গতকাল বাদ মাগরিব দারুর রিয়াদাহ, চট্টগ্রাম নামে একটি নতুন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কার্যক্রমের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে উপস্থিত থাকার সুযোগ হয়েছিল।

তাযকিয়া ট্রাস্টের উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত সম্পূর্ণ অলাভজনক এ প্রতিষ্ঠানটি দ্বীনি শিক্ষার বিকাশ, আধুনিক জ্ঞানচর্চা এবং দ্বীন ও উম্মাহর কল্যাণে নিবেদিতপ্রাণ জনশক্তি গড়ে তোলার লক্ষ্যে পরিচালিত হবে বলে উদ্যোক্তারা জানিয়েছেন।

ট্রাস্টের সূচনালগ্ন থেকেই এর সদস্য হিসেবে যুক্ত হওয়ার জন্য আমাকে বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছিল। তবে আমি মনে করেছি, প্রতিষ্ঠানটির কোনো প্রাতিষ্ঠানিক দায়িত্বে সরাসরি সম্পৃক্ত হওয়ার পরিবর্তে একজন শুভাকাঙ্ক্ষী হিসেবে বাইরে থেকে এর অগ্রযাত্রায় সহযোগিতা করাই আমার জন্য অধিকতর উপযোগী হবে।

উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে বহু আলিম, শিক্ষাবিদ, চিকিৎসক, রাজনীতিক ও আইনজীবী উপস্থিত ছিলেন। দেশের মাদরাসা শিক্ষার বিদ্যমান সংকট ও সীমাবদ্ধতার প্রেক্ষাপটে দারুর রিয়াদাহকে ঘিরে উদ্যোক্তাদের পরিকল্পনা ও ভবিষ্যৎ ভাবনা আশাবাদী হওয়ার সম্ভাবনা তৈরি করেছে।

প্রতিষ্ঠানটির অন্যতম লক্ষ্য এমন যোগ্য, সৎ ও দায়িত্বশীল আলিম গড়ে তোলা, যাঁরা একদিকে ইসলামী জ্ঞানে গভীর পাণ্ডিত্য অর্জন করবেন, অন্যদিকে আধুনিক জ্ঞান-বিজ্ঞানেও প্রয়োজনীয় দক্ষতা ও সম্যক ধারণা লাভ করবেন। একই সঙ্গে তাঁরা সমকালীন চ্যালেঞ্জ মোকাবিলা, সমাজের কল্যাণে অবদান রাখা এবং আধুনিক যুগের নেতৃত্বদানের উপযোগী প্রজ্ঞা, যোগ্যতা ও দূরদর্শিতা অর্জন করবেন।

উদ্যোক্তাদের বক্তব্য অনুযায়ী,

প্রতিষ্ঠানটি বেসরকারি উদ্যোগে সম্পূর্ণ অলাভজনক ভিত্তিতে ধারাবাহিকভাবে কামিল স্তর পর্যন্ত পরিচালিত হবে। জাতীয় শিক্ষাক্রম ও পাঠ্যসূচির সঙ্গে সমন্বয় রেখে নতুন সিলেবাস ও কারিকুলাম প্রণয়নের পাশাপাশি আধুনিক শিক্ষা-উপকরণ, প্রযুক্তিগত সুবিধা এবং জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার উপযুক্ত পরিবেশ নিশ্চিত করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

এ ছাড়া, কওমি শিক্ষাধারার আদলে মূল কিতাবনির্ভর শাস্ত্রীয় শিক্ষার জন্য পৃথক একটি শাখা প্রতিষ্ঠারও পরিকল্পনা রয়েছে। শাখাটি প্রায় অবৈতনিক কিংবা নামমাত্র ফি-এর বিনিময়ে পরিচালিত হবে বলে জানা গেছে। এর মাধ্যমে ইসলামী শাস্ত্রে গভীর পাণ্ডিত্যসম্পন্ন আলিমের ক্রমবর্ধমান সংকট নিরসনে প্রতিষ্ঠানটি উল্লেখযোগ্য অবদান রাখতে সক্ষম হবে বলে আশা করা যায়।

উদ্যোক্তাদের স্বপ্ন,

দারুর রিয়াদাহ একসময় আধুনিক যুগের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, জ্ঞানচর্চা ও গবেষনার সুযোগ-সুবিধাসমৃদ্ধ এবং আন্তর্জাতিক মানসম্পন্ন একটি শিক্ষাকেন্দ্র হিসেবে গড়ে উঠবে। তাঁদের মধ্যে এ স্বপ্ন বাস্তবায়নের যে আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও প্রত্যয় লক্ষ করেছি, তা নিঃসন্দেহে আশাব্যঞ্জক।

তবে এ ধরনের উদ্যোগের সাফল্য কেবল সুন্দর পরিকল্পনা কিংবা প্রাথমিক উদ্দীপনার ওপর নির্ভর করে না। এর জন্য প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার, প্রাতিষ্ঠানিক শৃঙ্খলা, যোগ্য নেতৃত্ব, দক্ষ ব্যবস্থাপনা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং সংশ্লিষ্ট সবার নিরবচ্ছিন্ন প্রচেষ্টা। বিশেষত, প্রতিষ্ঠানের ঘোষিত লক্ষ্য ও আদর্শের সঙ্গে বাস্তব কার্যক্রমের সামঞ্জস্য বজায় রাখা এবং সময়ের সঙ্গে শিক্ষার গুণগত মান উন্নত করা একটি দীর্ঘমেয়াদি চ্যালেঞ্জ।

এখানেই আমার বিশেষ উদ্বেগের জায়গা।

আমরা আলিমসমাজ এ ধরনের উদ্যোগের লক্ষ্য ও আদর্শ বাস্তবায়নে কতটা নিষ্ঠা, দায়িত্বশীলতা ও ধারাবাহিকতার পরিচয় দিতে পারব?

একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চেয়ে তার আদর্শ অক্ষুণ্ন রেখে গুণগত মান বজায়সহ দীর্ঘদিন পরিচালনা করা অনেক বেশি কঠিন। অতীতের অভিজ্ঞতা থেকেও এ বিষয়ে আত্মসমালোচনা ও বাস্তবসম্মত মূল্যায়নের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করা যায়।

দারুর রিয়াদাহর স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে হলে উদ্যোক্তাদের আন্তরিকতার পাশাপাশি প্রয়োজন যোগ্য ও নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষকমণ্ডলী, সুপরিকল্পিত শিক্ষাক্রম, কার্যকর প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থাপনা এবং আলিমসমাজের সক্রিয় সহযোগিতা ও প্রজ্ঞাপূর্ণ দিকনির্দেশনা।

সর্বোপরি,

এ উদ্যোগকে ব্যক্তি, গোষ্ঠী বা দলবিশেষের পরিচিতি ও স্বার্থের ঊর্ধ্বে রেখে দ্বীন ও উম্মাহর বৃহত্তর কল্যাণে পরিচালিত করার দৃঢ় মানসিকতা থাকতে হবে।

দারুর রিয়াদাহ, চট্টগ্রামের আনুষ্ঠানিক যাত্রা সফল হোক। প্রতিষ্ঠানটি তার ঘোষিত লক্ষ্য ও উদ্দেশ্য বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বীনি শিক্ষার উৎকর্ষ, শাস্ত্রীয় পাণ্ডিত্যের বিকাশ, যোগ্য আলিম গঠন এবং জ্ঞানচর্চা ও গবেষণার ক্ষেত্রে অর্থবহ অবদান রাখতে সক্ষম হোক—এই কামনা করি।