সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বাংলাদেশের গবেষণা-অঙ্গন নিয়ে একটি উদ্বেগজনক তথ্য নজরে এসেছে। সেখানে উল্লেখ করা হয়েছে যে, গবেষণা-নৈতিকতা লঙ্ঘন, তথ্যগত অসংগতি কিংবা অন্যান্য অনিয়মের কারণে বাংলাদেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের গবেষকদের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক গবেষণাপত্র আন্তর্জাতিক জার্নাল থেকে প্রত্যাহার করা হয়েছে; এমনকি একজন গবেষকের প্রায় ছাব্বিশটি গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের ঘটনাও ঘটেছে।
এ ধরনের সংবাদ নিঃসন্দেহে হতাশাজনক। তবে এটিকে কেবল কয়েকজন গবেষকের ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখলে সমস্যার প্রকৃত গভীরতা অনুধাবন করা যাবে না। বরং এটি আমাদের উচ্চশিক্ষা-ব্যবস্থা, গবেষণা-সংস্কৃতি, গবেষণা-নৈতিকতা এবং একাডেমিক জবাবদিহির সামগ্রিক অবস্থা সম্পর্কে নতুন করে ভাবার প্রয়োজনীয়তার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
অবশ্য বিষয়টির আরেকটি দিকও বিবেচনায় নেওয়া প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক পরিসংখ্যানে দেখা যায়, গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের সংখ্যা উন্নত গবেষণা-ব্যবস্থাসম্পন্ন অনেক দেশেই বাংলাদেশের তুলনায় বেশি। এর অর্থ এই নয় যে, সেখানে গবেষণার মান খারাপ; বরং সেসব দেশে স্কোপাস (Scopus), ওয়েব অব সায়েন্স (Web of Science) প্রভৃতি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত ইনডেক্সড জার্নালের সংখ্যা অনেক বেশি এবং গবেষণা-নৈতিকতা পর্যবেক্ষণের ব্যবস্থাও তুলনামূলকভাবে কঠোর ও কার্যকর। ফলে গবেষণার ত্রুটি, তথ্য বিকৃতি, প্লেজিয়ারিজম কিংবা অন্যান্য অনিয়ম দ্রুত শনাক্ত হয় এবং প্রয়োজন হলে সংশ্লিষ্ট প্রবন্ধ প্রত্যাহার করা হয়।
অন্য দিকে বাংলাদেশের বাস্তবতা ভিন্ন। আমাদের অধিকাংশ বিশ্ববিদ্যালয়-জার্নাল এখনও আন্তর্জাতিক সূচিকরণের বাইরে, অনেকগুলোর পূর্ণাঙ্গ অনলাইন সংস্করণও নেই। ফলে গবেষণার প্রকৃত মান কিংবা গবেষণা-নৈতিকতার বিচ্যুতির অনেক ঘটনাই আন্তর্জাতিক মূল্যায়নের আওতায় আসে না। কাজেই গবেষণাপত্র প্রত্যাহারের তুলনামূলক কম সংখ্যাকে গবেষণার উৎকর্ষের সূচক হিসেবে দেখার কোনো অবকাশ নেই।
আমরা প্রায়ই 'মানসম্পন্ন গবেষণা'র প্রয়োজনীয়তা এবং গবেষকদের দায়-দায়িত্বের কথা বলি; কিন্তু একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলনামূলকভাবে কম আলোচিত হয়—যাঁদের ওপর ভবিষ্যৎ গবেষণা-সংস্কৃতি গড়ে তোলার দায়িত্ব অর্পিত হবে, অর্থাৎ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হিসেবে যাঁরা নিয়োগ পাবেন, তাঁদের নির্বাচন কতটা মেধাভিত্তিক ও গবেষণামুখী?
বিভিন্ন সময়ে গণমাধ্যমে এমন অভিযোগ উঠে এসেছে যে,
কোথাও কোথাও অধিক যোগ্য প্রার্থীরা উপেক্ষিত হন এবং তুলনামূলক কম যোগ্য ব্যক্তিরা নানা ধরনের প্রভাব, পক্ষপাত বা অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে নিয়োগ লাভ করেন। এসব অভিযোগ সব প্রতিষ্ঠানের ক্ষেত্রে সমানভাবে প্রযোজ্য—এ কথা বলা যাবে না। কিন্তু যেখানে মেধার পরিবর্তে অন্য বিবেচনা প্রাধান্য পায়, সেখানে তার প্রভাব কেবল একটি নিয়োগেই সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং শিক্ষা, গবেষণা এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জ্ঞানচর্চার ওপরও দীর্ঘমেয়াদি নেতিবাচক প্রভাব পড়ে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক কেবল শ্রেণিকক্ষের পাঠদাতা নন; তিনি একই সঙ্গে একজন গবেষক, জ্ঞান-উৎপাদক এবং পরবর্তী প্রজন্মের গবেষকদের নির্মাতা। তাই শিক্ষক নিয়োগের ক্ষেত্রে কেবল পরীক্ষার ফলাফল বা আনুষ্ঠানিক যোগ্যতার পাশাপাশি গবেষণা-সামর্থ্য, বিশ্লেষণী দক্ষতা, মৌলিক চিন্তার ক্ষমতা এবং একাডেমিক সততাকেও সমান গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন। কারণ, গবেষণার মৌলিক পদ্ধতি, আন্তর্জাতিক প্রকাশনার মানদণ্ড কিংবা গবেষণা-নৈতিকতার চর্চায় যিনি নিজেই দুর্বল, তাঁর কাছ থেকে বিশ্বমানের গবেষণা প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
এর পরিণতিতে কোথাও প্লেজিয়ারিজম, কোথাও পুরোনো গবেষণার পুনরাবৃত্তি, আবার কোথাও নতুন জ্ঞান উৎপাদনের পরিবর্তে কেবল প্রকাশনার সংখ্যা বৃদ্ধির প্রবণতা দেখা দেয়। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, পরবর্তী সময়ে তাঁরাই আবার এম.ফিল. ও পিএইচ.ডি. গবেষকদের তত্ত্বাবধায়ক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ফলে দুর্বলতার একটি ধারাবাহিকতা এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে সঞ্চারিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।
গবেষণার মান নির্ধারণে সুপারভাইজারের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। একজন গবেষণা-তত্ত্বাবধায়কের দায়িত্ব কেবল প্রশাসনিক সহযোগিতা দেওয়া নয়; বরং একজন নবীন গবেষককে গবেষণার প্রতিটি ধাপে বুদ্ধিবৃত্তিক সহায়তা প্রদান করা। গবেষণার বিষয় নির্বাচন, গবেষণা-শূন্যতা (Research Gap) নির্ধারণ, গবেষণা-পদ্ধতি (Methodology) নির্বাচন, তথ্যসংগ্রহ ও তথ্যবিশ্লেষণ, গবেষণা-নৈতিকতার অনুসরণ, একাডেমিক লেখার মানোন্নয়ন এবং আন্তর্জাতিক মানের জার্নালে প্রকাশনার জন্য প্রস্তুত করা—এসবই তাঁর দায়িত্বের অবিচ্ছেদ্য অংশ।
বাস্তবে অবশ্য সব ক্ষেত্রে এ আদর্শ চিত্র দেখা যায় না। কোথাও কোথাও গবেষকের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সময় ব্যয় করার পরিবর্তে তত্ত্বাবধানের সংখ্যা বৃদ্ধি করাকেই সাফল্যের মানদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করার প্রবণতা লক্ষ করা যায়। অথচ একজন সুপারভাইজারের প্রকৃত মূল্যায়ন হওয়া উচিত তাঁর তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন গবেষণার গুণগত উৎকর্ষ, মৌলিকত্ব এবং জ্ঞানভাণ্ডারে তার অবদানের ভিত্তিতে।
গবেষণার মান নির্ধারণে গবেষকদের মানসিকতাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। নিঃসন্দেহে বহু গবেষক নতুন জ্ঞান উৎপাদন এবং সমাজের বাস্তব সমস্যার সমাধান অনুসন্ধানের আন্তরিক প্রয়াস নিয়েই এম.ফিল. বা পিএইচ.ডি. গবেষণায় আত্মনিয়োগ করেন।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও অস্বীকার করা যায় না যে, একটি অংশের কাছে উচ্চতর গবেষণা মূলত একটি পেশাগত যোগ্যতা অর্জনের মাধ্যম। চাকরিতে পদোন্নতি, বেতন-স্কেল কিংবা আনুষ্ঠানিক মর্যাদা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা অনেক সময় গবেষণার মূল উদ্দেশ্যকে আড়াল করে ফেলে। তখন নতুন জ্ঞান উৎপাদনের চেয়ে দ্রুততম সময়ে ডিগ্রি অর্জনই হয়ে ওঠে প্রধান লক্ষ্য।
এ ধরনের বাস্তবতায় এমন প্রবণতাও দেখা যায় যে, কেউ কেউ এমন তত্ত্বাবধায়কের সন্ধান করেন, যাঁর অধীনে তুলনামূলক কম সময় ও কম পরিশ্রমে গবেষণা সম্পন্ন করা সম্ভব। গবেষণা যখন জ্ঞান উৎপাদনের পরিবর্তে কেবল একটি সনদ অর্জনের উপায়ে পরিণত হয়, তখন তার গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়া অনিবার্য।
এই বাস্তবতার প্রতিফলন গবেষণা-প্রকাশনার ক্ষেত্রেও অনেক সময় পরিলক্ষিত হয়। উচ্চতর ডিগ্রি অর্জনের পরও অনেক গবেষকের আন্তর্জাতিকভাবে মূল্যায়িত পিয়ার-রিভিউড ও ইনডেক্সড জার্নালে উল্লেখযোগ্য প্রকাশনা দেখা যায় না। কারও কারও ক্ষেত্রে ডিগ্রি-অর্জনের অভিসন্দর্ভ ছাড়া আর কোনো গবেষণাকর্মই দৃশ্যমান হয় না।
অবশ্য এ পর্যবেক্ষণ সকলের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য নয়; বাংলাদেশের অনেক গবেষক আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সাফল্যের সঙ্গে কাজ করছেন এবং দেশের ভাবমূর্তি উজ্জ্বল করছেন।
কিন্তু একই সঙ্গে এটিও সত্য যে, উচ্চতর ডিগ্রির সংখ্যা বৃদ্ধি সব সময় গবেষণার গুণগত উৎকর্ষের সমার্থক নয়। আমাদের মূল্যায়নের কেন্দ্রবিন্দু হওয়া উচিত ডিগ্রির সংখ্যা নয়, বরং জ্ঞানভাণ্ডারে তার প্রকৃত অবদান।
একটি ইতিবাচক দিকও উল্লেখ করা প্রয়োজন। সম্প্রতি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় এম.ফিল. ও পিএইচ.ডি. গবেষণার ক্ষেত্রে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্কারমূলক সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেছে। এর মধ্যে গবেষণার নিজস্ব ফলাফল থেকে আন্তর্জাতিকভাবে ইনডেক্সড জার্নালে গবেষণাপত্র প্রকাশকে একটি গুরুত্বপূর্ণ শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। একই সঙ্গে অভিসন্দর্ভের সফট কপি বিশ্ববিদ্যালয়ে জমা দেওয়া এবং সেগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের ওয়েবসাইটে উন্মুক্ত করার উদ্যোগও গ্রহণ করা হয়েছে। গবেষণার স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এসব উদ্যোগ নিঃসন্দেহে সময়োপযোগী এবং প্রশংসার দাবিদার।
তবে এ ধরনের সংস্কার কার্যকর করতে হলে একটি মৌলিক প্রশ্নেরও উত্তর খুঁজতে হবে। গবেষণার্থীদের জন্য যে মানদণ্ড নির্ধারণ করা হচ্ছে, গবেষণা-তত্ত্বাবধায়কদের ক্ষেত্রেও কি সেই মানদণ্ড আংশিক হলেও প্রযোজ্য হওয়া উচিত নয়?
যিনি একজন গবেষণার্থীকে আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা পরিচালনা ও প্রকাশনার পথে দিকনির্দেশনা দেবেন, তাঁর নিজের গবেষণা-অভিজ্ঞতা, আন্তর্জাতিক প্রকাশনা, গবেষণা-নৈতিকতা এবং সমসাময়িক গবেষণা-ধারার সঙ্গে পরিচিতি কতটা—সেটিও তো বিবেচনার বিষয়।
এটি কোনো ব্যক্তিকে প্রশ্নবিদ্ধ করার উদ্দেশ্যে নয়; বরং গবেষণা-তত্ত্বাবধানকে আরও কার্যকর ও ফলপ্রসূ করার স্বার্থেই বিষয়টি ভাবা প্রয়োজন। বিশ্বের বহু গবেষণা-নিবিড় বিশ্ববিদ্যালয়ে গবেষণা-তত্ত্বাবধায়কের যোগ্যতা মূল্যায়নের ক্ষেত্রেও গবেষণায় সক্রিয় অংশগ্রহণ, উচ্চমানের প্রকাশনা এবং গবেষণা-অভিজ্ঞতাকে গুরুত্ব দেওয়া হয়।
গবেষণার মানোন্নয়নের ক্ষেত্রে আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর গবেষণা-জার্নালের অবস্থাও গভীর মনোযোগ দাবি করে।
দেশে অসংখ্য বিশ্ববিদ্যালয়-জার্নাল প্রকাশিত হলেও আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ী সূচিকরণ (Indexing), নিয়মিত ও সময়ানুবর্তী প্রকাশনা, DOI নিবন্ধন, কার্যকর ও স্বচ্ছ পিয়ার-রিভিউ ব্যবস্থা, ডিজিটাল সংরক্ষণ (Digital Archiving) এবং আন্তর্জাতিক সম্পাদকীয় নীতিমালা অনুসরণের ক্ষেত্রে এখনও উল্লেখযোগ্য ঘাটতি রয়ে গেছে। আরও উদ্বেগের বিষয় হলো, অনেক বিশ্ববিদ্যালয়-জার্নালের আজও পূর্ণাঙ্গ অনলাইন সংস্করণ নেই; ফলে সেগুলো বৈশ্বিক গবেষণা-ডেটাবেসে অন্তর্ভুক্ত হওয়ার কিংবা আন্তর্জাতিক গবেষকসমাজের কাছে সহজে পৌঁছানোর সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে আমাদের গবেষণার আন্তর্জাতিক দৃশ্যমানতা (Research Visibility), গ্রহণযোগ্যতা এবং উদ্ধৃতিযোগ্যতার (Citation Impact) ওপর।
অতএব,
মানসম্পন্ন গবেষণা-পরিবেশ গড়ে তুলতে হলে শুধু গবেষকদের আন্তর্জাতিক জার্নালে প্রকাশনার জন্য উৎসাহিত করলেই যথেষ্ট হবে না; একই সঙ্গে দেশের বিশ্ববিদ্যালয়-জার্নালগুলোকেও ধাপে ধাপে আন্তর্জাতিক প্রকাশনা-মানের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করে গড়ে তুলতে হবে। কারণ একটি দেশের গবেষণা-সংস্কৃতির পরিপক্বতা ও একাডেমিক সক্ষমতা অনেকাংশেই তার নিজস্ব গবেষণা-জার্নালের মান, বিশ্বাসযোগ্যতা এবং বৈশ্বিক গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে প্রতিফলিত হয়।
একই সঙ্গে আমাদের গবেষণা-অবকাঠামোর সীমাবদ্ধতার বিষয়টিও অকপটে স্বীকার করা প্রয়োজন। আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা কেবল ব্যক্তিগত মেধা বা আন্তরিকতার ওপর নির্ভর করে না; এর জন্য প্রয়োজন শক্তিশালী প্রাতিষ্ঠানিক সহায়তা। আধুনিক গবেষণাগার, সমৃদ্ধ গ্রন্থাগার, আন্তর্জাতিক ডেটাবেস ও ই-জার্নালে প্রবেশাধিকার, গবেষণা-সহকারী, গবেষণা-সফটওয়্যার, পরিসংখ্যানগত সহায়তা, আন্তবিভাগীয় সহযোগিতা, আন্তর্জাতিক গবেষণা-নেটওয়ার্ক এবং গবেষণার জন্য পর্যাপ্ত সময়—এসব ছাড়া বিশ্বমানের গবেষণা ধারাবাহিকভাবে প্রত্যাশা করা বাস্তবসম্মত নয়।
বিশেষ করে গবেষণা-খাতে বরাদ্দের বিষয়টি নতুনভাবে গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন। আমাদের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে গবেষণার জন্য যে অর্থ বরাদ্দ করা হয়, তা অধিকাংশ ক্ষেত্রেই প্রয়োজনের তুলনায় সীমিত। গবেষণা-অনুদান, গবেষণা-উপকরণ সংগ্রহ, আন্তর্জাতিক জার্নাল ও ডেটাবেসের সদস্যপদ, গবেষণা-সহকারী নিয়োগ কিংবা আন্তর্জাতিক সম্মেলনে অংশগ্রহণ—সব ক্ষেত্রেই অর্থের সীমাবদ্ধতা প্রকট। ফলে অনেক সম্ভাবনাময় গবেষণাও বাস্তবায়নের আগেই থেমে যায়।
তাই গবেষণা-খাতে সরকারি ও প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি করা সময়ের দাবি। তবে কেবল বাজেট বৃদ্ধি করলেই হবে না; বরং সেই অর্থের স্বচ্ছ, প্রতিযোগিতামূলক এবং ফলাফলভিত্তিক ব্যবস্থাপনাও নিশ্চিত করতে হবে, যাতে প্রকৃত গবেষকরাই গবেষণা-সহায়তার সুযোগ পান।
গবেষণা-নৈতিকতার প্রশ্নেও আমাদের আরও দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করতে হবে। প্লেজিয়ারিজম শনাক্তকরণ সফটওয়্যারের বাধ্যতামূলক ব্যবহার, গবেষণা-ডেটা সংরক্ষণ ও যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা, গবেষণা-নৈতিকতা বিষয়ে নিয়মিত প্রশিক্ষণ এবং অনিয়মের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্ত ও উপযুক্ত ব্যবস্থা—এসবকে গবেষণা-ব্যবস্থার অপরিহার্য অংশে পরিণত করতে হবে। গবেষণায় সততা কেবল নৈতিকতার বিষয় নয়; এটি একটি দেশের একাডেমিক বিশ্বাসযোগ্যতারও ভিত্তি।
সবশেষে আরেকটি বিষয়ে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন প্রয়োজন।
আমরা অনেক সময় গবেষণার সাফল্যকে প্রকাশনার সংখ্যা, ডিগ্রির সংখ্যা কিংবা তত্ত্বাবধানে সম্পন্ন গবেষকের সংখ্যার মাধ্যমে মূল্যায়ন করি। কিন্তু গবেষণার প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় তার মৌলিকত্ব, জ্ঞানভাণ্ডারে নতুন সংযোজন, সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য কার্যকর অবদান এবং আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিমণ্ডলে তার গ্রহণযোগ্যতার মাধ্যমে। সংখ্যার প্রতিযোগিতা নয়; গুণগত উৎকর্ষই হওয়া উচিত আমাদের গবেষণা-নীতির মূল দর্শন।
বাংলাদেশের গবেষণা-ব্যবস্থার বর্তমান সীমাবদ্ধতা কোনো একক ব্যক্তি, বিভাগ কিংবা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমস্যা নয়; এটি একটি সামগ্রিক প্রাতিষ্ঠানিক বাস্তবতা। ফলে এর সমাধানও হতে হবে সমন্বিত ও দীর্ঘমেয়াদি। প্রয়োজন স্বচ্ছ ও মেধাভিত্তিক শিক্ষক নিয়োগ, গবেষণায় সক্রিয় ও যোগ্য সুপারভাইজার নির্বাচন, বিশ্ববিদ্যালয়-জার্নালগুলোর আন্তর্জাতিক মানোন্নয়ন, গবেষণা-নৈতিকতার কঠোর বাস্তবায়ন, গবেষকদের ধারাবাহিক দক্ষতা উন্নয়ন, গবেষণা-খাতে পর্যাপ্ত বিনিয়োগ এবং আধুনিক গবেষণা-অবকাঠামো নির্মাণ। এর পাশাপাশি বিশ্ববিদ্যালয়, সরকার, গবেষণা-অর্থায়নকারী সংস্থা এবং নীতিনির্ধারকদের মধ্যে একটি কার্যকর সমন্বয়ও অপরিহার্য।
একটি জাতির জ্ঞানভিত্তিক অগ্রগতি তার গবেষণার মানের ওপর নির্ভর করে। বিশ্ববিদ্যালয় কেবল ডিগ্রি প্রদানের প্রতিষ্ঠান নয়; এটি নতুন জ্ঞান উৎপাদন, সমালোচনামূলক চিন্তার বিকাশ এবং সমাজের জটিল সমস্যার সমাধান অনুসন্ধানের কেন্দ্র।
তাই গবেষণাকে যদি আমরা সত্যিই জাতীয় উন্নয়নের অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত করতে চাই, তবে ব্যক্তি-সমালোচনা বা সাময়িক প্রতিক্রিয়ার গণ্ডি পেরিয়ে গবেষণা-ব্যবস্থার কাঠামোগত সংস্কারে আন্তরিকভাবে এগিয়ে আসতে হবে।
নিয়োগ থেকে গবেষণা-তত্ত্বাবধান, গবেষণা-জার্নাল থেকে গবেষণা-অবকাঠামো—প্রতিটি স্তরে গুণগত পরিবর্তন নিশ্চিত করতে পারলেই কেবল বাংলাদেশে একটি শক্তিশালী, সৃজনশীল ও আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন গবেষণা-সংস্কৃতির ভিত্তি নির্মাণ সম্ভব হবে।