(সম্প্রতি দেশে ‘কাফির’ ফাতওয়া দেয়ার প্রবণতা ক্রমশ যেহারে বেড়ে চলছে তাতে মনে হয়, এখানে মুসলমান বলতে কেউ থাকবে না। উল্লেখ্য, যখন তখন যাকে তাকে কাফির ফাতওয়া দেয়া একটি মস্ত বড় ফিতনা ও জঘন্য অপরাধ। ইসলামের ইতিহাসে উগ্রবাদী ও বিদআতী খারিজীরাই সর্বপ্রথম গণহারে সাহাবীগণকে কাফির ফাতওয়া দিয়েছিল এবং এ কারণে তারা বহু সাহাবীকেও হত্যা করেছিল।)

কোনো কোনো মুসলিম অনেক সময় জীবনে এমন অনেক কাজ করে এবং এমন অনেক কথা বলে, যা বাহ্যত কুফর কিংবা কুফরের সন্দেহযুক্ত। কিন্তু তাই বলে তাকে সরাসরি ‘কাফির’ ফাতওয়া দেয়া সঙ্গত নয়। কারণ, কখনো কোনো কুফরী কাজ করা বা কথা বলা এবং কাফির ফাতওয়া দেয়া এক কথা নয়। এ দুটির মধ্যে পার্থক্য রয়েছে। একটি হলো কর্ম, অপরটি বিশেষণ।

উল্লেখ্য, নিছক কোনো কথা বা কাজের জন্য কাউকে ঐ কথা বা কাজের বিশেষণ দ্বারা ভূষিত করা সঙ্গত নয়, যদি উক্ত কথা বা কাজ তার স্বভাবসিদ্ধ কিংবা তার প্রকৃত চিন্তার স্বাভাবিক অভিব্যক্তি না হয়। মানব জীবনে বিচ্ছিন্নভাবে কিংবা নানা প্রেক্ষিতে অনেক কাজই সংঘটিত হয়, তাই বলে তাকে ঐ কাজের বিশেষণ দ্বারা ভূষিত করা সমীচীন নয়।

পবিত্র কুরআনে যেসব লোক আল্লাহর নাযিলকৃত বিধান অনুসারে ফায়সালা করে না তাদেরকে কাফির বলা হয়েছে, কিন্তু আমাদের মুফতীরা কেউ তাদেরকে কাফির বলে ফাতওয়া দেয় না। হাদীসে ইচ্ছাকৃতভাবে নামায ছেড়ে দেয়াকেও কুফরী কর্ম বলা হয়েছে, কিন্তু আমরা কেউ ইচ্ছাকৃতভাবে নামায তরককারীকে কাফির ফাতওয়া দেই না। অনুরূপ হাদীসে যারা তাবীজ ব্যবহার করে সাধারণভাবে তাদেরকে শিরকে লিপ্ত বলা হয়েছে, কিন্তু আমরা কেউ তাদেরকে মুশরিক বলে ফাতওয়া দেই না।.... এর কারণ হলো,

প্রথমত, এ জাতীয় কথা বা কর্মে হয়তো নানা ব্যাখ্যার সম্ভাবনা থাকে অথবা যে কোনোরূপ সংশয় থাকে। উল্লেখ্য, সংশয়যুক্ত কিংবা ভিন্ন ব্যাখ্যার সম্ভাবনা রাখে অথবা যেসব বিষয়ে সত্যনিষ্ঠ ইমামগণের মধ্যে মতবিরোধ রয়েছে-এরূপ কোনো কথা বা কাজের জন্য কাউকে কাফির ফাতওয়া দেয়া যায় না।

কোনো মুসলিম যে যাবত না কোনো অকাট্য, সুস্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত হবে, তাকে কোনো পাপ কিংবা কোনো সন্দেহজনক কাজ বা বক্তব্য অথবা মতবিরোধপূর্ণ বিশ্বাসের কারণে কাফির আখ্যা দেয়া মোটেই বাঞ্ছনীয় নয়। রাসূল সা. বলেন, "তিনটি বিষয় মূল ঈমানের অন্তর্ভুক্ত। ১. যে ব্যক্তি লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ ঘোষণা দেবে তার (জান মাল ও ইজ্জতের ওপর যে কোনোরূপ অবৈধ হস্তক্ষেপ থেকে) বিরত থাকা, ২. তাকে আমরা কোনো পাপের কারণে কাফির বলবো না, ৩. কোনো আমলের কারণে ইসলাম থেকেও বের করে দেবো না।" (আবু দাউদ)

ফকীহগণের মতে, কোনো বিষয়ে কাউকে কাফির বলার মতো বহু উপলক্ষ থাকলেও যদি তাতে এমন কোনো উপলক্ষ খোঁজে পাওয়া যায়, যার ওপর ভিত্তি করে তাকে কাফির বলা যাবে না, তাহলে মুফতীর জন্য উচিত হবে, মুসলিমের প্রতি সুধারণা পোষণ করত সেই উপলক্ষ গ্রহণ করা। (ফাতহুল কাদীর, আল বাহরুর রায়িক, রাদ্দুল মুহতার...)

ফকীহগণের এ কথার মর্ম হলো, ঈমানের দাবিদার কোনো ব্যক্তি সাধারণত জেনেশুনে কুফরী করবেন না বলেই ধরে নিতে হবে। কারো কথা বা কর্ম বাহ্যত কুফরী হলেও যদি তার কোনোরূপ ইসলামসম্মত ব্যাখ্যা দেওয়া যায়, তা দূরবর্তী হলেও সেই ব্যাখ্যা গ্রহণ করে তাকে মুমিন বলে ধরে নিতে হবে। সর্বোপরি ঈমানের দাবিদার কোনো ব্যক্তি যদি সুস্পষ্ট কুফরীতে লিপ্ত হয়, তবে তার কর্মকে কুফরী বলা হলেও তাকে কাফির বলার আগে এ বিষয়ে তার কোনো ওযর বা ব্যাখ্যা আছে কিনা তা জানতে হবে। সেই ব্যক্তি অজ্ঞতা, ভয় বা অন্য কোনো ওযরের কথা উল্লেখ করলে তা গ্রহণ করা হবে।

মুল্লা আলী আলকারী (রাহ.) বলেন,

‘‘কোনো মুমিন যদি এমন কোনো কাজে লিপ্ত হয় বা কথা বলে, যা কুরআন-সুন্নাহর বর্ণনা অনুসারে কুফর বা শিরকরূপে গণ্য, তবে তার কর্ম বা কথাকে অবশ্যই শিরক বা কুফর বলা হবে; তবে ব্যক্তিগতভাবে উক্ত ব্যক্তিকে কাফির বা মুশরিক বলার আগে দেখতে হবে যে, অজ্ঞতা, ব্যাখ্যা, ভুল বুঝা বা এ জাতীয় কোনো ওযর তার আছে কিনা।”

রাসূল সা. কোনো মুসলিমকে কাফির বলতে কঠোর সতর্কতা অবলম্বনের নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন, "কোনো ব্যক্তি তার ভাইকে কাফির বলে আখ্যায়িত করলে তাদের দুজনের যে কোনো একজন এর সম্মুখীন হবে। যাকে কাফির ডাকা হয়েছে সে যদি বাস্তবিকই কাফির হয় তাহলে কোনো অসুবিধা নেই। তবে সে যদি বাস্তবিকই কাফির না হয়, তাহলে কাফির আখ্যায়িতকারী নিজেই এ আখ্যার উপযোগী হবে।"(বুখারী) অন্য হাদীসে তিনি বলেন,"যে ব্যক্তি কোনো মুমিনের প্রতি কুফরীর অভিযোগ দিল, সে প্রকারান্তরে যেন তাকে হত্যা করলো।" (বুখারী)

দ্বিতীয়ত, এ জাতীয় ফাতওয়ার ফলে একদিকে পাপী মুসলিমদের সংশোধনের সম্ভাবনা তিরোহিত হয়ে যায়, অপরদিকে ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়। এভাবে মুসলিম কমিউনিটি দুর্বল হয়ে পড়ে। আমরা জানি, পবিত্র মদীনার অনেক মুনাফিক, যারা সাচ্চা কাফির ছিল এবং তাদের থেকে নানা সময় ইসলাম, মুসলমান ও রাসূল সা. সম্পর্কে বিরূপ মন্তব্য প্রকাশ পেয়েছিল, এতদসত্ত্বেও রাসূল সা. তাদেরকে কাফির আখ্যা দিয়ে মুসলিম কমিউনিটি থেকে বের করে দেননি; বরং তাদেরকে নিজেদের সাথে রেখে সংশোধনের সুযোগ দান করেন।

[উসূলুল ঈমান ২য় খণ্ড (প্রকাশিতব্য) বই থেকে]

(সংক্ষেপিত)