জামায়াতে ইসলামী একটি আদর্শনিষ্ঠ ও ক্যাডারভিত্তিক সংগঠন। এর সাংগঠনিক কাঠামোয় ‘রুকন’ সর্বোচ্চ সদস্যপদের মর্যাদা বহন করে।

সংগঠনের আদর্শ, সংস্কৃতি ও নৈতিক মানদণ্ডের অন্যতম বাহক হিসেবে রুকনদেরই সাধারণত বিবেচনা করা হয়। ফলে জনপরিসরে সংগঠনের পরিচিতি, ভাবমূর্তি ও গ্রহণযোগ্যতা গঠনে তাদের ভূমিকা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ।

প্রত্যেক বৃহৎ সংগঠনের মতো জামায়াতে ইসলামীরও সাধারণ সদস্য, কর্মী, সমর্থক এবং বিভিন্ন পর্যায়ের শুভানুধ্যায়ী রয়েছেন। একইভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সংগঠনের পক্ষে সক্রিয় কিছু অনিয়ন্ত্রিত সমর্থক বা প্রচলিত ভাষায় কথিত ‘বট বাহিনী’র উপস্থিতিও অস্বীকার করা যায় না। অবশ্য এ ধরনের প্রবণতা কেবল জামায়াতে ইসলামীর মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বর্তমান সময়ে প্রায় সব রাজনৈতিক, সামাজিক ও আদর্শিক সংগঠনের ক্ষেত্রেই কমবেশি এর অস্তিত্ব লক্ষ করা যায়।

এ ধরনের সমর্থকদের কারও কারও অসংযত বক্তব্য, আবেগপ্রবণ আচরণ কিংবা অনলাইন তৎপরতা সংগঠনকে বিব্রতকর পরিস্থিতিতে ফেলতে পারে। তবে সাধারণভাবে এসব কর্মকাণ্ডকে সংগঠনের আনুষ্ঠানিক নীতি, অবস্থান বা সাংগঠনিক চরিত্রের প্রতিনিধিত্বকারী হিসেবে বিবেচনা করা হয় না।

কিন্তু একজন রুকনের ব্যক্তিগত বিচ্যুতি স্বাভাবিকভাবেই সংগঠনের আদর্শিক মান, নেতৃত্বের মূল্যায়ন এবং সদস্য নির্বাচনের প্রক্রিয়া সম্পর্কে বৃহত্তর পরিসরে প্রশ্নের জন্ম দিতে পারে। সে কারণে রুকন নির্বাচন শুধু সাংগঠনিক নয়; নৈতিক ও কৌশলগত দিক থেকেও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়।

আমার সীমিত পর্যবেক্ষণে মনে হয়েছে,

ব্যতিক্রমধর্মী কিছু ক্ষেত্রে এমন ব্যক্তিও রুকন হয়েছেন, যাদের সংগঠনের আদর্শ ও নীতি এবং কর্মপদ্ধতি বাস্তবায়নের প্রতি অঙ্গীকার প্রত্যাশিত গভীরতায় প্রতিষ্ঠিত ছিল না।

বরং তাদের পরবর্তী আচরণ, সিদ্ধান্ত ও সাংগঠনিক অবস্থান বিশ্লেষণ করলে এমন ধারণার অবকাশ তৈরি হয় যে, আদর্শিক অঙ্গীকারের পাশাপাশি ব্যক্তিগত পরিচিতি, সামাজিক অবস্থান, প্রভাব কিংবা অন্য কোনো স্বার্থসংশ্লিষ্ট বিবেচনাও তাদের রুকন হওয়ার প্রক্রিয়ায় যথেষ্ট প্রভাব বিস্তার করেছিল।

পরবর্তী সময়ে এ ধরনের কিছু ব্যক্তির কর্মকাণ্ডে এমন প্রবণতাও লক্ষ করা যায় যে, তারা আত্মগঠন, আত্মশুদ্ধি এবং সংগঠনের আদর্শিক ও সাংগঠনিক উন্নয়নে প্রত্যাশিত অবদান রাখার পরিবর্তে ব্যক্তিগত অবস্থান সুদৃঢ় করা, প্রভাব বিস্তার করা কিংবা নিজস্ব স্বার্থসংশ্লিষ্ট লক্ষ্য অর্জনের প্রতিই তুলনামূলকভাবে বেশি মনোযোগী হয়ে ওঠেন।

এর ফলে সংগঠনের আদর্শিক চর্চা, সাংগঠনিক সংস্কৃতি এবং দীর্ঘমেয়াদি বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর বিরূপ প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়।

অবশ্য এটিও স্পষ্ট করে বলা প্রয়োজন যে, এ ধরনের পর্যবেক্ষণ কোনোভাবেই রুকনদের সামগ্রিক চিত্রকে প্রতিফলিত করে না; বরং এটি সীমিত পরিসরে দেখা কিছু ব্যতিক্রমধর্মী ঘটনার ওপর ভিত্তি করে গঠিত একটি ধারণা।

আমার ব্যক্তিগত পর্যবেক্ষণে আরও মনে হয়েছে, এ ধরনের প্রবণতা সাধারণ রুকনদের তুলনায় উচ্চশিক্ষিত ও পেশাগতভাবে অধিক প্রতিষ্ঠিত কিছু ব্যক্তির মধ্যে তুলনামূলকভাবে বেশি দৃশ্যমান।

তবে এটি কোনো পরিসংখ্যানভিত্তিক সিদ্ধান্ত নয়; বরং সীমিত অভিজ্ঞতা থেকে উদ্ভূত একটি পর্যবেক্ষণ, যা আরও বিস্তৃত গবেষণার মাধ্যমে যাচাইয়ের দাবি রাখে।

এ ধরনের কিছু ব্যক্তির ক্ষেত্রে ব্যক্তিজীবন, পারিবারিক জীবন, পেশাগত আচরণ, আর্থিক লেনদেন কিংবা স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন বা বিতর্কের কথাও বিভিন্ন সময়ে শোনা গেছে। আবার কারও ক্ষেত্রে অতীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক বা সামাজিক বলয়ের সঙ্গে সুবিধাভিত্তিক সম্পর্ক থাকার বিষয়েও আলোচনা রয়েছে।

তবুও তাদের উচ্চশিক্ষা, আলিম পরিচয়, সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা কিংবা ব্যক্তিগত পরিচিতির কারণে প্রয়োজনীয় গভীর যাচাই-বাছাই সবসময় সমানভাবে হয়েছে কি না—সে প্রশ্ন উত্থাপনের অবকাশ রয়েছে।

অবশ্য একটি বৃহৎ সংগঠনের পক্ষে প্রত্যেক রুকন-প্রার্থীর জীবন ও কর্মকাণ্ডের প্রতিটি দিক সমানভাবে যাচাই করা খুব একটা সহজসাধ্য বা বাস্তবসম্মতও নয়।

অনেক ক্ষেত্রেই দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের সুপারিশ, ব্যক্তিগত পরিচিতি এবং প্রার্থীর নিজস্ব লিখিত রিপোর্টের ওপর নির্ভর করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণ করতে হয়। ফলে যদি এসব তথ্য অসম্পূর্ণ, অতিরঞ্জিত বা বাস্তবতার সঙ্গে পুরোপুরি সামঞ্জস্যপূর্ণ না হয়, তাহলে অনুপযুক্ত ব্যক্তি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক স্তরে প্রবেশের সুযোগ পেতে পারেন। বিভিন্ন সময়ে এ ধরনের ঘটনার কথাও শোনা যায়।

বিভিন্ন মহলে এমন অভিযোগও শোনা যায় যে, ব্যক্তিবিশেষে নিজস্ব রিপোর্ট পেশ বা তথ্য উপস্থাপনায় বাস্তবতার পূর্ণ প্রতিফলন নাও ঘটতে পারে। এ ধরনের অভিযোগের সত্যতা যাচাই অবশ্য সংশ্লিষ্ট সংগঠনের নিজস্ব দায়িত্ব।

এমন ব্যক্তি যদি সংগঠনকে আদর্শ বাস্তবায়নের পরিবর্তে ব্যক্তিগত প্রভাব, মর্যাদা বা স্বার্থ অর্জনের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেন, তাহলে সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে তারা সংগঠনের জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠতে পারেন।

বিভিন্ন সংগঠনের ইতিহাসে দেখা যায়, আদর্শিক দৃঢ়তার অভাব বা ব্যক্তিস্বার্থের প্রাধান্যের কারণে কোনো কোনো সদস্য পরবর্তী সময়ে অবস্থান পরিবর্তন করেছেন এবং তা সংগঠনের জন্য অস্বস্তিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করেছে। জামায়াতও এ ধরনের সাধারণ সাংগঠনিক বাস্তবতা থেকে সম্পূর্ণ ব্যতিক্রম—এমন দাবি করা কঠিন।

তবে এটিও বাস্তবতা যে,

কোনো বৃহৎ আদর্শিক, সামাজিক বা রাজনৈতিক সংগঠনের পক্ষে অনুপযুক্ত ব্যক্তির অনুপ্রবেশ শতভাগ প্রতিরোধ করা প্রায় অসম্ভব। ইতিহাসে প্রায় সব বড় সংগঠনই কোনো না কোনো সময়ে এ ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হয়েছে।

তাই এ ধরনের সমস্যা পুরোপুরি দূর করা হয়তো সম্ভব নয়; তবে সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি কল্যাণের স্বার্থে এমন একটি কার্যকর ও প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গড়ে তোলা প্রয়োজন, যা অনুপযুক্ত ব্যক্তির অনুপ্রবেশের সুযোগকে যথাসম্ভব সীমিত করবে এবং সংগঠনের নৈতিক, আদর্শিক ও সাংগঠনিক শক্তিকে আরও সুদৃঢ় করবে।

আমার বিবেচনায়,

রুকন নির্বাচনের ক্ষেত্রে শুধু ব্যক্তিগত পরিচিতি, শিক্ষাগত যোগ্যতা, লিখিত আত্মপ্রতিবেদন বা সুপারিশের ওপর নির্ভর করাই যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি প্রার্থীর কর্মস্থল, সামাজিক পরিমণ্ডল এবং সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন ক্ষেত্র থেকে তার ব্যক্তিগত চরিত্র, নৈতিক আচরণ, আমানতদারিতা, আর্থিক স্বচ্ছতা, পেশাগত সততা ও সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা সম্পর্কে যথাসম্ভব নিরপেক্ষ, বহুমাত্রিক এবং তথ্যভিত্তিক অনুসন্ধানের ব্যবস্থা থাকা প্রয়োজন। প্রয়োজনে নির্দিষ্ট সময় অন্তর রুকনদের নৈতিক ও সাংগঠনিক মূল্যায়নেরও একটি কার্যকর ব্যবস্থা বিবেচনা করা যেতে পারে।

এতে অনুপযুক্ত ব্যক্তিদের অনুপ্রবেশ পুরোপুরি রোধ করা সম্ভব না হলেও তা উল্লেখযোগ্যভাবে হ্রাস পাবে এবং সংগঠনের নৈতিক শক্তি, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা ও জনআস্থা আরও সুদৃঢ় হবে।

একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে আমার এ সামান্য পর্যবেক্ষণ ও প্রস্তাবনা। এর উদ্দেশ্য কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনকে হেয় করা নয়; বরং একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠনের দীর্ঘমেয়াদি শক্তি, বিশ্বাসযোগ্যতা ও নৈতিক মান আরও সুসংহত করার প্রয়োজনীয়তার প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করা।