(ইসলামী ঘরানার লেখক ও প্রকাশকদের প্রতি আন্তরিক নিবেদন; গতকালের ‘এক নজরে কুরআন বিক্রি’ শীর্ষক পোস্টের পরিপূরক আলোচনা)

https://www.facebook.com/share/p/1HfpaF6zg2/

ইসলামী জ্ঞানচর্চা, লেখালেখি ও প্রকাশনা কেবল একটি পেশাগত কার্যক্রম নয়; বরং এটি এক মহান দ্বীনী দায়িত্ব, আমানত এবং ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ তাআলা যাঁদের জ্ঞান, প্রজ্ঞা ও লেখনীর যোগ্যতা দান করেছেন, তাঁদের ওপর এ দায়িত্ব আরও বেশি বর্তায়।

এ কাজের মূল উদ্দেশ্য হওয়া উচিত মানুষের কাছে বিশুদ্ধ দ্বীনের শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া, ইলমের প্রসার ঘটানো এবং সর্বোপরি আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করা।

এ কারণে ইসলামী লেখালেখিকে আত্মপ্রচার, আত্মপ্রতিষ্ঠা কিংবা ব্যক্তিগত খ্যাতি অর্জনের হাতিয়ার বানানো একজন দ্বীনী লেখকের জন্য অত্যন্ত সতর্কতার বিষয়।

ইসলাম আমলের বাহ্যিক সৌন্দর্যের চেয়ে নিয়তের বিশুদ্ধতার ওপর অধিক গুরুত্বারোপ করেছে। কোনো কাজ বাহ্যিকভাবে যত বড়ই হোক, যদি তার পেছনে ইখলাসের ঘাটতি থাকে, তবে আল্লাহর কাছে তার গ্রহণযোগ্যতা প্রশ্নবিদ্ধ হতে পারে।

তাই ইসলামী লেখালেখির সঙ্গে সম্পৃক্ত প্রত্যেকেরই উচিত নিয়মিত নিজের নিয়ত পর্যালোচনা করা এবং সর্বোচ্চ আন্তরিকতার সঙ্গে এ দায়িত্ব পালন করা।

অবশ্য কোনো প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী লেখকের সম্মানী গ্রহণ করা শরীয়তসম্মত ও স্বাভাবিক বিষয়। ইসলামী শরীয়ত বৈধ উপার্জনকে নিরুৎসাহিত করে না।

তবে উদ্বেগের বিষয় হলো,

কোথাও কোথাও এমন প্রবণতা লক্ষ্য করা যায় যে, ইসলামী লেখালেখি ধীরে ধীরে দ্বীনী দায়িত্বের পরিবর্তে আত্মপ্রচার, ব্যক্তিগত ব্র্যান্ড নির্মাণ কিংবা অতিরিক্ত আর্থিক লাভের অন্যতম মাধ্যম হয়ে উঠছে। এ ধরনের প্রবণতা যদি সত্যিই বিস্তার লাভ করে, তবে তা ইসলামী জ্ঞানচর্চার মৌলিক চেতনার সঙ্গে সংগতিপূর্ণ নয় এবং আত্মসমালোচনার দাবি রাখে।

আমাদের পূর্বসূরি মনীষীদের জীবন এ ক্ষেত্রে এক উজ্জ্বল আদর্শ। তাঁরা তাঁদের রচনাকে ব্যক্তিগত খ্যাতি বা সম্পদ অর্জনের উপায় হিসেবে গ্রহণ করেননি; বরং একে আল্লাহর সন্তুষ্টি ও দ্বীনের খেদমতের মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করেছেন। তাঁদের ইখলাস, আত্মগোপন ও আল্লাহভীতির অসংখ্য দৃষ্টান্ত ইসলামী ইতিহাসে সংরক্ষিত রয়েছে।

এ প্রসঙ্গে প্রসিদ্ধ ফকীহ ও বিচারপতি ইমাম আবুল হাসান আল-মাওয়ারদী (রাহ.)-এর একটি ঘটনা বিশেষভাবে প্রণিধানযোগ্য।

বর্ণিত আছে, তিনি তাফসীর, ফিকহ ও ইসলামী জ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে বহু মূল্যবান গ্রন্থ রচনা করেছিলেন; কিন্তু জীবদ্দশায় সেগুলো প্রকাশ করেননি। মৃত্যুশয্যায় তিনি তাঁর এক বিশ্বস্ত ব্যক্তিকে ডেকে বলেছিলেন, অমুক স্থানে আমার রচিত গ্রন্থগুলো সংরক্ষিত আছে। যখন আমার মৃত্যুর সময় উপস্থিত হবে, তখন তুমি আমার হাত তোমার হাতে রাখবে। যদি দেখো, আমি তোমার হাত শক্ত করে ধরছি, তবে বুঝবে—আমার এ রচনাগুলো আল্লাহর কাছে কবুল হয়নি; সেক্ষেত্রে রাতের অন্ধকারে সেগুলো দিজলা নদীতে ফেলে দেবে। আর যদি দেখো, আমি হাত প্রসারিত করছি, তবে বুঝবে—আল্লাহ তাআলা আমার এ প্রচেষ্টাকে কবুল করেছেন। পরে তাঁর মৃত্যুর সময় দেখা যায়, তিনি হাত প্রসারিত করেছেন। তখন সেই ব্যক্তি তাঁর রচনাবলি মানুষের কল্যাণে প্রকাশ করেন। (আল-মুনাজ্জিদ, সিলসিলাতু আ‘মালিল কুলূব)

এ ঘটনার ঐতিহাসিক বিশুদ্ধতা নিয়ে গবেষকদের মধ্যে আলোচনা থাকতে পারে; তবে এর নৈতিক শিক্ষা অত্যন্ত গভীর। একজন আলিমের সবচেয়ে বড় দুশ্চিন্তা ছিল তাঁর গ্রন্থ কত কপি বিক্রি হবে, কত মানুষ তাঁর নাম জানবে বা কত অর্থ তিনি অর্জন করবেন—তা নয়; বরং তাঁর আমল আল্লাহর দরবারে কবুল হবে কি না। এ মনোভাবই প্রকৃত ইখলাসের পরিচায়ক।

একইভাবে ইসলামী বই প্রকাশনাকেও কেবল একটি বাণিজ্যিক উদ্যোগ হিসেবে দেখা সমীচীন নয়। এটি মূলত দ্বীনের দাওয়াত, ইলমের প্রসার এবং উম্মাহর বুদ্ধিবৃত্তিক নির্মাণের একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। এ দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে পরিচালিত হলে লেখক, প্রকাশক, সম্পাদক, মুদ্রাকর ও পরিবেশক—সবার শ্রমই ইবাদতের মর্যাদা লাভ করতে পারে এবং আল্লাহর নিকট সাওয়াবের কারণ হতে পারে।

অবশ্যই একটি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান পরিচালনার জন্য ব্যয় নির্বাহ এবং যৌক্তিক ও ন্যায্য মুনাফা অর্জন বৈধ ও প্রয়োজনীয়।

কিন্তু ইসলামী প্রকাশনার ক্ষেত্রে অতিরিক্ত মুনাফাখোরি, কৃত্রিম সংকট সৃষ্টি করে মূল্য বৃদ্ধি, সিন্ডিকেটের মাধ্যমে বাজার নিয়ন্ত্রণ, অতিরঞ্জিত বা বিভ্রান্তিকর বিজ্ঞাপন, অমূলক প্রচারণা, লেখক-পাঠকের প্রতি অস্বচ্ছ আচরণ কিংবা অন্যান্য অনৈতিক বাণিজ্যিক কৌশল—এসব সাধারণ ব্যবসায় যেমন নিন্দনীয়, ইসলামী বইয়ের ক্ষেত্রে তা আরও অধিক নিন্দনীয়। কারণ এখানে কেবল ব্যবসায়িক নীতির প্রশ্ন নয়; বরং দ্বীনের খেদমত, আমানতদারিতা ও নৈতিকতার প্রশ্নও কঠিনভাবে জড়িত।

বর্তমান সময়ে ইসলামী লেখক ও প্রকাশক—উভয়েরই প্রয়োজন নিয়মিত আত্মসমালোচনা করা এবং নিজেদের নিয়ত ও কর্মপদ্ধতিকে নবায়ন করা। আমাদের প্রত্যেকেরই স্মরণ রাখা উচিত, ইসলামী বই কেবল একটি পণ্য নয়; এটি মানুষের ঈমান, চিন্তা ও আমল গঠনের অন্যতম মাধ্যম।

তাই এ অঙ্গনের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রত্যেকের কাছে পেশাগত দক্ষতার পাশাপাশি ইখলাস, আমানতদারিতা, ন্যায়পরায়ণতা ও তাকওয়ার সর্বোচ্চ মান বজায় রাখার প্রত্যাশাই স্বাভাবিক।

আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে তাঁর দ্বীনের খেদমত একান্ত ইখলাসের সঙ্গে করার তাওফীক দান করুন এবং আমাদের সকল প্রচেষ্টাকে তাঁর দরবারে কবুল করুন। আমীন।