প্রতিবছর, বিশেষত দুর্গাপূজার সময়, একটি বিষয় লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। কিছু মুসলিম—এমনকি বিভিন্ন ইসলামী দলের কোনো কোনো নেতা-কর্মীও—বুঝে কিংবা না-বুঝে এমন কিছু কর্মকাণ্ডে অংশ নেন, যা ইসলামের আকীদাগত দৃষ্টিকোণ থেকে গুরুতর প্রশ্নের অবতারণা করে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিরক বা কুফরের পর্যায়ে পড়ে।
এ ধরনের পরিস্থিতিতে আমরা আলিমগণ তাঁদের ঈমান-আকীদা এবং শিরক ও কুফরের বিধান নিয়ে আলোচনা-পর্যালোচনা করি; সতর্কতামূলক বক্তব্যও দিয়ে থাকি। নিঃসন্দেহে, আকীদাগত বিচ্যুতি চিহ্নিত করা এবং মানুষকে সে বিষয়ে সতর্ক করা আমাদের গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।
তবে এ প্রসঙ্গে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—
যাঁদের ঈমান-আকীদা নিয়ে বিশেষ বিশেষ সময়ে আমরা এত সরব হয়ে উঠি, তাঁদের কাছে ঈমানের প্রকৃত স্বরূপ, শিরক ও কুফরের তাৎপর্য এবং এ-সংশ্লিষ্ট মৌলিক বিষয়গুলো আমরা কতটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পেরেছি?
যদি এ ক্ষেত্রে ঘাটতি থেকে থাকে, তবে এর দায় কি কেবল সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের, নাকি এ বিষয়ে আলিমসমাজের দায়িত্ব ও দুর্বলতাও গভীর আত্মসমালোচনার সঙ্গে পর্যালোচনা করা প্রয়োজন?!
আমরা সারা বছর দ্বীনের বিভিন্ন বিষয় নিয়ে জুমার খুতবা ও বিভিন্ন মাহফিলে আলোচনা করি। ইবাদত-বন্দেগি, আমল-আখলাক, হালাল-হারাম এবং দৈনন্দিন জীবনে ইসলামের বিধিবিধান পালনের গুরুত্ব তুলে ধরি। এসব আলোচনা অবশ্যই প্রয়োজনীয়। কিন্তু এর পাশাপাশি সাধারণ মুসলিমদের কাছে ঈমানের মৌলিক বিষয়গুলো কতটা সুস্পষ্টভাবে তুলে ধরা হচ্ছে?
আল্লাহর প্রতি ঈমান বলতে কী বোঝায়, এর অপরিহার্য দাবি কী, কোন বিশ্বাস ও আচরণ ঈমানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ এবং কোনগুলো এর পরিপন্থী—এসব বিষয়ে কি ধারাবাহিক ও সুপরিকল্পিত আলোচনা হচ্ছে? ঈমান কীভাবে অর্জিত, সংরক্ষিত ও দৃঢ় হয় এবং কোন বিষয়গুলো মানুষের ঈমানি চেতনাকে দুর্বল বা সম্পূর্ণ নষ্ট করে দিতে পারে—এসব প্রশ্নও কি আমাদের নিয়মিত আলোচনায় যথেষ্ট গুরুত্ব পাচ্ছে?!
বিশেষত, সমকালীন বিভিন্ন মতাদর্শ, চিন্তাধারা ও জীবনদৃষ্টির প্রভাবে মানুষের বিশ্বাস ও ধর্মীয় চেতনায় যে বিশাল পরিবর্তন ঘটছে এবং অনেকে ক্রমশ ধর্মহীনতার দিকে ঝুঁকে পড়ছে, সে বিষয়ে আমরা কতটা সচেতনতা তৈরি করতে পারছি?
সেক্যুলারিজম, লিবারেলিজম ও চরম বস্তুবাদী জীবনদৃষ্টির সঙ্গে ইসলামী বিশ্বাসের সম্পর্ক, সম্ভাব্য দ্বন্দ্ব এবং আকীদাগত প্রভাব নিয়ে কি যথেষ্ট বস্তুনিষ্ঠ ও জ্ঞানভিত্তিক আলোচনা হচ্ছে?
এসব চিন্তাধারার কোন দিকগুলো ইসলামী বিশ্বাসের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক, আর কোন বিষয়গুলোকে যথাযথ প্রেক্ষাপটে বিশ্লেষণ করা প্রয়োজন—তা কি আমরা সুস্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করছি?
নাকি এসব বিষয়ে পর্যাপ্ত আলোচনা না থাকায় মানুষের মধ্যে ধর্মবিমুখতা বাড়ছে এবং ঈমান ও ইসলামের মৌলিক বিষয়গুলো ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে?!
এখানে আলিমসমাজের একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বের কথা বিশেষভাবে উল্লেখ করা প্রয়োজন।
‘আল্লাহর প্রতি ঈমান’-এর অর্থ, ব্যাপ্তি ও দাবি সাধারণ মানুষের কাছে আমরা কতটা স্পষ্টভাবে তুলে ধরতে পেরেছি? আল্লাহ আছেন এবং তিনি আমাদের স্রষ্টা ও মালিক—এটুকু বিশ্বাসই কি ঈমানের পূর্ণ তাৎপর্য উপলব্ধির জন্য যথেষ্ট? নাকি আল্লাহর একত্ব স্বীকার, একমাত্র তাঁরই ইবাদত, তাঁর প্রতি আনুগত্য এবং তাঁর বিধান ও কর্তৃত্বের যথাযথ স্বীকৃতিসহ ঈমানের আরও গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে, যেগুলো সাধারণ মুসলিমদের কাছে স্পষ্ট হওয়া প্রয়োজন?!
ঈমানের এসব মৌলিক বিষয় সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা না থাকলে মানুষ নিজের বিশ্বাস ও আচরণের মধ্যে বিদ্যমান অসংগতি কিংবা কোনো কাজের আকীদাগত তাৎপর্য যথাযথভাবে উপলব্ধি করতে ব্যর্থ হতে পারে। ফলে কোনো কাজের বিধান জানা থাকলেও কেন তা ঈমানের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ বা সাংঘর্ষিক, সে সম্পর্কে তার উপলব্ধি অসম্পূর্ণ থেকে যেতে পারে।
আমাদের আকীদাবিশেষজ্ঞদের আলোচনায় আল্লাহ তা‘আলার সিফাত বা গুণাবলি নিয়ে বিস্তারিত ব্যাখ্যা, মতপার্থক্য ও তাত্ত্বিক বিতর্কের যথেষ্ট উপস্থিতি দেখা যায়। এসব আলোচনা ইসলামী আকীদাশাস্ত্রের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। তবে পাশাপাশি আল্লাহর রুবূবিয়্যাত ও উলূহিয়্যাতের তাৎপর্য, একমাত্র তাঁরই ইবাদতের অধিকার, তাঁর প্রতি পূর্ণ আনুগত্য এবং তাঁর বিধান ও কর্তৃত্বের স্বীকৃতি মানুষের ঈমানি চেতনায় কীভাবে সুস্পষ্টভাবে প্রতিষ্ঠা করা যায়—সে বিষয়েও গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
একইভাবে,
ওয়ায়িজ ও ধর্মীয় বক্তাদের আলোচনায় ইবাদত, আখলাক, সামাজিক সমস্যা ও বিভিন্ন আমল-সংক্রান্ত বিষয় গুরুত্ব পেলেও ঈমানের স্বরূপ, তার অপরিহার্য দাবি, ঈমানের সঙ্গে সাংঘর্ষিক বিশ্বাস ও আচরণ এবং ঈমান সংরক্ষণ ও দৃঢ় রাখার উপায় নিয়ে ধারাবাহিক আলোচনা আরও বিস্তৃত হওয়া প্রয়োজন।
অন্যদিকে,
ইসলামী দলের নেতাকর্মীদের বক্তব্য ও আলোচনায় সামাজিক সুবিচার, ন্যায় প্রতিষ্ঠা ও সুশাসনের মতো বিষয়গুলো গুরুত্ব পেলেও ঈমানের মৌলিক বিষয় ও এর অপরিহার্য দাবিসমূহ যথাযথ গুরুত্ব পায় কি না, তা নিয়েও ভাবনার অবকাশ রয়েছে। সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ইসলামের আদর্শ তুলে ধরার পাশাপাশি এসব আদর্শের ভিত্তি হিসেবে ঈমানের বিষয়গুলোও আলোচনায় যথাযথভাবে স্থান পাওয়া প্রয়োজন।
এখানে মূল প্রশ্নটি কেবল এই নয় যে,
কোনো বিশেষ উপলক্ষে কে কী করেছেন এবং তাঁর কাজের শরয়ি বিধান কী; বরং এর চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো, মুসলিম সমাজে ঈমানের মৌলিক শিক্ষা কতটা গভীরভাবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, মানুষকে আকীদাগত বিচ্যুতি থেকে রক্ষা করার জন্য কী ধরনের দীর্ঘমেয়াদি ও ধারাবাহিক শিক্ষামূলক উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে এবং এ ক্ষেত্রে আমরা আলিমগণ নিজেদের দায়িত্ব কতটা পালন করছি।
কোনো কাজের বাহ্যিক রূপ দেখেই তড়িঘড়ি করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির ঈমান নষ্ট হয়ে গেছে বলে সিদ্ধান্ত দেওয়া যায়, তবে তা কতটুকু ফলপ্রদ ও কার্যকর—তা প্রশ্নসাপেক্ষ। তবে এর বিপরীত দিকটিও বিবেচ্য—ঈমান-আকীদার পরিপন্থী কোনো কাজকে যথাযথ পর্যালোচনা ছাড়াই উপেক্ষা করাও সমীচীন নয়।
কোনো কাজের শরয়ি মূল্যায়ন এবং সেই কাজের কারণে কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির ঈমান সম্পর্কে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত—দুটি স্বতন্ত্র বিষয়। এ ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট কাজের প্রকৃতি, ব্যক্তির জ্ঞান, উদ্দেশ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনার পাশাপাশি শরয়ি বিধান প্রয়োগে সতর্কতা অবলম্বন করা জরুরি।
একই সঙ্গে, মানুষকে ঈমান ও আকীদার পরিপন্থী বিষয়গুলো সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা দেওয়া এবং সেগুলো থেকে সতর্ক করার ক্ষেত্রে আলিমসমাজ কতটা দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করছে, সে প্রশ্নেও গভীর আত্মসমালোচনা প্রয়োজন।
সুতরাং,
দুর্গাপূজা কিংবা অন্য কোনো উপলক্ষে মুসলমানদের এমন কোনো কর্মকাণ্ডে জড়িত হওয়ার বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়া অবশ্যই প্রয়োজন, যা ইসলামী আকীদা ও শরিয়তের পরিপন্থী।
তবে আমাদের দায়িত্ব যেন কেবল বিশেষ সময়ের প্রতিক্রিয়াশীল আলোচনা কিংবা ব্যক্তিবিশেষের ঈমান নিয়ে বিতর্কে সীমাবদ্ধ না থাকে। বরং সারা বছর ধরে সাধারণ মুসলিমদের মধ্যে তাওহীদ ও ঈমানের মৌলিক শিক্ষা প্রতিষ্ঠা, শিরক ও কুফরের প্রকৃতি সম্পর্কে সুস্পষ্ট ধারণা সৃষ্টি, সমকালীন চিন্তাধারা ও জীবনদৃষ্টির আকীদাগত তাৎপর্য ব্যাখ্যা এবং ঈমান সংরক্ষণের উপায় তুলে ধরার ধারাবাহিক উদ্যোগ গ্রহণ করা প্রয়োজন।
এ উদ্যোগ হতে হবে জ্ঞানভিত্তিক, দায়িত্বশীল ও শিক্ষামুখী—যাতে মানুষ কোনটি ঈমানের পরিপন্থী, কেবল তা-ই জানবে না; বরং কেন তা পরিপন্থী, কীভাবে তা থেকে বেঁচে থাকতে হবে এবং কীভাবে নিজের ঈমানকে দৃঢ় রাখতে হবে, সেটিও বুঝতে পারে।
কারণ,
অন্যের ঈমান নিয়ে প্রশ্ন তোলার পাশাপাশি তাঁর ঈমানি শিক্ষা কতটা নিশ্চিত করা হয়েছে, সে প্রশ্নও আমাদের নিজেদের কাছে তোলা জরুরি।
ঈমানের বিচ্যুতি চিহ্নিত করা যেমন আলিমদের দায়িত্ব, তেমনি সেই বিচ্যুতি থেকে মানুষকে রক্ষা করার জন্য ঈমানের বিশুদ্ধ ও সুস্পষ্ট শিক্ষা পৌঁছে দেওয়াও তাঁদের অপরিহার্য দায়িত্ব।
আত্মসমালোচনার এ দিকটি উপেক্ষা করে বিশেষ বিশেষ উপলক্ষে আমরা যতই উচ্চকণ্ঠ হই না কেন, মুসলিম সমাজে সুদৃঢ় ঈমানি সচেতনতা গড়ে তোলার দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য অপূর্ণ থেকে যাওয়ার আশঙ্কা থাকবে!