রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের ইতিহাস পর্যালোচনা করলে একটি বাস্তবতা স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয়—

কোনো দল বা সংগঠন যখন জনসমর্থনে শক্তিশালী হয়ে ওঠে, রাষ্ট্রক্ষমতায় অধিষ্ঠিত হয় কিংবা ক্ষমতার নিকটবর্তী অবস্থানে পৌঁছে, তখন সেখানে কেবল আদর্শনিষ্ঠ, ত্যাগী ও নিবেদিতপ্রাণ কর্মীরাই সমবেত হন না;

বরং একই সঙ্গে একশ্রেণির সুবিধাবাদী, কপট, ব্যক্তিস্বার্থসন্ধানী ও সুযোগসন্ধানী লোকও সংগঠনের আশ্রয়ে প্রবেশের চেষ্টা করে। তাদের কাছে সংগঠনের আদর্শ, লক্ষ্য ও মূল্যবোধের চেয়ে ব্যক্তিগত অবস্থান, প্রভাব, অর্থনৈতিক সুবিধা কিংবা ক্ষমতার অংশীদার হওয়াই মুখ্য হয়ে ওঠে।

শুধু নতুন অনুপ্রবেশকারীরাই নয়, ইতিহাস এটিও দেখায় যে,

দীর্ঘদিনের ত্যাগী ও পরীক্ষিত নেতা-কর্মীদের মধ্য থেকেও কেউ কেউ অনুকূল পরিবেশে আত্মসংযম হারিয়ে ফেলতে পারেন।

দীর্ঘ সংগ্রামের পর যখন সম্মান, প্রভাব কিংবা বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা হাতের নাগালে আসে, তখন ব্যক্তিগত আকাঙ্ক্ষা, পদলিপ্সা বা স্বার্থচিন্তা তাদের একাংশকে বিচ্যুত করে ফেলতে পারে। ফলে যে ত্যাগ ও আদর্শনিষ্ঠা একসময় তাদের সবচেয়ে বড় পরিচয় ছিল, তা ক্রমে ম্লান হয়ে যেতে থাকে।

এটি কোনো নির্দিষ্ট সংগঠনের ব্যতিক্রমী সমস্যা নয়; বরং প্রায় সব বড় সংগঠনের জন্যই একটি ঐতিহাসিক ও সমাজবৈজ্ঞানিক বাস্তবতা।

সেই বিবেচনায় জামায়াতে ইসলামীও এ ঝুঁকির ঊর্ধ্বে নয়। দলটির মধ্যেও সুবিধাবাদী, কপট বা ব্যক্তিস্বার্থসন্ধানী লোকের অনুপ্রবেশ ঘটতে পারে; আবার দীর্ঘদিনের কিছু নেতা-কর্মীর মধ্যেও ব্যক্তিস্বার্থের প্রবণতা নতুন করে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারে। কোনো সংগঠন সম্পর্কে বাস্তববাদী মূল্যায়ন করতে হলে এই সম্ভাবনাকে অস্বীকার না করে বরং সতর্কতার সঙ্গে বিবেচনা করাই যুক্তিসঙ্গত।

ইতিহাস আরও শিক্ষা দেয়,

যখন কোনো সংগঠনের অভ্যন্তরে এ ধরনের প্রবণতা সীমিত পরিসর অতিক্রম করে সাংগঠনিক সংস্কৃতিকে প্রভাবিত করতে শুরু করে, তখন তার অবক্ষয়ের সূচনা ঘটে। আদর্শের জায়গা দখল করে ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, মেধার পরিবর্তে তোষণনীতি, ন্যায়ের পরিবর্তে স্বজনপ্রীতি এবং জবাবদিহিতার পরিবর্তে গোষ্ঠীকেন্দ্রিক আনুগত্য প্রতিষ্ঠিত হতে থাকে।

শেষ পর্যন্ত এ ধরনের উপাদানই অনেক শক্তিশালী সংগঠনের অভ্যন্তরীণ দুর্বলতার প্রধান কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এ কারণেই যেকোনো আদর্শভিত্তিক সংগঠনের জন্য আত্মসমালোচনা, জবাবদিহি এবং নিয়মিত শুদ্ধি প্রক্রিয়া কোনো বিলাসিতা নয়; বরং সাংগঠনিক অস্তিত্ব রক্ষার অন্যতম অপরিহার্য শর্ত।

যে সংগঠন দ্রুত বিচ্যুতি চিহ্নিত করতে পারে, নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে সত্য উদ্ঘাটন করে এবং ব্যক্তি-পরিচয় বা অতীত অবদানের ঊর্ধ্বে উঠে ন্যায়সংগত ব্যবস্থা গ্রহণ করে, সে সংগঠন দীর্ঘমেয়াদে অধিক স্থিতিশীল থাকে।

পক্ষান্তরে, ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি অন্ধ আনুগত্যের কারণে যদি অনিয়ম, দুর্নীতি ও সুবিধাবাদকে প্রশ্রয় দেওয়া হয়, তবে সংগঠনের নৈতিক ভিত্তি ধীরে ধীরে ক্ষয়প্রাপ্ত হয় এবং জনআস্থাও ক্রমান্বয়ে দুর্বল হয়ে পড়ে।

এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তাআলার একটি সুন্নতের কথা স্মরণযোগ্য।

ব্যক্তি হোক বা সমাজ—আল্লাহ সাধারণত প্রথম অপরাধেই তাৎক্ষণিক শাস্তি দেন না; বরং সংশোধন ও প্রত্যাবর্তনের সুযোগ প্রদান করেন। কিন্তু যখন কেউ সেই সুযোগ গ্রহণ না করে ক্রমাগত সীমালঙ্ঘন করতে থাকে, তখন আল্লাহর পাকড়াও এমন আকস্মিকভাবে আসে যে সে তা কল্পনাও করতে পারে না। এ বাস্তবতাই পবিত্র কুরআনে আল্লাহ তাআলা এভাবে বর্ণনা করেছেন:

﴿فَلَمَّا نَسُوا مَا ذُكِّرُوا بِهِ فَتَحْنَا عَلَيْهِمْ أَبْوَابَ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّىٰ إِذَا فَرِحُوا بِمَا أُوتُوا أَخَذْنَاهُمْ بَغْتَةً فَإِذَا هُمْ مُّبْلِسُونَ﴾

“অতঃপর যখন তাদের যে উপদেশ দেওয়া হয়েছিল, তারা তা ভুলে গেল, তখন আমরা তাদের জন্য সবকিছুর দ্বার উন্মুক্ত করে দিলাম। অবশেষে যখন তারা প্রাপ্ত নিয়ামত নিয়ে উল্লসিত হয়ে উঠল, তখন আমরা তাদের হঠাৎ পাকড়াও করলাম। ফলে তারা তখন সম্পূর্ণ হতাশ ও নির্বাক হয়ে গেল।” (সূরা আল-আন'আম, ৬:৪৪)

এই আয়াত ব্যক্তি ও সমাজ—উভয়ের ক্ষেত্রেই একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি শিক্ষা দেয়।

অনেক সময় বাহ্যিক সাফল্য, ক্ষমতা, প্রভাব বা প্রাচুর্য আল্লাহর সন্তুষ্টির প্রমাণ নয়; বরং তা সংশোধনের জন্য প্রদত্ত অবকাশও হতে পারে। যদি সেই সুযোগ আত্মশুদ্ধি ও সংশোধনের পরিবর্তে আত্মতুষ্টি, সীমালঙ্ঘন ও নৈতিক অবক্ষয়ের কারণ হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে আল্লাহর পাকড়াও এমন আকস্মিকভাবে আসতে পারে, যা কেউ কল্পনাও করতে পারে না।

তাই কোনো ব্যক্তি বা সংগঠনের উচিত সাময়িক সাফল্যে আত্মতুষ্ট না হয়ে নিয়মিত আত্মসমালোচনা, জবাবদিহি ও আত্মশুদ্ধির মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করা।

এ প্রসঙ্গে আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত একটি ঘটনাও উল্লেখযোগ্য।

এক চোরকে উমর ইবনুল খাত্তাব (রা.)-এর কাছে আনা হলে সে বলেছিল, “আল্লাহর কসম! এটাই আমার প্রথম চুরি।” তখন উমর (রা.) বলেন, “তুমি মিথ্যা বলছ। আল্লাহ তাঁর কোনো বান্দাকে প্রথম অপরাধেই এমনভাবে প্রকাশ করে দেন না।” (আবু দাউদ)

এই নীতির আলোকে বলা যায়,

কোনো সংগঠনও সাধারণত প্রথম প্রথম বিচ্যুতিতেই ধ্বংসের মুখোমুখি হয় না। কিন্তু যদি সেখানে ধারাবাহিকভাবে নৈতিক অবক্ষয় বৃদ্ধি পায়, জবাবদিহি দুর্বল হয়ে পড়ে এবং সুবিধাবাদী ও দুর্নীতিগ্রস্ত উপাদান ক্রমে প্রভাবশালী হয়ে ওঠে, তাহলে আল্লাহর সুন্নত অনুযায়ী সেই সংগঠনও একসময় কঠিন পরীক্ষার সম্মুখীন হতে পারে।

সাম্প্রতিক বিভিন্ন আলোচনা, সামাজিক প্রতিক্রিয়া এবং বিচ্ছিন্ন কিছু ঘটনার প্রেক্ষাপটে অনেক পর্যবেক্ষক উদ্বেগ প্রকাশ করছেন যে,

জামায়াতের মধ্যেও ব্যক্তিস্বার্থ, সুযোগসন্ধানিতা, স্বজনপ্রীতি, অঞ্চলকেন্দ্রিকতা কিংবা ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকেন্দ্রিক আনুগত্যের মতো প্রবণতা অনেক ক্ষেত্রে দৃশ্যমান হচ্ছে। এসব মূল্যায়নের যথার্থতা নির্ধারণের দায়িত্ব অবশ্যই সংগঠনের নিজস্ব প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার।

তবে অভিযোগগুলোকে একেবারে উপেক্ষা না করে নিরপেক্ষভাবে দ্রুত যাচাই করা, প্রয়োজনে আত্মসমালোচনার মাধ্যমে কার্যকর সংস্কার কর্মসূচি গ্রহণ করা এবং ন্যায়সংগত সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিশ্চিত করাই একটি আদর্শভিত্তিক সংগঠনের দায়িত্ব।

বলার অপেক্ষা রাখে না,

একটি আদর্শিক আন্দোলনের সবচেয়ে বড় শক্তি তার জনবল নয়, তার নৈতিক বিশ্বাসযোগ্যতা।

যদি জামায়াতে ইসলামী সময়মতো আত্মসমালোচনার সাহস দেখাতে পারে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করে সুবিধাবাদী ও নীতিবিচ্যুত উপাদানের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে পারে এবং যোগ্যতা, তাকওয়া, জবাবদিহি ও ইনসাফকে সাংগঠনিক সংস্কৃতির কেন্দ্রস্থলে প্রতিষ্ঠিত করতে পারে, তবে তাদের সামাজিক গ্রহণযোগ্যতা ও দীর্ঘমেয়াদি শক্তি আরও সুদৃঢ় হবে।

কিন্তু যদি ব্যক্তিস্বার্থ ও গোষ্ঠীস্বার্থকে আদর্শের ওপর স্থান দেওয়ার প্রবণতা বাড়ে এবং বিচ্যুতিকে অবহেলা করা হয়,

তবে ইতিহাসের শিক্ষা অনুযায়ী যে কোনো সংগঠনের মতো তাদের জন্যও নৈতিক অবক্ষয় ও জনআস্থার সংকট ক্রমেই গভীর থেকে গভীরতর হওয়ার আশঙ্কা থেকে যায়।