বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী দেশের অন্যতম বৃহৎ ইসলামপন্থী রাজনৈতিক সংগঠন। বাংলাদেশের একটি উল্লেখযোগ্য জনগোষ্ঠীর প্রতিনিধিত্বকারী এ দলটি বর্তমানে জাতীয় সংসদে বিরোধী দলের দায়িত্ব পালন করছে। সাংগঠনিক শৃঙ্খলা, কর্মীবাহিনীর সক্ষমতা এবং দীর্ঘ রাজনৈতিক অভিজ্ঞতার কারণে দলটি বাংলাদেশের রাজনীতিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ শক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত।
তবে একটি আদর্শভিত্তিক ইসলামী আন্দোলনের ক্ষেত্রে সাংগঠনিক শক্তির পাশাপাশি শক্তিশালী জ্ঞানচর্চা, মৌলিক গবেষণা, নীতিনির্ধারণী বিশ্লেষণ এবং সমসাময়িক বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জ মোকাবিলার সক্ষমতা অপরিহার্য।
ইসলামী ইতিহাসে লক্ষ্য করা যায়,
যেসব আন্দোলন দীর্ঘমেয়াদে সমাজে ইতিবাচক প্রভাব বিস্তার করেছে, তারা কেবল সাংগঠনিক কার্যক্রমের ওপর নির্ভর করেনি; বরং গবেষণা, শিক্ষা, প্রকাশনা এবং চিন্তার বিকাশকে সমান্তরালভাবে এগিয়ে নিয়েছে।
এ কারণেই একটি ইসলামী সংগঠনের জন্য গবেষণা কোনো আনুষঙ্গিক বিষয় নয়; বরং এটি তার বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্ব, নীতিগত পরিপক্বতা এবং ভবিষ্যৎ বিকাশের অন্যতম ভিত্তি।
এই দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করলে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর গবেষণা অবকাঠামো এখনও প্রত্যাশিত মাত্রায় বিকশিত হয়েছে বলে প্রতীয়মান হয় না। বিশেষ করে ইসলামী চিন্তা, রাষ্ট্রনীতি, অর্থনীতি, সমাজবিজ্ঞান, আইন, শিক্ষা, সংস্কৃতি ও সমসাময়িক বৈশ্বিক ইস্যুকে কেন্দ্র করে ধারাবাহিক মৌলিক গবেষণা পরিচালনার জন্য একটি শক্তিশালী, পেশাদার এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একাডেমিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান দৃশ্যমান নয়।
আমার পর্যবেক্ষণে,
বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার অতীতে কিছু গবেষণামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করেছিল বলে প্রতীয়মান হয়। তবে বর্তমান সময়ে প্রতিষ্ঠানটির কার্যক্রমের প্রধান অংশ গবেষণানির্ভর জ্ঞান উৎপাদনের পরিবর্তে প্রচলিত প্রকাশনা ও নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডকেই বেশি কেন্দ্র করে আবর্তিত হচ্ছে বলে মনে হয়।
আমার পর্যবেক্ষণে,
বর্তমানে পরিচালিত কার্যক্রমে গবেষণার মৌলিক উপাদান—যেমন পরিকল্পিত গবেষণা প্রকল্প, তথ্যনির্ভর বিশ্লেষণ, পিয়ার-রিভিউভিত্তিক প্রকাশনা, নীতিনির্ধারণী গবেষণা কিংবা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একাডেমিক আউটপুট—যে মাত্রায় প্রত্যাশিত, তা কোনোভাবেই দৃশ্যমান নয়। ফলে বর্তমান কার্যক্রমকে প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণার মানদণ্ডে মূল্যায়ন করা যায় না।
একইভাবে, মাওলানা মাওদুদী রিসার্চ একাডেমি নামে একটি প্রতিষ্ঠান থাকলেও সমসাময়িক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক একাডেমিক পরিমণ্ডলে উল্লেখযোগ্য প্রভাব বিস্তারকারী ধারাবাহিক গবেষণা, রেফারেন্সগ্রন্থ বা নীতিনির্ধারণমূলক প্রকাশনা এখনো পর্যাপ্তভাবে দৃশ্যমান নয়—অন্তত আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে এমনটিই প্রতীয়মান হয়েছে।
প্রকাশনার ক্ষেত্রেও অনুরূপ বাস্তবতা লক্ষ করা যায়।
দল-সংশ্লিষ্ট প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলো কিছু কাজ করলেও বর্তমানে অধিকাংশ ক্ষেত্রেই তা প্রচলিত ধাঁচের বই প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ। সমসাময়িক সামাজিক, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, প্রযুক্তিগত ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রশ্নকে কেন্দ্র করে উচ্চমানের মৌলিক গবেষণা, নীতিপত্র (Policy Paper), গবেষণা প্রতিবেদন, জার্নাল, থিংক-ট্যাংকধর্মী প্রকাশনা কিংবা আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন অনুবাদ প্রকল্প তুলনামূলকভাবে অপ্রতুল।
অবশ্য জামায়াত-ঘরানার ব্যক্তিমালিকানাধীন কয়েকটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান আধুনিক পাঠকের চাহিদা বিবেচনায় মূল্যবান অনুবাদ ও কিছু গুরুত্বপূর্ণ গ্রন্থ প্রকাশ করেছে, যা ইতিবাচক উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতির দাবি রাখে। তবে ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানের স্বাভাবিক সীমাবদ্ধতার কারণে দীর্ঘমেয়াদি, ব্যয়বহুল ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা পরিচালনা করা তাদের পক্ষে সবসময় সম্ভব হয় না।
অন্যদিকে,
দেশে ও বিদেশে জামায়াত-ধারার সঙ্গে প্রত্যক্ষ বা পরোক্ষভাবে সম্পৃক্ত বহু যোগ্য আলিম, উচ্চমানের গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয়-শিক্ষক এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রের বিশেষজ্ঞ রয়েছেন। কিন্তু জামায়াত তাঁদের জ্ঞান, দক্ষতা ও গবেষণা-অভিজ্ঞতাকে একটি সুসংগঠিত ও প্রাতিষ্ঠানিক গবেষণা কাঠামোর অধীনে দীর্ঘমেয়াদে কাজে লাগাতে পারছে না; ক্ষেত্রবিশেষে এ ধরনের কিছু উদ্যোগ থাকলেও তার কার্যকর ফলাফল প্রত্যাশিত মাত্রায় দৃশ্যমান নয়।
এর পেছনে উপযুক্ত প্রাতিষ্ঠানিক প্ল্যাটফর্মের অভাব, কার্যকর সমন্বয়ের সীমাবদ্ধতা, গবেষণার জন্য প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা ও অর্থায়নের ঘাটতি, বিশেষজ্ঞদের দক্ষতাকে যথাযথভাবে মূল্যায়ন ও সম্পৃক্ত করার সীমাবদ্ধতা, কিংবা তাঁদের ব্যক্তিগত ও পেশাগত ব্যস্ততাসহ নানা বাস্তব কারণ ভূমিকা রাখতে পারে।
ফলে বিদ্যমান এ বিশাল মেধাসম্পদকে জ্ঞান উৎপাদন, নীতিনির্ধারণী গবেষণা, সমসাময়িক বুদ্ধিবৃত্তিক চ্যালেঞ্জের মোকাবিলা এবং সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি নীতিগত বিকাশে পূর্ণাঙ্গভাবে কাজে লাগানো সম্ভব হচ্ছে না।
বর্তমান বিশ্বে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কেবল জনসমর্থনের নয়; এটি একই সঙ্গে জ্ঞান, গবেষণা, নীতি-উদ্ভাবন এবং বুদ্ধিবৃত্তিক নেতৃত্বেরও প্রতিযোগিতা।
ফলে একটি ইসলামী আন্দোলন যদি গবেষণা, একাডেমিক উৎকর্ষ এবং চিন্তার বিকাশে ধারাবাহিক বিনিয়োগ করতে না পারে, তাহলে সমসাময়িক নানা ধর্মীয়, সামাজিক, রাজনৈতিক ও দার্শনিক প্রশ্নের কার্যকর উত্তর প্রদান, নীতিগত নেতৃত্ব সৃষ্টি এবং দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব বজায় রাখা ক্রমেই কঠিন হয়ে উঠবে।
অতএব, শক্তিশালী গবেষণা অবকাঠামো নির্মাণ, আন্তর্জাতিক মানের গবেষণা প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা, দক্ষ গবেষক তৈরির পরিবেশ সৃষ্টি এবং মৌলিক জ্ঞান উৎপাদনে বিনিয়োগ—এসবকে বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামীর ভবিষ্যৎ কৌশলগত অগ্রাধিকারের অন্যতম বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।