সুখের বিষয় হলো- জেনারেল লাইনে শিক্ষিত অনেক ধর্মপরায়ণ লোক ব্যক্তিগতভাবে দীনী বইপুস্তক ব্যাপক অধ্যয়ন করছেন, পাশাপাশি ইউটিউবে লেকচার শুনে দীন শেখার ও বোঝার চেষ্টা করছেন। তাদের কেউ কেউ আবার দীনের আনুষঙ্গিক নানা বিষয়ে পাণ্ডিত্যও অর্জন করছেন এবং মাঠে-ময়দানে দাওয়াহ-এর কাজেও নিজেদের ব্যাপৃত করছেন।
তাদের অনেকের বলার স্টাইল, ভাষাজ্ঞান ও যুক্তি উপস্থাপন আধুনিক শিক্ষিত সমাজ ও বুদ্ধিজীবী মহলের কাছে অতি জনপ্রিয় ও বহুল সমাদৃত।
উল্লেখ্য, প্রচলিত পদ্ধতিতে ওয়াজ-নসীহতের মাধ্যমে সর্বসাধারণের কাছে দীনের কথা পৌঁছানো যায় এবং দীনের শিক্ষা দেয়া যায় সত্যি; কিন্তু আধুনিক উচ্চ শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী মহলের কাছে আলিমদের সেই প্রথাগত ওয়াজ-নসীহত খুব একটা সমাদর লাভ করতে পারছে না।
কারণ, অধিকাংশ আলিমই আধুনিক উচ্চ শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবীদের মনন ও রুচির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ ভাষায় ও শব্দে কথা বলতে অভিজ্ঞ নন। তদুপরি আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, প্রচলিত নানা চিন্তাধারা এবং সামসময়িক অবস্থা সম্পর্কেও তাদের জানাশোনার বেশ স্বল্পতা রয়েছে।
পক্ষান্তরে এ ক্ষেত্রে জেনারেল শিক্ষিত দা‘ঈদের অনেকেই এগিয়ে রয়েছেন। তাদের আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞান, চিন্তাধারা ও সামসময়িক অবস্থা সম্পর্কে তাদের জানাশোনা আধুনিক উচ্চশিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী মহলকে ব্যাপকভাবে বিমোহিত করে থাকে।
সুতরাং জেনারেল লাইন থেকে ওঠে আসা দা‘ঈ এবং আলিম সমাজ- প্রত্যেকেরই নিজের দুর্বলতা, সীমাবদ্ধতা ও কর্মক্ষেত্র সম্পর্কে সম্যক ধারণা থাকা এবং পরস্পর কাজের মূল্যায়ন করা উচিত।
বলার অপেক্ষা রাখে না, জেনারেল লাইন থেকে ওঠে আসা দা‘ঈদের শরীয়তের কোনো শাখায় [যেমন- ফিকহ, ফাতওয়া, মাযহাব ও আকীদাগত জটিল ও সূক্ষ্ম বিষয়গুলো প্রভৃতি] শাস্ত্রীয় অভিজ্ঞতা অর্জনের সুযোগ হয়নি।
এ ক্ষেত্রে প্রকৃত ও যোগ্য আলিমগণ তাদের চেয়ে অনেক এগিয়ে রয়েছেন- সেটাই অনস্বীকার্য। অনেক আলিমেরই এসব বিষয়ে ব্যাপক পড়াশোনা ও অভিজ্ঞতা রয়েছে।
কাজেই এ জাতীয় বিষয়গুলোতে জেনারেল লাইন থেকে ওঠে আসা দাঈগণ যতই নীরব থাকবেন বা কম কথা বলবেন, ততই ভালো। তারা এ বিষয়ে কথার বলার দায়িত্ব কেবল সৎ ও অভিজ্ঞ আলিমদের কাছে সঁপে দেবেন- এটাই নিরাপদ ও যুক্তিযুক্ত।
এর পরিবর্তে তারা নিজেদেরকে মোটিভেশনাল কাজে যুক্ত রাখবেন। তারা লোকদের কুফর, শিরক ও নিফাকের বিপরীতে সত্যিকার ঈমান ও আমলের দিকে আহ্বান জানাবেন; সর্বসাধারণের কাছে আধুনিক নানা চিন্তা-বিশ্বাসের অসারতা তুলে ধরবেন, ইসলামের সৌন্দর্যাবলি ও কার্যকারিতা ব্যাখ্যা করবেন; ধর্মহীনতার যে সর্বপ্লাবী সয়লাব চলছে তার বিরুদ্ধে কথা বলবেন; উম্মাহর বিরুদ্ধে যে চর্তুমুখী ষড়যন্ত্র চলছে তার ব্যাপারে সর্বসাধারণকে সতর্ক করবেন। এটাই হলো তাদের উপযোগী কর্মক্ষেত্র। এ ক্ষেত্রে বর্তমান আলিমগণের তুলনায় তারা যে ভালো করবেন- তা বলাই বাহুল্য।
আমরা মনে করি, জেনারেল লাইন থেকে ওঠে আসা দা‘ঈ ও আলিমগণ- দু দলেরই উম্মতের প্রয়োজন রয়েছে। প্রত্যেকেই উম্মাহর জন্য নিজ নিজ যোগ্যতা অনুযায়ী দীন ও মিল্লতের জন্য কাজ করে যাচ্ছেন; তবে তাদের কাজের মধ্যে একটা সুন্দর সমন্বয় ও বোঝাপড়া থাকা প্রয়োজন। মনে করতে হবে, তারা প্রত্যেকেই একে অপরের সহায়ক ও পরিপূরক।
কাজেই প্রত্যেকেই নিজ নিজ দুর্বলতা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে সচেতন থাকবেন এবং একে অপরের যোগ্যতার ও কাজের মূল্যায়ন করবেন ও স্বীকৃতি দেবেন। কারো কোনো ভুল হয়ে থাকলে দরদ নিয়ে শুধরে দেবেন। এতেই দীন ও মিল্লত উপকৃত হবে।
পক্ষান্তরে যদি প্রত্যেকেই আত্মাভিমানী হই এবং একে অপরের যোগ্যতার মূল্যায়ন করতে না শিখি, কেউ কারো কাজের স্বীকৃতি না দেই; বরং ছোটবড় যে কোনো ভুলের জন্য একে অপরের রূঢ় সমালোচনায় মেতে উঠি এবং একজন অপরজনের কর্মক্ষেত্রে অনুপ্রবেশ করি, তাতে যে নিজেদের মধ্যে ফ্যাসাদ ও অনৈক্য প্রতিনিয়ত বৃদ্ধি পাবে, সর্বোপরি দীন ও মিল্লত যে ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হবে- তা বলাই বাহুল্য।