কয়েক দিন ধরে লক্ষ করছি, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে টুপি নিয়ে বেশ আলোচনা হচ্ছে। বিশেষত টুপির শরয়ী বিধান ও গুরুত্ব নিয়ে ধারাবাহিকভাবে বিভিন্ন পোস্ট প্রকাশিত হচ্ছে।
বিষয়টি নিঃসন্দেহে গুরুত্বপূর্ণ; তবে আমার মনে হয়, এ নিয়ে আলোচনায় কিছুটা ভারসাম্য ও বিষয়টির শরয়ী অবস্থান সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা থাকা জরুরি।
এ কথা অস্বীকার করার সুযোগ নেই যে,
টুপি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাত। বিভিন্ন হাদীস ও রিওয়ায়াতের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষ প্রমাণ থেকে জানা যায় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) নিজে টুপি পরিধান করেছেন এবং তাঁর টুপির ধরন ও পরিধানের বিষয়ে বিভিন্ন রিওয়ায়াতও পাওয়া যায়। এসব রিওয়ায়াতের কোনো কোনোটি অবশ্য সূত্রগত বিচারে আলোচনাযোগ্য।
তবে সামগ্রিকভাবে বলা যায়,
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর যুগে এবং পরবর্তী সময়ে সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-সহ মুসলিম সমাজে মাথা আবৃত রাখার রীতি প্রচলিত ছিল। পরবর্তী যুগগুলোতেও মুসলিম বিশ্বের বিভিন্ন সমাজ ও অঞ্চলে টুপি মুসলিম পোশাক-পরিচয়ের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশে পরিণত হয়েছে। কোনো কোনো সমাজে তো এটি কার্যত মুসলিমদের একটি স্বতন্ত্র বাহ্যিক পরিচয়ের (শি‘আর) রূপও ধারণ করেছে।
সুতরাং টুপিকে কোনোরূপ গুরুত্বহীন বা নিছক তুচ্ছ বিষয় হিসেবে দেখার কোনো যৌক্তিকতা নেই। বিশেষত যারা ইলম ও আমলের ক্ষেত্রে অন্যদের আদর্শ এবং যারা উম্মাহর দ্বীনি নেতৃত্বের দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের এ ধরনের সুন্নাতি নিদর্শনের প্রতি যথাযথ গুরুত্ব প্রদান এবং যত্নশীল থাকা বাঞ্ছনীয়।
এ বিষয়ে আমি আমার ‘ইসলামের দৃষ্টিতে পোশাক, পর্দা ও সাজসজ্জা’ গ্রন্থে বিস্তারিত আলোচনা করেছি।
তবে টুপির শরয়ী অবস্থান নির্ধারণের ক্ষেত্রে কয়েকটি সূক্ষ্ম বিষয় আলাদাভাবে বিবেচনা করা প্রয়োজন।
প্রথমত,
টুপি পরিধানের রীতিটি রাসূলুল্লাহ (সা.)-ই সর্বপ্রথম প্রবর্তন করেছেন—বিষয়টি এমন নয়। তাঁর আগেও আরব সমাজে মাথা আবৃত করার বিভিন্ন রীতি প্রচলিত ছিল; এমনকি অন্যান্য জাতি ও সংস্কৃতিতেও এ ধরনের পোশাক-রীতি অতীতেও বিদ্যমান ছিল এবং এখনও রয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.) প্রচলিত এসব সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতির কোনো কোনোটি প্রয়োজনীয় সংশোধন ও পরিমার্জনসহ বহাল রেখেছেন।
জুব্বার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। জুব্বা রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পূর্ব থেকেই প্রচলিত একটি পোশাক ছিল এবং তিনি বিভিন্ন সময়ে তা পরিধান করেছেন।
অতএব, কোনো পোশাক বা সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতিকে রাসূলুল্লাহ (সা.) অনুসরণ করেছেন—এটি নিঃসন্দেহে তার গ্রহণযোগ্যতা ও অনুসরণীয়তার একটি দিক নির্দেশ করে; কিন্তু এর অর্থ এই নয় যে, তিনি এ ধরনের প্রত্যেক রীতির অনুকরণ উম্মতের প্রত্যেক ব্যক্তির জন্য সমানভাবে আবশ্যক বা অপরিহার্য করে দিয়েছেন কিংবা প্রত্যেকের নিকট থেকে তা পালন করা শারয়ীভাবে কামনা করেছেন।
অতএব,
পোশাক-পরিচ্ছদ, রুচি-স্বভাব ও জীবনাচারের এ ধরনের অনেক বিষয়কে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত, অনুমোদিত বা সমর্থিত রীতি হিসেবে বিবেচনা করা হয়; কিন্তু এগুলোর প্রতিটির শরয়ী মর্যাদা অভিন্ন—এমনটি মনে করার অবকাশ নেই।
কোনোটি তাঁর প্রতি ভালোবাসার একান্ত নিদর্শন হিসেবে গ্রহণ করা হয় (যেমন লাউ খাওয়া পছন্দ করা), কোনোটি তাঁর অনুসরণ ও অনুকরণের শারয়ী দাবির অন্তর্ভুক্ত হতে পারে, কোনোটি মূলত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক রীতির পর্যায়ে থাকতে পারে, কোনোটি তাঁর ব্যক্তিগত রুচি ও স্বভাবজাত অভ্যাসের অন্তর্ভুক্ত হতে পারে; আবার কোনো কোনো ক্ষেত্রে স্থান, কাল ও পরিবেশের পরিবর্তনের সঙ্গে এসব রীতির গুরুত্ব ও প্রয়োগের ধরনেও পরিবর্তন ঘটতে পারে।
এ কারণে তাঁর অনুসৃত এ ধরনের সকল বাহ্যিক রীতির ক্ষেত্রে শরীয়তের পক্ষ থেকে সর্বজনীন ও অপরিহার্য নির্দেশ রয়েছে—এমন ধারণা করা সমীচীন নয়।
একইভাবে,
কেউ রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার নিদর্শনস্বরূপ তাঁর স্বভাবজাত ও রুচিগত কাজগুলো কিংবা সামাজিক-সাংস্কৃতিক প্রথাগত রীতিগুলো অনুসরণ করলে তা তাঁর মহব্বতের নিদর্শন হিসেবে সওয়াবের কারণ হতে পারে। কিন্তু কেউ তা অনুসরণ না করলে কেবল এ কারণেই তাকে দ্বীনের প্রতি অবহেলাকারী, সুন্নাতবিরোধী বা নিন্দনীয় ব্যক্তি হিসেবে চিহ্নিত করাও সমীচীন নয়।
সুন্নাতের প্রতি ভালোবাসা ও তার অনুসরণ যেমন কাম্য, তেমনি সুন্নাতের বিভিন্ন স্তর, প্রকৃতি ও শরয়ী মর্যাদার মধ্যে পার্থক্য করাও জরুরি।
এ প্রসঙ্গে আরেকটি বিষয়ও লক্ষণীয়।
কোনো নির্দিষ্ট পোশাকের মূল রীতি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত হলেও, তার নির্দিষ্ট নকশা, আকৃতি, রং, মাপ কিংবা স্থানীয়ভাবে প্রচলিত কোনো বিশেষ ধরনকে স্বতন্ত্রভাবে ‘সুন্নাত’ হিসেবে সাব্যস্ত করার জন্য পৃথক প্রমাণের প্রয়োজন। অথচ আমরা অনেক সময় একটি নির্দিষ্ট আকৃতি, নকশা বা ডিজাইনের টুপিকে ‘সুন্নাতি টুপি’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করি।
এখানে আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় বিবেচনা করা প্রয়োজন।
বিশেষত যখন দাওয়াতের ক্ষেত্র অমুসলিম, ধর্মনিরপেক্ষ (secular) কিংবা কথিত উদারপন্থী (liberal) মানসিকতার মানুষের মধ্যে বিস্তৃত হয়, তখন সুন্নাতুত-তাদাররুজ—অর্থাৎ ধাপে ধাপে অগ্রসর হওয়ার নীতি—দাওয়াতের ক্ষেত্রে বিশেষ গুরুত্ব বহন করে।
এর অর্থ এই নয় যে,
ইসলামের কোনো বিধানকে অস্বীকার বা স্থগিত করা হবে; বরং এর অর্থ হলো দাওয়াতের অগ্রাধিকার (প্রায়োরিটি) সঠিকভাবে নির্ধারণ করা এবং মানুষের ঈমান, মানসিক প্রস্তুতি ও বাস্তব অবস্থার বিবেচনায় বিষয়গুলো যথাযথ ক্রমে উপস্থাপন করা।
দাওয়াতের ক্ষেত্রে প্রথমত ঈমানের ভিত্তি দৃঢ় করা, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের প্রতি বিশ্বাস ও ভালোবাসা সৃষ্টি করা এবং ইসলামের মৌলিক আকীদা হৃদয়ে প্রতিষ্ঠিত করা জরুরি। এরপর ফরজ ইবাদত ও অপরিহার্য বিধানগুলোর প্রতি গুরুত্বারোপ করতে হবে। বাহ্যিক পরিবর্তনের আগে অন্তর্জগতের পরিবর্তন এবং নফল, মুস্তাহাব ও অন্যান্য আনুষঙ্গিক বিষয়ের আগে ফরজের প্রতি অগ্রাধিকার দেওয়া অধিক যুক্তিসঙ্গত।
মানুষের ঈমান যখন দৃঢ় হয় এবং ইসলামের প্রতি তার ভালোবাসা যখন অন্তরে গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়, তখন তার বাহ্যিক জীবনেও সেই ঈমানের স্বাভাবিক প্রতিফলন ঘটতে থাকে। ফলে পোশাক-পরিচ্ছদ, আচার-আচরণ, সামাজিক রীতি এবং জীবনযাপনের অন্যান্য ক্ষেত্রে ইসলামী আদর্শ গ্রহণের প্রবণতাও ক্রমে বৃদ্ধি পায়।
এ কারণেই দাওয়াতের ক্ষেত্রে বাহ্যিক পরিবর্তনের আগে মানুষের চিন্তা, বিশ্বাস ও অন্তর্জগতের পরিবর্তনের প্রতি মনোযোগ দেওয়া অধিক ফলপ্রসূ।
ধরা যাক,
কোনো সেক্যুলার মানসিকতার নারী, যিনি প্রচলিত অর্থে পর্দার প্রতি অনুরাগী নন। তাঁকে দাওয়াতের শুরুতেই যদি পর্দার বিধানকে প্রধান বিষয় হিসেবে সামনে আনা হয়, তাহলে তাঁর বিদ্যমান মানসিক অবস্থার কারণে তিনি হয়তো বিষয়টিকে গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত নাও থাকতে পারেন; বরং এতে দাওয়াতের মূল উদ্দেশ্যই ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।
এ ক্ষেত্রে অধিক কার্যকর পদ্ধতি হতে পারে—
প্রথমে তাঁর সামনে ঈমানের প্রকৃত তাৎপর্য, আল্লাহর সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক, ইসলামের মৌলিক বিশ্বাস এবং ইসলামের জীবনব্যবস্থার যথার্থতা যুক্তি ও প্রজ্ঞার সঙ্গে তুলে ধরা। তিনি যদি তা গ্রহণ করেন এবং ধীরে ধীরে ইসলামের অনুশীলনে অভ্যস্ত হয়ে ওঠেন, তখন তাঁর মানসিক প্রস্তুতি, উপলব্ধি ও বাস্তব অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়ে পর্যায়ক্রমে পর্দাসহ ইসলামের অন্যান্য বিধান ও জীবনাচারের প্রতি তাঁকে উদ্বুদ্ধ করা যেতে পারে।
আমাদের একটি প্রবণতা হলো,
আমরা অনেক সময় ব্যক্তির অভ্যন্তরীণ পরিবর্তনের চেয়ে বাহ্যিক পরিবর্তনকে বেশি দৃশ্যমান ও গুরুত্বপূর্ণ মনে করি। ফলে পোশাক-পরিচ্ছদের পরিবর্তনকে অপেক্ষাকৃত বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়। এর ফলে যারা দ্বীনের পথে নতুনভাবে এগিয়ে আসছেন, তাঁদের কাছ থেকে অনেক সময় দ্রুত বাহ্যিক পরিবর্তনের প্রত্যাশা করা হয় এবং সে পরিবর্তন যথেষ্ট না হলে সমালোচনার মুখোমুখি হতে হয়।
এর ফলে কেউ কেউ ইসলামের পথে স্বাভাবিক ও ক্রমবিকাশমান অগ্রযাত্রার পরিবর্তে মানসিকভাবে নিরুৎসাহিত হয়ে পড়তে পারেন। আবার এমনও দেখা যায়, যারা বাহ্যিক পরিবর্তনকে বেশি গুরুত্ব দেন, তাঁরা ব্যক্তির ঈমান, চিন্তা, চরিত্র ও অন্তর্জগতের পরিবর্তনের বিষয়টি তুলনামূলকভাবে কম গুরুত্ব দেন।
অথচ দাওয়াতের লক্ষ্য শুধু কোনো একটি বাহ্যিক আচরণ পরিবর্তন করা নয়; বরং ঈমানকে কেন্দ্র করে ব্যক্তির চিন্তা, চরিত্র ও জীবনযাপনে একটি স্বাভাবিক ও স্থায়ী পরিবর্তন সৃষ্টি করা। অন্তরে ইসলামের প্রতি ভালোবাসা ও আনুগত্য যত গভীর হবে, তার প্রভাব ততই স্বতঃস্ফূর্তভাবে বাহ্যিক জীবনেও প্রতিফলিত হবে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতি পদ্ধতিতেও আমরা এ নীতির বাস্তব প্রতিফলন দেখতে পাই।
সাইয়িদুনা উসমান ইবনু আবিল আস (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, ছকীফ গোত্রের প্রতিনিধি দল যখন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে এসে ইসলাম গ্রহণের ব্যাপারে কিছু শর্ত পেশ করেছিল, তখন তারা বলেছিল—
أَنْ لَا يُحْشَرُوا وَلَا يُعْشَرُوا وَلَا يُجَبُّوا
অর্থাৎ, তাদেরকে যুদ্ধে আহ্বান করা হবে না, তাদের কাছ থেকে ‘উশর (বা যাকাত) গ্রহণ করা হবে না এবং তাদেরকে সালাত আদায়ের নির্দেশ দেওয়া হবে না।
রাসূলুল্লাহ (সা.) তাদের কিছু শর্ত মেনে নিয়ে বলেছিলেন—
لَكُمْ أَنْ لَا تُحْشَرُوا وَلَا تُعْشَرُوا، وَلَا خَيْرَ فِي دِينٍ لَيْسَ فِيهِ رُكُوعٌ
অর্থাৎ, তোমাদের এ সুযোগ দেওয়া হলো যে, তোমাদেরকে যুদ্ধে আহ্বান করা হবে না এবং তোমাদের কাছ থেকে ‘উশর (বা যাকাত) গ্রহণ করা হবে না; তবে যে দ্বীনে রুকূ‘ নেই, সে দ্বীনে কোনো কল্যাণ নেই।
অন্য বর্ণনায় এসেছে,
রাসূলুল্লাহ (সা.) ভবিষ্যদ্বাণী করেছিলেন যে, ইসলাম গ্রহণের পর তারা অচিরেই স্বতঃস্ফূর্তভাবে যাকাত আদায় করবে এবং জিহাদেও অংশগ্রহণ করবে। পরবর্তী ইতিহাসে তার বাস্তব প্রতিফলনও দেখা যায়। ইসলাম গ্রহণের পর তারা আন্তরিক ও নিষ্ঠাবান মুসলিমে পরিণত হন এবং সাহাবায়ে কিরাম (রা.) তাঁদের সেই পরিবর্তনের সাক্ষ্য দিয়েছেন।
এ ঘটনাকে দাওয়াতের ক্ষেত্রে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রজ্ঞা, দূরদর্শিতা এবং মানুষের মানসিক প্রস্তুতি সম্পর্কে গভীর বাস্তববোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখা যায়। তিনি ইসলাম গ্রহণের প্রাথমিক পর্যায়ে মানুষের মানসিক প্রস্তুতি ও বাস্তব অবস্থাকে বিবেচনায় নিয়েছেন; কিন্তু একই সঙ্গে ইসলামের মৌলিক পরিচয় ও সালাতের অপরিহার্যতাকেও স্পষ্ট করে দিয়েছেন।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য লক্ষণীয়:
দাওয়াতের কৌশলে তাদাররুজ থাকতে পারে, কিন্তু ইসলামের মৌলিক সত্য ও অপরিহার্য বিধানের ক্ষেত্রে আপস নয়। অর্থাৎ, কোন বিষয় কখন এবং কীভাবে উপস্থাপন করা হবে—এটি দাওয়াতের প্রজ্ঞার বিষয়; কিন্তু কোনো বিধানকে সত্য বা শরয়ী বিধান হিসেবে অস্বীকার করা সম্পূর্ণ ভিন্ন বিষয়।
সুতরাং টুপি নিয়ে আলোচনায় আমাদের দুটো প্রান্তিক অবস্থা এড়িয়ে চলা প্রয়োজন।
একদিকে,
টুপিকে এতটাই তুচ্ছ করে দেখা ঠিক নয় যে, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত একটি রীতি এবং মুসলিম সমাজের দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক পরিচয়কে আমরা কোনো গুরুত্বই দেব না। বিশেষত ইলম, আমল ও দ্বীনি নেতৃত্বের সঙ্গে সম্পৃক্ত ব্যক্তিদের জন্য রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসৃত সুন্নাতি নিদর্শনগুলোর প্রতি যত্নশীল হওয়া নিঃসন্দেহে কাম্য় ও প্রশংসনীয়।
অন্যদিকে,
টুপির মতো একটি সুন্নাতি ও সাংস্কৃতিক বিষয়কে এমনভাবে উপস্থাপন করাও সমীচীন নয়, যাতে তা ঈমান, ফরজ ইবাদত কিংবা ইসলামের মৌলিক বিধানের সমপর্যায়ে চলে আসে; অথবা যে ব্যক্তি টুপি পরেন না, তাকে কেন্দ্র করে অপ্রয়োজনীয় নিন্দা, তিরস্কার কিংবা দ্বীনি মূল্যায়নের প্রবণতা তৈরি হয়।
দ্বীনের কোনো বিষয়কে মূল্যায়নের ক্ষেত্রে শুধু ‘এটি সুন্নাত কি না’—এই প্রশ্নই যথেষ্ট নয়; বরং ‘এর শরয়ী মর্যাদা কী’, ‘এটি ফরজ, ওয়াজিব, মুস্তাহাব নাকি মূলত সামাজিক-সাংস্কৃতিক রীতি’, ‘এর অনুসরণের প্রকৃতি কী’ এবং ‘দাওয়াত ও তারবিয়াতের ক্ষেত্রে কোন বিষয়কে কখন এবং কীভাবে অগ্রাধিকার দিয়ে উপস্থাপন করা উচিত’—এসব প্রশ্নও সমানভাবে বিবেচনায় রাখা জরুরি।
বিশেষত দাওয়াত ও ইসলামী সংস্কারের ক্ষেত্রে আমাদের মনে রাখা দরকার—মানুষের বাহ্যিক অবয়ব পরিবর্তন করাই চূড়ান্ত লক্ষ্য নয়; বরং তার অন্তরে ঈমান, আল্লাহভীতি, রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসা এবং ইসলামের প্রতি গভীর আনুগত্য সৃষ্টি করাই মূল লক্ষ্য। অন্তরে সেই ভিত্তি সুদৃঢ় হলে তার প্রভাব ধীরে ধীরে ব্যক্তির চিন্তা, চরিত্র, ইবাদত, পোশাক-পরিচ্ছদ ও সমগ্র জীবনব্যবস্থায় প্রতিফলিত হবে।
এটাই ছিল রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর দাওয়াতি প্রজ্ঞার অন্যতম বৈশিষ্ট্য—
প্রথমে মানুষকে ইসলামের দিকে হৃদয় দিয়ে নিয়ে আসা, তারপর সেই ইসলামের আলোয় তার সমগ্র জীবনকে ক্রমে আলোকিত করে তোলা।