১. গতকাল জামায়াতে ইসলামী, চট্টগ্রাম মহানগরী শাখার উদ্যোগে বাংলাদেশ ইসলামী ছাত্রশিবিরের প্রাক্তন সাথী ও সদস্যদের নিয়ে একটি বর্ণাঢ্য সম্মেলনের আয়োজন করা হয়। ছাত্রজীবনে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে সম্পৃক্ত থাকার পাশাপাশি কিছু দায়িত্ব পালনেরও সুযোগ হয়েছিল। ফলে ছাত্রশিবিরের সঙ্গে আমার জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়, বহু স্মৃতি এবং ব্যক্তিগত বিকাশের বেশ কিছু তাৎপর্যপূর্ণ অনুষঙ্গ জড়িয়ে আছে।

আজ আল্লাহ তা‘আলা আমাকে জীবনের যে পর্যায়ে পৌঁছার তাওফিক দিয়েছেন, সেখানে উপনীত হওয়ার পেছনে ছাত্রশিবিরের একটি গুরুত্বপূর্ণ অবদান ছিল—এ কথা স্বীকার না করলে অকৃতজ্ঞতা হবে। দরিদ্র পরিবারে বেড়ে ওঠা এবং অপেক্ষাকৃত সীমিত দৃষ্টিভঙ্গি নিয়ে জীবন শুরু করার কারণে হয়তো মাদরাসার পড়াশোনা শেষ করে দ্রুত কোনো পেশায় যুক্ত হওয়াকেই জীবনের স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে মেনে নিতাম।

কিন্তু ছাত্রশিবিরের সংস্পর্শ আমার চিন্তার জগৎকে প্রসারিত করেছিল, স্বপ্ন দেখতে শিখিয়েছিল এবং নিজের সম্ভাবনা সম্পর্কে নতুন করে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করেছিল। উপলব্ধি করতে শিখেছিলাম, জীবনকে একটি নির্দিষ্ট গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ রাখলে চলবে না; জ্ঞান, যোগ্যতা ও কর্মের পরিধি আরও বিস্তৃত করতে হবে, এগিয়ে যেতে হবে বহুদূর। সেই সময় এই প্রেরণা না পেলে আজকের অবস্থানে পৌঁছানো আমার পক্ষে কতটা সম্ভব হতো, তা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।

তাই আমার ব্যক্তিগত ও জ্ঞানগত বিকাশের ইতিহাসে ছাত্রশিবিরের অবদান কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করি।

ছাত্রত্বের অবসান ঘটিয়ে কর্মজীবনে প্রবেশের পরও ছাত্রশিবিরের প্রতি একধরনের আত্মিক টান অনুভব করেছি। অতীতের অবদান স্বীকার করা এবং তার প্রতি কৃতজ্ঞ থাকা আমার কাছে গুরুত্বপূর্ণ। এ কারণেই ছাত্রশিবির কিংবা সংশ্লিষ্ট মহলের কোনো বুদ্ধিবৃত্তিক ও একাডেমিক আয়োজনে দাওয়াত পেলে এখনও সাধ্যমতো উপস্থিত থাকার চেষ্টা করি।

২. এ প্রসঙ্গে নিজের রাজনৈতিক অবস্থান সম্পর্কেও একটি বিষয় স্পষ্ট করতে চাই।

কর্মজীবনের শুরু থেকেই সাংগঠনিক রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়ার পরিবর্তে পড়াশোনা, জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও লেখালেখিতে নিজেকে নিবিষ্ট রাখাকেই প্রাধান্য দিয়ে এসেছি। বলতে গেলে, পেশাগত সাধনা ও বুদ্ধিবৃত্তিক চর্চাকেই জীবনের একান্ত ব্রত হিসেবে গ্রহণ করে এখনও যথাসাধ্য কাজ করে যাচ্ছি। আল্লাহু হুওয়াল মুওয়াফফিক!

কেউ কেউ আমার লেখালেখির ধরন বিবেচনা করে আমাকে জামায়াতে ইসলামীর গুরুত্বপূর্ণ কোনো ব্যক্তি কিংবা দলটির সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে সম্পৃক্ত বলে ধারণা করেন। এ প্রসঙ্গে নিজের অবস্থানটি স্পষ্ট করা প্রয়োজন। আমি যা লিখি, তা যথাসম্ভব ব্যক্তিগত বা দলীয় পক্ষপাতের ঊর্ধ্বে থেকে, নৈর্ব্যক্তিক দৃষ্টিভঙ্গিতে উপস্থাপনের চেষ্টা করি। তবে আমার লেখায় কেউ কোনো বিশেষ মতাদর্শের প্রতিফলন খুঁজে পেলে, সেটি তাঁর নিজস্ব উপলব্ধি ও ব্যাখ্যার বিষয়।

এ কথা আগেও একাধিকবার স্পষ্ট করেছি যে,

আমি জামায়াতে ইসলামীকে সচেতনভাবে সমর্থন করি এবং বাংলাদেশের অন্যান্য ইসলামী দলের তুলনায় দলটিকে অধিক সুসংগঠিত ও সুশৃঙ্খল বলে মনে করি। কিন্তু এখন পর্যন্ত দলটির কোনো সাংগঠনিক দায়িত্ব পালন করিনি কিংবা নিয়মিত সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হইনি। এ ক্ষেত্রে জামায়াতের শীর্ষস্থানীয় কারও কারও বারবার অনুরোধ ও তাগাদা সত্ত্বেও—আমার বিবেচনায়— আপাতত পেশাগত সাধনা, জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও লেখালেখিতে নিবিষ্ট থাকাই নিজের জন্য অধিকতর সমীচীন বলে মনে করেছি। আল্লাহু আ‘লামু বিস্-সাওয়াব!

তবে দলটির বিভিন্ন একাডেমিক আয়োজনে মাঝেমধ্যে অংশ নিই; অন্য কেউ দাওয়াত জানালেও সাধ্যমতো সাড়া দেওয়ার চেষ্টা করি।

আমার বিশ্বাস, যারা নিষ্ঠা ও আন্তরিকতার সঙ্গে ইসলামের জন্য কাজ করেন, তাঁদের সবার প্রতিই সমর্থন ও ভালোবাসা থাকা উচিত। মতপার্থক্য কিংবা সাংগঠনিক ভিন্নতা যেন এ ক্ষেত্রে সংকীর্ণতার কারণ না হয়। একই সঙ্গে, কোনো ব্যক্তি বা দলের প্রতি রাজনৈতিক সমর্থন, তাদের আয়োজিত একাডেমিক অনুষ্ঠানে অংশগ্রহণ এবং তাদের সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডে সক্রিয় সম্পৃক্ততা—এগুলো স্বতন্ত্র বিষয়।

৩. গতকালের সম্মেলনে একটি বিষয় বিশেষভাবে লক্ষ করেছি। ছাত্রজীবনে যাঁরা ছাত্রশিবিরের সঙ্গে সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন, তাঁদের অনেকেই কর্মজীবনে প্রবেশের পর সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড থেকে অনেকটা দূরে সরে গেছেন। কিন্তু ছাত্রশিবিরের প্রতি তাঁদের অনুরাগ ও ভালোবাসায় যেন তেমন ভাটা পড়েনি। বরং দীর্ঘ সময় পেরিয়ে, এমনকি বার্ধক্যের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেও অনেককে নিজেদের শিবির-পরিচয় দিতে স্বাচ্ছন্দ্য ও তৃপ্তি বোধ করতে দেখেছি। কারও কারও ক্ষেত্রে জামায়াতের পরিচয়ের চেয়ে শিবিরের পরিচয়টিই যেন অধিক আবেগময় ও স্মৃতিবিজড়িত।

মনে হয়েছে,

ছাত্রশিবির তাঁদের কাছে নিছক একটি ছাত্রসংগঠনের পরিচয় নয়; বরং তারুণ্যের স্বপ্ন, সংগ্রাম, বন্ধুত্ব, আত্মগঠন ও জীবনের এক বিশেষ অধ্যায়ের প্রতীক। সময়ের ব্যবধানে সাংগঠনিক সম্পৃক্ততা কমে এলেও সেই পরিচয়ের প্রতি ভালোবাসা ও মমত্ববোধ অটুট থাকতে পারে—গতকালের সম্মেলন যেন তারই এক জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। সত্যিই, স্মৃতির ক্যানভাসে শিবিরের দিনগুলো অনেকের হৃদয়ে কত গভীর আলপনা এঁকে রেখেছে!

৪. তবে এখানেই একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন সামনে আসে:

ছাত্রজীবনে সংগঠনের জন্য ব্যাপক ত্যাগ স্বীকার করা ছাত্রশিবিরের এই বিপুল প্রাক্তন জনশক্তিকে জামায়াতে ইসলামী কেন আরও কার্যকরভাবে কাজে লাগাতে পারছে না?!

এর দায় কি মূলত সংগঠনের—যারা অভিজ্ঞ ও দক্ষ এই জনশক্তির সম্ভাবনাকে যথাযথভাবে কাজে লাগানোর উপযোগী কাঠামো ও পরিবেশ গড়ে তুলতে পারেনি? নাকি এর পেছনে প্রাক্তন জনশক্তিরও দায় রয়েছে—যাঁরা সময়ের পরিবর্তনের সঙ্গে সংগঠনের কর্মকাণ্ডে নিজেদের অভিজ্ঞতা, মেধা ও সামর্থ্যকে নতুনভাবে যুক্ত করতে পারেননি? নাকি উভয় পক্ষের সীমাবদ্ধতা এবং পরিবর্তিত বাস্তবতার সম্মিলিত প্রভাবেই এই দূরত্ব তৈরি হয়েছে?

প্রশ্নটি কেবল অতীতের ত্যাগের যথাযথ মূল্যায়নের নয়; বরং অভিজ্ঞতা, দক্ষতা ও সাংগঠনিক স্মৃতিতে সমৃদ্ধ একটি বৃহৎ জনশক্তিকে কীভাবে ব্যক্তি, সমাজ ও সংগঠনের কল্যাণে কার্যকরভাবে সম্পৃক্ত করা যায়—সেটিও বিবেচনার দাবি রাখে। ছাত্রজীবনের অভিজ্ঞতা ও আদর্শিক অনুপ্রেরণাকে কর্মজীবনের অর্জিত জ্ঞান, পেশাগত দক্ষতা এবং সামাজিক অভিজ্ঞতার সঙ্গে সমন্বয় করার সুযোগ কতটা তৈরি করা যাচ্ছে—তা নিয়েও ভাবা প্রয়োজন।

বিষয়টি নিয়ে আত্মসমালোচনা ও বস্তুনিষ্ঠ পর্যালোচনা জরুরি। কারণ, অতীতের ত্যাগের স্মৃতিকে কেবল আবেগের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে বর্তমানের সম্ভাবনা ও ভবিষ্যতের কর্মপরিকল্পনায় রূপান্তর করতে পারলেই সেই স্মৃতির যথার্থ মর্যাদা প্রতিষ্ঠিত হবে।

৫. সময়ের ব্যবধানে আমাদের সময়ের ছাত্রশিবিরের সঙ্গে বর্তমান ছাত্রশিবিরের কিছু পরিবর্তন লক্ষণীয়। এসব পরিবর্তনের কিছু ইতিবাচক ও আশাব্যঞ্জক; আবার কিছু পরিবর্তন নানা প্রশ্ন ও সমালোচনারও জন্ম দিয়েছে।

কোনো সংগঠনের প্রতি ভালোবাসা থাকলেই তার সব কর্মকাণ্ডের প্রতি নিঃশর্ত সমর্থন থাকতে হবে, এমন নয়। বরং ভালোবাসা ও কৃতজ্ঞতার পাশাপাশি সংগঠনটির কর্মকাণ্ডকে বিচার-বিশ্লেষণ করা এবং প্রয়োজনবোধে গঠনমূলক সমালোচনা করার মানসিকতাও থাকা প্রয়োজন। একইভাবে, তাদের কোনো উদ্যোগ, অর্জন কিংবা ইতিবাচক পরিবর্তন চোখে পড়লে তা স্বীকার করতে কার্পণ্য করাও সমীচীন নয়।

আমার বিবেচনায়, আন্তরিক অনুরাগ, ন্যায়সংগত মূল্যায়ন ও আত্মসমালোচনার সমন্বয়ই একটি সংগঠনের সুস্থ বিকাশের সহায়ক হতে পারে। পরিবর্তনের নানা দিক সম্পর্কে নিজস্ব উপলব্ধি ও কিছু প্রশ্ন থাকা সত্ত্বেও ছাত্রশিবিরের প্রতি আমার অন্তরের গভীরে আজও অকৃত্রিম ভালোবাসা ও অনুরাগ রয়ে গেছে।

৬. সম্ভবত সেই ভালোবাসা, পুরোনো স্মৃতির টান এবং একসময়ের সহযাত্রীদের সঙ্গে পুনর্মিলনের আকাঙ্ক্ষাই আমাকে গতকালের সম্মেলনে টেনে নিয়েছিল। দীর্ঘদিন পর বহু পুরোনো সঙ্গীর সঙ্গে দেখা হলো। সময়ের ব্যবধানে আমাদের জীবন, পেশা ও অবস্থানে নানা পরিবর্তন এসেছে; কিন্তু অভিন্ন অতীতের স্মৃতি যেন মুহূর্তেই অনেক দূরত্ব ঘুচিয়ে দিল। পুরোনো পরিচিত মুখগুলোর সঙ্গে সাক্ষাৎ মনে এক অন্য রকম অনুভূতির সঞ্চার করেছে।

এটি কেবল একটি সম্মেলনে অংশগ্রহণের আনন্দ ছিল না; বরং জীবনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়কে নতুন করে ফিরে দেখা, পুরোনো সম্পর্কের উষ্ণতা অনুভব করা এবং নিজের পথচলার পেছনে যাঁদের ও যেসব অভিজ্ঞতার অবদান রয়েছে, সেগুলো স্মরণ করারও এক বিশেষ উপলক্ষ ছিল।

৭. উদ্যোক্তাদের অনুরোধে সম্মেলনের সূচনায় পবিত্র কুরআন থেকে সংক্ষিপ্ত দারস পেশ করার সুযোগ হয়েছিল। সেখানে কুরআনের আলোকে যে বিষয়টির ওপর গুরুত্ব দিতে চেয়েছি, তা হলো—

একজন মুমিনের জীবনে সত্য, ন্যায় ও দ্বীনের ওপর আমৃত্যু অবিচল থাকার অপরিহার্যতা।

পরিস্থিতি অনুকূলে থাকলে নীতির কথা বলা তুলনামূলক সহজ; কিন্তু স্বার্থ, সুবিধা ও নিরাপত্তার সঙ্গে নীতির সংঘাত দেখা দিলে মুমিনের প্রকৃত দৃঢ়তার পরীক্ষা শুরু হয়।

সম্পদ, পদ-পদবি, ক্ষমতা ও সম্মানের মোহ যেমন মানুষকে সত্য থেকে বিচ্যুত করতে পারে, তেমনি জনপ্রিয়তা হারানোর আশঙ্কা, আর্থিক ক্ষতি, সুযোগ-সুবিধা থেকে বঞ্চিত হওয়ার ভয় কিংবা পেশাগত প্রতিকূলতার শঙ্কাও তাকে ন্যায়সংগত অবস্থান থেকে সরে যেতে প্ররোচিত করতে পারে।

অথচ মুমিনের নৈতিক অঙ্গীকারের প্রকৃত পরীক্ষা তখনই, যখন সত্য ও ন্যায়ের পক্ষে অবস্থান নেওয়ার জন্য কোনো না কোনো মূল্য দিতে হয়। বিশ্বাস, নীতি ও ব্যক্তিস্বার্থের মধ্যে সংঘাত দেখা দিলে কোনটিকে অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে—তার মধ্য দিয়েই মানুষের আদর্শিক দৃঢ়তার পরিচয় প্রকাশ পায়।

কুরআনের শিক্ষা আমাদের এমন এক আত্মজিজ্ঞাসার মুখোমুখি দাঁড় করায়—আমরা কি সত্যের প্রতি প্রকৃত অর্থেই অনুগত, নাকি আমাদের আনুগত্য ততক্ষণই, যতক্ষণ সত্য আমাদের ব্যক্তিগত স্বার্থ, পদ-পদবি ও সুযোগ-সুবিধার অনুকূলে থাকে?

নীতির কথা বলা আর নীতির পক্ষে মূল্য দিতে প্রস্তুত থাকা এক বিষয় নয়। বলতে গেলে, আদর্শিক জীবনের অন্যতম কঠিন পরীক্ষা এখানেই।

৮. সম্মেলনটির আয়োজন নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। দীর্ঘদিন পর বহু প্রাক্তন সাথী ও সদস্যের একত্র হওয়া, পারস্পরিক স্মৃতিচারণ এবং পুরোনো সম্পর্কের পুনঃসংযোগ অংশগ্রহণকারীদের মধ্যে যে প্রাণচাঞ্চল্য সৃষ্টি করেছিল, তা ছিল উপভোগ্য।

তবে আয়োজনটিকে আরও ফলপ্রসূ ও অংশগ্রহণমূলক করে তোলার কিছু সুযোগ ছিল বলেও মনে হয়েছে।

প্রথমত, আলোচকের সংখ্যা কিছুটা সীমিত রেখে প্রত্যেককে পর্যাপ্ত সময় দেওয়া হলে আলোচনা আরও গভীর ও তাৎপর্যপূর্ণ হতে পারত।

দ্বিতীয়ত, প্রশ্নোত্তর পর্বটি বাদ দেওয়া সমীচীন হয়নি বলে মনে করি। এ ধরনের পুনর্মিলনী সম্মেলন কেবল অতীতের স্মৃতিচারণ কিংবা শুধুই পারস্পরিক মিলনের জন্য নয়; বরং অভিজ্ঞতা বিনিময়, সমসাময়িক বাস্তবতা পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ করণীয় নির্ধারণেরও একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। প্রশ্নোত্তর পর্ব থাকলে অংশগ্রহণকারীরা নিজেদের ভাবনা, সংশয় ও প্রত্যাশা তুলে ধরার সুযোগ পেতেন; আয়োজকেরাও তাঁদের অভিজ্ঞতা ও মতামত থেকে উপকৃত হতে পারতেন।

তৃতীয়ত, মূল পর্বের আলোচনা কেবল নির্ধারিত আলোচকদের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে শ্রোতাদের মধ্য থেকেও বিজ্ঞ কয়েকজনকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া হলে আয়োজনটি আরও প্রাণবন্ত, সংলাপনির্ভর ও অংশগ্রহণমূলক হয়ে উঠত; একই সঙ্গে সম্মেলনটি আরও উপভোগ্য হয়ে উঠত।

৯. পরিশেষে,

অতীতের প্রতি অনুরাগ আমাদের স্মৃতিকাতর করে, আর কৃতজ্ঞতা আমাদের প্রাপ্ত অবদানগুলো স্বীকার করতে শেখায়।

কিন্তু কোনো সংগঠনের প্রতি প্রকৃত অনুরাগ কেবল তার অতীতকে স্মরণ করার মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়; বরং তার বর্তমানকে ন্যায়সংগতভাবে মূল্যায়ন করা, ইতিবাচক উদ্যোগের স্বীকৃতি দেওয়া, প্রয়োজনীয় প্রশ্ন তোলা ও যৌক্তিক সমালোচনা করা এবং ভবিষ্যৎকে আরও কল্যাণকর করে তোলার প্রত্যাশা রাখার মধ্যেও তার প্রকাশ ঘটে।

ভালোবাসা যেন অন্ধ আনুগত্যে পর্যবসিত না হয়, আবার সমালোচনাও যেন কৃতজ্ঞতাবোধকে অস্বীকার না করে—এই ভারসাম্য রক্ষা করা জরুরি। একইভাবে, অতীতের ত্যাগ ও অর্জনের স্মৃতি যেন কেবল আবেগের বিষয় হয়ে না থাকে; বরং তা বর্তমানের আত্মসমালোচনা, পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং ভবিষ্যতের ইতিবাচক কর্মপ্রয়াসের প্রেরণা হয়ে উঠুক।

আমার এই স্মৃতিচারণ, কৃতজ্ঞতার প্রকাশ ও সীমিত পর্যালোচনাকে সেই দৃষ্টিতেই দেখার প্রত্যাশা রাখি।