গতকাল কুষ্টিয়া ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে একটি ফ্যাকাল্টি মিটিং এবং একটি পিএইচ.ডি. ডিফেন্সে পরীক্ষক হিসেবে অংশগ্রহণের সুযোগ হয়েছিল।

সফরের শুরুতেই ঝিনাইদহে পৌঁছে মনে হলো—কোথাও ওঠার আগে প্রিয় শায়খ খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহ.)-এর কবরটি একবার জিয়ারত করে যাই।

তাঁর স্মৃতির সঙ্গে কিছুক্ষণ একান্তে থাকা, তাঁর জন্য দুআ করা এবং তাঁর রেখে যাওয়া কর্ম থেকে কিছু অনুপ্রেরণা নেওয়ার আকাঙ্ক্ষাই যেন আমাদেরকে সেদিকে টেনে নিল। সঙ্গে ছিলেন আমাদের বিভাগের সভাপতি প্রফেসর ড. মমতাজ উদ্দিন কাদেরী।

রাত হয়ে যাওয়ায় তাঁর প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ও ট্রাস্টে তখন আর কারও সঙ্গে সাক্ষাৎ করা সম্ভব হয়নি। তবে প্রতিষ্ঠানটির বিভিন্ন কার্যক্রম দেখে সত্যিই অভিভূত হলাম। মনে হলো, একজন মানুষ চলে গেলেও তাঁর চিন্তা, কর্ম ও রেখে যাওয়া খিদমত কত দীর্ঘকাল মানুষের মাঝে বেঁচে থাকতে পারে! এসব প্রতিষ্ঠান যুগের পর যুগ তাঁর স্মৃতি বহন করবে এবং ইনশাআল্লাহ দ্বীন, ইলম ও মানুষের কল্যাণে তাঁর অবদানের সাক্ষ্য হয়ে থাকবে।

সেখান থেকে বের হওয়ার সময় মনে একটি গভীর ভাবনার উদয় হলো—

আল্লাহ তা‘আলা যাকে দিয়ে চান, তাঁর মাধ্যমে উম্মাহর জন্য কত বিশাল খিদমত গ্রহণ করেন! মানুষ একদিন চলে যায়; আমরাও চলে যাব। হয়তো আমাদের কারও হাতে খুব বেশি সময়ও নেই।

কিন্তু প্রশ্ন হলো—

আমরা চলে যাওয়ার পর উম্মাহর জন্য কী রেখে যাব? আমাদের কাজের কী এমন অবশেষ থাকবে, যা আমাদের অনুপস্থিতিতেও দ্বীন ও মানুষের উপকারে আসবে?!

শায়খের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ও ট্রাস্ট যেন সেই প্রশ্নটি আবার নতুন করে মনে করিয়ে দিল। তাঁর রেখে যাওয়া কাজগুলো দেখে অনুপ্রেরণা লাভ করলাম এবং নিজের দিকে ফিরে তাকানোর সুযোগ পেলাম।

শায়খের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত কিছু স্মৃতিও রয়েছে। তিনি চট্টগ্রামে কয়েকবার আমার বাসায় এসেছেন। বিভিন্ন বিষয়ে তাঁর সঙ্গে একান্তে আলাপ-আলোচনারও সুযোগ হয়েছে।

আমার লেখালেখি দেখে তিনি আনন্দিত হতেন এবং উৎসাহ যোগাতেন; আমিও তাঁকে তাঁর বহুমুখী দ্বীনি খিদমতের জন্য উৎসাহিত করার চেষ্টা করতাম। তিনি ‘ইসলামী আইন ও বিচার’ পত্রিকার সম্পাদনা বোর্ডের একজন সদস্য ছিলেন, সেই হিসেবেও তাঁর সঙ্গে নানা বিষয় নিয়ে অভিজ্ঞতা ও ভাবনা বিনিময় হয়েছে।

আমার ‘বিদ‘আত’ সিরিজের বইগুলো দেখে তিনি বিশেষ আনন্দ প্রকাশ করেছিলেন। কয়েকটি বই সম্পর্কে তাঁর একটি মন্তব্য আজও মনে আছে। তিনি বলেছিলেন—“এগুলো আমার লেখার চিন্তা ছিল; আপনি লিখেছেন—তাই ভালোই হলো, আমি দায়মুক্ত হলাম।” তাঁর সেই আন্তরিক মন্তব্য ও স্নেহমিশ্রিত উৎসাহ আজও আমার কাছে মূল্যবান স্মৃতি হয়ে আছে।

কুষ্টিয়া থেকে ফেরার পথেও আবার খুব অল্প সময়ের জন্য শায়খের প্রতিষ্ঠানে যাওয়ার সুযোগ হলো। মনে হলো, আরেকবার গিয়ে তাঁর রেখে যাওয়া কর্মের পরিবেশ থেকে কিছু মনের খোরাক ও অনুপ্রেরণা নিয়ে আসি।

এবার শায়খের বড় ছেলে, ট্রাস্টের চেয়ারম্যান খন্দকার উসামা (যাদাহুল্লাহু ইলমান ওয়া তাওফীকান)-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ হলো। তাঁর সঙ্গে ছিলেন তাঁর ভগ্নিপতি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের অধ্যাপক ড. নুরুল আলম। আমাদের হঠাৎ দেখে তাঁরা অত্যন্ত আনন্দিত হলেন এবং অত্যন্ত আন্তরিকতার সঙ্গে আমাদের স্বাগত জানালেন। তাঁরা অনুরোধ করলেন—যতবারই এদিকে আসি, যেন তাঁদের মেহমান হই এবং সেখানেই অবস্থান করি।

ফেরার সময় সামান্য যে পথটুকু হেঁটেই যাওয়া সম্ভব, সেই পথও তাঁরা আমাদের গাড়িতে পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করলেন। তাঁদের আন্তরিকতা, সৌজন্য ও মেহমানদারি সত্যিই হৃদয় ছুঁয়ে গেল।

একজন আলিমের জীবনের সবচেয়ে বড় পরিচয় হয়তো তাঁর রেখে যাওয়া বইয়ের সংখ্যা কিংবা তাঁর বক্তৃতার স্মৃতি দিয়ে নয়; বরং তিনি চলে যাওয়ার পরও তাঁর চিন্তা, প্রতিষ্ঠান, ছাত্র, শিক্ষা ও খিদমত কতটা মানুষের উপকার করে যেতে থাকে—তা দিয়েই তাঁর জীবনের প্রভাব অনেকাংশে পরিমাপ করা যায়।

শায়খ খন্দকার আবদুল্লাহ জাহাঙ্গীর (রাহ.)-এর রেখে যাওয়া প্রতিষ্ঠান ও কর্মযজ্ঞের সামনে দাঁড়িয়ে তাই নিজের কাছেই যেন প্রশ্ন জাগল—আমাদের জীবনও তো একদিন শেষ হবে; তখন আমাদের পেছনে কী থাকবে?!

আল্লাহ তা‘আলা শায়খের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠান ও ট্রাস্টকে কবুল করুন, এর কার্যক্রমে বরকত দান করুন এবং যুগ যুগ ধরে এ প্রতিষ্ঠানকে দ্বীনের আলো, ইলমের জ্যোতি ও উম্মাহর কল্যাণের মারকায হিসেবে টিকিয়ে রাখুন।

আর আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকেও দ্বীন ও মিল্লাতের খিদমতের জন্য কবুল করুন, এমন কিছু কাজ করে যাওয়ার তাওফিক দিন—যার উপকার আমাদের চলে যাওয়ার পরও অব্যাহত থাকে।

আমীন, ইয়া রাব্বাল আলামীন!