বরাবরই লক্ষ্য করা যায়,
ইসলামী দলগুলোর ঐক্যের প্রসঙ্গ উত্থাপিত হলেই প্রায়শ আলোচনাটি ঘুরে ফিরে আকীদার প্রশ্নে গিয়ে ঠেকে। এতে সন্দেহ নেই, টেকসই ও দীর্ঘস্থায়ী ঐক্যের জন্য আকীদাগত মিল এক অত্যাবশ্যক অনুষঙ্গ।
কিন্তু প্রশ্ন হলো —
আমাদের দেশে বিদ্যমান বিভিন্ন ঘরানার আলিমদের আকীদা-সংক্রান্ত জ্ঞানের মান আসলে কতটা?
পর্যবেক্ষণে দেখা যায়,
আকীদার বিষয়ে আমাদের বেশিরভাগ আলিম—কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া—গভীরতা ও সমকালীন প্রেক্ষাপট-সচেতনতার দিক থেকে স্পষ্ট ঘাটতিতে ভোগেন।
তাদের অনেকের জ্ঞান কেবল ঐতিহ্যগত বা সনাতন চিন্তাধারার বৃত্তের মধ্যেই সীমাবদ্ধ;
আধুনিক যুগে নানা দার্শনিক, বৌদ্ধিক ও আদর্শগত প্রবণতা—যেগুলোর মাধ্যমে ইসলামী বিশ্বাসকে চ্যালেঞ্জ জানানো হচ্ছে—সেগুলোর বিষয়ে তাদের জ্ঞানের পরিধি প্রায়শই সীমিত। এ ব্যাপারে তাদের অনেকের চরম অজ্ঞতাও তাদের কথাবার্তায় মাঝেমধ্যে ফুটে ওঠে।
ফলে দেখা যায়—
শাইখুল হাদীস, প্রধান মুফতী, বা খ্যাতনামা মুফাসসিরদের মতো অনেক উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন ব্যক্তির মাঝেও আধুনিক কুফরি ধ্যান-ধারণা ও মতাদর্শের বিরুদ্ধে প্রায়ই কোনো সুস্পষ্ট অবস্থান, ফাতওয়া বা কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। বরং অনেক সময় তারা এমন গোষ্ঠীর সাথেও সৌহার্দ বজায় রাখেন, যারা স্পষ্টতই বিভ্রান্তিকর মতাদর্শ প্রচার করে। সনাতন আকীদা রক্ষায় তাদের অঙ্গীকার থাকলেও, আধুনিক কুফর ও ধর্মবিরোধী প্রবণতা মোকাবিলায় তাদের উদাসীনতা লক্ষণীয়।
অন্যদিকে,
আরেক শ্রেণির আলিম ও ইসলামী চিন্তাবিদ আছেন, যাদের আধুনিক চিন্তা, দর্শন ও মতবাদ বিষয়ে তুলনামূলক সচেতনতা রয়েছে, কিন্তু ইসলামের মূল বা ঐতিহ্যগত আকীদা-বিশ্বাস সম্পর্কে তাদের জ্ঞানের ভাণ্ডার অত্যন্ত সীমিত।
এর ফলস্বরূপ,
আধুনিক ইসলামী চিন্তাবিদ বা বুদ্ধিজীবী পরিচয়ে পরিচিত বহু ব্যক্তির চিন্তায় ইসলামের নানা গুরুত্বপূর্ণ আকিদা-বিশ্বাসের ব্যাপারে গুরুতর ভ্রান্তি ও অস্পষ্টতা পরিলক্ষিত হয়। তারা আধুনিক কুফরি চিন্তাধারার বিরুদ্ধে সরব থাকলেও, ইসলামের ঐতিহ্যগত আকীদা সংরক্ষণে যথাযথ মনোযোগ দেন না। এ ক্ষেত্রে তাদের উদাসীনতা দুঃখজনকভাবে স্পষ্ট।
সার্বিকভাবে বলা যায়,
আকীদার ক্ষেত্রে আমাদের আলিমসমাজের এই দ্বিমুখী দুর্বলতা ইসলামী ঐক্য ও জ্ঞানচর্চার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ প্রতিবন্ধক।
একদিকে ঐতিহ্যের আবদ্ধতা, অন্যদিকে আধুনিকতার অগভীরতা—উভয় মিলেই আকীদাগত ভারসাম্যের অভাব তৈরি করেছে।
ইসলামী চিন্তা ও আন্দোলনের টেকসই ভিত্তি গড়ে তুলতে হলে আকীদার এই জ্ঞানগত ঘাটতি পূরণে সমন্বিত উদ্যোগ গ্রহণ অপরিহার্য হয়ে উঠেছে।