রাসূলুল্লাহ সা. কবে থেকে নবী_এ প্রসঙ্গে সম্প্রতি ফেবু পাড়ায় _ দেখছি_ আলিমগণের মধ্যে এক অনাকাঙ্ক্ষিত বাহারি বিতর্ক ও কাদা ছোড়াছুড়ি দিনের পর দিন বেশ প্রবল হয়ে ওঠছে।
এ বিষয়ে কিছু লেখার ইচ্ছা একদমই ছিল না; কিন্তু কতিপয় ফেবু ফ্রেন্ড ও ফলোয়ারের একান্ত অনুরোধে অতি সংক্ষেপে বিষয়টি সম্পর্কে আমার ক্ষুদ্র জ্ঞানের নির্যাস পেশ করছি।
আমার জানা ও অভিজ্ঞতা মতে,
রাসূলুল্লাহ সা. কবে থেকে নবী_ এতদসংশ্লিষ্ট কিছু বিষয় এমন, যার ওপর সব ঘরানার আলিমগণের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব নয়।
এ জাতীয় বিষয়গুলোতে পরস্পরের মধ্যে বাহাস-মুনাজারা-মুজাকারা হতে পারে; তবে সম্মিলিত সিদ্ধান্তে পৌঁছা বা আশানুরূপ ফল পাওয়া যে প্রায়ই অসম্ভব তা বলার অপেক্ষা রাখে না। কোনো পক্ষই তার অবস্থান-হক হোক বা বাতিল- তা থেকে চুল পরিমাণ সরতে প্রস্তুত হবে না, (ইল্লা মা শা'আল্লাহ)।
আর রাসুলুল্লাহ সা. কবে থেকে নবী_ এতদসংশ্লিষ্ট আর কিছু বিষয় এমন, যেগুলো নিয়ে বিভিন্ন ঘরানার আলিমগণ মতবিরোধ করলেও সেই মতবিরোধ নিছক অভিব্যক্তি ও উপস্থাপনাগত কিংবা একান্তই নির্দিষ্ট প্রেক্ষাপট বিবেচনানির্ভর; মৌলিক কোনো মতবিরোধ নয়। যেমন,
ক. এ ক্ষেত্রে কেউ তার ‘নুবুওয়াতের শুরু’ দ্বারা লাওহে মাহফূযে তার নুবুওয়াত নির্ধারণ, লিপিবদ্ধকরণকে বোঝান; [এককথায় তাকদীরে লিখন],
(উল্লেখ্য, এ তাকদীর লিপিবদ্ধ হয় আসমান ও জমিন সৃষ্টির পঞ্চাশ হাজার বছর পূর্বে, 'কলম' সৃষ্টির অব্যবহিত পর। এ সময় আল্লাহ তাআলার আদি ইলম ও ইচ্ছা অনুসারে জগতের সকল কিছুর ভাগ্য লাওহে মাহফূযে নির্ধারণ ও লিপিবদ্ধ করা হয়। )
খ. আবার কেউ ‘নুবুওয়াতের শুরু’ দ্বারা আদম [আ.]-এর দেহ সৃষ্টির আগে রুহের জগতে তার নুবুওয়াত সম্পর্কে সকলকে অবহিতকরণ এবং তাদের থেকে তার প্রতি ঈমান আনয়ন ও সহযোগিতাকরণের প্রতিশ্রুতি গ্রহণকে বোঝান; [এককথায়- ইখবার ও মীছাক গ্রহণ]
গ. আবার কেউ ‘নুবুওয়াতের শুরু’ দ্বারা দুনিয়ার জগতে কার্যক্ষেত্রে তার প্রতি নুবুওয়াতের দায়িত্ব অর্পণকে বোঝান, যার সূচনা হয় তার চল্লিশ বছর বয়সে হিরা গুহায় ওহী লাভের মাধ্যমে। এর পর থেকেই কার্যত তার নুবুওয়াতের দায়িত্ব পালন শুরু হয়।
কাজেই বোঝা যায়,
প্রত্যেকের কথার প্রেক্ষিত ও ক্ষেত্র (মহল) ভিন্ন ভিন্ন এবং প্রত্যেক কথাই প্রেক্ষিত ও ক্ষেত্র বিবেচনায় সঠিক।
সুতরাং এ বিষয়টি নিয়ে বিতর্কের-বাহাসের-চ্যালেঞ্জের কোনো যথার্থতা আছে বলে আমি মনে করি না।
[এর একটা উদাহরণ এভাবে দেওয়া যায়,
ধরুন, কর্তৃপক্ষ বিভিন্ন প্রার্থীদের থেকে কিছু যোগ্য লোককে ‘প্রফেসর’ পদের জন্য বাছাই করলো। অতঃপর সংশ্লিষ্ট দপ্তর থেকে তাদের নামে প্রজ্ঞাপন জারি করা হলো। অতঃপর বাছাইকৃত যোগ্য প্রার্থীগণকে স্ব স্ব পদে নিয়োগ দান করা হলো এবং তারা নির্দিষ্ট প্রক্রিয়া শেষ করে নিজ নিজ পদে যোগদান করলো।
লক্ষ্য করুন, এখানে তিনটি পর্যায় রয়েছে, প্রথম- বাছাই পর্ব, দ্বিতীয়- প্রজ্ঞাপন জারি, তৃতীয়- নিয়োগ দান ও কাজে যোগদান।
উল্লেখ্য, বাছাই পর্বে, অতঃপর প্রজ্ঞাপনের মধ্যে এদের পদের নাম ‘প্রফেসর’ হিসেবে উল্লেখ থাকলেও এবং এরা এ পদের যোগ্য ও বাছাইকৃত ব্যক্তিরূপে আগেভাগেই খ্যাতি লাভ করলেও
কার্যক্ষেত্রে ‘প্রফেসর’ হিসেবে পরিচয় লাভ করবেন এবং ‘প্রফেসর’রূপে অফিসিয়ালি স্বীকৃতি পাবেন সেদিন থেকেই, যেদিন তারা নিয়োগপত্র নিয়ে যথাবিধি কাজে যোগদান করবেন।]
এ প্রসঙ্গে যে মতের ওপর সকলের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব নয় বলে শুরুতে উল্লেখ করা হয়েছে তা হলো-
এ প্রশ্নের সাথে আল্লাহ তা‘আলার প্রথম সৃষ্টি কে বা কী এবং সৃষ্টির আদি কার্যকরণ কী?-এ প্রশ্নও জড়িত।
এক শ্রেণির সূফী ও তাদের অনুসারীগণের মতে,
আল্লাহ তা‘আলার প্রথম সৃষ্টি হলো সাইয়িদুল মুরসালীন মুহাম্মদ সা. এবং তিনিই হলেন সৃষ্টির আদি কার্যকারণ। বেরেলভীগণও এ মত পোষণ করেন।
খ্রিষ্টানরাও সাইয়িদুনা ঈসা আ. সম্পর্কে অনুরূপ মত পোষণ করেন। তাদের মতে, আল্লাহ তা‘আলার প্রথম সৃষ্টি হলো ঈসা আ. এবং তিনিই হলেন সৃষ্টির আদি কার্যকারণ।
বস্তুতপক্ষে এ প্রশ্নের সাথে লগস [logos] তত্ত্ব ও নূরে মুহাম্মদী তত্ত্ব জড়িত। এ বিতর্কের মূল এতোটাই গভীর ও শাখাপ্রশাখায় বিস্তৃত যে, এ প্রসঙ্গে সকল ঘরানার আলিমের ঐকমত্য প্রতিষ্ঠা আদৌ সম্ভব নয়।
উপর্যুক্ত সূফীগণের মতে,
‘নূরে মুহাম্মদী’ একটি মধ্যবর্তী সত্তা। এর মাধ্যমেই আল্লাহ তা‘আলা পরম অচিন, অজ্ঞেয়, অনির্দিষ্ট ও অনিয়ন্ত্রিত অবস্থা থেকে সত্তা ও গুণাবলির মিশ্রণজাত অবস্থায় নিজের কাছে নিজে আত্মপ্রকাশ করেন। এরই নাম প্রথম নির্ধারণী সত্তা বা প্রকাশ। পরবর্তীতে এ সত্তা থেকেই ক্রমে বিশ্বসৃষ্টির উদ্ভব ঘটেছে। ..
[হাযারী, সূফীতত্ত্বের আত্মকথা, পৃ. ৩৯]
এ প্রসঙ্গে বিস্তারিত জানতে পড়ুন,
আমার ‘তাসাউফের স্বরূপ’ [প্রসঙ্গ: লগস তত্ত্ব (نظرية الكلمة الالهية) ও নূরে মুহাম্মদী তত্ত্ব]