আজ আমার প্রিয়তম স্যার—বিদগ্ধ শিক্ষাবিদ ও ইসলামিক স্কলার প্রফেসর ড. আ.ক.ম. আবদুল কাদের (হাফি.)-এর বিশ্ববিদ্যালয়ে বর্ণাঢ্য কর্মময় জীবনের শেষ অফিসিয়াল কর্মদিবস।
আজ থেকে তিনি অফিসিয়ালি অবসরজীবনে প্রবেশ করবেন—এই কথাটি ভাবতেই সকাল থেকে বুকের ভেতর কেমন এক চাপা শূন্যতা অনুভব করছি।
বারবার মনে হচ্ছে, জীবনের খুব আপন একটি অধ্যায় বুঝি আজ আনুষ্ঠানিকভাবে শেষ হয়ে গেল! কখনো কখনো অজান্তেই চোখের পলকে কান্না এসে জমছে; চোখের কোণ ভিজে উঠছে।
স্যারের সঙ্গে আমার সম্পর্কের বয়স প্রায় তিন যুগ। এই দীর্ঘ সময়ে সম্পর্কটি কেবল শিক্ষক-শিক্ষার্থীর আনুষ্ঠানিক গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ থাকেনি; সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তা রূপ নিয়েছে গভীর ভালোবাসা, পারস্পরিক আস্থা, আন্তরিক সহযোগিতা ও এক অনন্য আত্মিক বন্ধনে।
কখনো তিনি ছিলেন আমার শিক্ষক, কখনো অভিভাবক; কখনো পরামর্শদাতা, কখনো সহযোগী; আবার কখনো এমন একজন আপনজন, যার কাছে নিজের কথা অকপটে বলা যায়, যার স্নেহ ও সাহস জোগানোতে কঠিন পথও সহজ মনে হয়।
আমার স্মৃতিতে এই সম্পর্কের শুরুটা অনেক পুরোনো।
স্যার যখন বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়াশোনা শেষ করে চুনতী হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসায় অধ্যক্ষ হিসেবে যোগদান করেন, তখন আমি ছিলাম কামিল পরীক্ষার্থী। সেই সময় থেকেই তাঁর সঙ্গে আমার এক অন্তরঙ্গ সম্পর্ক গড়ে ওঠে।
আল্লাহ তাআলার কী অপার অনুগ্রহ—স্যার যতদিন চুনতী মাদরাসায় ছিলেন, আমাকেও তাঁর সঙ্গে সেখানে বেসরকারিভাবে খেদমত করার তাওফীক দিয়েছিলেন।
তখন আমি ছিলাম ছাত্র; আর তিনি ছিলেন আমার কাছে শুধু একজন অধ্যক্ষ নন, একজন অভিভাবকসুলভ শিক্ষক। তাঁর আন্তরিকতা, স্নেহ, দিকনির্দেশনা ও সহযোগিতা সে সময় আমার পড়াশোনা ও জ্ঞানচর্চায় গভীর প্রভাব ফেলেছিল। তাঁর হাতে লেখা কিংবা সংগৃহীত অনেক নোটপত্রও আমার স্টাডির গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হয়ে উঠেছিল।
এরপর আমার বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা, শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ, লেখালেখি ও গবেষণার অঙ্গনে প্রবেশ—আমার জীবনের এসব গুরুত্বপূর্ণ বাঁকেও স্যারের অবদান ও ভালোবাসা গভীরভাবে জড়িয়ে আছে।
স্যার যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগদান করেন, তখন আমি তাঁর ছাত্র। বিশ্ববিদ্যালয়ে এলেই প্রায়ই তাঁর বাসায় উঠতাম। তাঁর আন্তরিক আতিথেয়তা, আপন করে নেওয়া এবং স্নেহমাখা আচরণ আমাকে কখনোই মনে করতে দেয়নি যে আমি কেবল তাঁর একজন ছাত্র। বরং মনে হতো, আমি যেন তাঁর পরিবারেরই একজন। সেই সময়ের অসংখ্য ছোট ছোট স্মৃতি আজ বড় বেশি মনে পড়ছে।
স্যারের সুবাদেই বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন শ্রদ্ধেয় শিক্ষকের সঙ্গে আমার পরিচয় ও যোগাযোগ গড়ে ওঠে। এর পেছনে কোনো আনুষ্ঠানিকতা ছিল না; ছিল তাঁর আমার প্রতি আস্থা। তিনি আমাকে একজন অধ্যবসায়ী ও পড়ুয়া ছাত্র হিসেবে জানতেন, আর আমি তাঁকে চিনতাম একজন আন্তরিক, উদার ও সহযোগী শিক্ষক হিসেবে। এই পারস্পরিক আস্থা ও ভালোবাসাই ধীরে ধীরে আমাদের সম্পর্ককে আরও গভীর করেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ে আমার শিক্ষক হিসেবে যোগদানের ক্ষেত্রেও স্যারের অবদান কোনোদিন বিস্মৃত হওয়ার নয়। আমাদের দেশে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হওয়ার পথ যে কতটা কঠিন, কত দৌড়ঝাঁপ, তদবির ও নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়—তা কারও অজানা নয়।
অথচ আমার ক্ষেত্রে আল্লাহ তাআলা পথটি অস্বাভাবিকভাবে সহজ করে দিয়েছিলেন। এর পেছনে স্যারের আন্তরিক সহযোগিতা, আস্থা ও দু‘আ যে বড় একটি কারণ ছিল, তা অকপটে স্বীকার করতে আমার কোনো দ্বিধা নেই।
হয়তো স্যারের সহযোগিতা না থাকলে আমার মতো একজনের বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে জায়গা করে নেওয়া আরও কঠিন হতো। তাঁর আন্তরিকতার কারণে আমার জন্য তখন ভাগ্যের দুয়ারটি যেন একটু সহজে খুলে গিয়েছিল।
এই ঋণ কেবল পেশাগত কোনো সহযোগিতার ঋণ নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে একজন শিক্ষকের অকৃত্রিম ভালোবাসা, একজন অভিভাবকের আশীর্বাদ এবং একজন আপন মানুষের নির্ভরতার স্মৃতি।
শিক্ষক হওয়ার পরও স্যারের সহযোগিতা থেমে থাকেনি। বরং জীবনের নতুন অধ্যায়ে তাঁর স্নেহ ও দিকনির্দেশনা আরও নানা রূপে পেয়েছি। লেখালেখির জগতে প্রবেশ, গবেষণার হাতেখড়ি, একাডেমিক পথচলায় এগিয়ে চলা—প্রতিটি ক্ষেত্রেই কোনো না কোনোভাবে তাঁর উৎসাহ, পরামর্শ, সহযোগিতা কিংবা দু‘আ আমার সঙ্গে ছিল। আজও তাঁর স্নেহপরশে নানাভাবে ধন্য হই।
একজন ছাত্রের জন্য এর চেয়ে বড় গৌরবের বিষয় আর কী হতে পারে যে, তাঁর শিক্ষক বিভিন্ন সময়ে তাঁকে নিজের ‘শিষ্য’ হিসেবে পরিচয় করিয়ে দেন! স্যারের মুখে নিজের পরিচয় হিসেবে ‘আমার শিষ্য’ শব্দটি শুনে থাকি—এটি আমার জীবনের অন্যতম বড় প্রাপ্তি। কারণ এতে শুধু পরিচয় নয়, একজন মহান শিক্ষকের পক্ষ থেকে পাওয়া এক ধরনের স্বীকৃতি, স্নেহ ও আত্মীয়তার অনুভূতি জড়িয়ে থাকে।
আজ স্যারের কর্মজীবনের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তির দিনে দাঁড়িয়ে পেছনে ফিরে তাকালে মনে হয়—তিনটি দশক কেবল সময়ের হিসাব নয়; এর প্রতিটি পরতে পরতে মিশে আছে শিক্ষা, স্নেহ, ভালোবাসা, সহযোগিতা, আস্থা, অভিভাবকত্ব এবং অসংখ্য স্মৃতি।
শিক্ষক হিসেবে তিনি আমাকে যা দিয়েছেন, তার প্রতিদান দেওয়ার সাধ্য আমার নেই। জীবনের পথে তাঁর যে ঋণ আমার ওপর জমা হয়েছে, তা কোনোদিন শোধ হওয়ার নয়। শুধু হৃদয়ের গভীর থেকে বলতে পারি—স্যার, আপনার প্রতি আমার কৃতজ্ঞতা আজীবন অমলিন থাকবে।
কর্মজীবন থেকে অবসর মানেই তো সম্পর্ক থেকে অবসর নয়। বরং আমার বিশ্বাস, বিশ্ববিদ্যালয়ের আনুষ্ঠানিক দায়িত্বের পরিসর শেষ হলেও আমাদের এই ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, স্নেহ ও আত্মিক বন্ধন আরও বহুদিন অটুট থাকবে।
স্যারের জন্য আজকের দিনটি যেন অবসরের নয়; বরং জীবনের আরেকটি সুন্দর অধ্যায়ের সূচনা হয়—যেখানে তিনি আরও প্রশান্তি, সুস্থতা ও স্বস্তির সঙ্গে জ্ঞানচর্চা, লেখালেখি এবং দ্বীন ও মিল্লতের খিদমতে নিজেকে নিয়োজিত রাখতে পারেন।
আল্লাহ তাআলা আমার প্রিয় স্যারের হায়াতে অফুরন্ত বরকত দান করুন। তাঁকে সুস্থতা, প্রশান্তি ও নেক হায়াত দান করুন। দ্বীন ও মিল্লতের খিদমতে তাঁর অবদানকে আরও দীর্ঘ ও ফলপ্রসূ করুন। উম্মাহর কল্যাণে তাঁর ছায়াকে আমাদের ওপর আরও বহুদিন প্রলম্বিত করুন। আর তাঁর স্নেহ, ভালোবাসা ও দিকনির্দেশনা থেকে আমাদের মতো তাঁর শিষ্যদের আরও বহুদিন উপকৃত হওয়ার তাওফীক দান করুন।
প্রিয় স্যার, আপনার কর্মজীবনের আজ আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি; কিন্তু আপনার প্রতি আমার শ্রদ্ধা, কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসার কোনো অবসর নেই।