আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেন:

“তুমি এমন কোনো জাতিকে পাবে না, যারা আল্লাহ ও আখিরাতে ঈমান রাখে, অথচ তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের বিরোধিতাকারীদের সাথে বন্ধুত্ব স্থাপন করে—যদিও তারা তাদের পিতা, সন্তান, ভাই অথবা আত্মীয়স্বজনই হোক।”

— (সূরা আল-মুজাদালা, ৫৮:২২)

এই আয়াত ঈমানের একটি মৌলিক নীতিকে স্পষ্ট করে—

প্রকৃত মুমিনের আকীদা তাকে আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আনুগত্যে দৃঢ় রাখে, সত্য ও ন্যায়ের প্রশ্নে আপসহীন করে এবং ইসলামবিরোধী শক্তির ওপর নির্ভরশীলতা থেকে দূরে থাকতে শিক্ষা দেয়। তার অবস্থান সুবিধাবাদী সমঝোতার নয়; বরং আল্লাহর সন্তুষ্টিকে কেন্দ্র করে নীতিগত দৃঢ়তা ও অকুতোভয়তার পরিচায়ক।

যদি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী ঈমানের দাবি করেও কুফরী ও জালিম শক্তির সঙ্গে এমন সখ্য গড়ে তোলে, যা তাদের স্বার্থ ও আধিপত্যকে শক্তিশালী করে, তবে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—তাদের ঈমানের দাবি কতটা সহীহ, এবং তাদের কথিত অবস্থান ও বাস্তব কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোনো স্পষ্ট অসঙ্গতি সৃষ্টি হচ্ছে না তো?

দীর্ঘদিন ধরে আমরা দেখতে পাচ্ছি, কিছু আরব শাসকগোষ্ঠী ইস্রা-মেরিকার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক বজায় রেখেছে। শুধু কূটনৈতিক সম্পর্ক নয়, বরং অনেক ক্ষেত্রে সামরিক নির্ভরতা, ঘাঁটি স্থাপনের অনুমতি এবং নিরাপত্তা নীতিতে পূর্ণ নির্ভরশীলতা গড়ে উঠেছে।

তাদের যুক্তি—এতে জাতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। কিন্তু ইতিহাস বারবার দেখিয়েছে, আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে স্থায়ী বন্ধু বা শত্রু নেই; থাকে কেবল স্বার্থ। যে শক্তি আজ মিত্রের ভান করে, কাল স্বার্থের প্রয়োজনে ভিন্ন অবস্থান নিতেও দ্বিধা করে না। অতএব, কেবল বাহ্যিক আশ্বাসে নিশ্চিন্ত থাকা কৌশলগত দূরদর্শিতার পরিচয় নয়।

অন্যদিকে, ইরানের শাসকগোষ্ঠী শিয়া মতাদর্শে বিশ্বাসী—যার সঙ্গে সুন্নি আকীদার বহু মৌলিক বিষয়ে গভীর মতপার্থক্য রয়েছে এবং কিছু ক্ষেত্রে তা গুরুতর ধর্মতাত্ত্বিক বিরোধেও রূপ নিয়েছে।

তবে সমসাময়িক বৈশ্বিক প্রেক্ষাপটে তারা ইস্রা-মেরিকার বিরুদ্ধে স্পষ্ট রাজনৈতিক অবস্থান নিয়েছে—এটিও একটি বাস্তবতা।

অনেকের দৃষ্টিতে এই অবস্থান আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য রক্ষায় ভূমিকা রাখছে এবং পরোক্ষভাবে অন্য মুসলিম রাষ্ট্রগুলোর জন্য এক ধরনের প্রতিরোধক বলয় তৈরি করছে। যদিও এটি চূড়ান্ত সমাধান নয়, তবু ভূ-রাজনীতির বাস্তবতায় শক্তির ভারসাম্য একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান।

যদি ইরান দ্রুত দুর্বল হয়ে পড়ে, তবে ইতোমধ্যেই পরাশক্তির প্রভাবাধীন আরব রাষ্ট্রগুলো আরও তীব্র কৌশলগত চাপে পড়বে। এতে তাদের স্বাধীন কণ্ঠ, নীতিগত অবস্থান ও আত্মনির্ভর সক্ষমতা ক্রমশ সংকুচিত হয়ে পড়বে। দীর্ঘমেয়াদে এমন পরিস্থিতি তাদের জন্য স্বতন্ত্র ও স্বনির্ভর অবস্থান পুনর্গঠনকে আরও কঠিন করে তুলবে। পরনির্ভরতার শৃঙ্খল একবার দৃঢ়ভাবে বেঁধে বসলে, সেখান থেকে মুক্ত হওয়া যে কত দীর্ঘ ও জটিল প্রক্রিয়া—তা অনুমান করাও সহজ নয়।

এটাও অস্বীকার করার উপায় নেই যে,

মধ্যপ্রাচ্যের কিছু সুন্নি রাষ্ট্র ইরানের প্রভাববিস্তারমূলক নীতির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে; এ ধরনের হস্তক্ষেপ বা আধিপত্যকামী প্রবণতা নিঃসন্দেহে সমর্থনযোগ্য নয়।

তবে ক্ষমতার একটি স্বাভাবিক বৈশিষ্ট্য হলো—সেটি সুন্নি হোক বা শিয়া—নিজের প্রভাব বিস্তারের চেষ্টা করা। আমাদের সমাজেও বিভিন্ন মাজহাব ও মতাদর্শিক গোষ্ঠীর মধ্যে সহনশীলতার ঘাটতি লক্ষ্য করা যায়; যে পক্ষ শক্তিশালী হয়, অনেক সময় সে-ই প্রাধান্য বিস্তারে আগ্রহী হয়ে ওঠে।

সেই বাস্তবতায় আঞ্চলিক রাজনীতিতে সম্পূর্ণ নিরপেক্ষ, নিঃস্বার্থ ও সহনশীল আচরণ প্রত্যাশা করা কতটা বাস্তবসম্মত—সেটি গভীরভাবে ভাবার বিষয়।

এ প্রেক্ষাপটে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন হলো:

বিপুল প্রাকৃতিক সম্পদ, শক্তিশালী অর্থনীতি ও বিপুল জনশক্তি থাকা সত্ত্বেও আরব রাষ্ট্রগুলো কেন টেকসই ও আত্মনির্ভর প্রতিরক্ষা সক্ষমতা গড়ে তুলতে পারছে না?

কেন তারা প্রযুক্তি, শিক্ষা ও সামরিক প্রস্তুতিতে নিজস্ব ভিত্তি শক্ত করার পরিবর্তে বাইরের ওপর নির্ভরতার পথ বেছে নিয়েছে?

আল্লাহর নির্দেশ—“তোমরা তোমাদের সামর্থ্য অনুযায়ী শক্তি প্রস্তুত করো”—এটি তো কেবল আধ্যাত্মিক আহ্বান নয়; বরং কৌশলগত প্রস্তুতিরও নির্দেশনা। তবে কি এ নির্দেশ তাদের কর্ণকুহূরে পৌঁছায় না?

যে রাষ্ট্র বা গোষ্ঠী নিজস্ব শক্তি, সক্ষমতা ও নীতিগত দৃঢ়তার ওপর দাঁড়াতে শেখে না, তার পক্ষে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান ও মর্যাদা অর্জন করা কঠিন। দীর্ঘমেয়াদি পরনির্ভরতা ধীরে ধীরে তার রাজনৈতিক স্বাধীনতা ও স্বতন্ত্র সিদ্ধান্তগ্রহণের ক্ষমতাকে সংকুচিত করে দেয়। ফলত বাস্তবতা দাঁড়ায়—হয় পরাশক্তির প্রভাব মেনে চলতে হয়, নয়তো আঞ্চলিক প্রতিদ্বন্দ্বীর কর্তৃত্বের ছায়ায় অবস্থান নিতে হয়।

অতএব, আবেগপ্রসূত প্রতিক্রিয়া নয়—সময় দাবি করছে সুদূরপ্রসারী দৃষ্টিভঙ্গি, গভীর আত্মসমালোচনা এবং বাস্তবসম্মত কৌশলগত পরিকল্পনা।

আরব সুন্নি রাষ্ট্রগুলোর প্রকৃত শক্তি বাইরের আশ্রয়ে নয়; বরং তাদের পারস্পরিক ঐক্য, সামরিক আত্মনির্ভরতা, প্রযুক্তিগত ও জ্ঞানগত অগ্রগতি এবং নৈতিক দৃঢ়তার মধ্যেই নিহিত।

যতদিন তারা পরনির্ভর নিরাপত্তা ও অস্থায়ী মিত্রতার ওপর নির্ভর করে থাকবে, ততদিন তাদের স্বাধীন সিদ্ধান্তগ্রহণ সীমাবদ্ধই থাকবে—পরাধীনতার শৃঙ্খলই যেন তাদের নিয়তিতে পরিণত হবে।

কিন্তু যদি তারা নিজেদের সম্পদ, জনশক্তি ও ভৌগোলিক গুরুত্বকে কৌশলগতভাবে কাজে লাগিয়ে সমন্বিত প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা গড়ে তোলে, গবেষণা ও উদ্ভাবননির্ভর শিক্ষা বিস্তৃত করে এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক শাসনব্যবস্থা প্রতিষ্ঠা করে, তবে তাদের অবস্থান স্বাভাবিকভাবেই দৃঢ় ও মর্যাদাপূর্ণ হয়ে উঠবে।