ইসলামী শাস্তি আইনের অন্যতম মৌলিক বৈশিষ্ট্য হলো অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে আনুপাতিকতা (Proportionality) নিশ্চিত করা। এর তাৎপর্য হলো, শাস্তির মাত্রা যেন অপরাধের প্রকৃতি, গুরুত্ব ও ক্ষতির তুলনায় অতিরিক্ত বা অযৌক্তিকভাবে কঠোর না হয়; বরং অপরাধের সঙ্গে যথাযথ সামঞ্জস্য ও সমতা বজায় থাকে।
তা‘যীরের ক্ষেত্রে এ নীতির বিশেষ গুরুত্ব রয়েছে। কেননা, হদ্দ ও কিসাসের ক্ষেত্রে শাস্তি শরী‘আত দ্বারা নির্ধারিত হওয়ায় বিচারকের নিজস্ব বিবেচনায় তার মাত্রা নির্ধারণের সুযোগ সীমিত।
বিপরীতে, তা‘যীরের ক্ষেত্রে শাস্তির ধরন ও মাত্রা নির্ধারণে বিচারক বা আইনগতভাবে ক্ষমতাপ্রাপ্ত কর্তৃপক্ষের বিবেচনাধীন ক্ষমতা থাকায় অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে আনুপাতিকতা ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা তুলনামূলকভাবে বেশি।
তা‘যীরের আওতাভুক্ত অপরাধের বৈচিত্র্য এবং সেগুলোর প্রকৃতি, গুরুত্ব ও ক্ষতির মাত্রায় পার্থক্যও শাস্তি নির্ধারণকে জটিল করে তোলে।
এ ক্ষেত্রে বিচারিক অদক্ষতা, ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, স্বজনপ্রীতি, অপরাধীর প্রতি অবজ্ঞা বা অতিরিক্ত সহানুভূতি, স্বদেশপ্রীতিজনিত পক্ষপাত এবং অপরাধের গুরুত্ব ও পরিস্থিতি যথাযথভাবে মূল্যায়নে ব্যর্থতা শাস্তির আনুপাতিকতা ব্যাহত করতে পারে।
ফলে যে বিবেচনাধীন ক্ষমতা অপরাধের পরিস্থিতি অনুযায়ী ন্যায়সংগত শাস্তি নির্ধারণের সুযোগ সৃষ্টি করে, তার অপপ্রয়োগই শাস্তিকে অন্যায়ের মাধ্যমে পরিণত করতে পারে।
এ কারণে তা‘যীরের ক্ষেত্রে বিচারিক বিবেচনার যথাযথ সীমা নির্ধারণ এবং শাস্তি প্রয়োগে বস্তুনিষ্ঠতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
হদ্দ ও কিসাসের আওতাভুক্ত নয়—এমন বিভিন্ন অপরাধের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য ফিকহি বিধান ও আইনগত শর্তসাপেক্ষে তা‘যীরের শাস্তি আরোপ করা হতে পারে।
যেমন—প্রতারণা, খাদ্যে ভেজাল, মাপে কম দেওয়া, ঘুষ গ্রহণ, মিথ্যা সাক্ষ্য, যিনা ব্যতীত অন্য কোনো অপরাধের অপবাদ দেওয়া এবং বেগানা মহিলাকে চুম্বন করার মতো অপরাধ। এ ছাড়া, হদ্দ প্রয়োগের নির্ধারিত শর্ত পূরণ না হলেও কোনো কর্মকাণ্ড স্বতন্ত্রভাবে তা‘যীরযোগ্য হতে পারে।
এসব অপরাধের প্রকৃতি, গুরুত্ব ও ক্ষতির মাত্রা এক নয়। তাই অপরাধের ধরন, সংঘটনের পরিস্থিতি, ক্ষতির পরিমাণ, অপরাধীর প্রাসঙ্গিক অবস্থা এবং পুনরাবৃত্তির আশঙ্কা বিবেচনায় নিয়ে শাস্তির ধরন ও মাত্রা নির্ধারণ করাই আনুপাতিকতার নীতির দাবি।
অপরাধের গুরুত্ব উপেক্ষা করে অতিরিক্ত কঠোর শাস্তি আরোপ যেমন এ নীতির পরিপন্থী, তেমনি প্রাসঙ্গিক বিষয় বিবেচনা না করে শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ করাও ন্যায়সংগত নয়।
তা‘যীরের ক্ষেত্রে বিচারকের বিবেচনাধীন ক্ষমতা সীমাহীন বা স্বেচ্ছাধীন নয়; বরং শরী‘আতের বিধান, প্রযোজ্য আইন ও ন্যায়বিচারের মৌলিক নীতির দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। রাষ্ট্রের আইনসভাও তা‘যীরের শাস্তির ধরন, সীমা ও প্রয়োগপদ্ধতি নির্ধারণে প্রয়োজনীয় আইন প্রণয়ন করতে পারে। বিচারককে সংশ্লিষ্ট বিধানের আওতায় অপরাধের গুরুত্ব ও পরিস্থিতি বিবেচনা করে শাস্তি নির্ধারণ করতে হবে।
একই ধরনের অপরাধের ক্ষেত্রে পরিস্থিতিগত পার্থক্যের কারণে শাস্তির মাত্রায় ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য হতে পারে; তবে সে ভিন্নতার পেছনে বস্তুনিষ্ঠ ও যুক্তিসংগত কারণ থাকতে হবে। ব্যক্তিগত বিদ্বেষ, পক্ষপাত কিংবা অপ্রাসঙ্গিক বিবেচনার ভিত্তিতে শাস্তির তারতম্য ঘটানো আনুপাতিকতা ও ন্যায়বিচারের নীতির পরিপন্থী।
বিচারকের বিবেচনাধীন ক্ষমতার অপব্যবহার ও স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিরোধে কয়েকটি ব্যবস্থা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রথমত, তা‘যীরের শাস্তির ধরন ও সর্বোচ্চ সীমা সম্পর্কে সুস্পষ্ট আইনগত বিধান প্রণয়ন;
দ্বিতীয়ত, অপরাধের গুরুত্ব ও শাস্তির মাত্রা নির্ধারণে বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড অনুসরণ;
তৃতীয়ত, শাস্তি নির্ধারণের কারণ ও যুক্তি বিচারিক রায়ে উল্লেখ;
এবং চতুর্থত, আপিল ও বিচারিক পর্যালোচনার কার্যকর সুযোগ নিশ্চিত করা।
পাশাপাশি,
সমজাতীয় অপরাধের ক্ষেত্রে সামঞ্জস্যপূর্ণ নীতি অনুসরণ এবং শাস্তি নির্ধারণে বৈষম্য ও পক্ষপাত পরিহার করাও অপরিহার্য।
এসব ব্যবস্থা বিচারকের বিবেচনাধীন ক্ষমতা বিলোপ করার জন্য নয়; বরং সেই ক্ষমতার ন্যায়সংগত প্রয়োগ নিশ্চিত করার জন্য প্রয়োজনীয়।
অতএব,
তা‘যীরের ক্ষেত্রে বিচারকের বিবেচনাধীন এখতিয়ার অপরাধের বৈচিত্র্য ও পরিস্থিতির ভিন্নতা বিবেচনায় নিয়ে অপরাধ ও শাস্তির মধ্যে যথাযথ আনুপাতিকতা নিশ্চিত করার সুযোগ সৃষ্টি করে। কিন্তু এ এখতিয়ার যথাযথ সীমা ও নীতিমালার মধ্যে প্রয়োগ না হলে ন্যায়বিচারের পরিবর্তে স্বেচ্ছাচারিতার পথ উন্মুক্ত হতে পারে।
তাই তা‘যীরের ক্ষেত্রে শাস্তির ন্যায্যতা কেবল বিচারকের বিবেচনাধীন ক্ষমতার ওপর নির্ভর করে না; বরং সেই ক্ষমতার আইনসম্মত, বস্তুনিষ্ঠ, যুক্তিনির্ভর ও জবাবদিহিমূলক প্রয়োগের ওপরই এর সার্থকতা নির্ভরশীল।
অপরাধের তুলনায় শাস্তি যখন সীমা ছাড়িয়ে যায়, তখন ন্যায়বিচারের হাতিয়ারও জুলুমের মাধ্যমে পরিণত হতে পারে।