আজ থেকে শুরু হলো পবিত্র মাহে রবিউল আউয়াল—মুসলিম উম্মাহর কাছে যে মাসটি প্রিয় নবী মুহাম্মদ (সা.)-এর পবিত্র জন্ম ও ইন্তিকালের মহান স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত।

প্রতি বছর এ মাসের আগমনে মুসলিম সমাজে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আবেগের এক বিশেষ আবহ সৃষ্টি হয়। তাঁর পবিত্র জীবন, অনুপম চরিত্র, মহান আদর্শ এবং উম্মতের প্রতি তাঁর অপরিসীম মমতার কথা নতুন করে স্মরণ করা হয়। এ আবেগ স্বাভাবিক, এ ভালোবাসা ঈমানেরই দাবি।

তবে এ ভালোবাসা ও আবেগের প্রকাশ যেমন আন্তরিক হওয়া প্রয়োজন, তেমনি তা হতে হবে শরিয়তের সীমারেখার মধ্যেও।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা কেবল আবেগের বিষয় নয়; এটি ঈমানের অপরিহার্য দাবি এবং জীবনের সর্বক্ষেত্রে তাঁর অনুসরণের এক গভীর অঙ্গীকার।

রবিউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা ও শ্রদ্ধা প্রকাশে আমরা অনেকেই নানা জমকালো আয়োজন ও আনুষ্ঠানিকতার আশ্রয় নিই। এসব আয়োজনের মধ্য দিয়ে আমরা প্রিয় নবী (সা.)-এর প্রতি নিজেদের ভালোবাসা, শ্রদ্ধা ও আনন্দের বহিঃপ্রকাশ ঘটাতে চাই। আমাদের অন্তরের প্রকৃত অবস্থা আল্লাহ তা‘আলাই সর্বাধিক অবগত।

সঙ্গে আমাদের এ কথাটিও মনে রাখা প্রয়োজন—

তাঁর প্রতি ভালোবাসার আবেগ নিঃসন্দেহে হৃদয়ের এক পবিত্র অনুভূতি; কিন্তু এ ভালোবাসার সর্বোত্তম প্রকাশ প্রিয় নবী (সা.)-এর আদর্শের প্রতি আন্তরিক আনুগত্য এবং তাঁর সুন্নাহকে জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ করে নেওয়ার মধ্যে।

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি আমাদের ভালোবাসা যতই গভীর হোক, তার সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রমাণ হবে আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে তাঁর সুন্নাহর প্রতিফলন।

তাঁর ভালোবাসার দাবি হলো—

তাঁর কথা মেনে চলা, তাঁর আদর্শকে ধারণ করা, তাঁর চরিত্র অনুসরণ করা, তাঁর নিষেধ থেকে বিরত থাকা এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত ন্যায়, সত্য, দয়া, আমানতদারি, সংযম ও মানবিকতার শিক্ষা জীবনে বাস্তবায়ন করা।রাসূলুল্লাহ সা. বলেন,

من أحيا سنتي فقد أحبني

‘‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নতকে পুনরুজ্জীবিত করলো, সে-ই [প্রকৃত অর্থে] আমাকে ভালোবাসলো।” -তিরমিযী

কুরআন করীমে আল্লাহ তা‘আলা ইরশাদ করেছেন—

قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ

“বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; তাহলে আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন।”—সূরা আলে ইমরান, ৩:৩১

অতএব,

আল্লাহর ভালোবাসার যেমন নিদর্শন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর অনুসরণ, তেমনি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি সত্যিকারের ভালোবাসারও প্রধান অপরিহার্য দাবি হলো তাঁর সুন্নাহ ও জীবনাদর্শের অনুসরণ।

এ কারণেই

মাহে রবিউল আউয়ালকে কেবল আবেগ প্রকাশের একটি সাময়িক উপলক্ষ নয়; বরং সীরতচর্চা, আত্মসমালোচনা, সুন্নাহর পুনর্জাগরণ এবং জীবনকে নববী আদর্শে গড়ে তোলার অঙ্গীকার নবায়নের মাস হিসেবে গ্রহণ করা প্রয়োজন।

এর মাধ্যমে আমাদের এ আবেগ যেন ক্ষণস্থায়ী অনুভূতিতে সীমাবদ্ধ না থেকে স্থায়ী ভালোবাসা ও জীবনব্যাপী অনুসরণের রূপ ধারণ করে।

আমরা এ মাসে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর জীবনী পড়ব—শুধু তথ্য জানার জন্য নয়, তাঁর জীবন থেকে শিক্ষা গ্রহণের জন্য।

তাঁর জন্ম (মীলাদ), তাঁর আবির্ভাবের সময়কার আরব ও বিশ্বপরিস্থিতি সম্পর্কে জানব, যেন তাঁর আগমন ও নুবুওয়াতের মহান তাৎপর্য উপলব্ধি করতে পারি;

তাঁর ইবাদত সম্পর্কে জানব, যেন আমাদের ইবাদত সুন্দর হয়;

তাঁর চরিত্র সম্পর্কে জানব, যেন আমাদের চরিত্র সুন্দর হয়;

তাঁর পরিবারজীবন জানব, যেন আমাদের পরিবারে শান্তি ও সৌহার্দ্য প্রতিষ্ঠিত হয়; তাঁর সমাজনীতি ও ন্যায়বোধ জানব, যেন আমাদের সামাজিক আচরণে ন্যায় ও ইনসাফ প্রতিফলিত হয়;

তাঁর দাওয়াত ও ত্যাগের ইতিহাস জানব, যেন দ্বীনের প্রতি আমাদের দায়িত্ববোধ জাগ্রত হয়।

একই সঙ্গে এ কথাও মনে রাখা প্রয়োজন—

রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসা প্রকাশ করতে গিয়ে এমন কোনো কথা, কাজ বা আয়োজন গ্রহণ করা সমীচীন নয়, যা শরিয়তের সীমা অতিক্রম করে কিংবা তাঁর শিক্ষা ও সাহাবা-ই-কিরাম (রা.)-এর অনুসৃত পদ্ধতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

ভালোবাসার প্রকাশ যেন এমন কোনো রূপ না নেয়, যা ভালোবাসার মূল উদ্দেশ্যকেই আড়াল করে ফেলে। বরং প্রকৃত ভালোবাসার সৌন্দর্য হলো—ভালোবাসার মানুষটির শেখানো পথেই ভালোবাসা প্রকাশ করা।

সাহাবা-ই-কিরাম (রা.) ছিলেন রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার সর্বোৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। তাঁদের ভালোবাসা ছিল অশ্রুসিক্ত, গভীর ও সর্বস্বত্যাগী; কিন্তু সেই ভালোবাসার সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল তাঁর আনুগত্য ও অনুসরণ।

তাঁরা তাঁর কথা শুনেছেন, তাঁর আদেশ পালন করেছেন, তাঁর চরিত্র ধারণ করেছেন এবং তাঁর সুন্নাহকে নিজেদের জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত করেছেন। সুতরাং তাঁরাই আমাদের জন্য ভালোবাসা প্রকাশের সর্বোত্তম আদর্শ।

মাহে রবিউল আউয়ালের এ আবেগ যেন মাস শেষ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেষ হয়ে না যায়।

এ মাসে যে হৃদয় নরম হবে, তা যেন সারা বছর নরম থাকে;

যে চোখ তাঁর সীরত পাঠে অশ্রুসিক্ত হবে, তা যেন তাঁর সুন্নাহ ত্যাগ করতে না পারে;

যে কণ্ঠ তাঁর প্রশংসায় মুখর হবে, তা যেন তাঁর নির্দেশ অমান্য না করে;

যে হৃদয় তাঁর ভালোবাসার দাবি করবে, তা যেন তাঁর আদর্শ থেকে বিমুখ না হয়।

একজন কবি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণভাবে বলেছেন—

من يدّعي حُبَّ النبي ولم يُفد من هديه فسفاهةٌ وهُراءُ

الحب أوّلُ شرطِهِ وفروضهِ إنْ كان صِدقًا طاعةٌ ووفاءُ

“যে ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর ভালোবাসার দাবি করে, অথচ তাঁর জীবনাদর্শ থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে না এবং তাঁর নির্দেশনা অনুসরণ করে না—তার এ দাবি নিছক নির্বুদ্ধিতা ও অন্তঃসারশূন্য প্রলাপ ছাড়া আর কিছু নয়।

ভালোবাসার প্রথম শর্ত ও অপরিহার্য দাবি হলো—ভালোবাসা যদি সত্য হয়, তবে তা আনুগত্য ও বিশ্বস্ততার মাধ্যমে প্রমাণ করা।”

ফারসি সুফি সাধক শাইখ মাহমূদ শাবিস্তরী (রাহ.)-ও বিষয়টি অত্যন্ত সুন্দরভাবে তুলে ধরেছেন—

وَلی از پیروی چون همدم آمد

نبی را در ولایت محرم آمد

ز إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ یابد او راه

به خلوتخانهٔ یُحْبِبْکُمُ اللَّهُ

‘‘যে ব্যক্তি অনুসরণের মাধ্যমে নবীর সঙ্গী হয়ে ওঠে, সে নবীর নৈকট্য ও অন্তরঙ্গতার মর্যাদা লাভ করে।

“তোমরা যদি ভালোবাসো”—এই আহ্বান অনুসরণ করে সে সেই পথ লাভ করে, যা তাকে “আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন”—এই মহামর্যাদার অন্তঃপুরে পৌঁছে দেয়।”

সুতরাং আসুন,

মাহে রবিউল আউয়ালের এ পবিত্র আবহে আমরা শুধু রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর প্রতি ভালোবাসার কথা বলেই থেমে না যাই; বরং তাঁর সীরত জানার ও ব্যাপকভাবে চর্চা করার, তাঁর সুন্নাহ মানার এবং তাঁর আদর্শে নিজেদের জীবন গড়ার অঙ্গীকার নতুন করে করি।

একই সঙ্গে আমাদের শিশু-কিশোর ও তরুণ প্রজন্মের মধ্যেও সীরতচর্চার প্রতি গভীর আগ্রহ সৃষ্টি করি এবং তাদের জীবনেও নববী আদর্শের বীজ বপন করি।

আমাদের ভালোবাসা হোক আবেগে উজ্জ্বল, কিন্তু শরিয়তের সীমায় সংযত; আমাদের প্রশংসা হোক হৃদয়স্পর্শী, কিন্তু তা যেন তাঁর সুন্নাহর অনুসরণে পরিণত হয়; আমাদের সীরতচর্চা হোক জ্ঞানসমৃদ্ধ, কিন্তু তার চূড়ান্ত লক্ষ্য হোক আমল ও চরিত্রের পরিবর্তন।

মাহে রবিউল আউয়াল হোক—সীরতচর্চার মাস, ভালোবাসার নবায়নের মাস, সুন্নাহর পুনর্জাগরণের মাস এবং রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর আদর্শে জীবন গড়ার অঙ্গীকার নবায়নের মাস।

اللهم ارزقنا محبةَ نبيك صلى الله عليه وسلم، وحُسنَ اتباعه، واحشرنا تحت .لوائه. آمين، يا رب العالمين