‘হক্কানি’ শব্দটি ‘হক্ক’ থেকে গঠিত। ‘হক্ক’ অর্থ সত্য, আর হক্কানি অর্থ সত্যাবলম্বী, সত্যনিষ্ঠ, হকের ওপর সুপ্রতিষ্ঠিত।

আলিমরা সকলেই ব্যক্তিগতভাবে নিজেকে একান্ত হক্কানি বলে দাবি করে এবং প্রতিপক্ষ আলিমকে ‘বাতিল ও গোমরাহ’ বলে আখ্যায়িত করে থাকে।

অনুরূপভাবে আমাদের আলিমদের প্রতিটি দল ও গ্রুপ নিজেদের দল ও গ্রুপকে একান্ত হক্কানি ও আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাতের অনুসারী বলে দাবি করে এবং বিরোধী দল ও গ্রুপকে ‘বাতিল ও গোমরাহ ফেরকা’ বলে আখ্যায়িত করে থাকে।

উল্লেখ্য, প্রত্যেক ব্যক্তি ও দল হককে ধারণ করবে, হকের ওপর চলবে, হকের ওপর অধিষ্ঠিত থাকবে- এটিই শরিয়াহর একান্ত কাম্য ও নির্দেশ।

তবে ব্যক্তিগতভাবে কিংবা দলগতভাবে নিজেকে বা নিজের দলকে হকের একান্ত ধারকবাহক ও পূর্ণ সত্যনিষ্ঠ বলে দাবি করা এবং প্রতিপক্ষ প্রত্যেক ব্যক্তি ও দলকে নির্বিচারে বাতিল ও গোমরাহ বলে আখ্যায়িত করা সমীচীন নয়। কারণ,

প্রথমত, বাস্তবতা হলো- উম্মাহর কোনো আলিম বা কোনো দলই ভুলের ঊর্ধ্বে নয়; সকল ব্যক্তির বা সকল দলের কমবেশি ত্রুটি-বিচ্যুতি রয়েছে।

এ কারণেই ইমাম মালিক (রহ.) বলেন,

‘এই কবরের বাসিন্দা (অর্থাৎ রাসূলুল্লাহ ﷺ) ছাড়া আমাদের মধ্যে এমন কেউ নেই, যে কোনো না কোনো সিদ্ধ বিষয়কে প্রত্যাখ্যান করেনি এবং নিজে কোনো না কোনোভাবে প্রত্যাখ্যাত হয়নি।’

দ্বিতীয়ত, ব্যক্তি বা দলের নাম, উপাধি ও দাবিতে অনেক সময় সত্য ফুটে ওঠে না। এগুলো প্রায়ই অতিরঞ্জিত ও উচ্ছ্বাসিত হয়ে থাকে। কখনো ব্যক্তি ও দলের নামকরণ ও দাবি যে অবান্তর ও অমূলক হয়, তা বলার অপেক্ষা রাখে না।

কারণ তাদের চিন্তাধারা, আমল ও আচার-আচরণ থেকে অনেক সময় তাদের এরূপ নামকরণ ও দাবির বাস্তবতা ও যথার্থতা ফুটে ওঠে না।

সুতরাং কখনো এমনও হয়, ভণ্ড, বিদআতি ও দুনিয়াদার সুবিধাভোগী আলিমরা নিজেদের ‘হক্কানি’ বলে দাবি করে এবং সত্যপথ অবলম্বনকারী ঈমানের অগ্নি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ আলিমদের ‘বাতিল’ বলে আখ্যায়িত করে।

উল্লেখ্য, ইসলামের ভ্রান্ত বিদআতি দলগুলো সব সময় নিজেদের ‘আহলুস সুন্নাহ’ নামে আখ্যায়িত করে এবং ‘হক্কানি’ বলে দাবি করে; অথচ তারা সুন্নতের নামের আড়ালে ইসলামে বহু বিদআত ও শিরক আমদানি করে এবং চর্চা করে।

অধিকন্তু, যারা আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামাতের সত্যিকার অনুসারী, যুগে যুগে বিদআতি দলগুলোও তাঁদের সুন্নতের অনুসারী ও সুন্নি বলেই স্বীকৃতিই দিতে চায়নি। তারা তাঁদের মিথ্যাবাদী বলে আখ্যা দেয়।

যেমন- আগেকার যুগে আহলুস সুন্নাহর অনুসারীদের কাদরিয়্যাহ ও মুতাজিলারা ‘মুজাব্বিরা’ (চরম অদৃষ্টবাদী) নামে অভিহিত করে থাকে। এর কারণ তারা উল্লেখ করে, এ দলটি বিশ্বাস করে- সমগ্র সৃষ্টিজগৎ আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছা ও শক্তি দ্বারা নিয়ন্ত্রিত।

জাহমিয়্যারা তাঁদের ‘মুশাববিহাহ’ (সাদৃশ্যবাদী) নাম দেয়। কারণ, তাঁরা আল্লাহ তায়ালার নাম ও গুণাবলিতে বিশ্বাস করেন।

মুরজিয়ারা তাঁদের ‘শাককিয়াহ’ (সংশয়বাদী) নামে অভিহিত করে থাকে। এর কারণ, তাঁরা ঈমানের হ্রাস-বৃদ্ধি স্বীকার করে এবং তাঁদের প্রত্যেকেই বলে, ইনশাআল্লাহ আমি একজন মুমিন।

রাফিজিরা তাঁদের ‘নাসিবিয়্যাহ’ বলে। কেননা, তাঁরা সকলের সম্মতি ও রায়ের ভিত্তিতে ইমাম (রাষ্ট্রপ্রধান) নির্বাচনের কথা বলেন।

বাতিনিয়্যাহরা তাঁদের ‘হাশবিয়াহ’ নামে অভিহিত করে। কারণ, তাঁরা রাসূলুল্লাহ ﷺ-এর হাদিস ও সাহাবায়ে কেরামের জীবনাদর্শ অনুসরণ করে থাকেন।

এভাবে আহলুস সুন্নাত ওয়াল জামায়াতের এ দলটিকে অন্যান্য দলের লোকেরা যেমন খুশি তেমন নাম দিয়েছে; অথচ তাদের প্রদত্ত কোনো নামই এ দলের জন্য উপযুক্ত নয়, প্রযোজ্য হতে পারে না।

কাজেই কেউ নিজেকে কিংবা কোনো দলের অনুসারীরা নিজেদের দলকে হক্কানি দাবি করলেই প্রকৃত হক্কানি হয়ে যায় না;

বরং একজন আলিম হক্কানি হওয়ার জন্য ইতঃপূর্বে আলিমে রব্বানির যেসব গুণ ও বৈশিষ্ট্যের কথা উল্লেখ করা হয়েছে, সেসব পাওয়া গেলেই হক্কানি হবে; অন্যথায় নাম হক্কানি হলেও কার্যত সে হবে দুনিয়ালোভী মোসাহেব, মিথ্যার দোসর ও ভণ্ড ।

অনুরূপভাবে, কোনো ইসলামি দল বা গ্রুপ হক্কানি হওয়ার জন্য চিন্তানৈতিক ও কার্যগত যেসব বৈশিষ্ট্য ও কর্মসূচি থাকা প্রয়োজন, তা পাওয়া গেলেই তা হক্কানি হবে; অন্যথায় নাম হক্কানি হলেও কার্যত তা হবে ভ্রান্ত বা বাতিলের দোসর।

তৃতীয়ত, হক্কানিয়্যাতের দাবির মধ্যে অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তির প্রচণ্ড অহমিকাও প্রকাশ পায়।

উল্লেখ্য, দ্বীনের প্রধান ও মৌলিক বিষয়গুলোতে আহলুস সুন্নাহর অন্তর্ভুক্ত আলিমগণের মধ্যে মতপার্থক্য নেই বললেই চলে। আর দ্বীনের যেসব বিষয়ে চিন্তা-গবেষণার অবকাশ রয়েছে, সে সকল বিষয়ে ব্যক্তি বা দল যে চিন্তা-বিশ্বাসই পোষণ করুক না কেন, বেশিপক্ষে তা হক হওয়ার প্রবল আশাবাদী হতে পারে; কোনো অবস্থাতেই তাকে চূড়ান্ত হক বলে দাবি করা যেতে পারে না।

তদুপরি মানুষ যতই আল্লাহর ইবাদত ও তাকওয়ার পথ অবলম্বন করুক না কেন, বেশিপক্ষে সে তার আমল আল্লাহর নিকট গৃহীত হওয়ার ব্যাপারে আশাবাদী হতে পারে। কোনো অবস্থাতেই তা গৃহীত হয়েছে বলে নিশ্চিত হতে পারে না এবং তার আমলের অবস্থা যা-ই হোক না কেন, তিনি এ নিয়ে কোনোরূপ আত্মতৃপ্তিও বোধ করতে পারে না; নিজেকে আল্লাহর কাছে অতি সম্মানিত ও মর্যাদাবান বলেও মনে করতে পারে না।

কেননা, কে প্রকৃত মুখলিস ও মুত্তাকি, কে প্রকৃত হকের ওপর অধিষ্ঠিত আর কে বাতিল, কে সত্যবাদী আর কে কপটচারী- তা কেবল আল্লাহ তায়ালাই ভালো জানেন। কেউ নিজেকে পরিশুদ্ধ মানুষ হওয়ার সনদ দিতে পারে না।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা পবিত্রতার দাবিদারদের উদ্দেশ্য করে বলেন,

‘তোমরা নিজেরা নিজেদের ত্রুটিমুক্ত মনে করো না। প্রকৃতপক্ষে আল্লাহ তায়ালাই সবচেয়ে বেশি জানেন- কে (সত্যিকার অর্থে) পরহেজ করে চলে।’

অন্য আয়াতে তিনি বলেন,

‘আপনি কি দেখেননি সেসব লোককে, যারা নিজেদের পবিত্র ও ত্রুটিমুক্ত বলে দাবি করে? বস্তুতপক্ষে আল্লাহ তায়ালাই যাকে চান তাকে পরিশুদ্ধ করেন।’

রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন,

‘যে ব্যক্তি (নিজের পাপ ও ত্রুটি-বিচ্যুতিগুলো স্মরণ করত আল্লাহ তায়ালার ভয়ে সন্ত্রস্ত হয়ে) বলে, আমি জাহান্নামেরই উপযোগী, সে-ই প্রকৃত মুমিন।

পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি (নিজের ঈমান ও আমলের ওপর আত্মতৃপ্ত হয়ে) বলে, আমি জান্নাতি, সে জাহান্নামেই যাবে। আর যে ব্যক্তি (নিজের ঈমান ও আমলের ওপর সন্তুষ্ট হয়ে অহংকারবশত) দাবি করে,

আমি একজন হক্কানি, সত্যিকার মুমিন, সে প্রকৃতপক্ষে কাফিরই।’

অপর একটি হাদিসে রাসূলুল্লাহ ﷺ তিনটি ধ্বংসাত্মক বিষয়ের বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন,

‘একটি ধ্বংসাত্মক বিষয় হলো, নিজেকে নিজে শ্রেষ্ঠ মনে করা, এটা সবার চেয়ে জঘন্য।’

কাজেই কোনো অবস্থাতেই নিজেকে শ্রেষ্ঠ ও পূর্ণ সত্যনিষ্ঠ মনে করা এবং কথাবার্তায়, আচার-আচরণে ও বেশভূষায় এরূপ কিছু প্রদর্শন করা মোটেই সমীচীন নয়; বরং অতীব নিন্দনীয়।

অনুরূপভাবে উম্মাহর মধ্যে আলিমদের নিজের দল ও গ্রুপকে একমাত্র সত্যপন্থি মনে করা এবং অন্যান্য আলিমের দল ও গ্রুপকে নির্বিচারে বাতিল ও ভ্রান্ত বলে আখ্যায়িত করা সমীচীন নয়।

[‘প্রকৃত আলিমের সন্ধানে’ বই থেকে]