বর্তমান বাস্তবতায় আলিমদের একটি উল্লেখযোগ্য অংশের জাতীয় সংসদে জনগণের প্রতিনিধি হিসেবে প্রবেশ আলিমসমাজের জন্য নিঃসন্দেহে একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্জন। এর মধ্য দিয়ে তাঁদের প্রতি মানুষের আস্থা ও প্রত্যাশা যেমন বেড়েছে, তেমনি বেড়েছে দায়িত্ব ও জবাবদিহিও।
মুফতী আমীর হামজা সাহেবের সঙ্গে আমার ব্যক্তিগত পরিচয় নেই; কখনো দেখা-সাক্ষাৎও হয়নি। তবে তিনি একসময় মজলুম ছিলেন—এ কারণে তাঁর প্রতি আমার হৃদয়ে বিশেষ ভালোবাসা রয়েছে। আমি তাঁর কল্যাণ কামনা করি। সেই আন্তরিকতা ও কল্যাণকামিতা থেকেই তাঁর প্রতি এ নিবেদন। কথাগুলো তিনি কীভাবে নেবেন—জানি না। তবে আমার উদ্দেশ্য তাঁকে ছোট করা নয়; বরং তাঁর আরও ইতিবাচক ভূমিকা প্রত্যাশা করা।
একসময় তিনি ছিলেন মূলত একজন ওয়ায়িজ। ওয়াজের মঞ্চে তাঁর কোনো বেফাঁস, অতিরঞ্জিত কিংবা ভিত্তিহীন বক্তব্যের দায় সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের পক্ষে এড়িয়ে যাওয়া তুলনামূলকভাবে সহজ ছিল। কিন্তু এখন তিনি একটি দলের সংসদ সদস্য। ফলে তাঁর বক্তব্য ও আচরণের প্রভাব ব্যক্তিগত গণ্ডি ছাড়িয়ে দলের ভাবমূর্তির ওপরও পড়ে।
আমীর হামজা সাহেবের জনপ্রিয়তা ও ধর্মীয় আবেগ সৃষ্টির ক্ষমতাকে অস্বীকার করার সুযোগ নেই। তবে ওয়াজের মঞ্চে তাঁর কিছু বক্তব্যের অতিরঞ্জন, অসংযত ভাষা ও সমালোচনার আক্রমণাত্মক ভঙ্গি প্রতিনিয়ত অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্ক সৃষ্টি করছে।
বিশেষত, অন্য দলের আলিমদের সমালোচনায় অনেক সময় দরদের চেয়ে ক্ষোভ এবং তথ্য ও যুক্তির চেয়ে তীর্যক ও অপ্রাসঙ্গিক মন্তব্যই বেশি প্রকাশ পায়। অথচ একজন দা‘ঈর সমালোচনায় শালীনতা, ইনসাফ, কল্যাণকামিতা ও ইলমনির্ভরতার সমন্বয় থাকা অপরিহার্য।
কেউ তাঁর কথা বা আচরণে আপনাকে কিংবা আপনার দলকে আঘাত করতে পারে; কিন্তু তাই বলে আপনিও আপনার কথায় তাঁকে আঘাত করবেন—একজন দা‘ঈর কাছে এমনটি প্রত্যাশিত নয়। বরং বিরূপ আচরণের জবাব হতে পারে সৌজন্য, আর বিদ্বেষের জবাব ভালোবাসা। কাঁটার জবাবে কাঁটা নয়, ফুল দিয়েই বরণ করার মানসিকতা একজন দা‘ঈর মধ্যে থাকা উচিত।
একজন সংসদ সদস্যের ওয়াজ করা কিংবা ধর্মীয় মাহফিলে বক্তব্য দেওয়ায় নীতিগত কোনো অসুবিধা নেই। তবে সে বক্তব্য হওয়া উচিত কুরআন-সুন্নাহর আলোকে, তথ্য ও যুক্তিনির্ভর এবং শালীন ভাষায়। রাজনৈতিক প্রসঙ্গ আসতেই পারে; কিন্তু ধর্মীয় মাহফিলকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের প্রতি ব্যক্তিগত বা দলীয় আক্রমণের মঞ্চে পরিণত করা সমীচীন নয়। রাজনৈতিক মঞ্চের সমালোচনার ভাষা আর ধর্মীয় মঞ্চের নসিহত ও দাওয়াতের ভাষা এক হওয়া উচিত নয়।
রাজনৈতিক মঞ্চে প্রতিপক্ষের কঠোর সমালোচনা করা যেতে পারে, ক্ষেত্রবিশেষে প্রয়োজনও পড়ে; তবে সেখানেও কথার জোরের চেয়ে তথ্যের ভিত্তি, যুক্তির ধার ও বক্তব্যের প্রাসঙ্গিকতা বেশি গুরুত্বপূর্ণ। সমালোচনার শক্তি কণ্ঠের উচ্চতায় নয়, যুক্তির দৃঢ়তায়; বক্তব্যের তীক্ষ্ণতা বাগাড়ম্বরে নয়, তথ্যের নির্ভুলতায়।
বিষয়টি শুধু আমীর হামজা সাহেবের একার নয়; সংসদে নির্বাচিত সব আলিম ও ধর্মীয় বক্তার ক্ষেত্রেই এ কথা প্রযোজ্য। তাঁদের সংযত ও প্রজ্ঞাপূর্ণ বক্তব্য আলিমসমাজের মর্যাদা বাড়াতে পারে; বিপরীতে, অসতর্ক উচ্চারণ সেই মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করতে পারে।
তাই সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলেরও দায়িত্ব রয়েছে—
সমালোচনায় ভারসাম্যহীনতা কিংবা শালীনতার সীমালঙ্ঘন দেখা দিলে তা উপেক্ষা না করে দ্রুত প্রয়োজনীয় সংশোধনমূলক পদক্ষেপ নেওয়া এবং সংশ্লিষ্ট বক্তাদের আরও সংযত ও দায়িত্বশীল হতে কার্যকরভাবে উৎসাহিত করা।
আমীর হামজা সাহেবের প্রতি আমার আন্তরিক প্রত্যাশা,
তিনি তাঁর জনপ্রিয়তা ও প্রভাবকে আরও গঠনমূলক, সংযত ও দায়িত্বশীলভাবে কাজে লাগাবেন। তাঁর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, এ সমালোচনার উদ্দেশ্য তাঁকে হেয় করা নয়; বরং তাঁর বক্তব্য ও ভূমিকা আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও কল্যাণকর হয়ে উঠুক, সেটিই কাম্য।
সময় বদলেছে, ভূমিকা বদলেছে, দায়িত্বও বেড়েছে। তাই ওয়াজের মঞ্চের পরিচিত অভ্যাস থেকে সংসদীয় দায়িত্বের উপযোগী বক্তব্য ও আচরণে উত্তরণ জরুরি।
মর্যাদা শুধু পদে নয়; কথার সংযম, সমালোচনায় ইনসাফ এবং দায়িত্ব পালনের প্রজ্ঞাতেই তার প্রকৃত প্রকাশ।