সম্মানিত মুফতী রেজাউল করীম আবরার ও মুফতী আলী হাসান,

আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ।

প্রথমেই একটি বিষয় স্পষ্ট করে বলতে চাই—

আপনাদের কারও সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই; কখনও সাক্ষাৎও হয়নি। তবু দূর থেকে আপনাদের বক্তব্য, আলোচনা ও ইলমী কর্মকাণ্ড পর্যবেক্ষণ করে আমার মনে হয়েছে, আপনারা দুজনই প্রখর মেধাবী, অধ্যয়নশীল এবং আগামী দিনের সম্ভাবনাময় আলিম। আপনাদের ইলমী সামর্থ্য, বিশ্লেষণক্ষমতা ও বাগ্মিতা আমাকে বরাবরই মুগ্ধ করেছে।

একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমি আন্তরিকভাবে দোয়া করি—আল্লাহ তাআলা আপনাদের ইলমে বরকত দান করুন এবং দ্বীন ও উম্মাহর কল্যাণে আরও ব্যাপকভাবে আপনাদের দ্বারা খেদমত গ্রহণ করুন।

আপনারা উভয়েই কওমি শিক্ষাধারা থেকে গড়ে ওঠা আলিম। বর্তমানে আপনাদের একজন বাংলাদেশ জামায়াতে ইসলামী-এর সঙ্গে এবং অপরজন ইসলামী আন্দোলন বাংলাদেশ-এর গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে সম্পৃক্ত। এটি আপনাদের ব্যক্তিগত বিবেচনার বিষয়।

রাজনীতি মূলত সমাজ-রাষ্ট্র পরিচালনার একটি পদ্ধতিগত ও কৌশলগত অঙ্গন। যে ব্যক্তি যে পন্থাকে অধিকতর কার্যকর, বাস্তবসম্মত ও শরয়ী বিচারে গ্রহণযোগ্য মনে করবেন, তিনি সেই পথেই কাজ করবেন—এটি তাঁর ন্যায়সঙ্গত অধিকার। এ বিষয়ে অন্যের আপত্তির সুযোগ খুব সীমিত।

তবে একজন সাধারণ মুসলিম হিসেবে আমাদের একটি প্রত্যাশা থাকতেই পারে—

আপনাদের রাজনৈতিক বা সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড সর্বদা ইতিবাচকতা, প্রজ্ঞা, সৌজন্য ও ইসলামী আখলাকের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হয়ে উঠুক। মতপার্থক্য থাকবে, সমালোচনাও হতে পারে; কিন্তু সে সমালোচনা যেন প্রতিপক্ষকে হেয় করার ভাষায় নয়; বরং সত্যের অনুসন্ধান, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ এবং উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণের চেতনায় পরিচালিত হয়। দ্বীনের খেদমত কখনো প্রতিপক্ষকে পরাজিত করার প্রতিযোগিতা নয়; বরং সত্যকে মর্যাদার সঙ্গে প্রতিষ্ঠা করার এক অবিরাম প্রচেষ্টা।

ব্যক্তিগতভাবে আমার একটি অনুভূতি দীর্ঘদিনের। আল্লাহ তাআলা আপনাদের যে ইলমী যোগ্যতা, গবেষণার সামর্থ্য ও বুদ্ধিবৃত্তিক সম্ভাবনা দান করেছেন, তা যদি আরও ব্যাপকভাবে গবেষণা, রচনা, শিক্ষা ও ইলমী প্রশিক্ষণের ক্ষেত্রে নিবেদিত হতো, তাহলে জাতি হয়তো আরও সমৃদ্ধ হতো। প্রত্যেক মানুষের জন্য প্রত্যেক ময়দান সমানভাবে উপযোগী হয় না।

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়,

অনেক অসাধারণ আলিম প্রশাসন বা রাজনীতিতে গিয়ে সফলও হয়েছেন, আবার ব্যর্থও হয়েছেন; আবার অনেকেই উপলব্ধি করেছেন যে, তাঁদের প্রকৃত শক্তি ছিল কলম, পাঠদান ও গবেষণার জগতে।

তাই যে ময়দানে একজন মানুষের অবদান সবচেয়ে বেশি ফলপ্রসূ হতে পারে, সে ময়দানকে অগ্রাধিকার দেওয়াই অধিকতর প্রজ্ঞার পরিচয়।

সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আপনাদের মধ্যে কয়েকটি ধর্মতাত্ত্বিক বিষয়ে—বিশেষত ইসমাতে আম্বিয়া এবং সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর মি‘আরে হক প্রসঙ্গে—আলোচনা ও পাল্টা-আলোচনার বিষয়টি বারবার চোখে পড়ছে।

আরও বেদনাদায়ক বিষয় হলো,

এই আলোচনাকে কেন্দ্র করে উভয় পক্ষের অনেক অনুসারীর মধ্যে অশোভন ভাষা, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও বিদ্বেষপূর্ণ মন্তব্যের বিস্তার ঘটছে। যে বিষয়গুলো মূলত ইলম, আদব ও তাকওয়ার পরিবেশে আলোচিত হওয়ার কথা, সেগুলো অনেক ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবেগ, পক্ষপাত ও দলীয় প্রতিদ্বন্দ্বিতার উপকরণে পরিণত হচ্ছে।

এই প্রেক্ষাপটেই একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে কয়েকটি বিনীত কথা নিবেদন করছি। আপনারা সেগুলো গ্রহণ করবেন কি না—তা সম্পূর্ণ আপনাদের বিবেচনার বিষয়। তবু দীনী দায়বদ্ধতা থেকেই কথাগুলো বলা।

নবীগণের ইসমাতে আম্বিয়া এবং সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর মর্যাদা-সংক্রান্ত আলোচনা ইসলামী আকীদার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও সংবেদনশীল বিষয়। এ ধরনের বিষয়ে মতবিনিময় অবশ্যই হতে পারে; বরং প্রয়োজনে হওয়াও উচিত। তবে সেই আলোচনা হওয়া উচিত এমন পরিবেশে, যেখানে অংশগ্রহণকারীদের পর্যাপ্ত ইলম, পারস্পরিক আস্থা, গবেষণামনস্কতা এবং আদব বিদ্যমান থাকে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম বা উন্মুক্ত জনপরিসর সাধারণত সে ধরনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে পারে না।

বাস্তবতা হলো,

সাধারণ শ্রোতা ও পাঠকদের সবাই এ ধরনের জটিল আকীদাগত আলোচনা অনুধাবন করার মতো প্রস্তুতি বা সামর্থ্য রাখেন না। অনেকেই বক্তব্যের প্রেক্ষাপট, পরিভাষা বা সূক্ষ্ম পার্থক্য অনুধাবন করতে পারেন না। ফলে আলোচনার মূল উদ্দেশ্যের পরিবর্তে বিভ্রান্তি, ভুল বোঝাবুঝি কিংবা দলীয় আবেগই বেশি প্রাধান্য পায়।

আরও একটি বাস্তবতা হলো,

আমাদের সমাজে এমন ব্যক্তি ও গোষ্ঠীও রয়েছে, যাদের সকলের মধ্যে নবী-রাসূল (আ.) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর প্রতি সমান মাত্রার শ্রদ্ধা, অনুরাগ ও সংবেদনশীলতা পরিলক্ষিত হয় না।

পাশাপাশি এমন প্রবণতাও অস্বীকার করা যায় না যে, কোনো কোনো মহল আদর্শিক, রাজনৈতিক কিংবা দলীয় স্বার্থে এ ধরনের সংবেদনশীল ধর্মীয় বিতর্ককে ইচ্ছাকৃতভাবে উসকে দিতে বা কাজে লাগানোর চেষ্টা করতে পারে।

ফলস্বরূপ, সীমিত পরিসরের একটি ইলমী আলোচনা খুব দ্রুত এমন এক জনপরিসরে ছড়িয়ে পড়ে, যেখানে তা প্রাসঙ্গিকতা হারিয়ে ভুল ব্যাখ্যা, বিকৃতি, অপপ্রচার কিংবা পারস্পরিক বিদ্বেষের উপকরণে পরিণত হওয়ার আশঙ্কা সৃষ্টি করে।

এ কারণেই আমার বিনীত আবেদন—

এ ধরনের সংবেদনশীল আকীদাগত বিষয় যথাসম্ভব উন্মুক্ত বিতর্কের বিষয় না করে, প্রয়োজনে তা বিশেষজ্ঞ আলিমদের সীমিত, দায়িত্বশীল ও উপযুক্ত ইলমী পরিসরেই সীমাবদ্ধ রাখা হোক। সেখানে পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, গবেষণামনস্কতা এবং সত্য অনুসন্ধানের আন্তরিক মানসিকতায় বিষয়গুলো নিয়ে আলোচনা হতে পারে।

কিন্তু যে আলোচনা সাধারণ মানুষের মনে নবী-রাসূল (আ.) কিংবা সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর মর্যাদা সম্পর্কে সামান্যতম বিভ্রান্তিরও অবকাশ সৃষ্টি করতে পারে, অথবা তাঁদের প্রতি শ্রদ্ধা, ভালোবাসা ও আস্থার অনুভূতিকে ক্ষুণ্ন করার আশঙ্কা তৈরি করে, সে ধরনের আলোচনা প্রকাশ্য মঞ্চ কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিহার করাই অধিকতর হিকমত, প্রজ্ঞা এবং শরয়ী আদবের পরিচয়।

মনে রাখা প্রয়োজন,

ইসলামী ইলমচর্চার একটি মৌলিক নীতি হলো—প্রত্যেক সত্য প্রত্যেক পরিবেশে এবং সকল শ্রোতার সামনে একইভাবে উপস্থাপনের বিষয় নয়। আলোচনার বিষয়বস্তু যেমন গুরুত্বপূর্ণ, তেমনি গুরুত্বপূর্ণ তার সময়, প্রেক্ষাপট, শ্রোতার মানসিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতি এবং সম্ভাব্য ফলাফল।

কোনো বক্তব্য নিজে সত্য হলেও, যদি তার উপস্থাপনার ধরন বা পরিসর অনাকাঙ্ক্ষিত বিভ্রান্তি, বিদ্বেষ কিংবা ফিতনার কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে সে ক্ষেত্রে সংযম, প্রজ্ঞা এবং বৃহত্তর কল্যাণের বিবেচনাই ইসলামী দাওয়াহ ও ইলমচর্চার দাবি। বিশেষত যেসব বিষয় নবী-রাসূল (আ.) ও সাহাবায়ে কিরাম (রা.)-এর মর্যাদার সঙ্গে সম্পৃক্ত, সেসব ক্ষেত্রে সতর্কতা, ভারসাম্য ও উত্তম আদব প্রদর্শন করা কেবল একটি বুদ্ধিবৃত্তিক দায়িত্ব নয়; বরং তা ঈমানি সংবেদনশীলতারও অপরিহার্য দাবি।

আপনারা উভয়েই আমাদের সমাজের মূল্যবান সম্পদ। আপনাদের ইলম, প্রজ্ঞা ও দাওয়াহর শক্তি যদি পারস্পরিক প্রতিযোগিতার পরিবর্তে উম্মাহর ঐক্য, বুদ্ধিবৃত্তিক বিকাশ এবং ইসলামের সৌন্দর্য তুলে ধরার কাজে আরও বেশি ব্যয়িত হয়, তাহলে নিঃসন্দেহে জাতি ও উম্মাহ তার সুফল বহু গুণে লাভ করবে।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে সত্যকে জানার, সত্যের ওপর অটল থাকার এবং সত্যকে সর্বোত্তম প্রজ্ঞা ও উত্তম চরিত্রের মাধ্যমে উপস্থাপন করার তাওফীক দান করুন; আপনাদের ইলম, আমল ও দাওয়াহকে কবুল করুন এবং উম্মাহর জন্য কল্যাণকর করে তুলুন।