ড. মিযানুর রহমান আজহারি (হাফি.) রচিত ‘এক নজরে কুরআন’ কুরআনের মৌলিক বিষয়বস্তু সহজ ও সংক্ষিপ্তভাবে অনুধাবনের উদ্দেশ্যে প্রণীত একটি গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রকাশিত একটি প্রচারণায় দেখা যায়, এ গ্রন্থের ক্রেতাদের মধ্য থেকে লটারির মাধ্যমে নির্বাচিত দশজনকে লেখকের সঙ্গে উমরাহ পালনের সুযোগ দেওয়া হবে।

আধুনিক বিপণন কৌশলের দৃষ্টিতে এ ধরনের অফারকে আকর্ষণীয় ও কার্যকর প্রচারণা হিসেবে বিবেচনা করা হতে পারে।

কিন্তু ইসলামী শরীয়তের আলোকে বিষয়টি কেবল একটি বিপণন-কৌশল (Marketing Strategy) হিসেবে মূল্যায়ন করাই যথেষ্ট নয়। বরং এর অন্তর্নিহিত চুক্তির প্রকৃতি (العقد), উদ্দেশ্য (المقصد) এবং সম্ভাব্য শরয়ী ও নৈতিক প্রভাব (المفاسد) গভীরভাবে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন।

এ আলোচনার উদ্দেশ্য কোনো চূড়ান্ত শরয়ী রায় (ফাতওয়া) প্রদান নয়; বরং বিষয়টির সঙ্গে সংশ্লিষ্ট কয়েকটি মৌলিক শরয়ী প্রশ্ন উত্থাপন করা, যেগুলোর সুস্পষ্ট উত্তর জানা এ ধরনের প্রচারণামূলক অফারের শরয়ী মূল্যায়নের জন্য অপরিহার্য।

১. উমরাহর ব্যয় কি বইয়ের মূল্যের সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে যুক্ত?

এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন।

যদি উমরাহর ব্যয় বইয়ের মূল্য বৃদ্ধি করে সকল ক্রেতার কাছ থেকেই আদায় করা হয়ে থাকে, তাহলে বাস্তবে প্রত্যেক ক্রেতাই ওই পুরস্কারের অর্থায়নে অংশগ্রহণ করছেন; কিন্তু তার সুফল ভোগ করছেন মাত্র দশজন। এমন পরিস্থিতিতে কয়েকটি শরয়ী প্রশ্ন সামনে আসে—

• অধিকাংশ ক্রেতা অতিরিক্ত অর্থ প্রদান করলেও এর কোনো প্রত্যক্ষ প্রতিদান পাচ্ছেন না।

• অল্পসংখ্যক ব্যক্তি ভাগ্যনির্ভর নির্বাচনের মাধ্যমে বড় ধরনের আর্থিক সুবিধা লাভ করছেন।

• ফলে "অর্থ প্রদান" এবং "ভাগ্যনির্ভর পুরস্কার"— এই দুই উপাদানের সমন্বয়ে এমন একটি কাঠামো সৃষ্টি হয়, যা মাইসির (ميسر) বা জুয়ার সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ কি না, সে প্রশ্ন উত্থাপিত হয়।

এ কারণেই সমকালীন অনেক ফিকহবিদ এ ধরনের লেনদেনকে অন্তত শুবহাপূর্ণ (مشتبه) বলে বিবেচনা করেছেন।

আন্তর্জাতিক ইসলামিক ফিকহ একাডেমি (International Islamic Fiqh Academy, OIC) তাদের বিভিন্ন অধিবেশনে বাণিজ্যিক পুরস্কার (الجوائز التجارية) সম্পর্কে যে নীতিমালা তুলে ধরেছে, তার সারাংশ হলো—যদি পুরস্কারের অর্থ ক্রেতাদের কাছ থেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আদায় করা হয়, তাহলে এতে মাইসিরের উপাদান সৃষ্টি হতে পারে।অপরদিকে, যদি পুরস্কার সম্পূর্ণ বিক্রেতার স্বেচ্ছা অনুদান হয় এবং পণ্যের মূল্য তার দ্বারা প্রভাবিত না হয়, তাহলে তা বৈধ হওয়ার সম্ভাবনা প্রবল।

অর্থাৎ, মূল বিবেচ্য বিষয় লটারি নয়; বরং অর্থের উৎস।

২. ক্রয়ের মূল উদ্দেশ্য কী?

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো— ক্রেতারা বইটি কেন কিনছেন?

যদি অধিকাংশ মানুষ কুরআনের জ্ঞান অর্জনের উদ্দেশ্যে নয়; বরং উমরাহর সুযোগ লাভের আশায় বইটি ক্রয় করেন, তাহলে বইটি জ্ঞানের উৎস হিসেবে নয়, বরং পুরস্কার অর্জনের একটি মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে।

এ অবস্থায় ক্রয়-বিক্রয়ের মূল উদ্দেশ্য জ্ঞানার্জন থেকে সরে গিয়ে ভাগ্যনির্ভর লাভের দিকে স্থানান্তরিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

৩. এটি কি শরীয়তসম্মত ‘কুরআ (قرعة)’, নাকি প্রচারণামূলক লটারি?

শরীয়তে কুরআ (লট) একটি স্বীকৃত পদ্ধতি। তবে এর ব্যবহার নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে সীমাবদ্ধ। যেমন—

• সমান অধিকারসম্পন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে ন্যায়সঙ্গত নির্বাচন;

• যেখানে দায়িত্বপ্রাপ্ত ব্যক্তি কাউকে অগ্রাধিকার দেওয়ার যৌক্তিক ভিত্তি খুঁজে পান না।

কিন্তু যখন একটি আর্থিক লেনদেনের সঙ্গে ভাগ্যনির্ভর পুরস্কার যুক্ত হয়, তখন বিষয়টি প্রচলিত কুরআর সীমা অতিক্রম করে কি না— সে প্রশ্ন গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা প্রয়োজন।

৪. এতে কি মাইসির (জুয়া)-এর উপাদান বিদ্যমান?

মাইসিরের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো—

• সবাই কোনো না কোনোভাবে অর্থ প্রদান করে;

• অল্পসংখ্যক ব্যক্তি বড় ধরনের সুবিধা লাভ করে;

• অধিকাংশ অংশগ্রহণকারী কোনো অতিরিক্ত সুবিধা পায় না।

যদি উমরাহর ব্যয় বইয়ের মূল্যের মধ্যেই অন্তর্ভুক্ত থাকে, তাহলে এ কাঠামোর সঙ্গে মাইসিরের সাদৃশ্য আছে কি না— তা ফিকহী আলোচনার দাবি রাখে।

৫. যদি বইয়ের মূল্য অপরিবর্তিত থাকে?

ধরা যাক—

• বইটির বাজারমূল্য পূর্বেও একই ছিল;

• অফারের পরও মূল্য অপরিবর্তিত রয়েছে;

• এবং উমরাহর সম্পূর্ণ ব্যয় লেখক বা প্রকাশক তাঁদের নিজস্ব অর্থ থেকে বহন করছেন।

এক্ষেত্রে পূর্বোক্ত আপত্তিগুলোর একটি বড় অংশ দুর্বল হয়ে যায়।

তবে তখনও কয়েকটি নৈতিক প্রশ্ন অবশিষ্ট থাকে—

• ক্রেতারা কি জ্ঞানের জন্য বই কিনছেন, নাকি পুরস্কারের আকর্ষণে?

• একটি তাফসীরগ্রন্থের প্রচারে এ ধরনের কৌশল কি ইসলামী জ্ঞানচর্চার প্রকৃত উদ্দেশ্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?

৬. কুরআনের তাফসীরের মর্যাদা ও জ্ঞানচর্চার নৈতিকতা:

কুরআনের তাফসীর কেবল একটি বাণিজ্যিক পণ্য নয়; এটি ইবাদতমূলক জ্ঞানের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ উৎস।

অতএব এমন প্রচারণা, যাতে মানুষের দৃষ্টি গ্রন্থের বিষয়বস্তুর পরিবর্তে পুরস্কারের দিকে অধিক আকৃষ্ট হয়, ইসলামী জ্ঞানচর্চার আদব, রুচি ও মর্যাদার সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ— সে বিষয়টিও বিবেচনার দাবি রাখে।

৭. সম্ভাব্য বিকল্প পদ্ধতি

যদি উদ্দেশ্য মানুষকে কুরআনের প্রতি অধিক আগ্রহী করে তোলা হয়, তাহলে আরও কিছু শরীয়তসম্মত ও শিক্ষাকেন্দ্রিক উদ্যোগ গ্রহণ করা যেতে পারে। যেমন—

• বইয়ের মূল্য হ্রাস করা;

• দরিদ্র শিক্ষার্থী ও গবেষকদের বিনামূল্যে বই বিতরণ করা;

• কুরআন অধ্যয়ন বা তাফসীর-ভিত্তিক প্রতিযোগিতার বিজয়ীদের উমরাহর সুযোগ প্রদান করা;

• বই পাঠ, মূল্যায়ন বা গবেষণাধর্মী পর্যালোচনার ভিত্তিতে যোগ্য পাঠকদের সম্মাননা দেওয়া।

এসব ক্ষেত্রে ভাগ্যনির্ভরতার পরিবর্তে জ্ঞান, অধ্যয়ন ও যোগ্যতাই মূল বিবেচ্য হয়ে ওঠে।

উল্লিখিত আলোচনার আলোকে বলা যায়,

এ ধরনের প্রচারণার শরয়ী মূল্যায়নের পূর্বে অন্তত নিম্নোক্ত বিষয়গুলো সুস্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন—

১. উমরাহর ব্যয় কি প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে বইয়ের মূল্যের সঙ্গে যুক্ত?

২. অফারের কারণে বইয়ের মূল্য বৃদ্ধি পেয়েছে কি না?

৩. ক্রেতাদের প্রধান উদ্দেশ্য কি গ্রন্থ সংগ্রহ, নাকি পুরস্কার লাভ?

৪. এ ব্যবস্থায় অর্থের বিনিময়ে ভাগ্যনির্ভর সুবিধা অর্জনের কোনো কাঠামো তৈরি হচ্ছে কি না?

৫. এতে মাইসির (ميسر), গারার (غرر) অথবা অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ ভোগ (أكل أموال الناس بالباطل)-এর কোনো উপাদান বিদ্যমান কি না?

৬. একটি তাফসীরগ্রন্থের প্রচারে এ ধরনের বিপণন কৌশল ইসলামী জ্ঞানচর্চার মর্যাদা ও আদবের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ?

অতএব

বিষয়টিকে কেবল একটি আধুনিক বিপণন কৌশল হিসেবে দেখা যথেষ্ট নয়। শরীয়তের আলোকে এর চুক্তিগত, নৈতিক ও সামাজিক দিকসমূহ সমন্বিতভাবে মূল্যায়ন করা প্রয়োজন।

বিশেষত যদি প্রমাণিত হয় যে পুরস্কারের ব্যয় ক্রেতাদের কাছ থেকেই প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে আদায় করা হয়েছে এবং ভাগ্যনির্ভর নির্বাচনের মাধ্যমে অল্পসংখ্যক ব্যক্তি সেই সুবিধা লাভ করছেন, তাহলে এতে মাইসির-সদৃশ বৈশিষ্ট্য বিদ্যমান থাকার প্রশ্ন গুরুত্বের সঙ্গে আলোচিত হবে।

অন্যদিকে,

যদি প্রমাণিত হয় যে বইয়ের মূল্য সম্পূর্ণ অপরিবর্তিত এবং উমরাহর ব্যয় সম্পূর্ণভাবে লেখক বা প্রকাশকের স্বতন্ত্র অনুদান, তবে নিষিদ্ধতার প্রশ্ন পূর্বের মতো শক্তিশালী থাকবে না।

তবুও একটি তাফসীরগ্রন্থের প্রচারে এ ধরনের কৌশলের ইলমী, নৈতিক ও দাওয়াহগত উপযোগিতা নিয়ে আলোচনা ও পর্যালোচনার অবকাশ থেকে যায়।

هذا ما عندي، والله أعلم بالصواب.