একটি সমাজ, প্রতিষ্ঠান বা কমিউনিটির মধ্যে অশান্তি, বিভেদ ও পারস্পরিক দূরত্ব সৃষ্টির অন্যতম কারণ হলো-
শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকা এবং আত্মগুণাভিমান। এ প্রবণতা যেমন ব্যক্তির মধ্যে দেখা যায়, তেমনি দল, গোষ্ঠী ও প্রতিষ্ঠানের মধ্যেও বিদ্যমান থাকতে পারে।
যখন কোনো ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠী নিজেকে অন্যদের তুলনায় অধিক জ্ঞানী, অধিক বিশুদ্ধ, অধিক সত্যনিষ্ঠ বা অধিক যোগ্য মনে করতে শুরু করে এবং এর ফলে অন্যদের প্রতি অবজ্ঞা ও তুচ্ছতাবোধ পোষণ করে, তখন তা ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ের জন্যই ক্ষতিকর হয়ে ওঠে।
প্রকৃতপক্ষে এ ধরনের মানসিকতা পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ, সহনশীলতা ও সৌহার্দ্যের পরিবেশকে নষ্ট করে দেয়। মানুষ তখন অন্যের গুণ, অবদান ও যোগ্যতার স্বীকৃতি দিতে অনীহ হয়ে পড়ে।
এর ফলে গঠনমূলক মতবিনিময়ের পরিবর্তে বিরোধ, সহযোগিতার পরিবর্তে প্রতিদ্বন্দ্বিতা এবং ভ্রাতৃত্বের পরিবর্তে বিভাজন বৃদ্ধি পায়।
এ কারণেই রাসূলুল্লাহ (সা.) ধ্বংসাত্মক কয়েকটি বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করতে গিয়ে বলেন—
وَإِعْجَابُ الْمَرْءِ بِنَفْسِهِ، وَهِيَ أَشَدُّهُنَّ
“মানুষের নিজের প্রতি আত্মমুগ্ধতা—আর এটি তাদের মধ্যে সবচেয়ে ভয়াবহ।”— আল-বাইহাকী
আত্মগুণাভিমানের একটি সাধারণ লক্ষণ হলো,
ব্যক্তি নিজের জ্ঞান, অভিজ্ঞতা ও বিচারশক্তির ওপর এমন মাত্রায় আস্থাশীল হয়ে ওঠে যে,
সে নিজের মতামতকেই একমাত্র সঠিক এবং অন্যদের মতামতকে ভুল বা অগ্রহণযোগ্য মনে করতে শুরু করে।
ধীরে ধীরে সে এমন এক মানসিক অবস্থায় পৌঁছে যায়, যেখানে ভিন্নমতকে মূল্যায়ন করা তো দূরের কথা, অন্যের যোগ্যতা ও অবদান স্বীকার করতেও অনিচ্ছুক হয়ে পড়ে।
দুঃখজনকভাবে আমাদের ধর্মীয় ও ইলমী অঙ্গনও এ সমস্যা থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত নয়। কখনো কখনো এমন প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যে, ব্যক্তি বা গোষ্ঠী নিজেদের অবস্থানকে একমাত্র সঠিক বলে ধরে নিয়ে অন্যদের জ্ঞান ও অবদানকে খাটো করে দেখার চেষ্টা করেন।
অথচ ইসলামী জ্ঞান-ঐতিহ্যের ইতিহাসে আমরা সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখতে পাই। মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও ইমামগণ পরস্পরের জ্ঞান, মর্যাদা ও অবদানের স্বীকৃতি দিয়েছেন এবং ভিন্নমতের প্রতি সম্মান প্রদর্শনের উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন।
এ প্রসঙ্গে একটি ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা উল্লেখ করা যেতে পারে।
একবার একজন আলিম, যিনি একই সঙ্গে একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব এবং সুলেখকও, প্রকাশ্যে আমার সমালোচনা করেন।
সমালোচনা নিজেই কোনো সমস্যা নয়; বরং আমি বিশ্বাস করি, ন্যায়সঙ্গত ও তথ্যভিত্তিক সমালোচনা ব্যক্তি ও চিন্তার বিকাশে এবং আমলের সংশোধনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু সমালোচনার একপর্যায়ে তিনি মন্তব্য করেন যে, আমি ‘আল-হিদায়া’ কিতাবের মতো একটি গ্রন্থ পড়তে সক্ষম নই।
আমি নিজের সম্পর্কে কোনো বিশেষ যোগ্যতার দাবি করি না। বরং আমি বিশ্বাস করি, আমার জ্ঞান ও কর্মে বহু সীমাবদ্ধতা ও অপূর্ণতা রয়েছে। মানুষ হিসেবে ভুল-ত্রুটি ও দুর্বলতা থেকে মুক্ত থাকার কোনো সুযোগ নেই। সে কারণেই সমালোচনাকে আমি সাধারণত আত্মসংশোধন ও আত্মোন্নয়নের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম হিসেবে নিতে চেষ্টা করি ।
তবে ইনসাফের দাবি হলো,
কোনো ব্যক্তির সক্ষমতা বা অক্ষমতা সম্পর্কে মন্তব্য করার আগে তার বাস্তব অবস্থা, যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতা সম্পর্কে যথেষ্ট অবগত হওয়া।
কিন্তু বিস্ময়ের বিষয় হলো,
তিনি এমন একটি মন্তব্য করলেন, অথচ আমার সঙ্গে তাঁর কোনো শিক্ষক-শিক্ষার্থী সম্পর্ক ছিল না, তিনি কখনো আমার পাঠদান প্রত্যক্ষ করেননি এবং—আমার জানামতে—কোনো উল্লেখযোগ্য ইলমী আলোচনায় আমাদের সম্পৃক্ততা ঘটেনি। ফলে আমার জ্ঞানগত সক্ষমতা সম্পর্কে এমন চূড়ান্ত মূল্যায়নের ভিত্তি কী ছিল, তা আমার কাছে স্পষ্ট নয়।
সাধারণভাবে একজন মানুষের ইলমী যোগ্যতা সম্পর্কে মতামত প্রদানের জন্য ন্যূনতম পরিচয়, পর্যবেক্ষণ কিংবা মূল্যায়নের প্রয়োজন হয়। বিশেষত যখন সেই মন্তব্যটি তার অধ্যয়ন, পাঠদান বা গবেষণাগত সক্ষমতার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট হয়।
উল্লেখ্য, আমার শিক্ষকতা জীবনের সূচনাই হয়েছিল চুনতী হাকিমিয়া আলিয়া মাদরাসার মতো একটি প্রসিদ্ধ মাদরাসায় ‘আল-হিদায়া’ কিতাবের পাঠদানের মাধ্যমে। এ কথা আমি আত্মপ্রশংসার জন্য বলছি না; বরং এ কথা স্মরণ করিয়ে দেওয়ার জন্য বলছি যে, কোনো ব্যক্তির যোগ্যতা সম্পর্কে মন্তব্য করার ক্ষেত্রে অনুমান নয়; বরং তথ্য ও বাস্তবতাই হওয়া উচিত বিচার-বিশ্লেষণের ভিত্তি।
এ অভিজ্ঞতা এখানে ব্যক্তিগত অভিযোগ হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে না; বরং একটি বৃহত্তর সমস্যার প্রতিফলন হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে।
যখন কোনো ব্যক্তি নিজের অবস্থান ও মূল্যায়নকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করেন, তখন তিনি অজান্তেই অন্যদের সম্পর্কে এমন সিদ্ধান্ত দিয়ে ফেলেন, যা বাস্তবতা ও ন্যায়পরায়ণতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নাও হতে পারে। অথচ ইসলামী নৈতিকতা আমাদের শিক্ষা দেয়—কোনো ব্যক্তি সম্পর্কে রায় প্রদানের ক্ষেত্রে ইনসাফ, সতর্কতা এবং পর্যাপ্ত জ্ঞান অপরিহার্য।
আত্মগুণাভিমান ও আত্মতুষ্টির এই মানসিকতা সম্পর্কে রাসূলুল্লাহ (সা.) অত্যন্ত কঠোর সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন। তিনি বলেন—
“পরে এমন কিছু লোকের আবির্ভাব হবে, যারা কুরআন পড়বে এবং কুরআনের জ্ঞান অর্জন করবে। তারপর তারা বলতে শুরু করবে,
‘আমাদের চেয়ে বড় কারী কে আছে? আমাদের চেয়ে বড় ফকীহ কে আছে? আমাদের চেয়ে বড় আলিম কে আছে?’”
এরপর তিনি সাহাবায়ে কেরামকে জিজ্ঞেস করলেন,
“তোমরা কি মনে কর, এদের মধ্যে কোনো কল্যাণ আছে?”
সাহাবীগণ বললেন,
“না, হে আল্লাহর রাসূল!”
তখন তিনি বললেন,
“তারা তোমাদেরই এ উম্মতের লোক; আর তারাই হবে জাহান্নামের ইন্ধন।”
— আত-তাবারানী
একইভাবে সাইয়িদুনা উমার ইবনুল খাত্তাব রা. বলেন—
“তোমাদের ব্যাপারে আমি সবচেয়ে বেশি যে বিষয়ের আশঙ্কা করি, তা হলো- মানুষের নিজের মতামতের প্রতি আত্মতুষ্টি। আর যে ব্যক্তি নিজেকে আলিম বলে দাবি করে, সে প্রকৃতপক্ষে জাহিল।”
— ইবনু হাজার, আল-মাতালিবুল ‘আলিয়াহ
প্রকৃত আলিমের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হলো বিনয়। জ্ঞান যত বৃদ্ধি পায়, নিজের সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে উপলব্ধিও তত গভীর হয়।
পক্ষান্তরে অহমিকা, আত্মতুষ্টি ও শ্রেষ্ঠত্ববোধ মানুষকে সত্য গ্রহণ থেকে বিরত রাখে এবং অন্যদের প্রতি অবিচার করতে প্ররোচিত করে।
এ কারণেই ইলমের সঙ্গে বিনয়, মতভেদের সঙ্গে সহনশীলতা এবং সমালোচনার সঙ্গে ইনসাফ যুক্ত না হলে ব্যক্তি ও সমাজ উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
আজ আমাদের ধর্মীয়, সামাজিক ও বুদ্ধিবৃত্তিক অঙ্গনে পারস্পরিক বিরোধ ও বিভাজনের পেছনে যত কারণ রয়েছে, তার মধ্যে আত্মগুণাভিমান ও শ্রেষ্ঠত্বের অহমিকা নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ কারণ।
তাই প্রয়োজন নিজের জ্ঞান, অবস্থান ও অর্জন সম্পর্কে বিনয়ী থাকা; অন্যের গুণ ও অবদানের স্বীকৃতি দেওয়া; এবং সত্যকে ব্যক্তি, দল বা গোষ্ঠীর ঊর্ধ্বে স্থান দেওয়া।
কারণ ইলমের প্রকৃত মর্যাদা শ্রেষ্ঠত্বের দাবিতে নয়, বরং বিনয়, ইনসাফ এবং সত্যের অনুসরণে নিহিত।