বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নকালে আমাদের প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের মধ্যে পাঠ্যবইয়ের পাশাপাশি রেফারেন্স বই সংগ্রহ ও অধ্যয়নের একটি শক্তিশালী সংস্কৃতি ছিল। কোনো বিষয়ে মানসম্মত অ্যাসাইনমেন্ট বা গবেষণাপত্র প্রস্তুত করার জন্য আমরা গ্রন্থাগারে দীর্ঘ সময় কাটাতাম, বিভিন্ন লেখকের বই তুলনামূলকভাবে পড়তাম, এমনকি প্রয়োজন হলে বিদেশ থেকে বই সংগ্রহেরও চেষ্টা করতাম। জ্ঞানের গভীরে পৌঁছাতে বইকে তখন অপরিহার্য মাধ্যম হিসেবেই বিবেচনা করা হতো।

বর্তমান ডিজিটাল যুগে সেই চিত্রে উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন লক্ষ করা যাচ্ছে।

তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তৃত সুযোগ-সুবিধা নিঃসন্দেহে শিক্ষার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে; তবে এর একটি অনাকাঙ্ক্ষিত দিকও স্পষ্ট হয়ে উঠছে।

অনেক শিক্ষার্থীর মধ্যে ধারাবাহিক ও গভীর পাঠের পরিবর্তে নির্বাচিত (selective) এবং তাৎক্ষণিক প্রয়োজনভিত্তিক পড়াশোনার প্রবণতা বৃদ্ধি পেয়েছে। মুদ্রিত বই সংগ্রহ ও অধ্যয়নের পরিবর্তে তারা অধিকাংশ ক্ষেত্রে পিডিএফ বা সংক্ষিপ্ত অনলাইন উপকরণের ওপর নির্ভর করছে।

অ্যাসাইনমেন্ট প্রস্তুতের ক্ষেত্রেও বই অনুসন্ধান, তথ্য যাচাই ও বিশ্লেষণের পরিবর্তে অনেকেই চ্যাটজিপিটি বা অন্যান্য কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক একাডেমিক টুল ব্যবহার করে অল্প সময়ের মধ্যে কাজ সম্পন্ন করার চেষ্টা করে।

এসব টুল গবেষণা ও শিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক হলেও যাচাই-বাছাই ছাড়া এগুলোর ওপর অতিমাত্রায় নির্ভরশীলতা অনেক সময় তথ্যগত অসঙ্গতি, বিশ্লেষণগত দুর্বলতা এবং বিষয়বস্তুর গভীরতার ঘাটতি সৃষ্টি করছে। একই সঙ্গে স্বাধীন চিন্তা, সৃজনশীলতা ও মৌলিক গবেষণার দক্ষতার স্বাভাবিক বিকাশও দারুনভাবে ব্যাহত হচ্ছে।

শিক্ষার্থীদের মধ্যে বই পড়া ও বই কেনার অভ্যাস ক্রমাগত কমে যাওয়ার বিষয়টি শুধু ব্যক্তিগত পাঠাভ্যাসের সংকট নয়; এটি জ্ঞানচর্চা ও প্রকাশনা-সংস্কৃতির জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।

একটি সুস্থ প্রকাশনা-পরিবেশ টিকে থাকে মূলত পাঠকের ওপর। যখন বইয়ের পাঠক ও ক্রেতা উভয়ের সংখ্যাই কমতে থাকে, তখন লেখকের সৃজনশীল শ্রমের যথাযথ মূল্যায়নও বাধাগ্রস্ত হয়। ফলস্বরূপ অনেক গবেষক ও লেখক দীর্ঘ সময় ব্যয় করে মৌলিক গ্রন্থ রচনার অনুপ্রেরণা হারিয়ে ফেলেন। একইভাবে প্রকাশকরাও বই প্রকাশে আগের মতো আগ্রহ দেখাতে পারেন না।

বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রেই একটি পাণ্ডুলিপি প্রকাশকের কাছে জমা দেওয়ার পর দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। বিশেষ করে গবেষণাধর্মী, বৃহৎ পরিসরের বা উচ্চ ব্যয়সম্পন্ন প্রকাশনা প্রকল্প গ্রহণে অনেক প্রকাশক আর্থিক ঝুঁকির কারণে অনীহা প্রকাশ করেন। দীর্ঘমেয়াদে এই পরিস্থিতি অব্যাহত থাকলে মৌলিক গবেষণা ও মানসম্মত প্রকাশনার ক্ষেত্র সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা উড়িয়ে দেওয়া যায় না।

এ অবস্থায় একদিকে সম্ভাবনাময় ও মৌলিক লেখকদের একটি অংশ দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা ও গ্রন্থপ্রণয়নে উৎসাহ হারিয়ে ফেলছেন, অন্যদিকে পাঠকসংখ্যা ও বই বিক্রি হ্রাস পাওয়ায় বহু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানও অস্তিত্ব রক্ষার কঠিন চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হচ্ছে।

জ্ঞানচর্চার ধারাবাহিকতা বজায় রাখতে শক্তিশালী লেখক, সচেতন পাঠক এবং উদ্যমী প্রকাশক—এই তিনটি স্তম্ভের পারস্পরিক নির্ভরতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এর যেকোনো একটি দুর্বল হয়ে পড়লে পুরো জ্ঞান-পরিবেশই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।

লেখালেখির পদ্ধতিতেও লক্ষণীয় পরিবর্তন এসেছে। অতীতে একটি ২০০ পৃষ্ঠার মৌলিক গবেষণাধর্মী গ্রন্থ প্রস্তুত করতে প্রায়ই এক বছরেরও বেশি সময় লেগে যেত। কারণ, এর পেছনে ছিল বিস্তৃত পাঠ, তথ্য সংগ্রহ, তুলনামূলক বিশ্লেষণ, পুনর্বিবেচনা ও দীর্ঘ সম্পাদনা-প্রক্রিয়া।

বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক বিভিন্ন টুলের সহায়তায় একই পরিসরের একটি বই তুলনামূলকভাবে অনেক কম সময়ে প্রস্তুত করা সম্ভব হচ্ছে। প্রযুক্তির এই সুবিধা অবশ্যই ইতিবাচক; তবে যদি এটি গভীর অধ্যয়ন, স্বাধীন চিন্তা ও মৌলিক বিশ্লেষণের বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে গবেষণা ও লেখালেখির গুণগত মান ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।

অনেক ক্ষেত্রে মৌলিক চিন্তা, স্বতন্ত্র বিশ্লেষণ ও স্বাধীন গবেষণার পরিবর্তে বিভিন্ন উৎস থেকে তথ্য সংগ্রহ, পুনর্বিন্যাস এবং কপি-পেস্টনির্ভর সংকলনের প্রবণতা বাড়ছে।

এ প্রবণতা অব্যাহত থাকলে দীর্ঘমেয়াদে মৌলিকত্ব, সৃজনশীলতা এবং গভীর জ্ঞানচর্চার ভিত্তিই দুর্বল হয়ে পড়তে পারে।

একই ধরনের পরিবর্তন অনুবাদের ক্ষেত্রেও লক্ষ্য করা যায়। আগে একটি মানসম্মত অনুবাদ সম্পন্ন করতে উৎস ও লক্ষ্য—উভয় ভাষায় যথেষ্ট দক্ষতা অপরিহার্য ছিল। বর্তমানে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক অনুবাদ-প্রযুক্তি অল্প সময়েই সাবলীল অনুবাদ তৈরি করতে সক্ষম। এতে অনুবাদের গতি ও সহজলভ্যতা বৃদ্ধি পেলেও যদি ভাষাগত অনুশীলন ও দক্ষতা অর্জনের প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষিত হয়, তবে দীর্ঘমেয়াদে ভাষাজ্ঞান, শব্দবোধ ও শৈলীগত পারদর্শিতা ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে।

প্রযুক্তির অগ্রগতি নিঃসন্দেহে আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ আশীর্বাদ। তবে প্রযুক্তিকে যদি জ্ঞানচর্চার সহায়ক হিসেবে ব্যবহার করা হয়, তাহলে তা শিক্ষা ও গবেষণাকে সমৃদ্ধ করবে;

আর যদি তা গভীর পাঠ, মৌলিক চিন্তা ও সৃজনশীল পরিশ্রমের বিকল্পে পরিণত হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে ব্যক্তি, শিক্ষা-ব্যবস্থা এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ—সব ক্ষেত্রেই এর নেতিবাচক প্রভাব দৃশ্যমান হতে পারে।

তাই বইপড়া, বই সংগ্রহ, গভীর অধ্যয়ন এবং সমালোচনামূলক চিন্তার সংস্কৃতি পুনরুজ্জীবিত করা আজ সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।