একবার খলীফা সুলাইমান ইবনু আবদিল মালিক মক্কায় যাওয়ার পথে মদীনায় আগমন করেন এবং সেখানে কয়েকদিন অবস্থান করেন। তিনি জিজ্ঞেস করলেন,

“মদীনায় এমন কেউ আছেন কি, যিনি রাসূলুল্লাহ ﷺ–এর কোনো সাহাবীকে পেয়েছেন?”

লোকেরা বলল,

“হ্যাঁ, আবু হাযিম (রাহ.) আছেন।”

তখন তিনি আবু হাযিম সালামাহ ইবনু দিনার (রাহ.)কে ডেকে পাঠালেন।

তিনি উপস্থিত হলে সুলাইমান বললেন,

“হে আবু হাযিম! এ কেমন অসৌজন্য ও অবহেলা?!”

আবু হাযিম বললেন,

“হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনি এমন কথা বলবেন না যা বাস্তবে ঘটেনি। আজকের আগে আপনিও আমাকে চিনতেন না, আমিও আপনাকে দেখিনি।(তাহলে এখানে অসৌজন্য ও অবহেলার কী হলো!)”

তখন সুলাইমান মুহাম্মাদ ইবনু শিহাব আয-যুহরী (রাহ.)-এর দিকে ফিরে বললেন,

“শায়খ তো ঠিকই বলেছেন; ভুল করেছি আমি।”

সুলাইমান বললেন,

“আমরা মৃত্যুকে এত অপছন্দ করি কেন?”

আবু হাযিম বললেন,

“কারণ, আপনারা আখিরাতকে ধ্বংস করেছেন আর দুনিয়াকে আবাদ করেছেন। তাই আবাদভূমি থেকে ধ্বংসস্তুপে স্থানান্তর হতে অপছন্দ করছেন।”

সুলাইমান বললেন,

“আপনি সত্য বলেছেন, হে আবু হাযিম! আগামীকাল আল্লাহর সামনে উপস্থিতি কেমন হবে?”

তিনি বললেন,

أما المحسن فكالغائب يقدم على أهله، وأما المسيء فكالآبق يقدم على مولاه.

“নেককার ব্যক্তি হবে সেই প্রবাসীর মতো, যে আপনজনের কাছে ফিরে আসে। আর পাপী ব্যক্তি হবে পালিয়ে যাওয়া গোলামের মতো, যাকে তার প্রভুর কাছে ফিরিয়ে নেওয়া হয়।”

এ কথা শুনে সুলাইমান কেঁদে ফেললেন এবং বললেন,

“আহা! আল্লাহর কাছে আমাদের অবস্থা কী হবে!”

আবু হাযিম বললেন,

“আপনার আমলকে আল্লাহর কিতাবের সামনে পেশ করুন।”

সুলাইমান বললেন,

“কোথায় তা পাব?”

আবু হাযিম বললেন,

“নিশ্চয়ই সৎকর্মশীলরা থাকবে জান্নাতে এবং পাপিষ্ঠরা থাকবে জাহান্নামে।”

সুলাইমান বললেন,

“তাহলে আল্লাহর রহমত কোথায়?”

আবু হাযিম বললেন,

“নিশ্চয়ই আল্লাহর রহমত সৎকর্মশীলদের নিকটবর্তী।”

সুলাইমান বললেন,

“আল্লাহর বান্দাদের মধ্যে সবচেয়ে সম্মানিত কে?”

আবু হাযিম বললেন,

“যারা মর্যাদাবোধ ও প্রজ্ঞার অধিকারী।”

সুলাইমান বললেন,

“সবচেয়ে উত্তম আমল কোনটি?”

তিনি উত্তর দিলেন,

“ফরজসমূহ আদায় করা এবং হারাম থেকে বেঁচে থাকা।”

সুলাইমান বললেন,

“কোন দুআ সবচেয়ে অধিক কবুল হয়?”

তিনি বললেন,

“যার প্রতি অনুগ্রহ করা হয়েছে, তার পক্ষ থেকে অনুগ্রহকারীর জন্য করা দুআ।”

সুলাইমান বললেন,

“কোন সদকা সর্বোত্তম?”

তিনি বললেন,

“অভাবগ্রস্ত ভিক্ষুককে দান করা এবং দরিদ্র অবস্থায় সাধ্যানুযায়ী ব্যয় করা, যাতে না থাকে অনুগ্রহের খোঁটা, না থাকে কষ্ট দেওয়া।”

সুলাইমান বললেন,

“সবচেয়ে ন্যায়সঙ্গত কথা কোনটি?”

তিনি বললেন,

“যাকে ভয় করো কিংবা যার কাছ থেকে কিছু আশা করো, তার সামনেও সত্য কথা বলা।”

সুলাইমান বললেন,

“মু’মিনদের মধ্যে সবচেয়ে বিচক্ষণ কে?”

তিনি বললেন,

“যে ব্যক্তি আল্লাহর আনুগত্য করে এবং মানুষকেও তার দিকে আহ্বান করে।”

সুলাইমান বললেন,

“সবচেয়ে নির্বোধ মু’মিন কে?”

তিনি বললেন,

“যে ব্যক্তি কোনো অত্যাচারী মানুষের প্রবৃত্তির অনুসরণ করতে গিয়ে নিজের আখিরাতকে অন্যের দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রি করে দেয়।”

সুলাইমান বললেন,

“আমাদের বর্তমান অবস্থা সম্পর্কে আপনার মত কী?”

আবু হাযিম বললেন,

“হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনি কি আমাকে এ প্রশ্ন থেকে অব্যাহতি দেবেন?!”

তিনি বললেন,

“না, বরং আমাকে উপদেশ দিন।”

তখন আবু হাযিম বললেন,

يا أمير المؤمنين ان آباءك قهروا الناس بالسيف، وأخذوا هذا الملك عنوة على غير مشورة من المسلمين ولا رضا لهم حتى قتلوا منهم مقتله عظيمة؛ فقد ارتحلوا عنها فلو شعرت ما قالوه وما قيل لهم!

“হে আমীরুল মু’মিনীন! আপনার পূর্বপুরুষেরা শক্তির জোরে মানুষের ওপর কর্তৃত্ব কায়েম করেছিলেন। মুসলমানদের পরামর্শ ও সন্তুষ্টি ছাড়াই এ শাসনক্ষমতা গ্রহণ করেছিলেন এবং এ পথে বহু মানুষ নিহত হয়েছিল। অতঃপর তারা দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে। হায়! যদি জানা যেত, তারা কী বলেছে এবং তাদেরকে কী বলা হয়েছে!”

দরবারের এক ব্যক্তি বলল,

“হে আবু হাযিম! আপনি খুব খারাপ কথা বললেন!”

আবু হাযিম বললেন,

كذبت! إن الله أخذ ميثاق العلماء ليبيننه للناس ولا يكتمونه.

“তুমি মিথ্যা বলেছ। আল্লাহ আলিমদের থেকে অঙ্গীকার নিয়েছেন যে, তারা সত্য মানুষের সামনে প্রকাশ করবে এবং তা গোপন করবে না।”

সুলাইমান বললেন,

“আমরা কীভাবে নিজেদের সংশোধন করতে পারি?”

তিনি বললেন,

“অহংকার ও কৃত্রিম আভিজাত্য বর্জন করুন, মর্যাদাবোধ আঁকড়ে ধরুন এবং ন্যায়ভিত্তিক বণ্টন প্রতিষ্ঠা করুন।”

সুলাইমান বললেন,

“সম্পদ সঠিকভাবে ব্যয় করার পথ কী?”

তিনি বললেন,

“হালালভাবে গ্রহণ করবে এবং যথাস্থানে ব্যয় করবে।”

এরপর সুলাইমান বললেন,

“হে আবু হাযিম! আপনি কি আমাদের সঙ্গী হবেন, যাতে আপনি আমাদের থেকে উপকৃত হন এবং আমরাও আপনার থেকে উপকৃত হতে পারি?”

আবু হাযিম বললেন,

“আমি আল্লাহর কাছে এ থেকে আশ্রয় চাই।”

সুলাইমান বললেন,

“কেন?”

তিনি বললেন,

أخشى أن أركن إليكم شيئا قليلا فيذيقني الله ضعف الحياة وضعف الممات

“আমি আশঙ্কা করি, যদি সামান্যও আপনাদের দিকে ঝুঁকে পড়ি, তবে আল্লাহ আমাকে দ্বিগুণ শাস্তি ভোগ করাবেন—জীবনেও এবং মৃত্যুতেও।”

সুলাইমান বললেন,

“আপনার প্রয়োজনের কথা বলুন।”

তিনি বললেন,

“আমাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন এবং জান্নাতে প্রবেশ করান।”

সুলাইমান বললেন,

“এটা তো আমার ক্ষমতার বাইরে।”

আবু হাযিম বললেন,

“তাহলে আমার আর কোনো প্রয়োজন নেই।”

সুলাইমান বললেন,

“তাহলে অন্তত আমার জন্য দুআ করুন।”

আবু হাযিম দুআ করলেন,

اللهم إن كان سليمان وليك فيسره لخير الدنيا والآخرة، وإن كان عدوك فخذ بناصيته إلى ما تحب وترضى.

“হে আল্লাহ! যদি সুলাইমান আপনার বন্ধুদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তবে তার জন্য দুনিয়া ও আখিরাতের কল্যাণ সহজ করে দিন। আর যদি সে আপনার শত্রুদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে থাকে, তবে তার কপাল ধরে তাকে আপনার পছন্দনীয় ও সন্তোষজনক পথে পরিচালিত করুন।”

সুলাইমান বললেন,

“আরও উপদেশ দিন।”

তিনি বললেন,

قد أوجزت وأكثرت إن كنت من أهله، وان لم تكن من أهله فما ينفعني أن أرمي عن قوس ليس لها وتر.

“সংক্ষেপেই বলেছি, কিন্তু তা অনেক গভীর। যদি আপনি এর উপযুক্ত হন, তবে এ উপদেশই যথেষ্ট; আর যদি উপযুক্ত না হন, তবে টানবিহীন ধনুক থেকে তীর ছুড়ে কোনো লাভ নেই।”

তিনি আরও বললেন,

“আমি আপনাকে সংক্ষিপ্ত উপদেশ দিচ্ছি: আল্লাহকে এত মহান জ্ঞান করুন যে, তিনি যেন আপনাকে তাঁর নিষিদ্ধ কাজে লিপ্ত অবস্থায় না দেখেন; আর তিনি যেন আপনাকে তাঁর আদিষ্ট কাজ থেকে অনুপস্থিত না পান।”

আবু হাযিম বের হয়ে গেলে সুলাইমান তার কাছে একশত দিনার পাঠালেন এবং লিখলেন,

“এ অর্থ ব্যয় করুন; প্রয়োজনে এর চেয়েও বেশি পাবেন।”

আবু হাযিম তা ফিরিয়ে দিলেন এবং লিখলেন,

يا أمير المؤمنين أعيذك بالله ان يكون سؤالك إياي هزلا أو ردي عليك بذل وما أرضاها لك فكيف أرضاها لنفسي

“হে আমীরুল মু’মিনীন! আল্লাহর আশ্রয় চাইÑআপনার প্রশ্ন যদি উপহাস হয়ে থাকে কিংবা আমার প্রত্যাখ্যান যদি অপমান হিসেবে গণ্য হয়! আমি এ অর্থ আপনার জন্যও পছন্দ করি না; নিজের জন্যই বা কীভাবে পছন্দ করব?”

এরপর তিনি সাইয়িদুনা মূসা আলাইহিস সালাম ও শু‘আইব আলাইহিস সালাম-এর ঘটনা উল্লেখ করে বলেন যে,

মূসা (আ.) চরম ক্ষুধা ও ভয়ের মধ্যেও নিজের দ্বীনকে দুনিয়ার বিনিময়ে বিক্রি করতে চাননি।

অবশেষে তিনি লিখলেন,

ان كانت هذه المائة دينار عوضا لما حدثت فالميتة والدم ولحم الخنزير في حال الاضطرار أحل من هذه وان كان لحق في بيت المال فلي فيها نظراء فإن ساويت بيننا وإلا فليس لي فيها حاجة

“যদি এ একশত দিনার আমার এ উপদেশের বিনিময় হয়ে থাকে, তবে তা আমার জন্য মৃত পশুর গোশত, রক্ত ও শূকরের মাংসের চেয়েও নিকৃষ্ট।

আর যদি এটি বায়তুলমালের প্রাপ্য অংশ হয়, তবে সেখানে আমার মতো আরও বহু মানুষের অধিকার রয়েছে। সুতরাং সবার মাঝে সমানভাবে বণ্টন করলে আমি গ্রহণ করব; অন্যথায় এতে আমার কোনো প্রয়োজন নেই।” (দারিমী, আসসুনান, হা. নং: ৬৪৭)

এ ঘটনাটি ইসলামের ইতিহাসে সত্যনিষ্ঠ আলিমের চরিত্র, আখিরাতসচেতনতা ও আত্মমর্যাদাবোধের এক অনন্য দৃষ্টান্ত।

এ থেকে শিক্ষা পাওয়া যায় যে,

প্রকৃত আলিম ক্ষমতার সামনে কখনও তোষামোদ করেন না; বরং নির্ভয়ে হক কথা বলেন এবং নিজের দ্বীনী স্বাধীনতা রক্ষার্থে শাসকদের দান-অনুগ্রহ গ্রহণের ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক থাকেন।

ঘটনাটি আরও শিক্ষা দেয় যে,

দুনিয়ামুখিতা মানুষকে মৃত্যুভীতিগ্রস্ত করে, পক্ষান্তরে আখিরাতের প্রস্তুতি মৃত্যু ও আল্লাহর সাক্ষাতকে সহজ করে তোলে।

একই সঙ্গে এতে ফরজ আদায়, হারাম বর্জন, ন্যায়ভিত্তিক শাসন, বায়তুলমালের আমানতদারিত্ব এবং শাসকের সামনে সত্য কথা বলার গুরুত্বও সুস্পষ্টভাবে ফুটে উঠেছে।