রাজনীতির মূল অর্থ রাষ্ট্রশাসন ও পরিচালনার নীতি। বর্তমানে তা দ্বারা রাজনৈতিক উদ্দেশ্য সিদ্ধির উপায় ও কলাকৌশলকেও বোঝানো হয়। এ অর্থে একে অনেক রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ‘ব্যবহারিক রাজনীতি’ নামে অভিহিত করেছেন। অর্থাৎ রাজনীতির দুটি রূপ রয়েছে। একটি হলো- তার তাত্ত্বিক রূপ, অপরটি হলো- ব্যবহারিক রূপ।

‘রাজনীতি’ পরিভাষাটি সমাজে সুশাসন, ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থাপনা প্রসঙ্গে ইতিবাচক অর্থে যেমন ব্যবহৃত হয়, তেমনি এটি প্রায়শ একটি নেতিবাচক অর্থও বহন করে। যেমন বলা হয় যে, ‘আমরা রাজনৈতিক চাল চালি না।’ এখানে ‘রাজনীতি’ শব্দটি কূটকৌশল, কূটিল নীতি অর্থে ব্যবহৃত হয়েছে।

সুতরাং রাজনীতির অর্থ যদি হয় রাষ্ট্রের শাসন-ক্ষমতা লাভের উদ্দেশ্যে কূটকৌশল ও চাতুর্যের আশ্রয় গ্রহণ করা, তাহলে সেই অর্থে ইসলামে অবশ্যই রাজনীতি নেই। তদুপরি রাজনীতি যদি হয় ব্যক্তিস্বার্থ এবং গোষ্ঠী ও দলীয় অন্যায্য স্বার্থ হাসিলের পথ, তবে তা হবে ইসলামের দৃষ্টিতে চরম নিন্দনীয়।

কিন্তু রাজনীতির অর্থ যদি হয় রাষ্ট্র-শাসননীতি ও পরিচালনা ব্যবস্থা, তাহলে ইসলামে এ ধরনের রাষ্ট্রনীতি ও পরিচালনাব্যবস্থা অবশ্যই আছে; শুধু তা-ই নয়, কুরআন-হাদীসের অনেকাংশ জুড়েই এসব ফলপ্রসু নীতি ও ব্যবস্থার কথা স্পষ্ট ও সুন্দরভাবে বর্ণিত আছে, যেগুলো মান্য করে চললে সাধারণ জনগণ থেকে শুরু করে রাষ্ট্রপ্রধান পর্যন্ত সকলেই তার নিজ নিজ ন্যায্য অধিকার পাবে।

ইসলামে এ রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থার নাম খিলাফত ব্যবস্থা। ইসলামের দৃষ্টিতে রাষ্ট্রীয় ব্যাপারে এই খিলাফত ব্যবস্থা ভিন্ন অন্য যেকোনো ব্যবস্থা গ্রহণের সুযোগ নেই। আর এই খিলাফত ব্যবস্থায় বা ইসলামী রাষ্ট্রে সব কিছুই আল্লাহ তা‘আলার বিধান অনুযায়ী হয়ে থাকে।

পবিত্র কুরআনের বহু আয়াতে ও বিভিন্ন হাদীসে দ্বীন কায়িম, খিলাফত প্রতিষ্ঠা, আল্লাহ তা‘আলার বিধিবিধান অনুসারে বিচার-ফায়সলা ও শাসন এবং সমাজে ইনসাফ, শান্তি ও নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তার কথা জোরালোভাবে ফুটে ওঠেছে। নিম্নে উদাহরণস্বরূপ কয়েকটি আয়াত ও হাদীস তোলে ধরা হলো-

আল কুরআন:

১.

﴿شَرَعَ لَكُمْ مِنَ الدِّينِ مَا وَصَّى بِهِ نُوحًا وَالَّذِي أَوْحَيْنَا إِلَيْكَ وَمَا وَصَّيْنَا بِهِ إِبْرَاهِيمَ وَمُوسَى وَعِيسَى أَنْ أَقِيمُوا الدِّينَ وَلَا تَتَفَرَّقُوا فِيهِ﴾

‘‘তিনি তোমাদের জন্য সে দীন বিধিবদ্ধ করে দিয়েছেন, যার আদেশ তিনি দিয়েছিলেন নূহকে এবং যা আমি আপনার কাছে ওহীরূপে পাঠিয়েছি, উপরন্তু যার আদেশ আমি ইবরাহীম মূসা ও ‘ঈসাকে দিয়েছিলাম। (এদের সবাইকে আমি বলেছিলাম,) তোমরা এ জীবনব্যবস্থা (সমাজে) প্রতিষ্ঠিত করো এবং (কখনো) এতে অনৈক্য সৃষ্টি করো না।”

উল্লেখ্য যে, ‘ইকামতে দ্বীন’ একটি বহুল তাৎপর্যপূর্ণ পরিভাষা। এর কয়েকটি মর্ম হতে পারে এবং প্রত্যেকটি মর্মই এর উদ্দেশ্যের অন্তর্গত। যেমন-

ক. সকল মানুষকে দীনের মৌলিক আকীদা-বিশ্বাস ও বিধিবিধানের ওপর সুদৃঢ় রাখার ব্যবস্থা করা।

খ. দীনের বিধি-বিধানগুলোকে ব্যক্তি জীবন থেকে শুরু করে সমাজ ও রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষেত্রে পূর্ণভাবে কার্যকর করার ব্যবস্থা নেয়া।

গ. দীনের প্রচার-প্রসার এবং তাকে তার শত্রুদের কবল থেকে পরিপূর্ণ সুরক্ষার ব্যবস্থা করা।

২. ...

.....

আল হাদীস

১. ..

২. ..

....

একজন মুসলিমমাত্রই এ কথা বিশ্বাস করে যে,

ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনব্যবস্থা। এখানে মানবজীবনের সকল দিক ও বিভাগের যুক্তিপূর্ণ ও ভারসাম্যপূর্ণ সমাধান রয়েছে এবং এর আলোকে তার জীবনের সকল কিছুই পরিচালিত হবে। আল্লাহর হুকুম পালন কেবল ব্যক্তিজীবনে সীমাবদ্ধ রেখে সামাজিক, রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক প্রভৃতি ক্ষেত্রে অন্য কোনো ব্যবস্থা গ্রহণের কিংবা নিজের বিদ্যা-বুদ্ধি, অভিজ্ঞতা, ইচ্ছা-আকাঙ্ক্ষা ও প্রচলিত প্রথা অনুসারে চলার সুযোগ ইসলামে নেই।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا﴾

‘‘যে বিষয়ে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল কোনো ফায়সালা দেবে, তাতে কোনো মুমিন নর-নারীর জন্য এ ইখতিয়ার নেই যে, সে তা লঙ্ঘন করবে। আর যে এরূপ করবে সে সুস্পষ্ট গোমরাহীতে লিপ্ত হবে।”

কাজেই ইসলামে দ্বীন ও রাষ্ট্র একই সূত্রে গ্রথিত। এতে রাজনীতি থেকে দ্বীনকে এবং দ্বীন থেকে রাজনীতিকে বিচ্ছিন্ন করার কোনো অবকাশ নেই।

সাইয়িদুনা আবদুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,

الإسلام والسلطان أخوان توأمان لا يصلح واحد منهما إلا بصاحبه فالإسلام أس والسلطان حارس وما لا أس له يهدم وما لا حارس له ضائع

‘‘ইসলাম ও রাষ্ট্রক্ষমতা দুজন যমজ ভাইয়ের মতো, যাদের একজন অপরজন ব্যতীত সুস্থ হতে পারে না। সুতরাং ইসলাম হচ্ছে কোনো অট্টালিকার ভিতসদৃশ। আর রাষ্ট্রশক্তি হচ্ছে তার পাহারাদার। যে অট্টলিকার ভিত নেই তা যেমন ধ্বসে পড়তে বাধ্য, তেমনি যার পাহারাদার বা রক্ষক নেই তাও ধ্বংস হয়ে যেতে বাধ্য।’’

কেউ কেউ কথাটি এভাবেও উদ্ধৃত করেছেন,

الدين والملك توأمان ففي ارتفاع أحدهما ارتفاع الآخر لأن الدين أس والملك حارس وما لا أس له فمهدوم وما لا حارس له فضائع .

“দ্বীন ও রাষ্ট্র এ দুটি পরস্পর অবিচ্ছিন্ন। সুতরাং এ দুটি অংশের যেকোনো একটিকে যদি পরিত্যাগ করা হয়, তবে অন্য অংশও পরিত্যক্ত হয়ে পড়বে। কেননা, দ্বীন হলো ভিত্তি, আর রাষ্ট্র হলো প্রহরী ও রক্ষকস্বরূপ। বলাই বাহুল্য, যে ইমারতের ভিত্তি নেই, তা তো ধসে পড়বেই, আর যে ইমারতের প্রহরী ও রক্ষক নেই, তা তো বিনষ্ট হবেই।”

যাকাত অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে খলীফা আবু বকর আছ-সিদ্দিক রা.-এর যুদ্ধ ঘোষণা থেকে জানা যায়, ইসলামী রাষ্ট্রের প্রতিটি মুসলিম নাগরিক ব্যক্তিগত জীবনের পাশাপাশি সামাজিক, রাষ্ট্রীয় ও অর্থনৈতিক জীবনেও ইসলামের অনুশাসন মেনে চলতে বাধ্য।

বিশ্ববরেণ্য মুসলিম দার্শনিক কবি আল্লামা ইকবাল বলেন, ধর্ম ও রাষ্ট্র দেহ ও আত্মার সমতুল্য। এদের পারস্পরিক নিবিড় সংযোগ জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে অপরিহার্য, আর এদের পারস্পরিক বিরোধ বিচ্ছেদের নিশ্চিত পরিণতি ধ্বংস। তিনি ধর্মহীন রাজনীতিকে ‘ভূতের কন্যা’ ও ‘পঙ্কিল মনোবৃত্তি’র পরিচায়ক বলে উল্লেখ করেছেন। ইমাম গাযালী (রাহ.)-ও প্রায় একই রকম মত প্রকাশ করেছেন।

তিনি বলেন-

الدين والملك توأمان فلا يستغنى أحدهما عن الآخر.

“দ্বীন ও রাষ্ট্র_এ দুটি পরস্পর অবিচ্ছিন্ন। সুতরাং এ দুটির একটি অন্যটি ছাড়া চলতে পারে না।”

ইমাম গাযালী (রাহ.) অন্য জায়গায় বলেছেন,

إن نظام الدين لا يحصل إلا بنظام الدنيا .. والدين والسلطان توأمان... والسلطان ضروري في نظام الدنيا ونظام الدنيا ضروري في نظام الدين.

“দ্বীনের ওপর জীবনযাপন দুনিয়ার বিধিবদ্ধ ব্যবস্থাপনা ছাড়া সম্ভব নয়। ... দ্বীন ও রাষ্ট্রক্ষমতা দুটি পরস্পর অবিচ্ছিন্ন। ... রাষ্ট্রক্ষমতা দুনিয়ার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনার জন্য একান্ত প্রয়োজন আর দুনিয়ার সুশৃঙ্খল ব্যবস্থাপনা দ্বীনের ওপর জীবনযাপনের জন্য একান্ত প্রয়োজন।”

বর্তমানে অধিকাংশ আধুনিক শিক্ষিত লোক, এমনকি কতিপয় আলিমও মনে করে যে,

ইসলামের সাথে রাজনীতির কোনো সম্পর্ক নেই। এ ধারণা থেকে তাদের অনেকেই রাজনীতিকে পরিত্যাগ করে, তার সাথে কোনোরূপ সম্পর্ক না রেখে চলে। তাদের মতে, রাজনীতি সম্পূর্ণ ও মূলগতভাবে দুনিয়ারদারির ব্যাপার, দুনিয়াদার লোকেরাই কেবল রাজনীতি করে।

এ শ্রেণির লোকদের মুখে প্রায় শোনা যায় যে, তারা বলে বেড়ায়, ‘আমরা রাজনীতি করি না’ কিংবা ‘রাজনীতি অনেক দিন করেছি, এখন আর করি না’।

আবার কেউ কেউ বলে, ‘আমরা ধার্মিক লোক, রাজনীতির সাথে আমাদের কোনো সম্পর্ক নেই।’

এরূপ ধারণা চরম ভ্রান্ত। এর কারণ হলো,

এ ধারণা স্বয়ং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শ, আকীদা ও কর্মনীতির সম্পূর্ণ বিপরীত। রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর নুবুওয়াতী জীবন অকাট্যভাবে প্রমাণ করে যে, তিনি রাজনীতি করেছেন, রাষ্ট্রের সাথে তাঁর কাজের সংঘর্ষ হয়েছে এবং শেষ পর্যন্ত তিনি সব বাতিল রাষ্ট্র ও গায়র-ইসলামী রাজনীতির অবসান ঘটিয়ে পুরোপুরি ইসলামী রাষ্ট্র কায়িম করেছেন, সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ইসলামী আদর্শের রাজনীতি ও রাষ্ট্রব্যবস্থা। রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবদ্দশায় এবং তাঁর ইন্তিকালের পর তাঁর সাহাবা কিরাম রা. রাজনীতি করেছেন, রাষ্ট্র পরিচালনা করেছেন এবং রাষ্ট্র সংক্রান্ত যাবতীয় দায়িত্ব সম্পাদন করেছেন।

সাইয়িদুনা ‘আবদুল্লাহ ইবনু মাস‘উদ (রা.) সাহাবীদের সম্পর্কে বলেন,

اختارهم الله لصحبة نبيِّه ، ولإقامة دِينه

‘‘আল্লাহ তা‘আলা তাঁদের বাছাই করে নিয়েছেন তাঁর নবীর সঙ্গী-সাথী হওয়ার জন্য এবং তাঁর দ্বীনকে কায়িম করার জন্য।”

এখানে দুটি কথা বলা হয়েছে। প্রথম কথাটি থেকে প্রমাণিত হয়েছে যে,

সাহাবা কিরামের ফযীলত ও মর্যাদার একমাত্র ভিত্তি হলো রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুহবত লাভ করা, তাঁর সহযোগী ও সাথী হওয়া। সকলেই জানে যে, রাসূলুল্লাহ (সা.) -এর রিসালতের মূল দায়িত্ব পালনের ব্যাপারেই তাঁরাই ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাথী ও সহযোগী।

আর দ্বিতীয় কথা বলা হয়েছে, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর দীনকে কায়িম করার উদ্দেশ্যেই রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সাহাবীগণকে মনোনীত করেছেন।

এ দুটি কথা থেকে জানা যায় যে, তাঁদের নবীর সাথী ও সহযোগী বানিয়ে দেবার মূল লক্ষ্যই ছিল দ্বীন কায়িম করা। এ কথা থেকে যেমন একদিকে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আগমনের উদ্দেশ্যের কথা জানা যাচ্ছে, অপরদিকে সাহাবীদের জীবনের মহান মিশনের কথাও জানা যাচ্ছে।

বলাই বাহুল্য,

রাজনীতি শুধু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নাতই নয়; বরং তা হচ্ছে ইসলামী জীবনব্যবস্থার প্রহরী ও ত্রাতা। দুনিয়ায় যুগে যুগে নবী-রাসূল প্রেরণের মূলেও রয়েছে যমীনের বুকে আল্লাহর দ্বীন কায়িম করা এবং এর সাহায্যে মানব সমাজে ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠা করা। তাঁরা দুনিয়ায় এ দায়িত্ব পালন করেছেন পূর্ণ শক্তি দিয়ে, জীবন ও প্রাণ দিয়ে। আর আধুনিক পরিভাষায় এ-ই হচ্ছে রাজনীতি।

আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

﴿لَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلَنَا بِالْبَيِّنَاتِ وَأَنْزَلْنَا مَعَهُمُ الْكِتَابَ وَالْمِيزَانَ لِيَقُومَ النَّاسُ بِالْقِسْطِ وَأَنْزَلْنَا الْحَدِيدَ فِيهِ بَأْسٌ شَدِيدٌ وَمَنَافِعُ لِلنَّاسِ﴾

আমি আমার রাসূলগণকে সুস্পষ্ট নিদর্শনসহ প্রেরণ করেছি এবং তাঁদের সাথে অবতীর্ণ করেছি কিতাব ও মীযান (মানদণ্ড), যাতে মানুষ ইনসাফ প্রতিষ্ঠা করতে পারে। আরো নাযিল করেছি লোহা। এর মধ্যে রয়েছে প্রচণ্ড শক্তি ও জনগণের জন্য অপূর্ব কল্যাণ।

এ আয়াত থেকে যে মূল কথাটি জানা যাচ্ছে, তা হলো-

দুনিয়ার মানুষ সুষ্ঠু ও নির্ভুল ইনসাফের ভিত্তিতে জীবন যাপন করার সুযোগ লাভ করুক- এ উদ্দেশ্যে আল্লাহ তা‘আলা নবী-রাসূলগণকে পাঠিয়েছেন। নবী-রাসূলগণ যাতে করে দুনিয়ায় সঠিক ইনসাফ ও সুবিচার কায়িম করতে সক্ষম হন, তার জন্য রাসূলগণকে আল্লাহর নিকট থেকে প্রধানত দুটি বিষয় দেয়া হয়েছে।

একটি হলো- সুস্পষ্ট যুক্তি ও প্রমাণ, যা লোকদের সামনে নবী-রাসূলগণের নুবুওয়াত ও রিসালতকে সত্য বলে প্রমাণিত করে দেয়।

আর অপরটি হলো আল্লাহর কালাম, যা নাযিল করা হয়েছে মানুষের জীবন যাপনের বাস্তব বিধান হিসেবে।

এ ছাড়া আরো দুটি বিষয় দেয়া হয়েছে। একটি হলো ‘মীযান’ অর্থাৎ মানদণ্ড, মাপকাঠি; যার সাহায্যে ন্যায়-অন্যায়, ভালো-মন্দ ও সত্য-মিথ্যা প্রমাণ করা যায়। অপরটি হলো ‘হাদীদ’। চলতি কথায় এর অর্থ হলো লোহা।

ইমাম রাগিব আল-ইস্পাহানী [মৃ. ৫০২ হি.] রাহ. বলেন,

হাদীদ অর্থ হলো ধারালো, তীক্ষ্ণ, শক্তভাবে প্রভাববিস্তারকারী জিনিস। অতএব, ‘হাদীদ’ দ্বারা আমরা বুঝতে পারি প্রথমত লৌহ ধাতু, দ্বিতীয়ত এক শক্ত শাণিত ও অমোঘ প্রভাব বিস্তারকারী ও ক্ষমতা প্রয়োগকারী বস্তু। আর নবী-রাসূলগণের প্রসঙ্গে এর যে অর্থ অনায়াসে বোঝা যায় তা হলো- ‘জবরদস্ত শক্তি’।

নবী-রাসূলগণ আল্লাহ তা‘আলার বিধানের ভিত্তিতে অত্যন্ত তীব্র তীক্ষ্ণ শক্তিসম্পন্ন ও অমোঘ কার্যকর রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়িম করতেন, তারই সাহায্যে লৌহ-নির্মিত অস্ত্র ব্যবহার করে সমস্ত অন্যায় ও যুলমের পথ বন্ধ করতেন, আর নির্বিশেষে সমস্ত মানুষের ওপর নিরপেক্ষ ইনসাফ কায়িম করতেন।

কাজেই নবী-রাসূলগণকে যে ইনসাফ কায়িমের উদ্দেশ্যে পৃথিবীতে প্রেরণ করা হয়েছিল, খতমে নুবুওয়াতের পর সেই ইনসাফ কায়িম করা এবং তারই জন্য তীব্র শক্তি অর্থাৎ প্রভাবশালী রাষ্ট্রশক্তি প্রতিষ্ঠিত করা নবীর উম্মতের দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর এ শক্তি অর্জন করতে চেষ্টা করা, এ শক্তি অর্জন করে তার সাহায্যে ইনসাফ কায়িম করাকেই আধুনিক পরিভাষায় বলা হয় ‘রাজনীতি’।

বস্তুতপক্ষে দ্বীন কায়িম এবং সামাজিক ন্যায় ও সুবিচার প্রতিষ্ঠার নাম যদি রাজনীতি হয়, তবে এ রাজনীতি দ্বীন ইসলামের হাড়মজ্জার সাথে মিশ্রিত, ইসলামের প্রাণের সাথে সম্পৃক্ত।

সকল নবী-রাসূলই এরূপ রাজনীতি করেছেন। আজ যারা এ রাজনীতিকে ‘ক্ষমতার লোভ’ বলে দোষারোপ ও ঘৃণা প্রকাশ করছে, তারা বুঝতে পারে না যে, এ দোষারোপ কার্যত রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ওপরেই বর্তে, বর্তে সাহাবা কিরামের ওপর।

এ রাজনীতি ছাড়া যে দ্বীন, তা কোনোক্রমেই সেই দ্বীন ইসলাম নয়, যে দ্বীন নিয়ে এসেছিলেন আখিরী নবী। এ রাজনীতি পরিহার করে চলা এবং একে ‘ক্ষমতার লোভ’ বলে ঘৃণা করা ও গালাগালি করাই হলো এক অতি বড়ো গুমরাহি।

এ রাজনীতি অস্বীকার করা, তাকে পাশ কাটিয়ে চলা কিংবা রাজনীতির ব্যাপারে সম্পূর্ণ নির্লিপ্ত থেকে দ্বীনের কিছু অংশ প্রচার করা নিঃসন্দেহে ইসলামের প্রাণশক্তিকেই অস্বীকার করার শামিল।

এ গুমরাহি একদিকে ইসলামকে এক বৈরাগ্যবাদী ধর্মে পরিণত করেছে, অপরদিকে মুসলিমদের ওপর ফাসিক-ফাজিরদের কর্তৃত্ব ও জুলুম-শোষণ চলার ব্যবস্থা করে দিয়েছে। ইসলামিক স্কলারদের মতে, প্রত্যক্ষভাবে আল্লাহর দ্বীন কায়িমের রাজনীতি করা একান্ত কর্তব্য এবং ঈমানেরই দাবি।

....

উসূলুল ঈমান ৫ম খণ্ড (প্রকাশিতব্য) বই থেকে

(সংক্ষেপিত)