্ণাঙ্গ দীনী ও তুলনামূলকভাবে স্বতন্ত্র শিক্ষাব্যবস্থায় থেকে যে সংখ্যক উচ্চমানের গবেষক, মুজতাহিদসুলভ চিন্তাশীল আলিম এবং সমকালীন বাস্তবতা অনুধাবনে সক্ষম নেতৃত্ব গড়ে ওঠার প্রত্যাশা করা যায়, বাস্তবে সেই অনুপাতে তাদের সংখ্যা_স্বীকার করেন আর না করেন_এখনও অত্যন্ত সীমিত।

বিশেষ করে প্রয়োজনীয় আধুনিক জ্ঞান, সমকালীন বৌদ্ধিক প্রবণতা এবং বৈশ্বিক চ্যালেঞ্জ সম্পর্কে সম্যক ধারণাসম্পন্ন আলিমের প্রয়োজনীয়তা আজ আরও বেশি অনুভূত হচ্ছে।

তবে বিশুদ্ধ কুরআন তিলাওয়াত শিক্ষা এবং প্রথাগত ইসলামী বিদ্যার সংরক্ষণ ও বিকাশে কাওমী মাদরাসাগুলোর বিশেষ অবদান নিঃসন্দেহে স্বীকৃত হওয়া উচিত।

অতএব বাস্তবতা হলো,

দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা কমবেশি সব শিক্ষাধারাতেই বিদ্যমান। একইভাবে প্রতিটি ধারারই উল্লেখযোগ্য সাফল্য, ঐতিহ্য ও অবদান রয়েছে।

তাই একে অপরকে হেয় করা, অবজ্ঞা করা বা সামগ্রিকভাবে অযোগ্য বলে আখ্যায়িত করা কোনো ন্যায়সংগত বা দায়িত্বশীল অবস্থান হতে পারে না।

যেমন আলিয়া শিক্ষাব্যবস্থাকে অবজ্ঞাসূচক ভাষায় উল্লেখ করা, সেখানে কোনো মানসম্মত শিক্ষা নেই বা কেউ শুদ্ধভাবে কুরআন তিলাওয়াত করতে জানেন না—এ ধরনের সর্বগ্রাসী মন্তব্য বাস্তবতাবিবর্জিত এবং আত্মতুষ্টিমূলক মানসিকতার পরিচায়ক।

একইভাবে কাওমী শিক্ষাব্যবস্থার ঐতিহাসিক অবদান অস্বীকার করা, তাদের অর্জনকে খাটো করে দেখা কিংবা বিদ্রূপের ভাষায় উপস্থাপন করাও বস্তুনিষ্ঠতার পরিপন্থী এবং সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির বহিঃপ্রকাশ।

বস্তুনিষ্ঠ মূল্যায়নের দাবি হলো—

উভয় ধারাই নিজেদের সীমাবদ্ধতাগুলো আন্তরিকভাবে চিহ্নিত করে প্রয়োজনীয় সংস্কারের উদ্যোগ গ্রহণ করবে এবং একই সঙ্গে পরস্পরের ইতিবাচক দিকগুলোকে স্বীকৃতি দেবে।

এ প্রসঙ্গে স্মরণযোগ্য যে, অতীতে কাওমী ও আলিয়া—উভয় ধারার আলিমদের মধ্যে পারস্পরিক শ্রদ্ধা, সুসম্পর্ক ও নিয়মিত জ্ঞানবিনিময়ের একটি সমৃদ্ধ ঐতিহ্য ছিল। একে অপরের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও অবদানকে তারা আন্তরিকভাবে মূল্যায়ন করতেন।

ব্যক্তিগতভাবেও আমি সে ঐতিহ্যের সাক্ষী। আমার শিক্ষকদের মধ্যে একাধিক বিশিষ্ট আলিম ছিলেন দারুল উলূম দেওবন্দের ফাজিল, যাঁদের কাছ থেকে আমি শিক্ষা গ্রহণের সৌভাগ্য অর্জন করেছি। তাঁদের জীবন ও কর্মে মতপার্থক্যের ঊর্ধ্বে উঠে পারস্পরিক সম্মান, ইলমের প্রতি নিষ্ঠা এবং বৃহত্তর দ্বীনি স্বার্থকে প্রাধান্য দেওয়ার যে দৃষ্টান্ত দেখেছি, তা আজও আমাদের জন্য অনুসরণীয়।

কাজেই প্রতিযোগিতা যদি হয়, তবে তা হওয়া উচিত জ্ঞান, গবেষণা, নৈতিকতা, শিক্ষা ও সমাজসেবায় উৎকর্ষ অর্জনের প্রতিযোগিতা; পারস্পরিক অবমূল্যায়ন বা বিভাজনের নয়।

কারণ কাওমী ও আলিয়া—উভয় ধারাই এ দেশের ইসলামী শিক্ষা-ঐতিহ্যের অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাদের পারস্পরিক সহযোগিতা, সংলাপ ও গঠনমূলক আত্মসমালোচনাই ইসলামী শিক্ষার সামগ্রিক উন্নয়ন এবং জাতির বৃহত্তর কল্যাণে অধিক কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।