একটি উদ্বেগজনক প্রবণতা লক্ষ করা যায় যে,
যখন সেক্যুলার বা কায়েমি স্বার্থনির্ভর কোনো মহল ইসলামী ঘরানার কোনো দল, সংগঠন বা ব্যক্তিত্বের সমালোচনা করে, তখন অন্যান্য ইসলামী ধারার কিছু আলিম, কর্মী বা সমর্থকের মধ্যে ব্যাপক সন্তোষ, স্বস্তি কিংবা উচ্ছ্বাসের প্রকাশ দেখা যায়।
বিষয়টি নিছক আবেগগত প্রতিক্রিয়া নয়; এর পেছনে কিছু বাস্তব কারণও রয়েছে।
বাস্তবতা হলো,
আকীদা, ফিকহ, মানহাজ, দাওয়াতি পদ্ধতি ও রাজনৈতিক চিন্তার বিভিন্ন ক্ষেত্রে ইসলামী ধারাগুলোর মধ্যে দীর্ঘদিনের মতপার্থক্য বিদ্যমান। এসব মতপার্থক্যকে কেন্দ্র করে বুদ্ধিবৃত্তিক বিতর্ক, সমালোচনা এবং পারস্পরিক বিরোধিতারও একটি দীর্ঘ ইতিহাস রয়েছে।
অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা দলীয় স্বার্থের প্রতিযোগিতা ও দ্বন্দ্ব এ বিরোধকে আরও তীব্র করে তোলে।
ফলে কোনো প্রতিদ্বন্দ্বী বা মতভিন্ন ইসলামী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে বাইরের মহলের সমালোচনায় কিছু মানুষের ইতিবাচক প্রতিক্রিয়া বা সন্তোষ ও উচ্ছ্বাস প্রকাশ সম্পূর্ণ অস্বাভাবিক বা অপ্রত্যাশিত নয়।
তবে বিষয়টিকে যদি কেবল এ সংকীর্ণ প্রতিযোগিতা বা মতবিরোধের পরিসরে সীমাবদ্ধ রাখা হয়, তাহলে বৃহত্তর বাস্তবতার একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক উপেক্ষিত থেকে যায়।
কারণ
যে আদর্শিক বা বুদ্ধিবৃত্তিক অবস্থান থেকে এ ধরনের সমালোচনা উত্থাপিত হয়, তা সাধারণত কোনো একটি সংগঠন বা নির্দিষ্ট ইসলামী ধারার মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না।
বরং সময়, পরিস্থিতি ও প্রাসঙ্গিকতার ভিত্তিতে ইসলামপন্থী, ঐতিহ্যনিষ্ঠ এবং ধর্মীয় মূল্যবোধকেন্দ্রিক প্রায় সব ধারাই কোনো না কোনোভাবে সেই সমালোচনার লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়।
অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়,
একটি বিশেষ দল বা ধারার সমালোচনায় যারা সোচ্চার, তারা একই সঙ্গে অন্যান্য ধর্মীয় ধারা, আলিমসমাজ, ইসলামী শিক্ষাব্যবস্থা, মাদরাসা শিক্ষা কিংবা ইসলামী ঐতিহ্যের প্রতিও সমান বা আরও তীব্র আপত্তি পোষণ করে।
ফলে কোনো একটি ইসলামী গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে তাদের সমালোচনাকে অন্য কোনো ইসলামী ধারার প্রতি সমর্থন, স্বীকৃতি বা শ্রদ্ধার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে ব্যাখ্যা করা বাস্তবসম্মত নয়।
একটি পক্ষের বিরোধিতা করা মানেই যে তারা অন্য পক্ষকে আদর্শগতভাবে গ্রহণ করে নিয়েছে—এমন ধারণা অবান্তর ও ভিত্তিহীন।
এখানে রাজনৈতিক ও সামাজিক বাস্তবতার পরিবর্তনকেও বিবেচনায় রাখতে হবে। বিভিন্ন সময় বিশেষ পরিস্থিতির কারণে কোনো ইসলামী ধারা বা গোষ্ঠীর প্রতি আপাত সহনশীলতা, সহানুভূতি কিংবা ইতিবাচক মনোভাব প্রদর্শিত হতে পারে।
কিন্তু রাজনৈতিক কৌশল, ক্ষমতার সমীকরণ, সামাজিক প্রয়োজন কিংবা পরিস্থিতিগত স্বার্থকে স্থায়ী আদর্শিক অবস্থানের সমতুল্য মনে করা ঠিক নয়।
কোনো গোষ্ঠীর প্রতি সাময়িক নমনীয়তা যেমন স্থায়ী সমর্থনের প্রমাণ নয়, তেমনি অন্য কোনো গোষ্ঠীর সমালোচনাও অপর কোনো ধারার প্রতি গ্রহণযোগ্যতার দলিল নয়।
অতএব,
কোনো ইসলামী দল বা ঘরানার সমালোচনায় উচ্ছ্বাস প্রকাশের আগে বৃহত্তর আদর্শিক প্রেক্ষাপটটি বিবেচনা করা প্রয়োজন।
অনেক ক্ষেত্রে সমালোচনার লক্ষ্য কেবল একটি সংগঠন বা বিশেষ ব্যক্তি নয়; বরং ধর্মীয় কর্তৃত্ব, ইসলামী ঐতিহ্য, শরীয়তভিত্তিক মূল্যবোধ এবং জনপরিসরে ইসলামের সক্রিয় উপস্থিতির সামগ্রিক ধারণাটিই সেই সমালোচনার প্রকৃত কেন্দ্রবিন্দু হয়ে থাকে।
তাই সাময়িক দ্বন্দ্ব ও প্রতিদ্বন্দ্বিতার আবেগে বৃহত্তর বাস্তবতাকে আড়াল না করে দূরদর্শী ও বস্তুনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি গ্রহণ করাই অধিকতর সমীচীন।