লেখালেখির জগতে দীর্ঘদিনের কিছু অভিজ্ঞতা থেকে মনে হয়েছে,

বাংলাদেশে—বিশেষত ইসলামী জ্ঞানচর্চার পরিসরে—মৌলিক, গবেষণাধর্মী ও তাত্ত্বিক গ্রন্থের প্রতি আগ্রহ তুলনামূলকভাবে সীমিত।

এর পেছনে কেবল পাঠকের রুচি দায়ী নয়; প্রকাশনা-বাজারের বাস্তবতাও এখানে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে।

সাম্প্রতিক সময়ে সহজপাঠ্য, সংক্ষিপ্ত, চটকদার ও মোটিভেশনাল বইয়ের প্রতি পাঠকের আগ্রহ বৃদ্ধি পেয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই প্রকাশকরাও বাজারের চাহিদাকে বিবেচনায় নিয়ে অপেক্ষাকৃত কম ব্যয়, দ্রুত প্রকাশ এবং নিশ্চিত বিক্রয়ের সম্ভাবনাসম্পন্ন বইয়ের দিকে বেশি ঝুঁকছেন।

কোনো লেখক যদি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ইতোমধ্যে জনপ্রিয় বা ‘ভাইরাল’ হয়ে থাকেন, তাহলে তাঁর বই প্রকাশের ক্ষেত্রে এই আগ্রহ আরও বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

এর ফলে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈপরীত্য তৈরি হয়েছে।

যে ধরনের মৌলিক ও তাত্ত্বিক গবেষণাকর্ম ইসলামী জ্ঞানচর্চার দীর্ঘমেয়াদি ভিত্তি নির্মাণ করতে পারে, সেগুলো সাধারণত দীর্ঘ সময়, বিপুল শ্রম, দক্ষ সম্পাদনা এবং যথেষ্ট আর্থিক বিনিয়োগ দাবি করে; কিন্তু প্রকাশনা-বাজারের প্রচলিত কাঠামোতে এসব গ্রন্থের বাণিজ্যিক সাফল্য নিশ্চিত নয়।

ফলে বৃহৎ কলেবরের গবেষণাগ্রন্থ, বহু-খণ্ডের প্রকল্প, সমন্বিত অভিধান, বিশ্বকোষ, বিষয়ভিত্তিক গবেষণা-সিরিজ কিংবা দীর্ঘমেয়াদি অনুবাদ প্রকল্পে প্রকাশকদের বিনিয়োগের আগ্রহ স্বাভাবিকভাবেই সীমিত থাকে। এভাবে বাজারের তাৎক্ষণিক চাহিদা ধীরে ধীরে জ্ঞানচর্চার দীর্ঘমেয়াদি প্রয়োজনকে ছাপিয়ে যায়।

এখানে সমস্যাটি কেবল প্রকাশক বা পাঠকের রুচির নয়; এর সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত রয়েছে গবেষণার প্রাতিষ্ঠানিক অবকাঠামো। বৃহৎ গবেষণা-প্রকল্প ব্যক্তিগত উদ্যোগে দীর্ঘদিন পরিচালনা করা অত্যন্ত কঠিন। এর জন্য প্রয়োজন পর্যাপ্ত অর্থায়ন, গবেষক-দল, গবেষণা-সহকারী, পাণ্ডুলিপি সম্পাদনা, তথ্য-সংগ্রহ, গ্রন্থাগার ও ডিজিটাল রিসোর্স, দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা এবং সর্বোপরি একটি স্থিতিশীল প্রাতিষ্ঠানিক পৃষ্ঠপোষকতা।

দুঃখজনকভাবে বাংলাদেশে ইসলামী গবেষণার ক্ষেত্রে এ ধরনের শক্তিশালী ও ধারাবাহিক প্রতিষ্ঠান এখনও গড়ে ওঠেনি।

রাষ্ট্রীয় পর্যায়ে একসময় ইসলামিক ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ ইসলামী গবেষণা, অনুবাদ, সম্পাদনা ও প্রকাশনার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। অভিধান, বিশ্বকোষ, মৌলিক গবেষণাগ্রন্থ, অনুবাদ এবং বিভিন্ন বৃহৎ প্রকাশনা-প্রকল্পের মাধ্যমে প্রতিষ্ঠানটি বাংলাদেশের ইসলামী জ্ঞানচর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক ঐতিহ্য নির্মাণে অবদান রেখেছে।

এ ধরনের উদ্যোগের বিশেষ গুরুত্ব ছিল এই কারণে যে, এগুলো কেবল একটি-দুটি বই প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল না; বরং দীর্ঘমেয়াদি জ্ঞান-অবকাঠামো নির্মাণের সম্ভাবনা তৈরি করেছিল।

তবে সাম্প্রতিক দেড় দশক বা তারও বেশি সময়ে সেই ধারাবাহিকতা আগের মাত্রায় দৃশ্যমান নয়। প্রকাশনা কার্যক্রম একেবারে বন্ধ হয়ে গেছে—এমন কথা বলা যাবে না; কিন্তু মৌলিক গবেষণা, দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা-প্রকল্প এবং আন্তর্জাতিক মানের প্রতিযোগিতাযোগ্য একাডেমিক উদ্যোগের পরিমাণ ও ধারাবাহিকতা নিয়ে প্রশ্ন তোলার যথেষ্ট অবকাশ রয়েছে। ফলে ইসলামী জ্ঞানচর্চার একটি বড় অংশ ক্রমশ ব্যক্তিনির্ভর ও বিচ্ছিন্ন উদ্যোগের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে।

জামায়াতের ক্ষেত্রে প্রাতিষ্ঠানিক সম্ভাবনা ও দুর্বলতা:

বাংলাদেশের ইসলামী রাজনৈতিক-সামাজিক পরিসরে জামায়াতে ইসলামী একটি বৃহৎ ও প্রভাবশালী সংগঠন। রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের পাশাপাশি ইসলামী জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও বৌদ্ধিক পরিসর নির্মাণের ক্ষেত্রেও তাদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখার যথেষ্ট সম্ভাবনা রয়েছে।

বস্তুত, এটি কেবল তাদের সামাজিক প্রভাব বিস্তারের জন্যই নয়; বরং তাদের নিজস্ব চিন্তাধারা, সাংগঠনিক বিকাশ ও দীর্ঘমেয়াদি অস্তিত্বের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।

কারণ,

কোনো ইসলামী আন্দোলনের দীর্ঘমেয়াদি স্থায়িত্ব কেবল সাংগঠনিক দক্ষতা, জনসম্পৃক্ততা কিংবা রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডের ওপর নির্ভর করে না।

এর জন্য প্রয়োজন একটি সুদৃঢ় বৌদ্ধিক ভিত্তি, সুসংহত জ্ঞানতাত্ত্বিক ও চিন্তাগত কাঠামো এবং পরিবর্তিত সামাজিক, রাজনৈতিক ও বৈশ্বিক বাস্তবতা সম্পর্কে ধারাবাহিক গবেষণা ও বিশ্লেষণ।

একটি আন্দোলন যতই বিস্তৃত সাংগঠনিক কাঠামো গড়ে তুলুক না কেন, তার চিন্তাগত ভিত্তি যদি সময়ের সঙ্গে বিকশিত না হয় এবং নতুন বাস্তবতা ও নতুন প্রশ্নের জ্ঞানভিত্তিক উত্তর দেওয়ার সক্ষমতা যদি তৈরি না হয়, তাহলে দীর্ঘমেয়াদে তার প্রাণশক্তি ও প্রাসঙ্গিকতা ক্ষয়প্রাপ্ত হওয়ার আশঙ্কা থাকে।

বিশেষত ইসলামী আন্দোলনের ক্ষেত্রে এ প্রয়োজন আরও গভীর। কারণ, সমকালীন সমাজে ইসলামী চিন্তা ও মূল্যবোধকে কার্যকরভাবে উপস্থাপন করতে হলে ঐতিহ্যগত জ্ঞানভাণ্ডারের সঙ্গে আধুনিক সমাজ, রাষ্ট্র, অর্থনীতি, আইন, দর্শন, বিজ্ঞান ও সংস্কৃতির পরিবর্তনশীল বাস্তবতারও গভীর পরিচয় থাকা প্রয়োজন।

ফলে একটি ইসলামী আন্দোলনের জন্য গবেষণা ও জ্ঞানচর্চা কোনো আনুষঙ্গিক বা গৌণ কর্মকাণ্ড নয়; বরং তার চিন্তার পুনর্গঠন, নীতিনির্ধারণ, নেতৃত্বের বিকাশ এবং ভবিষ্যৎ প্রজন্মের বুদ্ধিবৃত্তিক প্রস্তুতির অন্যতম মৌলিক ভিত্তি।

এই বিবেচনায় জামায়াত-সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর গবেষণা ও প্রকাশনা কার্যক্রমকে আরও বিস্তৃত, বৈচিত্র্যময় ও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে; বরং বর্তমান সময়ের বৌদ্ধিক চ্যালেঞ্জ বিবেচনায় তা এখন সময়ের একান্ত দাবিতে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টারসহ জামায়াত-ঘরানার বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান দীর্ঘদিন ধরে ইসলামী বই প্রকাশের সঙ্গে যুক্ত থাকলেও, বৃহৎ পরিসরের মৌলিক গবেষণা, বহু-খণ্ডের একাডেমিক প্রকল্প, আন্তঃবিষয়ক গবেষণা এবং সমকালীন মুসলিম বিশ্বের গুরুত্বপূর্ণ বৌদ্ধিক ও চিন্তাগত প্রশ্ন নিয়ে দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা-উদ্যোগের ক্ষেত্রে তাদের কার্যক্রম তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত সীমিত।

বিশেষত একটি বৃহৎ ও সুসংগঠিত ইসলামী আন্দোলনের বৌদ্ধিক প্রয়োজন ও সম্ভাবনার তুলনায় এ কার্যক্রমের পরিসর আরও বিস্তৃত হওয়ার প্রত্যাশা স্বাভাবিক।

এখানে একটি বিষয় বিশেষভাবে স্পষ্ট করা প্রয়োজন—

প্রতিষ্ঠানগুলো হয়তো বিপুলসংখ্যক জনপ্রিয় ও পাঠকসমাদৃত বই প্রকাশ করছে; কিন্তু কোনো প্রতিষ্ঠানের জ্ঞানচর্চার প্রকৃত মূল্যায়ন কেবল তার প্রকাশিত বইয়ের সংখ্যা, বাজারে সেসব বইয়ের জনপ্রিয়তা কিংবা প্রকাশনার ধারাবাহিকতার ভিত্তিতে করা যথেষ্ট নয়।

বরং এর পাশাপাশি দেখতে হবে, প্রতিষ্ঠানগুলো নতুন জ্ঞান উৎপাদনে কতটা অবদান রাখছে; মৌলিক গবেষণাকে কতটা উৎসাহিত ও পৃষ্ঠপোষকতা করছে; গবেষকদের জন্য কী ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ তৈরি করছে; বৃহৎ ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা-প্রকল্প গ্রহণে কতটা সক্ষম; এবং সর্বোপরি, একটি উন্মুক্ত, সৃজনশীল ও দীর্ঘস্থায়ী বৌদ্ধিক পরিবেশ নির্মাণে কতটা কার্যকর ভূমিকা রাখছে।

এই মানদণ্ডে বিচার করলে ইসলামী রাজনৈতিক-সামাজিক পরিসরের বড় প্রতিষ্ঠানগুলোর সামনে এখনও একটি বিস্তৃত কর্মক্ষেত্র উন্মুক্ত রয়েছে।

বিশেষত বর্তমান সময়ে ইসলামী চিন্তা ও মুসলিম সমাজকে ঘিরে যে নতুন নতুন প্রশ্ন, চ্যালেঞ্জ ও বিতর্ক তৈরি হচ্ছে, সেগুলো মোকাবিলায় বিচ্ছিন্ন ও স্বল্পমেয়াদি প্রকাশনা উদ্যোগের পরিবর্তে সুপরিকল্পিত ও দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা-প্রকল্প প্রয়োজন।

এজন্য গবেষণা তহবিল গঠন, পূর্ণকালীন ও সহযোগী গবেষক নিয়োগ, গবেষণা-সহকারী ও সম্পাদনা কাঠামো তৈরি, আন্তঃবিষয়ক গবেষণাকে উৎসাহিত করা এবং বৃহৎ একাডেমিক প্রকল্পে ধারাবাহিক অর্থায়নের মতো কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা গ্রহণ এখন সময়ের গুরুত্বপূর্ণ দাবি।

কওমি অঙ্গনের প্রকাশনা-সংস্কৃতি: একটি ভিন্ন অভিজ্ঞতা:

এই জায়গায় তুলনামূলকভাবে কওমি অঙ্গনের কিছু ইতিবাচক দিক বিশেষভাবে লক্ষণীয়।

সীমিত পরিসরে হলেও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান পর্যায়ে তারা এমন বেশ কিছু প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছে, যেগুলো থেকে বৃহৎ কলেবরের কিতাব, বহু-খণ্ডের শরহ, গবেষণাধর্মী গ্রন্থ এবং ধারাবাহিক প্রকাশনা বের হচ্ছে।

এসব প্রকাশনার অনেকগুলো বাণিজ্যিকভাবে খুব বড় বাজার তৈরি না করেও প্রকাশিত হচ্ছে—যা মূলত একটি নির্দিষ্ট জ্ঞান-ঐতিহ্যের প্রতি পাঠকসমাজ ও প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়বদ্ধতার পরিচায়ক।

সম্প্রতি আমাদের বিভাগের জন্য শাইখ মাওলানা আবদুল মতীন (হাফি.)-এর প্রণীত কিফায়াতুল মুগতাযী ফী শারহি জামি‘ইত তিরমিযী–এর ১৭ খণ্ডের সেট সংগ্রহের সুযোগ হয়েছে। প্রথম দর্শনে এত বড় একটি প্রকাশনা দেখে মনে হয়েছিল, হয়তো এটি বিদেশে প্রকাশিত কোনো গ্রন্থ। পরে বই হাতে নিয়ে দেখলাম, এটি বাংলাদেশেই প্রকাশিত হয়েছে।

বিষয়টি নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক। কওমি অঙ্গনের বিভিন্ন প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান থেকে এ ধরনের বৃহৎ কলেবরের আরও বহু গ্রন্থ প্রকাশিত হচ্ছে।

তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, ইসলামের ইতিহাস ও অন্যান্য শাস্ত্রে ধারাবাহিক ও সিরিজভিত্তিক প্রকাশনার ক্ষেত্রেও তাদের উল্লেখযোগ্য তৎপরতা রয়েছে।

অবশ্য কওমি অঙ্গনের প্রকাশনা-সংস্কৃতিরও নিজস্ব সীমাবদ্ধতা রয়েছে। সেখানে প্রকাশিত সব বই যে মৌলিক গবেষণার মানদণ্ড পূরণ করে, এমন দাবি করার সুযোগ নেই। একইভাবে বৃহৎ কলেবর বা বহু-খণ্ডের প্রকাশনাই যে উন্নত গবেষণার নিশ্চয়তা দেয়, সেটিও নয়।

তবে সীমিত প্রাতিষ্ঠানিক সক্ষমতা এবং অনেক ক্ষেত্রে ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র পরিসরের উদ্যোগের মধ্যেও বৃহৎ কলেবরের গ্রন্থ প্রকাশ, দীর্ঘমেয়াদি কিতাবি প্রকল্প গ্রহণ এবং নিজস্ব জ্ঞান-ঐতিহ্যকে প্রাতিষ্ঠানিক প্রকাশনার মাধ্যমে সংরক্ষণ ও বিস্তারের ক্ষেত্রে কওমী অঙ্গনে একটি কার্যকর ও ধারাবাহিক প্রকাশনা-সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে—এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক দিক।

এর বিপরীতে জামায়াত-সংশ্লিষ্ট বা তাদের অনুসারীদের পরিচালিত প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে এ ধরনের বৃহৎ গবেষণাধর্মী প্রকাশনা এবং তাফসীর, হাদীস, ফিকহ, ইসলামের ইতিহাস ও অন্যান্য ইসলামী শাস্ত্রে ধারাবাহিক বা সিরিজভিত্তিক গ্রন্থ প্রকাশের প্রবণতা তুলনামূলকভাবে অত্যন্ত সীমিত।

তাদের প্রকাশনায় সাধারণ পাঠকের উপযোগী সংক্ষিপ্ত ও সহজপাঠ্য বই, দাওয়াহভিত্তিক সাহিত্য, সমকালীন সামাজিক ও ধর্মীয় চাহিদাকে কেন্দ্র করে রচিত বিভিন্ন ইসলামী গ্রন্থ এবং মোটিভেশনাল সাহিত্যের উপস্থিতি অপেক্ষাকৃত বেশি।

এসব প্রকাশনার নিজস্ব প্রয়োজন, পাঠকচাহিদা ও উপযোগিতা নিঃসন্দেহে রয়েছে। একটি সক্রিয় প্রকাশনা প্রতিষ্ঠানের জন্য সাধারণ পাঠকের উপযোগী সহজপাঠ্য, দাওয়াহভিত্তিক ও সমকালীন চাহিদাসম্পন্ন সাহিত্যও গুরুত্বপূর্ণ।

তবে সমস্যা তখনই দেখা দিতে পারে, যখন এ ধরনের জনপ্রিয় প্রকাশনা একটি প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনা-নীতির প্রধান বৈশিষ্ট্যে পরিণত হয় এবং তার পাশাপাশি বৃহৎ পরিসরের মৌলিক গবেষণা, তাত্ত্বিক কাজ ও দীর্ঘমেয়াদি একাডেমিক প্রকাশনা-প্রকল্প পর্যাপ্ত গুরুত্ব ও পৃষ্ঠপোষকতা না পায়।

দীর্ঘমেয়াদে এর ফলে প্রতিষ্ঠানের বৌদ্ধিক পরিসর এবং গবেষণাভিত্তিক প্রকাশনা-ঐতিহ্য প্রত্যাশিত মাত্রায় বিকশিত হওয়ার সুযোগ সীমিত হতে পারে।

আরও একটি বিষয় এখানে বিবেচনাযোগ্য। কোনো নির্দিষ্ট বৃত্ত বা সাংগঠনিক পরিসরের বাইরে থাকা গবেষক ও লেখকদের কাজ প্রকাশের ক্ষেত্রে যদি প্রতিষ্ঠানগুলো অতিরিক্ত সতর্ক বা অনাগ্রহী হয়ে ওঠে, তাহলে ধীরে ধীরে একটি বৃত্তকেন্দ্রিক জ্ঞান-পরিবেশ তৈরি হয়।

এর ফলে একই ধরনের চিন্তা, একই ধরনের পাঠ এবং একই ধরনের লেখক বারবার সামনে আসতে থাকেন। নতুন প্রশ্ন, ভিন্ন পদ্ধতি, বহির্বৃত্তের গবেষক এবং ভিন্নমতের বুদ্ধিবৃত্তিক অবদান তখন যথাযথভাবে প্রবেশের সুযোগ পায় না। দীর্ঘমেয়াদে এটি একটি প্রতিষ্ঠানের জ্ঞানচর্চাকে সমৃদ্ধ করার পরিবর্তে সংকুচিত করতে পারে।